পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় দফার নির্বাচন হয়ে গিয়েছে। মোট ৩০টি কেন্দ্রে ভোট থাকলেও এই দফায় সংবাদমাধ্যম থেকে রাজনৈতিক মহল, সকলেরই পাখির চোখ নন্দীগ্রাম। বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার পর থেকে নাগরিক ডট নেট কার্যত চষে ফেলেছে নন্দীগ্রাম বিধানসভা ক্ষেত্র। নির্বাচনের পরেও দুই প্রধান শিবিরের সেনাপতিদের সঙ্গে কথা বলেছি আমরা। এই সবকিছুর ভিত্তিতেই বোঝার চেষ্টা করব ঠিক কেমন হতে পারে হাই প্রোফাইল এই কেন্দ্রের ফলাফল।

নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র দুটি ব্লক নিয়ে গঠিত — নন্দীগ্রাম-১ এবং নন্দীগ্রাম-২। মুসলিম ভোট প্রায় ৩৭%, নির্দিষ্ট করে বললে ৩৬.৭%। এই সংখ্যালঘু ভোটের অধিকাংশই নন্দীগ্রাম-১ ব্লকে। মোট মুসলিম ভোটের প্রায় ৬০ শতাংশ এই ব্লকের ৫টি পঞ্চায়েতে — কালীচরণপুর, কেন্দামারী, জালপাই, দাউদপুর, মহম্মদপুর ও সামসাবাদ। তৃণমূলের বড় ভরসা এই এলাকাগুলি। ভোট শতাংশের নিরিখে এই অঞ্চল স্বস্তি দিচ্ছে রাজ্যের শাসক শিবিরকে। সকাল থেকে সংখ্যালঘু এলাকার মানুষ দলে দলে বেরিয়ে এসে বুথের বাইরে লাইন দিয়েছে। প্রায় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পড়েছে এই অঞ্চলে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

অন্য দিকে নন্দীগ্রাম-২ ব্লকে সংখ্যালঘু ভোট বেশ কম। এই ব্লকে মোট সাতটি পঞ্চায়েত রয়েছে। প্রতিটি পঞ্চায়েতেই শুভেন্দু অধিকারীর অনুগামীদের দাপট। তৃণমূলের সকলেই যে দল ছেড়ে পদ্ম শিবিরে ভিড়েছেন তা কিন্তু নয়। তবে তৃণমূলের অন্দরে অস্বস্তি রয়েছে অনেককে নিয়েই। কারা যে সত্যিই তৃণমূলের হয়ে কাজ করছেন আর কারা জোড়া ফুলের পতাকার নিচে থেকেও শুভেন্দুর ‘লোক’, তা নিয়ে বিভ্রান্তি চরমে। শুভেন্দু যেভাবে মেরুকরণের হাওয়া তুলেছেন, তাও যে বেশ প্রভাব ফেলেছে, একটু ঘুরলেই তা বোঝা যায়। উল্লেখ্য, জমি আন্দোলনের আগে নন্দীগ্রাম-২ ব্লক বামফ্রন্টকে নিয়ম করে ১৪ থেকে ১৬ হাজার ভোটে লিড দিত। এমনকি, ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনেও সিপিআই প্রার্থীর অধিকাংশ ভোট এসেছিল এই অঞ্চল থেকেই। গত পাঁচ বছরে সেই বাম ভোটে বিপুল ধ্বস নেমেছে। এলাকার পুরনো বাম নেতাদের একটি অংশ এখন বিজেপিতে। তাঁদের অন্যতম দুর্গাশঙ্কর গিরি প্রকাশ্যেই বললেন, “শুভেন্দুদার জয় নিশ্চিত। সুফিয়ান মডেল ফেল করে গিয়েছে। এই ব্লক থেকে আমরা যা লিড দেব, তা ওরা নন্দীগ্রাম-১ নম্বরের ওই পাঁচটি এলাকা থেকে মেক-আপ করতে পারবে না।”

