শালবনী বিধানসভার একটি গ্রাম। সবেমাত্র প্রচার সেরে গিয়েছেন সংযুক্ত মোর্চা সমর্থিত সিপিআই (এম) প্রার্থী সুশান্ত ঘোষ। চায়ের দোকানের জটলায় ঢুকে পড়া গেল। একজন বৃদ্ধ আদিবাসী মহিলা বিড়ি টানছেন। দেখে মনে হল, বয়স প্রায় সত্তরের কোঠায়।

– কি বুড়িমা, কে জিতবে তোমাদের এখানে?

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

– এই তো সুশান্ত ঘোষ বলে গেল ভোট দিতে। ওকেই দেব।

– কিন্তু লোকটা তো ভাল নয় বলে শুনি। অনেক খুন করেছে নাকি?

– খুন এদিকে কে করেনি বাবা? সিপিএম, তৃণমূল সবাই করেছে। আর সবচেয়ে বেশি খুন করেছে বন পার্টি। ওরা যখন ছিল, তখন এলাকা নরক হয়ে গেছিল। এবার যারা লড়ছে, তাদের মধ্যে সুশান্ত ঘোষই ভাল।

– কিন্তু দিদি তো রাস্তাঘাট করেছে। উন্নয়ন করেছে। তাই না?

– করেছে তো। তাই গেল বার জোড়া ফুলে দিয়েছি। তারপর দেখি খালি চুরি আর চুরি। গত লোকসভায় পদ্মফুল এল। বলল চুরি আটকাবে। তখন ওদের দিলাম। এবার দেখছি পদ্মফুলে তিনটে ভাগ। তাই লালপার্টিকে দেব।

শালবনী অবশ্যই ব্যতিক্রমী কেন্দ্র। তৃণমূল, বিজেপির পাশাপাশি এখানে প্রবল ভাবে লড়াইয়ে আছেন সিপিএমের এক সময়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা সুশান্তবাবু৷ কিন্তু শালবনী, গড়বেতা, রানীবাঁধ, চন্দ্রকোনার মতো হাতে গোনা কয়েকটি আসন বাদে সংযুক্ত মোর্চা প্রথম দফার অন্য কেন্দ্রগুলিতে কার্যত লড়াইয়ে নেই৷ সরাসরি দ্বিমুখী লড়াই — বিজেপি বনাম তৃণমূল। জঙ্গলমহলের অসংখ্য জনজাতির দাবিদাওয়ার হাজার রকমের সমীকরণ সামলে ভোটপ্রচারে নেমেছে দুই ফুল। তৃণমূলের প্রধান প্রতিপক্ষ প্রবল বিজেপি হাওয়া, বিজেপির কপালে ভাঁজ ফেলছে অর্ন্তকলহ। এর মধ্যেই আলোচনা চলছে কুর্মি ভোট নিয়ে। জঙ্গলমহল জুড়ে প্রায় ৩০ লক্ষ কুর্মি থাকেন। তাঁরা ২০১৯ সালে দু হাত ভরে ভোট দিয়েছিলেন পদ্মফুলে। এবার তাঁরা কাকে সমর্থন করবেন, সমর্থন বিভাজিত হবে কিনা, তা নিয়ে জল্পনা চলছে।

জঙ্গলমহল ও পূর্ব মেদিনীপুর জুড়ে ঘুরতে ঘুরতে মনে হল, প্রথম দফার ৩০টি কেন্দ্রে কোন সমসত্ত্ব ভোটিং প্যাটার্ন তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। অধিকারী পরিবারের দলত্যাগ এবং বিজেপির পক্ষে হাওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর, তেমনই প্রতিটি আসনেই রয়েছে কিছু নির্দিষ্ট সমীকরণ। ফলে আসন ধরে ধরে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করাই ভাল।

