২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে ৩৪% আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। মনোনয়ন পর্বে শাসক দল তৃণমূলের ভয়ে বিরোধী পক্ষ কল্কে পায়নি। ২০১৮ সালের মনোনয়ন পর্বের কিছু ছবি সোশাল মিডিয়ায় ফিরে ফিরে আসে। গোঘাটে তৃণমূলের লুম্পেন বাহিনী বিরোধী দলের এক মহিলা প্রার্থীর শাড়ি ধরে টানছে প্রকাশ্য রাস্তায়। একজন (পরে জানা যায় তৃণমূলের সক্রিয় কর্মী) সেই মহিলা প্রার্থীর পশ্চাদ্দেশে লাথি মারছে। এমন নারকীয় দৃশ্য দেখে লজ্জায় মাথা নত করেছিল বাংলা। অবশ্য শাসকের তাতে বিন্দুমাত্র টনক নড়েনি। সিপিএমের প্রাক্তন সাংসদ ডাঃ রামচন্দ্র ডোম রক্তাক্ত হয়েছিলেন দলীয় প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দিতে গিয়ে। বালুরঘাটে মাঝরাস্তায় বিরোধী দলের প্রার্থী রক্তস্নাত পড়েছিলেন। এমন অজস্র খণ্ড চিত্র খুঁজে পাওয়া যাবে গতবারের পঞ্চায়েত নির্বাচনের। নির্বাচনের দিন গণতন্ত্র হত্যার কথা বলতে গেলে পুনরুক্তি হয়ে যাবে। শুধুমাত্র নির্বাচনের দিন ১৩ জন খুন হয়েছিলেন।

গতবারের মত এবারের নির্বাচনেও তৃণমূল একই কায়দায় বিরোধীশূন্য পঞ্চায়েত গড়ার চেষ্টায় কোনো ত্রুটি রাখেনি। মিনাখাঁয় সিপিএম পার্টি অফিস ঘিরে রেখে মনোনয়নে বাধা দিয়েছে। সিপিএমের মহিলা নেত্রী সোমা দাস মুখার্জীকে শাসক দলের আক্রমণে গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ায় তৃণমূল কোনো বিরোধী দলকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেয়নি। পুরো ব্লকে বিরোধী দল এবং নির্দল মিলিয়ে মাত্র তিনখানা মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিনে বাম-কংগ্রেস একজোট হয়ে মিছিল করে মনোনয়নপত্র জমা দিতে যাওয়ার পথে শাসক দল আক্রমণ করে। অভিযোগ, স্বয়ংক্রিয় রাইফেল থেকে গুলি চলে। বাম-কংগ্রেস জোটের অভিযোগ, বহু মানুষ গুলিবিদ্ধ হন। বেশ কয়েকজন সঙ্কটজনক অবস্থায় হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। এই চোপড়াতেই দিন কয়েক আগেই সিপিএমের এরিয়া কমিটির সম্পাদক এবং কংগ্রেস নেতৃত্বকে তৃণমূল অপহরণ করেছিল বলেও অভিযোগ আছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

তাহলে এবারেও কি বিরোধী শিবির কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি? তড়িঘড়ি নির্বাচন ঘোষণা, মনোনয়নে অল্প সময় ইত্যাদি কারণে অগোছালো হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছে? প্রধান বিরোধী দল বিজেপিকে দেখলে আপাতভাবে সেরকমই মনে হবে। বিজেপি কেন্দ্রীয় বাহিনী ও মনোনয়নের সময় বৃদ্ধির দাবিতে আদালতে গেছে। রাস্তাতেও বিজেপি এবং শাসক দলের সংঘাত বিশেষ চোখে পড়েনি। কিন্তু শাসক দলকে এবার মনোনয়ন পর্বে কড়া প্রতিরোধের মুখে ফেলেছে বাম শিবির। মুর্শিদাবাদের ডোমকল, ইসলামপুর, রানীনগর ইত্যাদি জায়গায় বাম, কংগ্রেস জোট বেঁধে রাস্তায় শাসক দলের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যেভাবে রুখে দাঁড়িয়েছে, তা এককথায় তৃণমূলের কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল। সংবাদমাধ্যম খবর করছে, রণং দেহি সিপিএম। খবরের কাগজে বেরোচ্ছে, আরামবাগ মহকুমা কাঁপাচ্ছে সিপিএম।