সার্বিকভাবে দেখলে নন্দীগ্রামের নির্বাচন এবার কার্যত দ্বিমুখী লড়াই৷ সিপিএম প্রার্থী মীনাক্ষী মুখার্জি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়িয়েছেন, একমাত্র তিনিই প্রচারে বেরিয়ে জনজীবনের জ্বলন্ত সমস্যাগুলির কথা বলেছেন, তাঁর মাটি কামড়ে পড়ে থাকা লড়াই গোটা রাজ্যের বামকর্মীদের প্রাণিত করেছে। কিন্তু ভোটবাক্সে মীনাক্ষীর লড়াইটা অসম। তাঁকে লড়তে হচ্ছে তৃণমূল-বিজেপির বিপুল বিত্ত এবং ভোট মেশিনারির বিরুদ্ধে। তবে নন্দীগ্রাম-২ ব্লকে এখনো বামপন্থীদের কিছুটা জনভিত্তি রয়েছে। ২০১৯ সালে ক্ষয়প্রাপ্ত ভোটের একটা অংশ যদি সিপিএম ফিরিয়ে আনতে পারে, তাহলে অনেক হিসাব বদলে যাবে।

মোটের উপর শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হওয়ায় তা একেবারে অসম্ভব নয়। ইতিমধ্যেই বাম ভোট নিয়ে প্রবল অস্বস্তি তৈরি হয়েছে তৃণমূল-বিজেপির মধ্যে। মীনাক্ষী কার ভোট কাটবেন, তা বুঝে উঠতে পারছেন না দুই শিবিরের ভোট সেনাপতিরাই। রেয়াপাড়ায় দেখা হয়ে গেল শুভেন্দু অধিকারীর চিফ ইলেকশন এজেন্ট মেঘনাদ পালের সঙ্গে। তাঁর কথায়, “এই মেয়েটির ভাবমূর্তি স্বচ্ছ, ব্যবহার ভাল। কিন্তু ওকে পরিকল্পিত ভাবে ছাড় দিচ্ছে তৃণমূল। সুফিয়ান মডেল এবার আর কাজ করবে না বুঝে ওরা চাইছে ২ নম্বর ব্লকে সিপিএমকে দিয়ে বিজেপির ভোট কাটাতে। কিন্তু মমতা বেগমকে হারাতে এবার মানুষ এককাট্টা।” মেঘনাদবাবুর দাবি, নন্দীগ্রাম-১ ব্লকে প্রচারে গিয়ে মীনাক্ষী নাকি এমন কথাও বলেছেন, তাঁকে ভোট না দিলেও চলবে, কিন্তু বিজেপিকে কোন ভোট নয়। যদিও আমরা এর প্রমাণ পাইনি।

বাম ভোট নিয়ে একই রকম উদ্বেগে রয়েছে শাসক শিবিরও। আইনি জটিলতায় তৃণমূল নেতা আবু তাহের আত্মগোপনে রয়েছেন। গ্রেফতারি এড়াতে প্রকাশ্যে আসতে না পারলেও অন্তরালে থেকে ভোট পরিচালনা করছেন তিনি। নন্দীগ্রাম-১ ব্লকের সেই গোপন আস্তানায় বসে তাহের বললেন, “জমি আন্দোলনের প্রভাব মূলত ১ নম্বর ব্লকে। কাজেই ২ নম্বর ব্লকে সিপিএমের প্রভাব এখনো কিছুটা রয়েছে। ২০১৯ সালে ওদের সব ভোট রামে চলে গিয়েছিল। এবার মীনাক্ষী ছুটোছুটি করছে ঠিকই, কিন্তু শুভেন্দুদা যে রকম কমিউনাল প্রচার করছেন, তাতে পুরনো বাম ভোটাররা আদৌ ওকে ভোট দেবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে।” এরই সঙ্গে তাঁর সংযোজন, “তবে ১ নম্বর ব্লকেও বামেদের কিছু ভোট রয়েছে। গত লোকসভাতেও ঐ ভোট বামেরাই পেয়েছিল। এই ভোটের একটা বড় অংশ মুসলিম। সিপিআই-এর প্রাক্তন বিধায়কের ছেলে এবার নির্দল হয়ে লড়ছে। কাজেই বিজেপির তীব্র সাম্প্রদায়িক প্রচারকে আটকাতে এই ভোট আমাদের দিকে এলেও আসতে পারে।”

