দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নেমে চায়ের দোকানে জিজ্ঞেস করা গেল, তাপসী মালিকের বাড়িটা কীভাবে যাব? তিন-চারজন এগিয়ে এলেন। “এই রাস্তাটা ধরে সোজা এগিয়ে যান। টাটার মাঠের পাশ দিয়ে যাবেন। তারপর কাউকে জিজ্ঞেস করবেন উজ্জ্বল সংঘের মাঠ, বাজেমেলিয়া…”

টাটার মাঠ?

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

হ্যাঁ, টাটার মাঠ। এক হাজার একরের মাঠ। যে জমিতে একদিন কারখানা হওয়ার কথা ছিল, রাজ্য রাজনীতির ভরকেন্দ্রে ছিল যে জমি, যে হাজার একরকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর ইতিহাসে সংসদীয় পথে গড়ে ওঠা সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি কমিউনিস্ট শাসনের অবসান ঘটিয়েছিলেন কালীঘাটের টালির চালা থেকে উঠে আসা যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সেই জমি এখন ধু ধু মাঠ। বিক্ষিপ্ত ভাবে দু-এক জায়গায় চাষের কাজ হচ্ছে, অধিকাংশ জায়গাই ফাঁকা, এককালে যে জমি সবুজে সবুজ হয়ে যেত, তার শরীরময় পড়ে আছে মৃত কারখানার কঙ্কাল। মাটির অনেক নিচে বসে থাকা সিমেন্টের ভিত, যা বহু চেষ্টাতেও উপড়ে ফেলা যায়নি, ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা এক দশক পুরনো সারি সারি লোহার রড, নিরাপত্তারক্ষীদের থাকার জায়গার ভগ্নাবশেষ। একটু দূরে পর পর কয়েকটি পুলিশ ভ্যান। টাটার মাঠ পাহারা দিচ্ছে বছরভর। চোখে পড়ল কয়েকদিন আগে সিপিএমের করা ‘প্রতীকি’ শিলান্যাসের ফলক। তার গায়ে ঝুলতে থাকা বাসি মালা বুঝিয়ে দেয়, এই তল্লাটে বামেদের সংগঠন এখনো সেই তিমিরেই।

সিঙ্গুর স্টেশনের গায়ে মনোরঞ্জন মালিকের এক চিলতে দোকান। ভোট প্রচারে বেরিয়ে সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন সিপিএমের তরুণ প্রার্থী ছাত্রনেতা সৃজন ভট্টাচার্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই ভিডিও। দেখা যাচ্ছে, সৃজনকে হাত তুলে আর্শীবাদ করছেন মনোরঞ্জন। ফাল্গুনের ভরদুপুরে যখন তাঁর বাড়িতে পৌঁছনো গেল, দোকান ফেরত মনোরঞ্জন তখন খেতে বসবেন। রং না হওয়া বাড়ির তক্তপোষে বসে সৃজনের কথা তোলা গেল। আপনি কি সিপিএম প্রার্থীকে আর্শীবাদ করেছেন? মনোরঞ্জন বললেন, “ছেলেটি বয়সে তরুণ। আমার দোকানে এসে বলল, আমি ভোটে দাঁড়িয়েছি। আর্শীবাদ করবেন। আমি তখন হাতটা তুলে বললাম, ভাল হোক। এইটুকুই। আমার বাড়িতে যদি কেউ আসে, সে যদি চরম শত্রুও হয়, ভাল ব্যবহার তো করতেই হবে।” এরপরেই তাঁর সংযোজন, “সিপিএম আমার মেয়েকে খুন করেছিল। মেয়েটা বেঁচে থাকলে আজ এই সৃজনের বয়সী হত। সিপিএমকে আমি কখনো ক্ষমা করব না।”

মালিক পরিবারে বাহ্যত নিম্মবিত্ততার ছাপ স্পষ্ট। বাইরের ঘরে দেওয়ালে একটা ফটোফ্রেমে  ছবির কোলাজ। কোন ছবিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মনোরঞ্জন, কোনটাতে মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে। কয়েকটি ছবিতে উপস্থিত রয়েছে সিঙ্গুরের ‘মাস্টারমশাই’, প্রবীণ বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। এই বছর যিনি দল বদলে বিজেপির প্রার্থী। কিন্তু একটি ছবিতেও নেই জমি আন্দোলনের অন্যতম মুখ বেচারাম মান্নার।

কেন? বেচাবাবুর সঙ্গে কি আপনার দূরত্ব রয়েছে?

