~সায়ন্তন সেন~

বন্ধুগণ, শিরোনাম দেখেই অযথা হল্লা করবেন না। আব্বাস সিদ্দিকি, আনন্দবাজার অথবা আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের সঙ্গে এই লেখার কোন সম্পর্ক নেই। এমনকি — আইনশাস্ত্র, অর্থাৎ, জুরিসপ্রুডেন্সের সঙ্গেও — এই লেখার সম্পর্ক অতি ক্ষীণ। এতটাই ক্ষীণ যে কেতাবি আইনের চৌহদ্দি থেকে দূরবীনে চোখ রেখে নজর করতে চাইলেও আমাদের সন্দর্ভের কেবল খোলসটুকু আবছা মত পড়তে পারা যাবে, নির্যাস আত্মস্থ হবে না। কারণ আমরা কথা বলব মূলত ভাষা নিয়ে। আরো নির্দিষ্টভাবে বললে, ভাষার আইন নিয়ে। আব্বাস অথবা আনন্দবাজার-প্রসঙ্গ কখনও আচম্বিতে ‘ভুস্ করে’ উঠে পড়তে পারে কথায়-কথায়, কিন্তু উঠলেও, আবার তা নেমে যাবে। নিশ্চয়ই।

প্রথম কথা এই, আইন তুলে কখনো কথা বলা উচিত নয়।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

“আইন হাতে তুলে নেওয়া” — সে তো সত্যিই ভারী বিপজ্জনক ব্যাপার, কিন্তু আইন তুলে কথা বলা — সে আরো অনেক বেশি ভয়ঙ্কর। কথা প্ররোচিত করে। কথা স্লোগানের মতো ছড়িয়ে পড়তে পারে। কথা নিমেষেই হয়ে ওঠে এক থেকে বহুর। কথা একটি কণ্ঠে অনায়াসে ধারণ করে জনকণ্ঠের দাবি। তাই, আইন তুলে কখনো কথা বলতে নেই। রাষ্ট্র মাঈ বাপ। তার আইন, অন্তত বড় ভাই। ভাইজান বলেছেন, বড় ভাই আব্বা সমান। বাপ তুলে কথা বলতে নেই।

সুতরাং বুঝতেই পারছেন, আমরাও আইন তুলে কথা বলব না। আইন-টাইন তেমন বুঝিও না। আমরা ভাষার আইন তুলে দু-চার কথা বলতে চাই। বলতে চাই, ভাষার আইন বহুতর ― প্লুরাল।

যেমন ধরুন, এই কিছুদিন আগে দিল্লীতে এক মুসলিম যুবক জনতার হাতে প্রহৃত হয়ে মারা গেলেন রাস্তায়, হয়ত অনেকের মনে থাকবে, তাঁকে ঘিরে উন্মত্ত জনতা কোন এক কল্পিত স্বপ্নরাষ্ট্রের কার্নিভাল উদযাপন করেছিল গান গেয়ে। স্বপ্নরাষ্ট্র মানে এক্ষেত্রে এক্সক্লুসিভ হিন্দুরাষ্ট্র। আর, কী দুর্ভাগ্যজনক, তখন, সেই হননোৎসবে, তাদের সহায় হয়েছিলেন বাংলার অন্যতম কবি রবীন্দ্রনাথ। দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু হয়েছিলেন যে, সে-ও তো ইতিহাস! ঐ যে ছেলেটি, যে জাতীয় সংগীত শুনছিল লিঞ্চড হতে-হতে — রবি ঠাকুরের গান কেমন বেজেছিল তার কানে!

