সন্দেশখালির শাহজাহান বা শিবু হাজরা, উত্তম সর্দারদের দেখলেই অনেকগুলো ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বাম জমানার দাপুটে নেতাদের থেকে শুরু করে তৃণমূলের আঞ্চলিক অধিপতিদের।

২০০৯ সালের জুন মাসে যখন লালগড় ছুঁয়ে ধরমপুরে পৌঁছলাম, তখন সিপিএম নেতা অনুজ পাণ্ডের প্রাসাদোপম বাড়ির সামনে হাজার হাজার গ্রামবাসী ভিড় করে আছেন। দামামা বাজছে, সঙ্গে মুখে মুখে আদিবাসীদের হুঙ্কার। একদল বন্দুকধারী মাওবাদীর নেতৃত্বে সেই বাড়ির ছাদে পড়ছে বড় হাতুড়ির আঘাত। ভেঙে পড়ছে কংক্রিটের চাঁই, চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে ঔদ্ধত্য। অনতিদূরে সিপিএমের অফিস জ্বলছে। তার মাঝে পঞ্চায়েত অফিসটি সুরক্ষিত। কারণ ওটা ‘জনগণের’। এলাকার সিপিএম নেতাদের দেখা নেই। ধরমপুর এবং আশপাশের গ্রাম থেকে আসা জনগণের ক্ষোভ ফেটে পড়ছে একটি বাড়িকে কেন্দ্র করে। না পাওয়ার ক্ষোভ। কথায় কথায় পার্টি অফিসে ডেকে পাঠানোর ক্ষোভ। পার্টির দাদাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

একই ধরনের ক্ষোভের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ দেখা গিয়েছিল ২০০৭ সালের জানুয়ারির শীতের সকালে। নন্দীগ্রাম জুড়ে রাস্তা কাটা। শয়ে শয়ে গ্রামবাসী রাস্তায় নেমে পড়েছেন, হাতে কালো পতাকা। সঙ্গে বঁটি, কাটারি, কাস্তে, কুড়ুল। যে যা পেরেছে নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছেন। জমি নিতে দেবেন না তাঁরা। জমি অধিগ্রহণের নোটিস প্রত্যাহার করতে হবে। কেমিকাল হাবের জন্য বসতবাড়ি বা কৃষিজমি নেওয়া যাবে না। গরীব কৃষকের বাড়ির উঠোনে বসে শুনতে হচ্ছে, “আমার বাপ-ঠাকুর্দারা যে মাটিতে শুয়ে আছে, ওটাও নিয়ে নেবে!”  আমার দেখা প্রথম গণঅভ্যুত্থান। এলাকার সিপিএম নেতারা ঘরছাড়া, গ্রাম জ্বলছে। নন্দীগ্রামের সিপিআই বিধায়ক সেই সকালে মশারির ভিতরে ঘুমোচ্ছেন। সাংবাদিকদের ডাকাডাকিতে বেরিয়ে এলেন, কিন্তু অসহায় তিনিও।

তার কিছুদিন পরে হলদিয়ার শ্রমিক ভবনে এলাকার সাংসদ লক্ষ্মণ শেঠের সঙ্গে রীতিমত অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে দেখা করতে গিয়েও দেখেছি কী দাপট তাঁর। আরামবাগের অনিল বসু বা গড়বেতার সুশান্ত ঘোষদের দাপটই বা কী কম ছিল! শাসনের যে মজিদ মাস্টারের ডাকে বাঘে গরুতে একঘাটে জল খেত, সেই মাস্টারমশাইকেও দেখেছি গ্রামছাড়া হয়ে বারাসাতের অদূরে একটা ছোট্ট ঘরে ঘাপটি মেরে বসে থাকতে।