প্রথমেই শুরু করা যাক পূর্ব মেদিনীপুর থেকে। আসনের নাম পটাশপুর। অধিকারী গড় হিসেবে পরিচিত এই কেন্দ্রের বড় ফ্যাক্টর হতে পারে শুভেন্দু ও শিশিরের দলবদল। তাঁদের হাত ধরেই ভরে উঠতে পারে বিজেপির ঝুলি। শুভেন্দু ও শিশির ফ্যাক্টরের জন্যই এই কেন্দ্রে কিছুটা হলেও এগিয়ে বিজেপি। নির্বাচনী মেশিনারি প্রায় পুরোটাই অধিকারী পরিবারের নিয়ন্ত্রণে। সেই সঙ্গে কয়েকটি পকেটে আরএসএসের পুরনো সংগঠন। পটাশপুর কেন্দ্রের বাম প্রার্থী সৈকত গিরি সিপিআই-এর ছাত্র সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক। তাঁর সমর্থনে প্রচার করে গিয়েছেন কানহাইয়া কুমার। সভায় ভিড়ও হয়েছে ভালই। সেই উদ্দীপনা কাজে লাগিয়ে বাম প্রার্থী যদি বিজেপির ভোটে থাবা বসাতে পারেন, তাহলে লড়াইয়ে ফিরবে তৃণমূল।

কাঁথি উত্তর। অধিকারী পরিবারের দুর্গ। তবে দীর্ঘদিন ধরেই দলের অন্দরে ‘শান্তিকুঞ্জের বিরোধী’ হিসাবে পরিচিত অংশও এখানে সক্রিয়। ফলে লড়াই সহজ নয়। এই আসন জয়ের জন্য তৃণমূলের হাতিয়ার পুরনো সংগঠন। তার মোকাবিলায় তৈরি বিজেপি প্রার্থী সুনীতা সিনহার স্বচ্ছ ভাবমূর্তি। কোন পক্ষই এই আসনে সহজ জয় পাচ্ছে না। লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। তৃণমূলের সুবিধা, এই আসনে তাদের সংগঠকদের বহুদিন ধরে অধিকারীদের সঙ্গে লড়াই করার অভিজ্ঞতা রয়েছে।

ভগবানপুর। এই কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী অর্ধেন্দু মাইতি। গত দুবারের বিধায়ক। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, তাঁকে এলাকায় দেখা যায় না। সরকার বিরোধী এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে কিছুটা এগিয়ে বিজেপি প্রার্থী রবীন্দ্রনাথ মাইতি। অধিকারী পরিবারের নিজস্ব মেশিনারির সঙ্গে যোগ হয়েছে আরএসএসের পুরনো পকেট সংগঠনের শক্তি৷ শুভেন্দু অধিকারী নিজে বারবার এই কেন্দ্রে সময় দিয়েছেন।

খেজুরি। নন্দীগ্রাম লাগোয়া এই কেন্দ্রে বিজেপি-তৃণমূলের কড়া টক্কর। সমানভাবে লড়াইয়ে আছেন সিপিএম প্রার্থী হিমাংশু দাসও। তৃণমূল প্রার্থী দাসের ‘চরিত্র’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর স্ত্রী। এই ঘটনা আমজনতার মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তুলনামূলকভাবে ভাল ভাবমূর্তি বিজেপি প্রার্থী শান্তনু প্রামাণিকের। তবে খেজুরির বৈশিষ্ট্য হল ২০১৯ সালের বাম থেকে রামে যাওয়া লাল ভোটের বড় অংশের ঘর ওয়াপসির সম্ভাবনা৷

কাঁথি দক্ষিণ। শুভেন্দুর গড় হিসাবে পরিচিত এই কেন্দ্রটিও। এই এলাকার শহরকেন্দ্রিক ভোটাররা অধিকারীদের ‘পকেট ভোটার’ হিসাবেই পরিচিত। তার উপর জ্যোতির্ময় কর ছিলেন পটাশপুরের বিধায়ক। তাঁকে সরিয়ে নেওয়া নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। স্বাভাবিকভাবেই এই কেন্দ্রে এগিয়ে বিজেপি। শহরের সর্বত্রই পদ্মের দাপট।

রামনগর। জেলার রাজনীতির অঙ্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তৃণমূল-বিজেপির দ্বিমুখী লড়াই। তৃণমূলের সংগঠন শক্তপোক্ত। কিন্তু সরকারবিরোধী হাওয়া রয়েছে। ফলে তৃণমূল প্রার্থী অখিল গিরি কিছুটা ব্যাকফুটে। মনে রাখা দরকার, অখিল গিরি তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকে অধিকারীদের বিরোধিতা করে আসছেন। নন্দীগ্রামেও মমতার অন্যতম ভরসা তিনি। বিজেপি হাওয়াতেও নিজের দুর্গ রক্ষায় মরিয়া অখিল শিবির। তবে তাঁর ছেলে সুপ্রকাশ গিরি এবার টিকিট না পাওয়ায় একটু সুর কেটেছে বলে জল্পনা।