অবশ্য রবীন্দ্রনাথ উপলক্ষ, গানের বাণীও অপ্রাসঙ্গিক, গুরুত্বপূর্ণ হল সিম্ফনিটা, কারণ ওটা গিলিয়ে দেওয়া যায় — এরকম কখনো কখনো, আমাদের এবং অন্যান্য দেশে, ‘পবিত্র’ করে তোলার জন্য হিংসার ভাষাকে বাঁধা হয় সিম্ফনিতে। যে সিম্ফনি রাষ্ট্রকে ‘এক্সক্লুসিভিটি’ দেবে। এই কিছুদিন আগে, সিনেমা হলে ‘বাধ্যতামূলক’ জাতীয়ঙ্গীতকে ‘বাধ্যতামূলক’ সম্মান না দেখালে আকছার হেনস্থার ঘটনা ঘটত। কেন? যে ‘বাক্’, যে ‘মেলডি’, যে ‘সিম্ফনি’, যে ঢ্যা-র‍্যা-র‍্যা-র‍্যা-সহযোগে উচ্চকিত কোরাস ― ওয়ান নেশনের ইমেজকে মর্মে ধারণ করে আছে, প্রোমোট করছে — তার অবমাননা, বস্তুত দেশেরই অবমাননা। এবার ঠ্যালায় পড়ে উত্তেজিত জনতার নাকের ডগায় আপনি যতই সংবিধান উচ্চে তুলে জাতীয়সঙ্গীতের সময় পুচ্ছ না তোলার অধিকার ঘোষণা করুন, সাউথ সিটির পুলিশও আপনারই মা-মাসি তুলে গাল হাঁকাবে, বাপের নামে খিস্তি ছুঁড়বে। উর্দি পরেই। কেন জানেন? সেদিন দিল্লির রাস্তায় যারা লাঠি তুলে নিয়েছিল হাতে, তাদের কাছে, এবং সাউথ সিটির পুলিশবাবুটির কাছেও — ঐ সিম্ফনিটাই হচ্ছে আসল আইন। ঐ বাক্, ঐ সুর। আইন মানে, অমুক ধারার তমুক উপধারা নয়। আইন মানে, ভাষার আইন। আইন নাম্বার ওয়ান।

হিন্দুরাষ্ট্র গঠন হলে এ আইন বলবৎ হবে — ব্যাপারটা ঠিক এমন একেবারেই নয়। ব্যাপার হল, ১৯৯২ থেকে এ আইন বলবৎ হয়ে গেছে। আপাতদৃষ্টিতে যাকে ‘আইন’ বলে মনে হয়, তা আসলে কাগজের স্তূপ। ভাষাহীন। নির্জন। খসখসে। বাপের জন্মে সেসব কেউ পড়ে দেখে না। পড়া উচিৎও না। আমি শুনেছি, সেই কাগজের স্তূপে কোথাও কোথাও নাকি লেখা আছে — ‘সবাই সমান’। কিন্তু যাকে পয়লা নম্বর আইন বলেছি, তাতে বলা আছে — ‘অমুকের বাচ্চা পাকিস্তানে যা’। আমি শুনেছি যে কাগজের স্তূপে কোনো এক পৃষ্ঠায় লেখা আছে — ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’। অথচ আদত আইন জানিয়ে দিয়েছে, ‘কবিতা লিখলে জেলে পচে মরবি’। এমনকি, কী করুণ রসিকতা, এখনও ভারতবর্ষে একটি কাগজে লেখা আছে, ‘ধর্ষণ করলে শাস্তি’! কিন্তু এখানেও আছে আসলি আইনের দাওয়াই। যদি আপনি অমুকদের, বা নীচু জাতের কেউ হন, তাহলে সেই আইনের শাসন কায়েম রাখতেই আপনার ধর্ষকদের সমর্থনে মিছিল বেরোবে। এক্সক্লুসিভ হিন্দুরাষ্ট্রের ভাষার আইনে সকল অহিন্দু ও কম হিন্দুদের ‘অওকাত’ বুঝিয়ে দেওয়ার বিচিত্র সব পদ্ধতির কথা বলা আছে।

আপনি কান খুলুন, চোখ খুলুন, যদি নিতান্ত নির্বোধ না হন তো দেখতে পাবেন, আপনার দেশ, আপনার সেকুলার ভারতবর্ষ এই এক্সক্লুসিভ হিন্দুরাষ্ট্রের ভাষার আইন অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। এই যে আমাদের দেশে গণহত্যা হলে পুলিশ গা নড়ায় না, নড়ালে সংখ্যাগরিষ্ঠকে আগুন জ্বালাতে সাহায্য করে — তারও ঐ এক কারণ — ছোট (কেতাবি) আইনের বাবা বড় আইন বসে আছে পায়ে পা তুলে। সেই বড় আইনের কাছে জবাবদিহি করতে হবে বলেই না খাকি উর্দি পরেও টায়ারে আগুন জ্বালাতে হয়। ব্যারিকেড করে ঘিরে রাখতে হয় জ্বলন্ত মানুষদের।