সেই দাপট কি তৃণমূল জমানাতেও দেখিনি? দেখেছি তো বটেই। যাঁর নাম দিয়ে শিরোনাম করেছি, সেই অনুব্রত মণ্ডলকে কি পাঠকদের মনে নেই? সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী বেষ্টিত অনুব্রতর অফিসে পৌঁছে দেখি তিনি পার্টির কর্মসূচিতে যোগ দিতে প্রস্তুত হচ্ছেন, মণ্ডা মিঠাই আনতে বলছেন সহযোগীদের। তাড়া তাড়া টাকা পকেটে পুরছেন। ভ্রূক্ষেপই নেই সামনে বহিরাগত সাংবাদিক। পাত্তা দেওয়ার কথাও নয় অবশ্য। তার একদিন আগেই তিনি প্রকাশ্য সভা থেকে পুলিসের গাড়িতে বোম মারার হুমকি দিয়েছেন। তাঁর অনেক বাণীই তখন বাংলার জনগণের কানে বাজে। চড়াম চড়াম ধ্বনিতে মুখরিত হয় গোটা বাংলা।

সেই অনুব্রত আজ কোথায়? পাঠকরা কি মনে রেখেছেন? পাঠক ছেড়ে দিন, তাঁর দলের নেতৃত্বই কি মনে রেখেছে তাঁকে? বীরভূম থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে দিল্লির তিহার জেলের ঘানি টানছেন ‘মাথায় অক্সিজেন কম যাওয়া’ অনুব্রত। সে রাজাও নেই। সেই রাজত্বও নেই।

এইসব নেতাদের বিরুদ্ধে কী কী চক্রান্ত হয়েছিল বা হয়নি, তা অন্য প্রশ্ন এবং অন্য বিতর্কের বিষয়। কিন্তু এঁরা জলজ্যান্ত প্রমাণ যে দিন চিরকাল এক যায় না। ক্ষমতার দম্ভে মত্ত আঞ্চলিক অধিপতিদের সেসব মাথায় থাকে না।

সন্দেশখালির উত্তম বা শিবু যে অত্যাচার করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, তা ভয়ঙ্কর। জোর করে চাষের জমিতে নোনা জল ঢুকিয়ে ভেড়ি তৈরি করে ফেলার থেকেও ভয়ঙ্কর অভিযোগ গ্রামের মহিলাদের ডেকে ডেকে যৌন নির্যাতন। শাসকদলের ছত্রছায়ায় থেকে এই ধরনের কাজ সভ্য সমাজে অকল্পনীয়। কিন্তু এটাই হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ক্ষোভেরই স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখেছি সন্দেশখালির গ্রামে।

শাহজাহানকে এখন পর্যন্ত লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। পুলিসের পক্ষে করা সম্ভব নয় এমন কোনো কাজ নেই। সেই পুলিস যখন শাহজাহানের মতো চুনোপুঁটিকে ধরতে পারছে না, তখন ধরে নিতে হবে সে শাসকদলের নিরাপত্তা বেষ্টনীতেই রয়েছে। চিন্তা নেই, একটা সময়ে প্রয়োজন ফুরোলেই তাঁর মাথার উপর থেকেও হাত সরিয়ে নেবেন তৃণমূল নেতৃত্ব। ঠিক যেমনটা হয়েছে অনুব্রত, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বা মদন মিত্রদের ক্ষেত্রে। একসময় কুণাল ঘোষের ক্ষেত্রেও।