যেখানে পাঁচ বছর আগে পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়ন জমা দেওয়ার আগের রাতে দেবু দাস আর ঊষারানী দাসকে জীবন্ত পুড়িয়ে খুন করেছিল তৃণমূল, সেই কাকদ্বীপে ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টকে (আইএসএফ) সঙ্গে নিয়ে সিপিএম প্রায় সমস্ত আসনে মনোনয়ন জমা দিয়েছে। কেষ্টহীন বীরভূমে তৃণমূল পার্টি অফিস চলে গেছে কংগ্রেসের দখলে। বর্ধমান ২ নং ব্লকের বড়শুলে সিপিএমের মনোনয়ন জমা দেওয়ায় বাধা দিতে এসে ব্যাপক প্রতিরোধের মুখে পড়েছে তৃণমূল। শেষপর্যন্ত তৃণমূল বিধায়ক কৃতকর্মের জন্য প্রকাশ্যে সিপিএম নেতৃত্বের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। সোশাল মিডিয়ায় সে ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।

২০১৮ সালে এসব দৃশ্য ছিল অকল্পনীয়। রায়না, কালনা, ময়নাগুড়ি, বারাসাত, ঘাটাল সমেত রাজ্যের বেশিরভাগ এলাকায় সিপিএম মিছিল করে প্রায় ১০০% নমিনেশন জমা দিয়েছে। মুর্শিদাবাদে বামেদের যোগ্য সঙ্গত করেছে কংগ্রেস। মনোনয়ন পর্বে চমকপ্রদ উত্থান ঘটেছে আইএসএফ দলের। ভাঙড় ১ ও ২ নং ব্লকে শাসক দলের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তারা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। আইএসএফের ভয়ে কুখ্যাত আরাবুল ইসলাম সপুত্র পরপর দুদিন পুলিসি পাহারায় আত্মগোপন করে থেকেছে। শওকত মোল্লারও প্রায় একই অবস্থা। ২০১৮ সালে এমনটা ভাবা যেত না। নওশাদ সিদ্দিকির নেতৃত্বে আইএসএফ বহুদিন বাদে বাংলায় জঙ্গি প্রতিরোধ ফিরিয়ে এনেছে। বাম, কংগ্রেস, আইএসএফ অধিকাংশ আসনে মনোনয়ন জমা দিয়েছে। আদালত নির্দেশ দিয়েছে পুরো বাংলায় কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে নির্বাচন করাতে হবে। কেন্দ্রীয় বাহিনী যদি সদর্থক ভূমিকা নেয়, তাহলে ২০২৩ পঞ্চায়েত নির্বাচন তৃণমূলের কাছে বিপজ্জনক। ২০০৮ ফিরে আসার অপেক্ষায়? সময় উত্তর দেবে।

এবার প্রশ্ন হল, সিপিএম কীভাবে এই প্রতিরোধ গড়ে তুলল? নিশ্চিতভাবে একাধিক কারণে ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে শূন্য পাওয়া সিপিএম ২০২৩ নির্বাচনের মাঠে কিছুটা হলেও দাপাচ্ছে। প্রথম কারণ অবশ্যই দলের সাংগঠনিক পরিবর্তন। মহম্মদ সেলিম রাজ্য সম্পাদক হওয়ার পরে সংগঠন গতিময় হয়েছে। সেলিম দলের তরুণ অংশকে দারুণভাবে উজ্জীবিত করতে পেরেছেন। বারবার বলেছেন নির্বাচনের জন্য দল প্রস্তুত। শাসককে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করার জন্য। তার আগে নজরে পঞ্চায়েত কর্মসূচি নিয়েছিলেন। নতুন মুখ হিসাবে মীনাক্ষীর উত্থান সংগঠনকে স্বাস্থ্যবান করেছে। নতুন প্রজন্ম, বিশেষ করে সংখ্যালঘু নতুন প্রজন্মের কাছে, তাঁর গ্রহণযোগ্যতা রীতিমত ঈর্ষণীয়। মীনাক্ষীর নেতৃত্বে যুব, ছাত্র সংগঠনের একাধিক অভিযান জেলায় জেলায় যুব সম্প্রদায়ের মনে তৃণমূল সম্পর্কে জমে থাকা ভয় ভেঙে দিয়েছে। ছাত্র, যুব সংগঠনগুলো লাগাতার প্রচারে গ্রামের মানুষের মধ্যে একথা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে যে তৃণমূল সত্যিই দুর্নীতিগ্রস্ত। তৃণমূলের নেতা, কর্মীদের মানসিক জোর তলানিতে নেমেছে। সিপিএমের গ্রাম জাগাও কর্মসূচি, ভোটের আগে গ্রাম সংসদ কর্মসূচি দক্ষিণবঙ্গে তৃণমূলকে কিছুটা হলেও বেকায়দায় ফেলেছে।

