অর্ক মুখার্জি

প্যারিস অলিম্পিকে ভারতের সোনার ছেলে নীরজ চোপড়া জ্যাভলিন ছুড়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে রুপো জিতেছেন। আগেরবার, অর্থাৎ টোকিও অলিম্পিকে, নীরজ সোনা জিতেছিলেন এবং স্বাভাবিকভাবেই এবারেও স্বর্ণপদক আশা করেছিল দেশের মানুষ। কিন্তু এবারে নীরজকে হারিয়ে সোনা জিতেছেন প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের আরশাদ নাদিম।

নীরজ নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। টোকিও অলিম্পিকে তিনি ছুড়েছিলেন ৮৭.৫৮ মিটার এবং সোনা জিতে নিয়েছিলেন। এবারে তিনি ছুড়েছেন ৮৯.৪৫ মিটার দূরে। এই মরশুমের তাঁর এটিই সেরা থ্রো। তবুও তাঁকে সোনা হারাতে হয়, কারণ পাকিস্তানি নাদিম তাঁর দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় ৯২.৯৭ মিটার দূরে ছোড়েন এবং শেষবার ৯১.৭৯ মিটার দূরে। এর আগে দশটি প্রতিযোগিতায় নীরজ নাদিমকে হারিয়েছেন, কিন্তু প্যারিসে এসে সেই বিজয়রথ আটকে দিলেন নাদিম।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

নীরজ সোনা হারিয়েছেন। ভারতীয়দের একটু হলেও চিনচিনে যন্ত্রণা হয়েছে। সেই যন্ত্রণার উপশমে মলম হয়েছে নীরজের মায়ের বক্তব্য। এত স্পষ্ট, বলিষ্ঠ এবং মানবিক বক্তব্য বহুবছর কোনো খেলোয়াড়ের পরিবারের তরফ থেকে শোনা যায়নি। অথচ ধর্মনিরপেক্ষ ভারতবর্ষ যে সুর শুনতে আগ্রহী, যে চেতনার বিকাশে আগ্রহী, যে দ্বেষহীন দেশ স্থাপনে আগ্রহী, তাতে নীরজের মায়ের কথা ছড়িয়ে পড়া খুবই দরকার। প্যারিস অলিম্পিকে নীরজ সোনা জিততে ব্যর্থ হয়েছেন, কিন্তু তাঁর মায়ের বক্তব্য সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ধর্মনিরপেক্ষ আকাঙ্ক্ষার মানুষের হৃদয় জিতে নিয়েছে। এই জয়ের বিচার সোনা, রুপো বা অন্য কোনো রত্ন দিয়ে হয় না, হওয়া উচিত নয়।

নীরজের মা সরোজ দেবী ছেলে রুপো জেতার পর পানিপথ থেকে বলেন ‘আমরা রুপোতে খুশি। যে সোনা পেয়েছে সে আমাদের ছেলে, তেমন যে রুপো পেয়েছে সেও আমাদের ছেলে। সবাই অ্যাথলিট। সবাই কঠোর পরিশ্রম করে। নাদিমও খুব ভাল খেলে। আমার কাছে নীরজ এবং নাদিমের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আমাদের কাছে সোনা এবং রুপোর মধ্যেও পার্থক্য নেই।’

ভারত জুড়ে যে ভাষ্য ধর্মীয় মৌলবাদীরা ছড়িয়ে দিতে চাইছে, কোথাও কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের ইন্ধনে, কোথাও বা কোনো রাজ্য সরকারের প্রশ্রয়ে, সেই ভাষ্যকে বর্শাবিদ্ধ করে এই কথাগুলি, কথার মধ্যে নিহিত মানুষের মানুষের ভালবাসার স্বীকৃতি। লক্ষণীয়, আরশাদের মা রাজিয়া পরভীনও একইরকম আনন্দ প্রকাশ করেছেন নীরজের সাফল্যে। তিনিও বলেছেন ‘নীরজও আমার ছেলে। ওরা দুজনে বন্ধু, দুই ভাইয়ের মত।’

আজকের দিনে ধর্মীয় মৌলবাদকে সচেতনভাবে লালনপালন করা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কাজই হল ভারতের অমুসলমান, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মনে, অভারতীয় এবং ভারতীয় মুসলমানদের শত্রুপক্ষ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা। তার প্রথম ধাপ উপমহাদেশের অন্য দেশের মুসলমানদের শত্রু হিসাবে উপস্থাপিত করা।

সিনেমার পর্দা থেকে শুরু করে জয় শাহদের ক্রিকেট বোর্ড – সকলেই এ কাজে উপাদান সরবরাহ করে। সময় বিশেষে প্রয়োগ করা হয়। প্রয়োজন অনুসারে ধার বাড়ানো বা কমানো হয়। কিন্তু হরিয়ানার পানিপথের সরোজ দেবী কত সহজে পরিষ্কার করে দিলেন সবকিছু। যে সোশাল মিডিয়াকে ব্যবহার করা হয় ঘৃণাভাষ্য রচনার ক্ষেত্র হিসাবে, সেই সোশাল মিডিয়াতেই ভাইরাল হয়েছে নীরজ আর আরশাদের মায়ের বক্তব্য। সেখানে হিংসা নেই, ঈর্ষা নেই, ঘৃণা নেই। আছে কেবল ভালোবাসা, মানুষকে মানুষ হিসাবে গ্রহণ করার সদিচ্ছা। সংবিধানে যে ভারত নির্মাণের কথা বলা আছে, যে ভারতের জন্য ক্ষুদিরাম, ভগৎ সিং, রাজগুরু, বটুকেশ্বর দত্তের মত বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রাণ দিয়েছিলেন, যে সংগ্রামে যোগ দেওয়ার জন্য নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আইসিএস পরীক্ষায় পাস করেও চাকরি না করে (ওঁর ভাষায় ব্রিটিশদের দালালি না করে) সংগ্রামের পথ বেছে নিয়েছিলেন, সেই ভারতেরই মা সরোজ দেবী।