দেড় দশক আগের জমিরক্ষা আন্দোলনের প্রধান ঘাঁটি ছিল নন্দীগ্রাম-১ ব্লক। এই ব্লকে মোট ১০টি পঞ্চায়েত। তার মধ্যে সংখ্যালঘু প্রধান পাঁচটি অঞ্চলের কথা আগেই বলেছি। বাকি পাঁচটি পঞ্চায়েত — ভেকুটিয়া, হরিপুর, সোনাচূড়া, গোকুলনগর, নন্দীগ্রামে বিজেপি বেশ শক্তিশালী। লড়াই এখানে সমানে সমানে। এর মধ্যে তিনটি পঞ্চায়েতের বিরাট অংশে বিপুল সংখ্যক দলিত (তফসিলি জাতি) জনবসতি। মূলত পৌণ্ড্র ক্ষত্রিয় এই মানুষেরা বিজেপির দৃঢ় জনভিত্তি। এই এলাকায় মেরুকরণের হাওয়া প্রবল। প্রতিপক্ষ এখানে তৃণমূল নয়, মুসলমান। তৃণমূলের ভরসা সাংগঠনিক ভোট। কিন্তু যেভাবে সাম্প্রদায়িক হাওয়া তোলা হয়েছে, তাতে শাসক দলের সংগঠন ধরে রাখা নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়। গোকুলনগরে দাঁড়িয়ে শুভেন্দু অধিকারী নাগরিক ডট নেটকে স্পষ্ট বললেন, “বেগম বলছেন আমি মেরুকরণ করছি। বেশ করছি। উনি দুধেল গাইদের ভোটে জিততে চান, আমি জয় শ্রী রামের ভোটে জিততে চাই। যাঁরা জয় শ্রীরাম বলেন, তাঁরা একজোট হয়ে গিয়েছেন।”

নন্দীগ্রামের নির্বাচন সংক্রান্ত আলোচনায় তফসিলি জাতির এই ভোটের কথা সেভাবে আসছে না। কিন্তু শতাংশের বিচারে এই ভোটের পরিমাণ বিরাট। মনে রাখা জরুরি, শুভেন্দুকে ছাড়াই নন্দীগ্রামে দু বছর আগে বিপুল উত্থান হয়েছিল বিজেপির। তার প্রধান ভিত্তি ছিল এই তফসিলি ভোট। ২০১৬ সালে নন্দীগ্রামে ১ লক্ষ ৩৪ হাজার ৬২৩ ভোট পেয়েছিলেন তৃণমূল প্রার্থী শুভেন্দু। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সিপিআই পেয়েছিল ৫৩ হাজার ৭১৩টি ভোট। জয়ের ব্যবধান ছিল ৮১,২৮০। সেবার মাত্র ১০,৭১৩টি ভোট পেয়েছিল বিজেপি। তৃণমূল, বাম ও বিজেপির ভোটের হার ছিল যথাক্রমে ৬৬.৭৯%, ২৬.৪৯% ও ৫.৭৩%।

ঠিক তিন বছর পরে লোকসভা ভোটে ধস নামে বাম ভোটে, ফুলে ফেঁপে ওঠে বিজেপি। লোকসভার নিরিখে নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের ভোটপ্রাপ্তির হার কিছুটা কমে হয় ৬৩.১৪%। বামেদের ভোট কমে দাঁড়ায় মাত্র ৫.৩৮%। অন্যদিকে, লোকসভার চেয়ে ছ গুণ ভোট বাড়িয়ে বিজেপি পৌঁছে যায় ৩০.৯ শতাংশে। এই বিপুল বৃদ্ধির বড় কারণ নিঃসন্দেহে নন্দীগ্রাম-২ ব্লকের বাম ভোট। কিন্তু সেটাই একমাত্র ফ্যাক্টর নয়। তৃণমূল নেতা স্বদেশ দাসের কথায়, “আমাদের ভোট আড়াই শতাংশ কমেছিল। যে হিন্দু এস সি ভোট আমরা পেতাম, তার বেশ কিছুটা অংশ বিজেপিতে চলে গিয়েছিল। আমরা সেটা মেক-আপ করতে পেরেছিলাম, কারণ মুসলিম ভোটের প্রায় সবটাই আমরা পেয়ে গিয়েছিলাম। অন্যদিকে বামেদের ভোট কমেছিল প্রায় ২১ শতাংশ। ওদের হিন্দু ভোট প্রায় পুরোটাই বিজেপিতে যায়। মুসলিম ভোটের কিছুটা আমরা পাই।” স্বদেশ আশাবাদী এবার বামেরা নিজেদের হারানো জনভিত্তি কিছুটা ফিরে পাবেন, মমতা নামের ম্যাজিকে তৃণমূলও ক্ষত মেরামত করতে পারবে।