মনোরঞ্জন দৃশ্যতই বিরক্ত। হাতজোড় করে বললেন, “বেচার সঙ্গে আমার খুবই সুসম্পর্ক। বড় বেশি সুসম্পর্ক। ওর সম্পর্কে কোনও কথা আমায় বলতে বলবেন না।”

সিঙ্গুরে কান পাতলে অবশ্য সেই সম্পর্কের রসায়ন ভালই বোঝা যায়। তাপসী মালিকের বাবার সঙ্গে কার্যত মুখ দেখাদেখি নেই বেচারামের। হরিপালের বিধায়ক এবার সিঙ্গুরে তৃণমূলের প্রার্থী। পাশের আসন হরিপালে লড়ছেন তাঁর স্ত্রী। রতনপুর গ্রামের বাসিন্দা বেচারামের বিরুদ্ধে সিঙ্গুর জুড়ে অনেক অভিযোগ। তাঁর নাকি এই ক বছরে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। একাধিক পেট্রল পাম্পের মালিক নাকি তিনি। এমনকি, বিজেপির আদি কর্মীদের একাংশের এমনও দাবি, লকেট চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গেও নাকি হটলাইন রয়েছে বেচারামের। তাঁর জয় নিশ্চিত করতেই নাকি ৮৯ বছরের মাস্টারমশাইকে বিজেপির টিকিট দিয়েছেন লকেট। অন্যদিকে, বেচা শিবিরের পাল্টা দাবি, বাইরে থেকে বাড়ি যেমনই হোক, মনোরঞ্জনও নাকি অনেক সম্পত্তির মালিক। রবীন্দ্রনাথবাবু বাড়ির বাইরেই বেরোতে চান না। বহুদিন ধরেই নাকি দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিলেন মাস্টারমশাই। বলা বাহুল্য, এই সব অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগের কোন প্রমাণ নেই৷ বাতাসে ভাসিয়ে দেওয়া কথার মতোই সিঙ্গুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে এরকম বহু ফিসফাস।

ভোটের প্রচারে অবশ্য কেবলই বেচারাম। সিপিএমের ‘বহিরাগত’ প্রার্থী সৃজন ছুটছেন ঠিকই, কিন্তু ধারে ভারে প্রত্যাশিতভাবেই অনেক এগিয়ে তৃণমূল। আর বিজেপি কার্যত প্রচার শুরুই করতে পারেনি। বৃদ্ধ রবীন্দ্রনাথের নাম প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই সিঙ্গুর উত্তপ্ত। বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন বিজেপির আদি কর্মীরা। প্রার্থী বদলের দাবিতে রাস্তা অবরোধ, ভাঙচুর – হয়েছে সবই। সিঙ্গুর স্টেশনের কাছে বিজেপির দফতর গমগম করছে, কিন্তু সেখানে মাস্টারমশাইয়ের কোন ছবি নেই। জমি আন্দোলনের স্মৃতি উস্কে প্রার্থী বদলের দাবিতে ধর্ণামঞ্চ সাজিয়ে বসেছেন বিজেপি কর্মীদের একাংশ। সিঙ্গুরে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, প্রার্থী বদল করা হলেও হতে পারে। অথচ লোকসভা নির্বাচনের হিসাবে এই কেন্দ্রটি বিজেপির জন্য সম্ভাবনাময়।

লোকসভা ভোটের ফল বলছে, হুগলী লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত এই বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিজেপি প্রার্থী লকেট চট্টোপাধ্যায় ১০ হাজার ৪২৯ ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন। লকেট পেয়েছেন ৯৩, ১৭৭টি ভোট (৪৬.০৬%)। সেখানে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল প্রার্থী রত্না দে নাগের প্রাপ্ত ভোট ৮২, ৭৪৮ (৪১.০৩%)।