এগরা কেন্দ্রে প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক তরুণ মাইতি বনাম বিজেপির তরুণ প্রার্থী অরূপ দাসের লড়াই। কারোর বিরুদ্ধেই তেমন বড় কোন অভিযোগ নেই। ফলে স্বচ্ছ ভাবমূর্তি নিয়ে সেয়ানে সেয়ানে টক্কর। তৃণমূলের পুরনো সংগঠন এখানে তেমন ভাঙেনি। তবে যুবকদের বড় অংশ শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে।

মেদিনীপুর। নিঃসন্দেহে এগিয়ে বিজেপি। এমনিতেও লোকসভা ভোটের নিরিখে এই কেন্দ্রে এগিয়ে গেরুয়া শিবির। বহিরাগত তারকা প্রার্থী জুন মালিয়াকে নিয়ে তৃণমূলের অন্দরে ক্ষোভ থাকায় সুবিধা পাচ্ছে তারা। তবে প্রচারের দিক থেকে বিজেপিকে দশ গোল দিয়েছেন ঘাসফুল প্রার্থী। বিজেপি নেতৃত্বের অবশ্য দাবি, তাঁদের জয়ের জন্য এই কেন্দ্রে ব্যানার, ফ্লেক্সের প্রয়োজন নেই।

শালবনী। জঙ্গলমহল তথা প্রথম দফার সবচেয়ে আলোচিত কেন্দ্র। কয়েকটি পকেট এলাকা তৃণমূলের গড় হিসাবে পরিচিত। লোকসভায় বিজেপি ভাল সংগঠন তৈরি করলেও, তা এখন তিন টুকরো। বিজেপির সরকারী প্রার্থী ছাড়াও রয়েছেন গেরুয়া শিবিরের দুই বিক্ষুব্ধ নির্দল। ফলে রামে যাওয়া বাম ভোট ফিরিয়ে জেতার বিষয়ে প্রত্যয়ী সুশান্ত ঘোষ। ধারে ভারে অনেকটাই এগিয়ে বামফ্রন্ট।

গড়বেতা। এই কেন্দ্রে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। সংগঠন শক্ত হলেও বিজেপির কাঁটা অন্তর্দ্বন্দ্ব। এলাকায় প্রবল তৃণমূলবিরোধী হাওয়া। জঙ্গলমহলের এই কেন্দ্রে বিজেপির সংগঠন সেই বাম আমল থেকে। অভিযোগ, পুরনো নেতারা গুরুত্ব পাচ্ছেন না। সংযুক্ত মোর্চার প্রার্থী সিপিএমের তপন ঘোষ। এককালের বিখ্যাত অথবা কুখ্যাত তপন-সুকুরের তপনবাবুর সভায় ভিড় হচ্ছে৷ আব্বাস সিদ্দিকি এসে তাঁর পক্ষে প্রচার করে গিয়েছেন। ফলে দুই ফুলের পাশে প্রবল ভাবে লড়াইয়ে আছে বামেরা।

দাঁতন কেন্দ্রে অনেকটা এগিয়ে তৃণমূল। ঘাসফুল শিবিরের সংগঠন ও প্রার্থীর ভাবমূর্তিকে টক্কর দেওয়া বিজেপির পক্ষে কার্যত অসম্ভব। এই এলাকায় অধিকারী পরিবারের প্রভাবও সীমিত। সংযুক্ত মোর্চার প্রার্থীও লড়াইয়ে নেই৷

কেশিয়াড়ি কেন্দ্র জিততে মরিয়া স্বয়ং শুভেন্দু অধিকারী। এলাকা জুড়ে প্রধান ইস্যু অনুন্নয়ন। তৃণমূলের ব্লক সভাপতিও মানছেন পর্যাপ্ত উন্নয়ন হয়নি এখানে। তৃণমূলের জয়ের পথে কাঁটা বিছিয়ে দিতে পারে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, বালি খাদান ইস্যু। ফলে লোকসভা নির্বাচনের পরে তৈরি হওয়া সংগঠনের জোরে লড়াইয়ে পদ্মফুল শিবির।