আরো পড়ুন নন্দীগ্রাম আর গুজরাট মডেল মনে করাচ্ছে বেনিয়াগ্রাম

আঞ্চলিক অধিপতিদের এটা কখনোই মাথায় থাকে না যে তাঁদের নেতারা আসলে তাঁদের ব্যবহার করে থাকেন নিজেদের প্রয়োজনে। প্রয়োজন ফুরোলেই তাঁরা ব্রাত্য। সে লক্ষ্মণ শেঠই হোন আর অনিল বসু বা সুশান্ত ঘোষ। দলের জন্য প্রাণপাত করেছেন। কিন্তু সন্ত্রাসের অভিযোগ জোরালো হতেই তাঁদের একঘরে করে দিয়েছে নিজের দলের নেতৃত্বই। ভাঙড়ের বেতাজ বাদশা আরাবুল ইসলামের কথাই ধরুন না। ‘দলের প্রয়োজনে’ এই দাপুটে নেতাকেও কতবার জেল খাটতে হয়েছে। এই অধিপতিদের দোষ দিয়ে অবশ্য লাভ নেই। শাহজাহানরা জানেন তাঁরা কোনোদিন অভিষেক ব্যানার্জি হতে পারবেন না, মুখ্যমন্ত্রীও হতে পারবেন না। শিবুও জানেন তিনি জেলা পরিষদের বাইরে যেতে পারবেন না। যদি ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে তবে বড়জোর বিধায়ক হওয়ার টিকিট পেলেও পেতে পারেন। কিন্তু সেখানে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি। তাই তাঁরা নিজের এলাকার মুখ্যমন্ত্রী হতে চান। সেখানেই নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন করে ক্ষমতার দম্ভে বেঁচে থাকতে ভালবাসেন। সঙ্গে নিজের আখের যতটা গুছিয়ে নেওয়া যায়। টাকা হাতে না থাকলে স্বঘোষিত বাদশা হবেন কী করে? সুতরাং লুটেপুটে খাও।

এরকম আঞ্চলিক অধিপতিদের দলগুলোর দরকার হয় ভোটের জন্য আর দলের তহবিলের জন্য। কিন্তু পুরোটাই ক্ষণস্থায়ী। সেটা যত তাড়াতাড়ি আঞ্চলিক অধিপতিরা বোঝেন ততই ভাল। বামফ্রন্ট সরকারের পতন হয়েছে, তৃণমূল সরকারেরও পতন হবে। অনুব্রত এবং তাঁর মত অন্যরা স্মৃতির আড়ালে চলে গেছেন, মমতা ব্যানার্জিও যাবেন। কোনোকিছুই চিরস্থায়ী নয়। চিরস্থায়ী শুধু জনগণ। একবার ঠিক করে নিলে তখত উল্টে দিতে সময় লাগে না তাঁদের। এই সরল সত্যটা রাজনীতির আঞ্চলিক অধিপতিরা এবং তাঁদের শাগরেদরা তাড়াতাড়ি বুঝলে হয়।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

3 মন্তব্য

  1. কি আশ্চর্য একটি পল্লবগ্রাহী একটি প্রবন্ধ। নন্দীগ্রামে মহিলাদের অত্যাচারের অভিযোগ ছিল? সন্দেশখালিতে মাওবাদীরা আছেন? শিল্পস্থাপনের ইচ্ছার কোনো নির্দিষ্ট খবর দিয়েছেন সরকার? পুলিশ.গুলি চালিয়েছে , কোন স্থানীয় নেতা খুন হয়েছেন?

    • দালাল সাংবাদিক কাম লেখক। বামপন্থীদের বিরুদ্ধে কুৎসা ছড়িয়ে দু’পয়সা কামিয়েছেন। এখন বোধহয় ভাতার উৎসে টান পড়েছে, তাই ব্যালেন্সের খেলায় নেমে পড়েছেন! 😀

  2. আসলে সাংবাদিকতার নামে পুঁজিবাদী দালালদের ওই সময় সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, জঙ্গলমহলে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল ২০০২ থেকে ২০১০ নয়া- উদারবাদী প্রকল্পের স্বার্থে যাদের চোখে অনুজ পান্ডে’র ” প্রাসাদসম” ( এটি আনন্দবাজারীয় শব্দবন্ধ) বাড়ি চোখে পড়েছে কিন্তু জন মজুর শালুক সোরেন বা শিক্ষক দিবাকর মাহাতোর মৃতদেহ চোখে পড়ে নি।
    এই লেখাটি যিনি লিখেছেন উনিও সম্ভবত ওই গোষ্ঠির অন্তর্ভূক্ত।
    ফলে, এই ধরনের নৈরাজ্যবাদী মদতপুষ্ট লেখা অতীতে অনেক লেখা হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে যাদের কাজ মূলতঃ প্রকৃত বস্তনিষ্ঠ বিশ্লেষণের পরিবর্তে সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করা।
    পাঠককে বিভ্রান্ত করার এই অপচেষ্টা বন্ধ হোক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.