বেড়াবেড়ি, কেজেডি এবং গোপালনগর — এই তিনটি মৌজা নিয়েই ছিল টাটাদের প্রকল্প এলাকা। এর মধ্যে গোপালনগর পঞ্চায়েতের মোট ১৮টি আসনের মধ্যে লোকসভায় বিজেপি ১১টিতেই জিতেছে। সাতটিতে জিতেছে তৃণমূল। কেজেডি-র ১৮টি আসনেও একই ফল। বেড়াবেড়ি মৌজারও কিছু আসন গিয়েছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। ফলে নিঃসন্দেহে অ্যাডভান্টেজ গেরুয়া শিবির। কিন্তু সব হিসাব গোলমাল করে দিচ্ছে বিজেপির অর্ন্তবিরোধ। যার ফলে হাসি চওড়া হচ্ছে বেচারামের।

নাগরিক ডট নেটকে বেচারাম বললেন, “মাস্টারমশাই শ্রদ্ধেয় মানুষ। ৯০ বছর বয়সে টিকিটের জন্য দলবদল করলেন। কী আর বলব! বিজেপিও প্রার্থী পাচ্ছে না বলে ওঁকে টিকিট দিয়ে দিল। উনি অসুস্থ, তিনবার অ্যাটাক হয়ে গিয়েছে, আশা করব রোদ লাগাবেন না।” রবীন্দ্রনাথবাবু অবশ্য বলছেন, “অসম্মানের জবাব দিতেই আমার লড়াই। আমার সততা নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। অনেকের ভাবমূর্তি এমন নয়। মানুষই জবাব দেবেন।” বিজেপি প্রচারে বলছে, তারা সরকারে এলে সিঙ্গুরে কারখানা গড়বে। জমিরক্ষা কমিটির প্রধান নেতা হিসাবে আপনার অস্বস্তি হচ্ছে না? প্রসঙ্গ এড়িয়ে মাস্টারমশাইয়ের সংক্ষিপ্ত উত্তর, “অসম্মান আর অসততা মেনে নেব না। লড়াই হবে।”

একথা ঠিক যে রবীন্দ্রনাথবাবুর ভাবমূর্তি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন। বামপন্থী ছাত্রকর্মী বলছিলেন, “মাস্টারমশাইয়ের সততা নিয়ে তো প্রশ্ন নেই। ওঁর ইমেজের জন্য উনি প্রচুর ভোট পান। কিন্তু সংগঠনটা পুরোপুরি বেচা মান্নার। এলাকার সব ক্লাব ওঁর নিয়ন্ত্রণে, নিয়মিত জনসংযোগ করেন। তৃণমূল স্তর পর্যন্ত সংগঠন ওঁর সঙ্গেই। মাস্টারমশাই তো বেরতেই পারেন না, বাড়িতে বসেই যা করার করেন। কাজেই ভাবমূর্তি যেমনই হোক, বেচারাম মান্না অনেক এগিয়ে।”

এ তো গেল ভোটের পাটিগণিতের কথা। তার বাইরে সিঙ্গুর জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে চাপ চাপ হতাশা আর দীর্ঘশ্বাস। জমি আন্দোলনের দেড় দশক পরের সিঙ্গুরে কেবল বিশ্বাস আর স্বপ্নভঙ্গের  অন্ধকার। এতখানি হতাশা পশ্চিমবঙ্গের অন্য কোন বিধানসভায় চোখে পড়েনি। নন্দীগ্রামে তো নয়ই। বস্তুত, ২০২১ সালের সিঙ্গুরে জমি আন্দোলনের  কোন রেশ আর অবশিষ্ট নেই। এক দিকে কারখানা হলে কী হত বা হত না, সেই আলোচনা। অন্য দিকে বন্ধ্যা হাজার একর নিয়ে হাহাকার। তবুও তার মধ্যে যেন ঝিলিক মারে দেড় দশকের পুরনো আবেগ। গোপালনগরে দেখা হল এস ইউ সি আই নেতা শঙ্কর জানার সঙ্গে। বেচারাম মান্নার সঙ্গে যৌথভাবে জমিরক্ষা কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন মৃৎশিল্পী শঙ্করবাবু৷ সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধের পোশাক মলিন। সংসার জুড়ে দারিদ্র্যের ছবি। দুপুরে ভাত খেতে খেতে শঙ্করবাবু বলছিলেন আন্দোলনের দিনগুলোর কথা। কেমন করে গড়ে উঠল জমিরক্ষা কমিটি, কেমন করে গ্রামে গ্রামে তৈরি হল কমিটির শাখা। বলছিলেন ২০০৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরের সেই রাতের কথা। যে রাতে  পুলিশের লাঠিতে গুরুতর আহত হন রাজকুমার ভুল। বাড়ি ফিরে মৃত্যু হয় তাঁর। শঙ্করবাবু বলছিলেন, “আমরা ডিএম-কে ঘেরাও করেছিলাম। আমি ছিলাম, আমাদের পার্টির নেতারা ছিলেন, মাস্টারমশাই ছিলেন, বেচা ছিল। তারপর কলকাতা থেকে মমতা এলেন। তখন অনেক রাত। মমতা ডিএম-কে বলতে লাগলেন, এখনই জমি ফেরতের ব্যবস্থা করতে হবে। আমি তো অবাক! এভাবে হয় নাকি…”।  তারপর শুরু হয় অবস্থান। পুলিশ লাঠিচার্জ করে অবরোধমুক্ত করে ডিএম-কে। বাংলার রাজনীতিতে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়।