খড়গপুর গ্রামীণ কেন্দ্রে বিরোধীরা সংগঠিত নয়। বিজেপির অন্দরে তীব্র অর্ন্তবিরোধ। লোকসভার পর গেরুয়া শিবির ফুলে ফেঁপে উঠলেও পরে দল ছেড়েছেন অনেকে। ফলে লড়াইয়ে এগিয়ে রাজ্যের শাসক দলই।

পুরুলিয়া জেলার বান্দোয়ান কেন্দ্র। একসময় মাওবাদীদের মুক্তাঞ্চল। সেই জনযুদ্ধ আমল থেকে এখানে শক্তিশালী বন পার্টি। মাওবাদী এবং জনসাধারণের কমিটির অনেকেই এখন তৃণমূলে। বিদায়ী বিধায়ক রাজীবলোচন সোরেন প্রার্থী হওয়ায় দলে ক্ষোভ রয়েছে। কিন্তু আদিবাসী, মাহাতো-সহ বিভিন্ন জনজাতির মানুষ তৃণমূলের পাশে আছেন। বিজেপি প্রার্থীকে নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে গেরুয়া শিবিরে। সেটা ‘প্লাস পয়েন্ট’ তৃণমূলের। দলে তেমন জনপ্রিয় না হলেও ব্লকের আদিবাসী সংগঠনগুলির সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ তৃণমূল প্রার্থীর।

বলরামপুর। এটিও মাওবাদীদের মুক্তাঞ্চল ছিল। জনসাধারণের কমিটি বাদে অন্য কোন রাজনৈতিক শক্তির অস্তিত্ব ছিল না। সেই কমিটির নেতারা এখন তৃণমূলে, কিন্তু কর্মীদের বড় অংশ পদ্মফুলে। গত পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকে এই কেন্দ্র একেবারে গেরুয়াময়। তবে প্রার্থী নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে গেরুয়া শিবিরে। তার সুযোগ নিতে মরিয়া তৃণমূল। ফলে এই কেন্দ্রে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি।

বাঘমুণ্ডি। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। একদা কংগ্রেসের ‘গড়’ বাঘমুন্ডিতে লোকসভায় বিজেপির প্রবল হাওয়া ছিল। কিন্তু আসনটি বিজেপি আজসুকে ছেড়ে দেওয়ায় দলের ভিতরে ক্ষোভ-বিক্ষোভ চরমে উঠেছে। তাই বিজেপির ভোট কংগ্রেসে যেতে পারে। এই কেন্দ্রের দুবারের কংগ্রেস বিধায়ক, জেলা কংগ্রেস সভাপতি তথা এই কেন্দ্রের জোট প্রার্থী নেপাল মাহাতো আবার জয়ী হতেই পারেন। জেলার নিরিখে দেখলে অন্যতম হেভিওয়েট প্রার্থী তিনি। এই এলাকায় ফরোয়ার্ড ব্লকের পকেট ভোট রয়েছে। সেই ভোট জোট প্রার্থী পাবেন কিনা, তা নিয়ে জল্পনা চলছে।

জয়পুর কেন্দ্র। রাজ্যের একমাত্র কেন্দ্র যেখানে জোড়া ফুলের কোন প্রার্থী নেই। সেই সঙ্গে মুখোমুখি লড়াই কংগ্রেস, ফরওয়ার্ড ব্লকের। তৃণমূল প্রার্থী উজ্জ্বল কুমারের মনোনয়ন বাতিল হয়ে গিয়েছে। এই উজ্জ্বল কুমারের রাজনৈতিক জীবন শুরু ডিএসও দিয়ে। পরে মাওবাদী অভিযোগে জেল খাটেন। এখানে নির্দল দিব্যজ্যোতি সিং দেও-কে সমর্থন করছে তৃণমূল। জোট থেকে ফরওয়ার্ড ব্লকের প্রাক্তন সাংসদ ধীরেন্দ্রনাথ মাহাতোকে প্রার্থী করা হলেও কংগ্রেস এখানে প্রার্থী দিয়ে দিয়েছে। বিজেপি প্রার্থী, মুকুল-পন্থী, ফরওয়ার্ড ব্লক থেকে আসা প্রাক্তন সাংসদ নরহরি মাহাতোর বিরুদ্ধেও রয়েছেন গোঁজ প্রার্থী। ফলে এই আসনের অঙ্কটা বেশ কঠিন। তবে আসনটি কংগ্রেসের ঝুলিতে যেতে পারে। তৃণমূলের একাংশের ভোট পেতে পারে কংগ্রেস।