আরো পড়ুন লড়াইটা মোদী বনাম মমতা হলে মোদীর সুবিধা হয়: সেলিম

তার উপর নওশাদের ৪২ দিনের অকারণ কারাবাস সংখ্যালঘুদের কিছু অংশকে শাসক দলের প্রতি বিমুখ করেছে। অনুব্রত, পার্থর মত একাধিক নেতা মন্ত্রী জেলে। নিয়োগ দুর্নীতি শাসক দলকে বেআব্রু করে দিয়েছে। অভিষেক ব্যানার্জিকে সিবিআই, ইডির বারবার তলব নিশ্চিতভাবে জনমানসে ভাল বার্তা দিচ্ছে না। আপাতত নবজোয়ার যাত্রা দিয়ে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব সামলালেও নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, তত তৃণমূল ভাঙার সম্ভাবনা বাড়বে। সব মিলিয়ে ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন শাসক দলের কাছে কঠিন পিচে ব্যাটিং।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

1 মন্তব্য

  1. কেউ এই প্রশ্নটা করছে না , কেন বাংলার রাজনীতি এত রক্তাক্ত হয়???। বঙ্গ সমাজের মজ্জায় মজ্জায় violence, আর বহিরঙ্গে ভদ্রলোকের মুখোশ ….এই রক্তাক্ত ইতিহাস 2010 র পরে শুরু হয়েছে বলে যদি কেউ মনে করেন, তিনি হয়তো naive নয়তো complicit…এগুলি সিপিএমের cadre-based local politics র ফসল যেটাকে TMC আরো digital touch দিয়েছে… … communistদের cadre-based রাজনীতির দরুন স্থানীয় dada রা ( এখন ভাইপো, কিন্তু তারা ছিলো “comrade” 2010 র আগে)….কোনো বিরোধী দল গড়ে উঠার অবকাশ দেয়নি……সমস্ত মতবিরোধ পার্টির মধ্যেই মেটাতে হতো…like Chinese Communist Party…. শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া সব সরকারই violence করবে…এই ধরনের রাজত্ব কায়েম করে কমিউনিস্টরা এখন সাধু!!!
    না জানি বিজেপি এলে আর কি ভয়াবহ পরিণাম হবে!!!
    বাংলার মানুষের আর মুক্তি নেই…
    Communistsরা এখন মন্দের ভালো , সে ক্ষমতা না থাকলে সবাই আইনের শাসনের কথা বলে …কিন্তু তিক্ত সত্য কথা…communists betrayed Bengal..তারা ” Gangstar Party society” করেছিল…TMC সেটাকে copy করেছে….communists রা বাঙালি দরিদ্রদের না দিতে পেরেছে শিক্ষা, না স্বাস্থ্য, না শিল্প …তারা কেবল ভদ্রলোকি নাটক, গান কবিতা করেই রাজ্যের মানুষের উন্নয়নের চেষ্টা চালিয়েছে…আরা Communist local Cadre রা তারা বেশিরভাগ দলিত ও মুসলিম ….নিজেদের নিজেদের মধ্যে মারামারি ও গোলাগুলি করেছে…সেই ট্রাডিশন সমানে চলিতেছে …..

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.