কিন্তু এই আসলি ‘আইন’ (একো হলে বলতেন ‘উর’) যদি পড়ে ফেলে কেউ কোনদিন, যদি দেখে ফেলে — এ দেশের প্রধান আইন বিক্ষোভকারীকে প্রকাশ্য হত্যায় মদত দিয়েছে, একেবারে লেখাপড়া করে, স্ট্যাম্প মেরে মদত দিয়েছে, হত্যার অধিকার তুলে দিয়েছে খোদ উর্দিধারীর কাঁধেই, যদি ঠিক ঠিক বলে ফেলে মইদুল ইসলাম মিদ্যার জন্য মৃত্যুর বিধানই তো লেখা আছে ভারতীয় আইনে, সাদা চোখেই দেখতে পাচ্ছি, তা না হলে আর ‘পিটিয়ে পিটিয়ে’ ঐ নৃশংস খুনের বিচার হয় না কেন — তাহলে চাপ! কিছুক্ষণ তোতলানোর পর সুমন-সাংবাদিকদের তখন আরেক ভাষার আইনে চলকে পড়তে হয়। জাবর কাটতে হয় অন্য এক আইনের ভাষা। সে ভাষা বড় চতুর। আব্বাস ভদ্রজন, কিন্তু তেমন ঠ্যাঁটা কেউ যদি জিগ্যেস করে — তোর সেকুলার দেশে ‘জয় শ্রী রাম’ বলতে বলে বাচ্চা ছেলেরাও গরিব মুসলমান ট্যাক্সিচালকের দাড়ি ধরে টানার সাহস পায় কেমন করে, কাদের ভরসায় জল খাওয়ার অপরাধে মুসলিম কিশোরের অণ্ডকোষে ক্রমাগত লাথি মারা যায়, তখন সুমনেরা তুরুপের আরেক তাস বার করবেন কৌশলে। ভ্রুযুগল ঈষৎ কুঞ্চিত করে চোখে মুখে প্রবল আশঙ্কার অভিব্যক্তি ফুটিয়ে উচ্চারণ করবেন বেদ — “তার জন্য তো আইন আছে, আদালত আছে, অপরাধীর বিচার আছে, কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তির ব্যবস্থা আছে”। সুমন দে-র আবেগমথিত উচ্চারণ, সুমন দে-র ভাষা শুনে মনে হয়, এই ভারতবর্ষে এত কিছু আছে — আমি শালা জানতামই না! মনে হয়, ভারতবর্ষ যেন ভারী সব-পেয়েছির-দেশ। এখানে সব, কেবলই, ‘আছে আছে আছে’। ন্যায় আছে। নীতি আছে। আদালাত আছে। বিচার আছে। এতসব যখন আছে, তখন ইনসাফও নিশ্চয়ই আছে। আর যদি কখনো, কোন গর্ত দিয়ে দুনিয়ার লাঞ্ছিত ভাগ্যহতের দল পোড়া ভাঙা ঘরদোর থেকে মুখটুকু বাড়িয়ে বলে — ‘ইনসাফ কোথায়?’, তখন আনন্দবাজারের শ্বদন্তটি দৃশ্যমান হয়, নরমাংসভোজ সেরে সুমন দে জানান — এক হাতে তো তালি বাজে না (আল্লার কৃপায় সুমন কখনো ঘন্টাখানেক তালাল আসাদের মুখোমুখি বসবেন না, নইলে সুইসাইড বম্বিং-এও কেমন করে দু-হাতে তালি বাজে, আসাদ বুঝিয়ে দিতেন)। প্রবাদ হয়ে যাওয়া এই যুক্তি আর কে খন্ডাবে! এও তো পাবলিকেরই স্লোগান, গণমানুষের হৃদয়ের বাণী — খুনে-ধর্ষণে-গণহত্যায় মধ্যবিত্ত সেকুলার ভাষার আইনে অব্যর্থ পাঁচন, ‘এক হাতে তো তালি বাজে না’। এই তবে আপনার আইন নম্বর দুই। যে ভাষার আইনে আনন্দবাজার কথা বলে। কেবল গণহত্যায় নয়, মমতা ব্যানার্জি যাদের ‘কন্ট্রোল করেন’, তারা লোহার রড নিয়ে বুথে বুথে সন্ত্রাস চালালেও আবাপ গোষ্ঠী ‘উভয়পক্ষের সংঘর্ষ’ দেখতে পায়। কেন পায়? আইনে বলা আছে। বলা আছে, ‘এক হাতে তালি বাজে না’। দুই নম্বর আইনে — মধ্যবিত্ত সেকুলার ভাষার আইনে।