বৃদ্ধ শঙ্কর জানার আক্ষেপ, শহীদ রাজকুমার ভুলকে কেউ মনে রাখেনি। বলছিলেন, “মমতা আন্দোলনটাকে হাইজ্যাক করে নিলেন। আন্দোলনের ফয়দা তুললেন উনি। সিঙ্গুরের মাটি থেকে আন্দোলনটা চলে গেল ধর্মতলার অনশন মঞ্চে। কৃষকরা ঠকলেন। আমরা চেষ্টা করেছিলাম রুখতে, দুর্বল শক্তি নিয়ে পারিনি। তারপর তো যা হল জানেনই…”।

ওঁকে প্রশ্ন করা হল, এখন ঠিক কী মনে হয়? ভুল করেছিলেন? এই যে কারখানা হল না, চাষও হল না, আপনারা দায় নেবেন না? শঙ্কর জানা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর বলেন, “নাঃ, ভুল কিছু করিনি। সময়ের ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম। কারখানা হলে যত লোক কাজ পেত, তার চেয়ে অনেক বেশি লোক কাজ হারাত। এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার শিল্পায়ন মানুষের ভাল করতে পারে না।” এরপর, একটু চুপ করে থেকে আবার বলেন, “তবে হ্যাঁ, জমিটাকে যদি বাঁচাতে পারতাম, নষ্ট করতে না দিতাম… তা তো পারিনি… তবে আজও যখন দেখি দিল্লির আন্দোলনকারী কৃষকরা সিঙ্গুরের কথা বলছেন, তখন গর্ব হয়…”

সিঙ্গুর জুড়ে চরকি পাক খেতে খেতে পৌঁছে গেলাম সেই সময়কার সিপিএম নেতা সুহৃদ দত্তের বাড়িতে। তাকানো যায় না বৃদ্ধের দিকে। সমস্ত শরীর জুড়ে দগদগে ঘা। হাঁটতে পারেন না। ধরে ধরে বাথরুমে নিয়ে যেতে হয়। তিরিক্ষি মেজাজ। কয়েকদিন আগেই বাথরুমে পড়ে গিয়ে চোট পেয়েছেন। বাড়ি গিয়ে চোখের দেখা দেখলেও কথা হল না। পরদিন ফোনে বললেন, “আমি কে! আমার সঙ্গে কথা বলে হবে কী! ওরা আমায় শেষ করে দিয়েছে, সিঙ্গুরকেও শেষ করে দিয়েছে।”

একটা মরে যাওয়া কারখানা। একটা মৃত বিতর্ক। অনেকগুলো জীবন্মৃত মানুষ আর দু কাল ছাপানো হতাশা — বিধানসভা নির্বাচনের আগে চুম্বকে সিঙ্গুরের ছবি এটাই। যেখানে দলবদল আছে, জমি আন্দোলন নেই।

সিঙ্গুরে টাটার কারখানা, সৃজন ভট্টাচার্য এবং বেচারাম মান্না – ছবি ফেসবুক থেকে

আরো পড়ুন – নন্দীগ্রাম: বিজেপির পাতা ফাঁদে পা দিচ্ছেন মমতা?

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.