শ্যামসুন্দর গুপ্ত
আর জি কর মেডিকাল কলেজে স্নাতকোত্তর স্তরের ছাত্রীর সঙ্গে সদ্য ঘটে যাওয়া ভয়াবহতা আগে কলকাতায় হয়েছে বলে শুনিনি। বলা বাহুল্য, দিল্লির নির্ভয়ার কথা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে এই ঘটনা।
ময়না তদন্তের রিপোর্ট বলছে, মেয়েটির পেলভিক বোন মারের চোটে ভেঙে গেছে। দুই চোখ থেকে, যোনিদ্বার থেকে রক্তপাত হয়েছে। মুখ, ঠোঁট, গাল, পেট, বুক, ক্ষত বিক্ষত। ধর্ষণ করে গলা টিপে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলা হয়েছে। যদিও পুলিস এখন দাবি করছে শরীরের কোনো হাড় ভাঙা ছিল না। তবে এর আগে প্রায় সমস্ত সংবাদমাধ্যমেই খবর এসেছিল যে মেয়েটির কলার বোন এবং পেলভিক বোন ভেঙে গেছে। এই খবর পুলিস সূত্রই না দিয়ে থাকলে কোথা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল, সে প্রশ্নও তাহলে তুলতে হয়।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
যা-ই হোক, সরকারি হাসপাতালের ভিতর নিজের বিভাগে ডিউটি করতে গিয়ে এক ছাত্রী এইভাবে ধর্ষিত এবং খুন হল। হাউস স্টাফশিপ, স্নাতকোত্তর স্তরের পড়াশোনা – সব মিলিয়ে ৩-৪ বছর হাসপাতালের ওয়ার্ডই ডাক্তারির ছাত্রছাত্রীদের ঘরবাড়ি হয়ে যায়। সে জানে এখানে সে সুরক্ষিত। সারা সন্ধে ডিউটি করে রাতের খাওয়াদাওয়া সেরে সেমিনার হলে বই নিয়ে বসে একজন হবু ডাক্তার। কারণ আলাদা ঘর থাকে না তাদের শোয়া বসার জন্যে। এই সেই সেমিনার হল যেখানে কমাস আগেই তিন নেশাড়ু ঢুকে পড়েছিল। কিন্তু পাহারার কোনো ব্যবস্থা নেই। সিসিটিভিই বা কোথায়? এদিকে পায়রার খোপের মত একের পর এক বিল্ডিং উঠছে। কোথাও কোনো জবাবদিহির ব্যাপার নেই।
প্রথমে কোনোরকম ময়না তদন্ত না করেই মৃতদেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার কথা চলছিল, আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টাও হয়েছিল। ছাত্রছাত্রীদের চাপে ময়না তদন্ত হয় এবং এই নারকীয় ধর্ষণ ও খুনের কথা প্রকাশ্যে আসে। তারপরেও আর জি কর মেডিকাল কলেজের অধুনা পদত্যাগী অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ বলেন, অত রাত্তিরে সেমিনার হলে একা একা মেয়েটা কী করছিল তা ভাবা দরকার। আর জি করের মত বিখ্যাত মেডিকাল কলেজের অধ্যক্ষ অর্ধনগ্ন, পা ভাঁজ হওয়া, রিগর মর্টিস হয়ে যাওয়া দেহ দেখেও কী করে আত্মহত্যা বলে চালাতে পারেন? তার থেকেও বড় প্রশ্ন, কাকে বা কাদের বাঁচাতে এই সীমাহীন মিথ্যাচার চলছে?
একথা আর জি করে সবাই জানে যে সন্দীপ শাসক দলের দাস। কলেজের এবং তৃণমূল ছাত্র পরিষদের (টিএমসিপি) ইউনিটের কোনো কার্যকলাপ নিয়ে প্রশ্ন তুললে হোস্টেল খালি করে দিতে বলা হয় বা ফেল করিয়ে দেওয়ার হুমকি পাওয়া যায়। এরপরেও যে বা যারা প্রতিবাদ করার সাহস দেখায়, তাদের একের পর এক সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা দিতে হয়। আর্থিক দুর্নীতি, নিয়োগ দুর্নীতি, হাসপাতালের হিসাবে গরমিল, জাদুবলে টিএমসিপি করলেই বিশেষ সুযোগ দেওয়া – এসব তো আছেই। হাসপাতালের মেডিকাল বর্জ্য বাংলাদেশে চালান করা, বেশি দামে হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কিনে তার থেকে কমিশন খাওয়া – সন্দীপের বিরুদ্ধে চাপা অভিযোগের শেষ নেই।