স্বাধীনতা দিবস এসে পড়ল। যথারীতি বিদ্বেষ ছড়ানোর জন্য চ্যানেলে চ্যানেলে এমন ফিল্ম বা সংবাদ দেখানো চলবে যার কিছুটা সত্যি আর অনেকটা মিথ্যে। মানুষকে ঘৃণায় মশগুল রাখার কাজ চলবে। মানুষ ভাববে না সে নাগরিক হিসাবে তার প্রাপ্য পাচ্ছে কিনা, ভাববে না কীভাবে রাষ্ট্রের সম্পদ লুঠ করা চলছে, আস্তে আস্তে কীভাবে সরকারি পরিষেবাগুলির বেসরকারিকরণ হচ্ছে। নিয়মিত ঘটে চলা রেল দুর্ঘটনায় সরকারের দায় কতটা, তাও যেন সে না ভাবে। ঘৃণার নেশায় তাকে আর সবকিছু ভুলিয়ে দেওয়া হোক – সরকার এমনটাই চায়। কিন্তু হরিয়ানার সরোজ দেবী এইসব চক্রান্তের ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর ছেলের হারের পরেও নাদিমের প্রশংসা করতে পেরেছেন। নীরজও বলেছেন ‘ভারত এবং পাকিস্তানে জ্যাভলিন তেমন জনপ্রিয় নয়। আমি জানি আরশাদ খুব পরিশ্রম করেছে। আজ রাতে সে যোগ্য জয়ী। আমরা দুজনেই আমাদের দেশকে গর্বিত করছি।’

ইতিহাস লক্ষ করলে দেখা যাবে, ঘৃণা তৈরি করা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার কালপুরুষ নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন ‘ঘৃণা নিয়ে কেউ জন্মগ্রহণ করে না। যদি কেউ ঘৃণা করতে শেখে তাহলে সে ভালোবাসা শিখে নিতে পারবে। ঘৃণা নয়, মানব হৃদয়ে স্বাভাবিকভাবে ভালবাসার জন্ম হয়।’ ঘৃণা সৃষ্টি করা হয় শাসনকালের মেয়াদ বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে। ব্রিটিশরা ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতিতে শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল ভারতে। ফরাসি কবি আর্তুর র‍্যাঁবো তাঁর ‘Le Dormeur du Val’ কবিতায় দেখিয়েছেন, এক কিশোরকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া হয় ঘৃণাকে কাজে লাগিয়ে। তার মৃত্যু ঘটেছে । মৃতদেহ পড়ে আছে অরক্ষিত অবস্থায় খোলা আকাশের নিচে। তার মুখের নিষ্পাপ হাসি তার সারল্য উপস্থাপিত করছে। বোঝা যাচ্ছে কীভাবে সে কিছু না বুঝে প্রাণ দিল, ব্যবহৃত হল রাষ্ট্রশক্তির দ্বারা।

আরো পড়ুন অপমানে হতে হবে মহম্মদ শামির সমান

খেলার মাঠ প্রতিদ্বন্দ্বিতার পৃষ্ঠপোষক হলেও ঘৃণাকে প্রশ্রয় দেয় না। আমরা দেখেছি যে রজার ফেডেরার-রাফায়েল নাদাল, শচীন তেন্ডুলকার-ব্রায়ান লারা, ভিভ রিচার্ডস – ইয়ান বথাম খেলার মাঠে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও মাঠের বাইরে বন্ধু। ভারতের রোহন বোপান্না এবং পাকিস্তানের আইসাম-উল হক কুরেশি জুটি বেঁধেছিলেন টেনিসে এবং ২০১০ ইউএস ওপেনের ডাবলস ফাইনাল খেলেছিলেন। এখন নীরজ আর আরশাদের বন্ধুত্ব দেখছি সীমানা ছাড়িয়ে। বন্ধুত্বের নীল আকাশের ব্যাপ্তিতে হারিয়ে যায় সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক কূটকৌশল। অঞ্জন দত্ত সেই কবে গেয়েছিলেন ‘কোথায় তুমি টানবে বলো দেশের সীমারেখা/আমার জানলা দিয়ে গোটা পৃথিবী।’

নীরজের মা সেই সাহস দেখিয়েছেন, যে সাহস দেখানোর ধক নেই অনেক বড় মাপের শিল্পী, খেলোয়াড়, লেখক বা এক কথায় সেলিব্রিটির। নয়ের দশকে বাজিগর ছবির ভিকির চরিত্রে শাহরুখ খানের একটি সংলাপ অনেকেরই মনে আছে “কভি কভি জিতনে কে লিয়ে কুছ হারনা ভি পড়তা হ্যায়। ঔর হার কর জিতনেওয়ালে কো বাজিগর কহতে হ্যাঁয়।’ প্যারিসে নীরজ নিজে থেকে হারেননি, হেরেছেন যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে। কিন্তু তাঁর মা হয়ে উঠেছেন বাজিগর। তাঁর উক্তি অমর হয়ে থাকবে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.