এবং মহিলা ভোট। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। নন্দীগ্রামের দুটি ব্লকেই বুথের বাইরে বিপুল সংখ্যক মহিলা লাইন দিয়েছেন। তৃণমূলের দাবি, মহিলা মুখ্যমন্ত্রীকে জেতাতেই ভোট দিয়েছেন মেয়েরা। আর শুভেন্দু বলছেন, “হিন্দু বাড়ির মেয়ে-বউরা পাকিস্তানিদের হারাতে বুথে গিয়েছেন”। সত্যি বলতে কি, হিন্দু ভোট-মুসলিম ভোট-দলিত ভোটের চলনবলনের হদিশ মিলছে, কিন্তু মহিলা ভোটের কত শতাংশ কোন দিকে যাবে, তা বলা মুশকিল। মমতার প্রতিটি সভায় উপচে পড়েছে মেয়েদের ভিড়। তাঁদের অধিকাংশই সংখ্যালঘু। শুভেন্দুর সভায় তুলনামূলকভাবে মেয়েদের উপস্থিতি কিছুটা কম ছিল। আবার নির্বাচনের দিন বিজেপির হয়ে বড় সংখ্যক মহিলাকে মাঠে নামতে দেখা গিয়েছে। বয়ালের বুথে যখন কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে রয়েছেন মমতা, তখনো বাইরে বিপুল সংখ্যক বিজেপি সমর্থক মহিলারা বিক্ষোভ দেখিয়েছেন।

মমতার চিফ ইলেকশন এজেন্ট শেখ সুফিয়ানের কথায়, “জমি আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল মেয়েরা। এবারও দিদিকে ওঁরাই জেতাবেন”। বিজেপির মেঘনাদ পালের পাল্টা দাবি, জেহাদিরা নন্দীগ্রামে ধর্ষণের সংস্কৃতি তৈরি করতে চাইছে। হিন্দু বাড়ির মেয়েরা তাই দাদাকে জেতাতে মরিয়া। নন্দীগ্রাম হাসপাতালের সামনে গৃহবধূ উজ্জ্বলা গুছাইত অবশ্য বললেন, “রান্না তো আমাদের করতে হয়, গ্যাসের দাম বাড়ার জ্বালাটা আমরা বুঝি। শুভেন্দু তো সে সব নিয়ে কিছু বলছেই না। আর শেখ সুফিয়ানদের চুরি ডাকাতির কথাও জানি। আমাদের টাকা মেরেই তো ওই জাহাজবাড়ি করল। সিপিএম আগে যা করার করেছে। কিন্তু এই মীনাক্ষী দিদি যা বলছে, সেগুলোই বাস্তব কথা।”

সব মিলিয়ে নন্দীগ্রামের লড়াই একেবারে হাড্ডাহাড্ডি। উসেন বোল্টের মত বাকি প্রতিদ্বন্দ্বীদের কয়েক হাত পিছনে ফেলে কেউ জিতে যাবেন, এমন সম্ভাবনা কম। মেরুকরণের হাওয়া, বাম ভোটের গতিবিধি, দলিত ভোট এবং মহিলাদের সমর্থন — এই চারটি প্রধান ফ্যাক্টরের উপর নির্ভর করছে ফলাফল।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.