পুরুলিয়া কেন্দ্রে অনেকটাই এগিয়ে বিজেপি। শুভেন্দু অনুগামী প্রাক্তন কংগ্রেস বিধায়ক সুদীপ মুখোপাধ্যায় বিজেপির প্রার্থী হওয়ায় দলের অন্দরে ক্ষোভ রয়েছে। তবে সুদীপ এলাকায় জনপ্রিয়। এই আসনে এবার কংগ্রেসের প্রার্থী পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়। শহরের পরিচিত মুখ। অন্যদিকে দাপুটে নেতা বলে পরিচিত পুরুলিয়া জেলা পরিষদের সভাধিপতি সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রার্থী করেছে তৃণমূল।

মানবাজার কেন্দ্রের দু বারের বিধায়ক রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণিকল্যাণ দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী সন্ধ্যারানি টুডু এবারও তৃণমূলের প্রার্থী। এই কেন্দ্র তৃণমূলের ‘গড়’। ফলে জেলা জুড়ে বিজেপির বাড়বাড়ন্ত হলেও এই কেন্দ্রে তৃণমূলের জয় একপ্রকার নিশ্চিত।

কাশীপুর। এই কেন্দ্রে তৃণমূলের দুবারের বিধায়ক স্বপন বেলথরিয়া এবারও প্রার্থী। তৃণমূলবিরোধী হাওয়া প্রবল। বিজেপি এখানে ‘ঘরের ছেলে’, শিক্ষক, দলের আদিবাসী সংগঠককে প্রার্থী করেছে। আগে এই কেন্দ্র সিপিএমের ‘গড়’ ছিল। এবার সেই ‘গড়’ পুনরুদ্ধারে মরিয়া লাল পার্টি। এখানে কিন্তু লড়াই দ্বিমুখী নয়। দুই ফুলের ভোট কাটাকাটিতে জিততে পারেন জোট প্রার্থীও।

পাড়া আসনে তৃণমূলের বিধায়ক উমাপদ বাউরিই এবার প্রার্থী। প্রার্থী নিয়ে বিজেপিতে কলহ প্রবল। না হলে এই কেন্দ্রে গেরুয়া শিবিরের জয়ের সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু হারানো জমি পুনরুদ্ধার করে এগিয়ে তৃণমূল।

রঘুনাথপুরে তৃণমূলের দুবারের বিধায়ক পূর্ণচন্দ্র বাউরি এবার এই কেন্দ্র থেকে প্রার্থী না হওয়ায় দলের গোষ্ঠীকোন্দল প্রশমিত। কোমর বেঁধে প্রচারে নেমে পড়েছেন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। তবে সংগঠন মজবুত করেছে বিজেপি। প্রভাবশালী যুব তৃণমূল নেতারা শুভেন্দুর হাত ধরে বিজেপিতে।

বাঁকুড়া জেলার শালতোড়া কেন্দ্রে বিজেপি এগিয়ে। বাউড়ি ভোট ফল নির্ধারণ করে এই কেন্দ্রের। তৃণমূল প্রার্থী মণ্ডল সম্প্রদায়ের। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বিজেপি প্রার্থী চন্দনা বাউড়ি নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা। এই এলাকায় আরএসএসের মজবুত সংগঠন। ছোট ছোট ক্যাম্প করে প্রচার করছে তারা।

ছাতনায় তৃণমূল প্রার্থী শুভাশিস বটব্যালকে কাছে না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। ব্লকের নেতারাই বলছেন, তাঁকে ফোনে পাওয়া যায় না। জনসংযোগও নাকি তলানিতে ঠেকেছে। জলকষ্ট মেটাতে সরকার টাকা দিয়েছে কিন্তু বিধায়ক কাজ করেননি বলে অভিযোগ। ফলে দলের অন্দরে ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও এগিয়ে বিজেপি।

রানিবাঁধ। এই কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী জ্যোৎস্না মাণ্ডি আদিবাসী। তবু আদিবাসীদের মধ্যে আরএসএস সংগঠন শক্ত। ২০১৩ সাল থেকে জনকল্যাণমুখী কাজ করেছে। তবে সম্প্রতি আদিবাসীদের মধ্যে বিজেপিবিরোধী হাওয়া তৈরি হয়েছে। ঝাড়খণ্ড পার্টি (নরেন) তৃণমূলের পাশে। কিন্তু প্রচারে ঝড় তুলছেন সিপিএমের দেবলীনা হেমব্রম। ত্রিমুখী লড়াই এই আসনে। রামে যাওয়া বাম ভোট ফেরাতে পারলে জিতবেন দেবলীনা।

