ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হল প্রতিবন্ধকতা বিষয়টি। এই বছরের জুলাই মাসে শুরু হতে চলেছে ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে-৬। গতবারের সমীক্ষায় প্রথমবার প্রতিবন্ধীদের পরিসংখ্যান নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। ভারতের সমস্যা হল, ভিন্ন ভিন্ন সমীক্ষাতে প্রতিবন্ধীদের সম্পর্কে ভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করা হয়। ফলে আমাদের দেশে জনগণনা, এনএসএসও এবং ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সমীক্ষা সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিসংখ্যান দেয়। ফলে প্রতিবন্ধী আন্দোলনের কর্মীরা মনে করেন, আমরা কখনোই সঠিক পরিসংখ্যান জানতে পারি না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে পৃথিবীর অন্তত ১৬% মানুষের কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা আছে। অথচ গত জনগণনা অনুসারে আমাদের জনসংখ্যার মাত্র ২.২১% প্রতিবন্ধী। ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সমীক্ষা-৫ অবশ্য জানিয়েছিল প্রতিবন্ধীদের সংখ্যা এক শতাংশের বেশি নয়। সঠিক পরিসংখ্যান নেওয়ার পদ্ধতি, সমীক্ষকদের প্রশিক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ে প্রতিবন্ধী আন্দোলনের কর্মীরা বিভিন্ন সময়ে সরকারি আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এ বছরের ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভের আগেও এই ধরনের বৈঠক হয়েছে, কিন্তু বৈঠক নিষ্ফলা। কারণ স্বাস্থ্য দফতরের পরামর্শদাতা কমিটি বিষয়টি পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। আন্দোলনের কর্মীরা মনে করেন সঠিক পরিসংখ্যানের অভাবে এদেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা নানাভাবে বঞ্চিত হন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সরকার কি সঠিক পরিসংখ্যানের গুরুত্ব বোঝে না? সেকথা তো সত্যি নয়। সাস্টেনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস (এসডিজি) লক্ষ্যপূরণের অন্যতম শর্ত হল সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা। খসড়া ন্যাশনাল ডিসেবিলিটি পলিসিতে সামাজিক ন্যায় দপ্তর পরিষ্কারভাবে ব্যক্ত করেছে পরিসংখ্যানের গুরুত্ব। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সমীক্ষাতে প্রতিবন্ধী মানুষ অন্তর্ভুক্ত হলেন না কেন? সরকারি আধিকারিকদের বক্তব্য, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পরিচয় তাঁদের মেডিকাল শংসাপত্র। যাঁরা সমীক্ষা করবেন তাঁরা তো ডাক্তার নন, তাই তাঁদের পক্ষে এই শংসাপত্র পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। তাছাড়া সাধারণ মানুষকে এই বিষয়গুলি নিয়ে প্রশ্ন করলে তাঁরা প্রশ্নের মানে বুঝতে পারেন না। কাজেই সঠিক সংখ্যা জানা যায় না।