সাম্প্রতিককালে হাউস স্টাফ নিয়োগের ক্ষেত্রে অনার্স পাওয়া ছাত্রছাত্রীদের ইন্টারভিউতে কম নম্বর দিয়ে টিএমসিপি করা ছাত্রদের অনৈতিকভাবে ঢোকানোর ঘটনাও ঘটেছে। পরবর্তীকালে কোনো মতে বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে বা ইন্টারভিউ না নিয়েও নিয়োগ চলেছে। সাধারণ ছাত্রছাত্রী দূরের কথা, অধ্যাপকরাও কোনো প্রয়োজনে কলেজ প্রশাসনের কেউ, বিশেষ করে অধ্যক্ষের সঙ্গে সরাসরি দেখা করতে পারেন না। বহুক্ষণ অপেক্ষা করে হতাশ হয়ে চলে যেতে হয়। এই রাঘব বোয়ালদের পোষা বাহুবলীও আছে। ক্যাম্পাসে তাদের প্রবেশ অবাধ। তৃণমূলের মিছিলে জোর করে গায়ে অ্যাপ্রন পরে হাঁটতে বাধ্য করে তারা। ফলস্বরূপ প্রত্যেক ব্যাচেই একদল ছাত্রছাত্রী হয়ে ওঠে দলদাস। হাউস স্টাফদের ডিউটিতে না এসে বাকিদের দিয়ে জোর করে ডিউটি করানো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। বাধা দিলে মারধোর করা হয়। এইভাবে ধীরে ধীরে গুন্ডারাজ কায়েম হয়ে সমাজবিরোধীদের আশ্রয় হয়ে উঠেছে আর জি কর মেডিকাল কলেজ ও হাসপাতাল।
সন্দীপকে এর আগে দুবার স্বাস্থ্য ভবন থেকে বদলির নোটিস দেওয়া হয়েছিল। দুবারই দু-এক সপ্তাহের মধ্যে সেই নোটিস বদলে যায়, উনি নিজের চেয়ারে থেকে যান। বশংবদ ছাত্রদের নিয়ে কলেজে রীতিমত জমিদারি চালান উনি। ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে ধৃত সঞ্জয় রায়ের মত দালালদের নিয়ে রোগী ভর্তির নেটওয়ার্ক চালান সন্দীপ। তার টাকা তথাকথিত ‘নর্থ বেঙ্গল লবি’-র কাছে পৌঁছয়, যারা এখন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিভাগের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা বলে অভিযোগ।
আরো পড়ুন পরীক্ষার মধ্যেই শুনছি ‘মেরে ডাক্তার হওয়া ঘুচিয়ে দেব’
ধৃত সঞ্জয়কে যেভাবে দোষী সাব্যস্ত করার চেষ্টা চলছে, তা গল্পের গরু গাছে তোলা বললেও কম বলা হয়। প্রথমত, প্রাথমিক রিপোর্টে দুজন ব্যক্তির শুক্রাণু পাওয়া গেছে মৃতার দেহ থেকে। তাহলে আরেকজন কে? পেলভিক বোন ভেঙে যাওয়া; মুখে, পেটে, বুকে ক্ষতের দাগ, অনামিকায় চোট রয়েছে মানে রীতিমত ধস্তাধস্তি হয়েছে। বত্রিশ বছরের একজন মানুষকে এইভাবে আঘাত করে একা হাতে ধর্ষণ করে, খুন করে আধ ঘন্টার মধ্যে সেমিনার হলে ঢুকে আবার বেরিয়ে চলে যাওয়া একজন মানুষের কম্ম বলে তো মনে হয় না। একটু বিশ্রাম নেওয়ার দরকার হলে ছাত্রছাত্রীরা সাধারণত ওই সেমিনার হলেই যায়। ছিটকিনি লাগিয়ে নেয়। ওয়ার্ড বা নার্সিং স্টেশন – কোনোটাই দশ ফুটের বেশি দূরে নয়। তাই বাইরের অচেনা কেউ দরজা খুলে বিনা প্রতিরোধে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড করে বেরিয়ে চলে গেল, শুধু পড়ে রইল তার ছেঁড়া হেডফোনের তার – এমনটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
ঘটনা খতিয়ে দেখতে একটা কমিটি তৈরি করা হয়েছে, অথচ সেই কমিটিতে ফরেন্সিক বিভাগের কাউকে রাখা হয়নি। অথচ কয়েকজন ইন্টার্ন আছেন। তাঁরা সবাই টিএমসিপির সদস্য। সুতরাং কমিটির রিপোর্ট কী হতে চলেছে তা সহজেই অনুমেয়। রবিবার দুপুরের জেনারেল বডি মিটিং ভেস্তে দেওয়া, অন্য কলেজের ছাত্রদের বহিরাগত বলে ঢুকতে না দেওয়া এবং গেটের সামনে প্রতিবাদী মানুষের ভিড়ের (যার মধ্যে অনেক বর্ষীয়ান ডাক্তার, সমাজের সব শ্রেণির মানুষ এবং অন্য কলেজের ছাত্রছাত্রীরাও ছিলেন) দিকে শাসক দলের ছাত্রদের ‘গো ব্যাক’ ধ্বনি দিয়ে তেড়ে যাওয়া আর পুলিশের নির্মম লাঠিচার্জ কিছু লুকোবার মরিয়া চেষ্টা ছাড়া আর কী?
আশা করি, মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এদিকে নজর দেবেন এবং প্রকৃত দোষীকে খুঁজে বের করার ব্যবস্থা করবেন। আর জি করের চরম প্রশাসনিক অব্যবস্থারও বিহিত করবেন। ফের যেন আমাদের কারোর বাড়ির আরেকটা মেয়েকে হারাতে না হয়। তবে সন্দীপকে আর জি কর থেকে সরিয়ে ন্যাশনাল মেডিকাল কলেজে পুনর্বাসন দিয়ে সে কাজ হওয়ার নয়।
নিবন্ধকার পেশায় ডাক্তার। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