রাইপুরের তৃণমূল প্রার্থী আদিবাসী হলেও জনসংযোগ বিচ্ছিন্ন। আরএসএসের সংগঠনের জোরে বিজেপি এগিয়ে। তবে আব্বাস সিদ্দিকির জনপ্রিয়তাও প্রবল। আইএসএফের প্রার্থীর সংগঠন শক্ত। তিনি প্রচুর ভোট পাবেন।

ঝাড়গ্রাম জেলার নয়াগ্রাম কেন্দ্রে তৃণমূলের উন্নয়নমূলক কাজ ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। কাজের নিরিখে এগিয়ে তৃণমূল। তবে বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি অনেকটাই বেশি। এলাকায় এলাকায় শক্ত সংগঠন আরএসএসের। আদিবাসী সংগঠনগুলির বড় অংশের সমর্থনও পদ্মের দিকে।

গোপীবল্লভপুরে তৃণমূল প্রার্থী খগেন্দ্রনাথ মাহাতো। বিজেপির প্রার্থী সঞ্জিত মাহাতো। সিপিএমের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন প্রশান্ত দাস। জঙ্গলমহলের এই আসনে তৃণমূল-বিজেপির হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। এই আসনে পিসিসি সিপিআইএমএলেরও কিছু পকেট ভোট রয়েছে। লোকসভা ভোটে বিজেপি হাওয়া ছিল প্রবল। কিন্তু তারপর থেকে অর্ন্তবিরোধের জেরে ভাটার টান পদ্মে।

ঝাড়গ্রাম। হাইপ্রোফাইল কেন্দ্র। তৃণমূল প্রার্থী বীরবাহা হাঁসদা, বিজেপি প্রার্থী সুখময় শতপথী। সিপিএমের টিকিটে দাঁড়িয়েছেন মধুজা সেনরায়। কাজের নিরিখে তৃণমূল এগিয়ে। বিজেপির সংগঠন শক্তপোক্ত। ফলে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। মধুজাও ২০১৯ সালে অন্য শিবিরে যাওয়া বাম ভোটের বড় অংশ ফেরাতে পারবেন বলে মনে করছেন জেলার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বীরবাহা পাচ্ছেন মা চুনীবালার সমর্থন। এই আসনে সেটাও বড় ফ্যাক্টর।

বিনপুরে দেবনাথ হাঁসদা এবার তৃণমূল প্রার্থী। বিজেপি প্রার্থী পালহান সোরেন এবং সিপিএম প্রার্থী প্রাক্তন বিধায়ক দিবাকর হাঁসদা। লড়াইয়ে এগিয়ে জোড়াফুল। পুরনো জনসাধারণের কমিটির পুরোটাই তাদের পক্ষে।

প্রথম দফার নির্বাচনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কুর্মি ভোট।

গত লোকসভা নির্বাচনে জঙ্গলমহলে কুর্মিরা দু হাত তুলে বিজেপিকে সমর্থন করেন। শুধু জঙ্গলমহলেই নয়, সংলগ্ন ঝাড়খণ্ডে এই জনগোষ্ঠী বিজেপিকে সমর্থন করেছে। তবে গত দু বছরে হাওয়া অনেকটাই ঘুরে গিয়েছে। এন আর সি নিয়ে বিজেপির উপরে ক্ষুব্ধ কুর্মীদের বড় অংশ। বিশেষ করে যাঁরা গভীর অরণ্যে থাকেন, তাঁদের ক্ষোভ প্রবল। বহুবার দাবি তোলা সত্ত্বেও কুর্মীদের আদিবাসীর মর্যাদা দেয়নি বিজেপি। মনে রাখা জরুরি, জঙ্গলমহলে এই সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা প্রায় ৩০ লক্ষের মতে। এই ভোট কারা পাচ্ছেন, তার উপরে অনেক কিছু নির্ভর করবে।

~ছবি ফেসবুক থেকে

আরো পড়ুন : সুশান্ত ফেরত: যত কাণ্ড জঙ্গলমহলে >>

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.