আরো পড়ুন ভারত সরকারের অস্পষ্ট প্রতিবন্ধকতা নীতির বিরুদ্ধে লড়াই

এইভাবে সাধারণ মানুষের উপর দোষারোপ করে সরকার কি জরুরি কাজ বাদ দিতে পারে? যাঁরা সমীক্ষা করতে যাবেন, তাঁদের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব কি সরকারি দপ্তরের নয়? আমরা জনগণনার দায়িত্বে থাকা কর্তাদের কাছে আগেও শুনেছি, প্রতিবন্ধকতা নিয়ে প্রশ্ন করলে সাধারণ মানুষ রাগ করেন, কারণ তাঁরা মনে করেন পরিবারের কেউ প্রতিবন্ধী চিহ্নিত হলে তা লজ্জার ব্যাপার এবং একথা লুকিয়ে রাখাই ভাল। ভারতবর্ষে প্রচুর খরচ করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিত হয়। অথচ ‘প্রতিবন্ধকতা পূর্ব জন্মের পাপের ফল’ – এই প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে জনমত তৈরির কোনো প্রচেষ্টা চোখে পড়ে না। দেশের সাধারণ নাগরিকদের ভুল বিশ্বাস বা অবৈজ্ঞানিক মনোভাব দূর করার কাজও কি সরকারের নয়? আর সমীক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পদ্ধতি তো সারা পৃথিবীতেই নানা দেশের সরকার নানাভাবে নিয়েছে। সেই পদ্ধতিগুলির কোনটি আমাদের দেশের জন্য উপযুক্ত তা নিয়ে ভাবনাচিন্তার কাজও কি সরকার শুরু করেছে? এদেশের প্রতিবন্ধী আন্দোলনের কর্মীরা মনে করেন ওয়াশিংটন গ্রুপ অফ কোয়েশ্চেনস, যা পৃথিবীর ষাটের বেশি দেশ ব্যবহার করেছে, তা আমাদের দেশের জন্যেও উপযুক্ত। এই সার্ভেতে কখনোই সরাসরি জিজ্ঞেস করা হয় না “আপনার বাড়িতে কেউ দৃষ্টিহীন আছেন কি?” বরং প্রশ্নগুলিকে অনেক নরম করে নেওয়া হয়। যেমন “আপনার পরিবারে চশমা পরেও দেখতে পান না এরকম কেউ আছেন কি?” অথবা “আপনার পরিবারে এমন কেউ আছেন কি, যিনি লাঠির সাহায্য ছাড়া চলতে পারেন না?” বোঝাই যায়, এই ধরনের প্রশ্ন করলে সাধারণ মানুষ রাগও করবেন না এবং সহজে বুঝে উত্তরও দিতে পারবেন। অদ্ভুতভাবে আমাদের সরকার মনে করে, প্রশ্নের ধরন বদল না করে সাধারণ মানুষ উত্তর দিতে পারেন না বলে দেওয়াই সহজ।

এর আগেও ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভের পর প্রশ্ন উঠেছিল, সমীক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যাপারে। এমনকি সমীক্ষকরা ঠিকমত তাঁদের টাকাপয়সা পাননি, সার্ভে চলার সময়ে অসুস্থ হলেও ছুটি মেলেনি – এসব নিয়েও আলোচনা হয়েছিল। আরেকটি কথা আমরা শুনেছিলাম। কর্ণাটকের গ্রামে গিয়ে সমীক্ষার কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল গুরগাঁওয়ের এক এজেন্সিকে। ফলে বিপুল ভাষাগত অসুবিধা হয়। এই ধরনের সমীক্ষা থেকে যে আমরা সঠিক তথ্য পাব না তা বলাই বাহুল্য। অথচ গার্হস্থ্য হিংসা বা যৌন হিংসার মত তথ্য এই সমীক্ষা থেকে আমাদের পাওয়ার কথা।

এ বছরের সমীক্ষায় নতুন করে যোগ হয়েছে কোভিড সংক্রান্ত প্রশ্নাবলী। তাছাড়াও মহিলারা মোবাইল ফোন কতটা ব্যবহার করছেন, বিশেষ করে টাকা পয়সা লেনদেনের ক্ষেত্রে, সে প্রশ্নও যুক্ত করা হয়েছে। তথ্যগুলি জানা যে জরুরি তাতে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু তার জন্য প্রতিবন্ধকতার মত বিষয় কেন বাদ দিতে হবে তার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনিতে দেশের প্রধানমন্ত্রী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের “দিব্যাঙ্গ” বলে সম্বোধন করেন। তাঁর ভাষণে আমরা প্রায়ই শুনি “সব কা সাথ সব কা বিকাশ”। কিন্তু “সব” এর মধ্যে কিছু কিছু গোষ্ঠী কখনো অন্তর্ভুক্ত হয় না। এ বছরের ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে তাই প্রতিবন্ধীদের সমাজে অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর বদলে তাঁদের আরও দূরে সরিয়ে দিল।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.