অমিত শাহ যদি ‘ঐ’ প্রথম আইন শেখান, তবে সুমন দে ‘এই’ দ্বিতীয় আইন দেখাবেন। হাত ধরাধরি করেই তাঁরা ওয়ান নেশন বানাবেন। এ পর্যন্ত কোনো ঝক্কি ছিল না।

কিন্তু মুস্কিল হয়েছে কি, আরও এক আইন রয়েছে এই দেশেই। ক্ষমতার স্তর বিন্যাসে — তিনটি যে ভাষার আইন, তার মধ্যে সবচাইতে নীচে, বা বলা ভাল, একেবারে প্রান্তে। সে আইন ঘোষণা করেছে, রাষ্ট্র যদি পেটে লাথি মারে, তবে ভিক্ষা চেয়ে খাব, কিন্তু দেশ থেকে তাড়াতে চাইলে রেলের লাইনে আগুন জ্বলবে। এই যে মানুষরা ফুঁসে উঠলেন হঠাৎ, এত হাজারে হাজারে, নিঃস্ব, অসহায়, আনএকোমোডেটেড মানুষ, তাঁদের সকলের কণ্ঠ মিলল একটি আওয়াজে, একটি ভাষায়, দূর থেকে সে ভাষাকে কবিতার বলে মনে হয়, কিন্তু সে ভাষাও আইনেরই ভাষা। সে আইন স্পষ্টতই, পুলিশকে রসুল নয়, বরং জালিম বলে চিহ্নিত করেছে। সংসদে বসে, জল খেতে খেতে, কাগজে-কলমে জীবনের বিকিকিনি ইনকার করেছে সেই আইন। সে আইন হঠকারী। সে আইন বিপজ্জনক। লুঠেরাদের ‘মাটিতেই কবর’ দিতে বলে ― লাথখোরদের ভাষার আইন। বলে রোহিত, তোমার হত্যাকারীর বেঁচে থাকা আমায় ক্রুদ্ধ করে। সে আইন, মানুষের মুখে মুখে, বাতাসে বাতাসে ফিরে, কবিতার ভাষা হয়ে ঘোরে, ওড়ে, গোপনে হিংসায় প্ররোচনা দেয়। দূর থেকে মনে হয় কবিতাই বুঝি। বুঝি বাক্যের কারসাজি। আসলে তা নয়, আসলে নিষিদ্ধ আইন। যে আইন জনতার দরবারে বিচার করতে চায় বিচারপতির। কথা হয়ে, শব্দ হয়ে, স্লোগান হয়ে প্ররোচনা দেয়, হয়ে ওঠে এক থেকে অনেকের। এ আইন, “আইন তুলে কথা বলে”।

আমাদের অত সাধ্যি নেই। আমরা গোবেচারা, আমরা এলেবেলে, আমরা তেঢ্যামনাও কখনও-কখনও — কিন্তু আনন্দবাজারের সিঁড়িতে (উপযুক্ত ইনসেন্টিভের বিনিময়ে) মগজ না রেখে এলে আমাদেরই মধ্যে কেউ কেউ নিশ্চয়ই বুঝতে পারতেন, এই অতিকায় গণতন্ত্রের দেশে একটিই ভাষার আইনে সব মানুষকে বেঁধে ফেলা যায় না। বাঘ আর হরিণের আইন আলাদা ছিল, আলাদাই থাকবে।

এবং, ফ্রানৎস ফানোঁ বলেছেন, দাস আগে কর্মকে ভালোবাসত, এখন প্রভুকে ভালোবাসে। সুতরাং, সাধু, সাবধান।

Leave a Reply