সৌরভ প্রকৃতিবাদী

“জঙ্গলমহল হাসছে”। তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত রাজ্য সরকারের সাফল্যের বিজ্ঞাপনের এই জিঙ্গল আজকাল সরকারি নেতা মন্ত্রীদের মুখে আর তেমন শোনা যায় না। বরং গত কয়েক বছরের ঘটনাপ্রবাহ জানলে রাজ্য সরকারের উন্নয়নের মডেলকে এই বাক্য বিদ্রূপ করে বলেই মনে হবে। ভোটের অঙ্ক, কোন দল কটা আসন জিতল – এসব দিয়ে জঙ্গলমহল খ্যাত চার জেলার মানুষের অবস্থান বোঝা সম্ভব না হলেও ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির ভোট শতাংশ নিশ্চিতভাবে দেখায় জঙ্গলমহলের মানুষ তৃণমূলে যত দ্রুত আস্থা রেখেছিলেন, তত দ্রুত আস্থা হারাচ্ছেন। ২০২১ সালে কর্পোরেট কায়দায় প্রচার এবং বিভিন্ন সম্প্রদায় ও জনজাতির সামাজিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্বকে দলভুক্ত করে অবশ্য তৃণমূল খানিকটা ভোট ফিরিয়ে আনতে পেরেছে।

একের পর এক কোনো পার্টির সরাসরি নিয়ন্ত্রণহীন সামাজিক আন্দোলন যেভাবে জঙ্গলমহলে আছড়ে পড়ছে তা বাম আমলের সরকারি শোষণ, বঞ্চনার বিরূদ্ধে সংগঠিত একের পর এক আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দেয়। ২০০০ থেকে ২০১১ সাল অবধি সান্তালি ভাষা আন্দোলন ও রেশন বিদ্রোহ দিয়ে শুরু হয়ে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আন্দোলনগুলোর বামফ্রন্টকে যূথবদ্ধ প্রত্যাখ্যান ভোটবাক্সে তৃণমূলের ঝুলিতে জমা পড়েছিল। বিজেপি, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা (জেএমএম), ঝাড়খণ্ড দিশম পার্টি (জেডিপি) অথবা সংসদীয় ব্যবস্থার বাইরে থাকা সিপিআই (মাও)-এর মত অন্যান্য পার্টিগুলোর সংগঠন ও প্রভাব বেড়েছিল। ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সংগঠিত হওয়া আন্দোলনগুলো কোনো পার্টির সংগঠন বৃদ্ধিতে কাজে লাগছে বলে মনে হচ্ছে না। বরং কিছু উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে যা পার্টিগুলোর নিয়ন্ত্রণকে খর্ব করার সামাজিক চাহিদা প্রকাশ করে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে সাঁওতাল আদিবাসী সংগঠন ভারত জাকাত মাঝি পারগানা মহলের ডাকে জঙ্গলমহল জুড়ে রেল রোকো হয়। সংগঠনটি সামাজিক সংগঠন বলেই পরিচিত। এই রেল রোকোয় লক্ষাধিক মানুষ রাস্তায় নামেন। মূল দাবি ছিলো সাঁওতালি ভাষায় শিক্ষার পরিকাঠামো গঠন। রেল রোকোর ঠিক পরে তৃণমূলের জমি উদ্ধার করতে সংগঠনটির রাজ্য ও জাতীয় স্তরের নেতাদের ভাঙিয়ে আনা হয়। তৃণমূলের জেলা ও রাজ্য স্তরে গুরুত্বপূর্ণ পদ, লোকসভায় প্রার্থী পদের লোভ দেখিয়ে কয়েকজন নেতাকে ভাঙিয়ে আনা হলেও সংগঠন এই প্রশ্নে দুভাগ হয়ে যায়। বৃহত্তর অংশ ওই নেতাদের অস্বীকার করে নতুন সংগঠন তৈরি করে। সেই বৃহত্তর অংশ জেগেত জাকাত মাঝি পারগানা মহল নামে এ বছর সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতায় বিপুল বাধা সত্ত্বেও দশ হাজার মানুষের জমায়েত করেছে। এরাই অযোধ্যা পাহাড়ে পাঁচ বছর ধরে পার্টির নিয়ন্ত্রণের বাইরে প্রকৃতি ও আদিবাসী অধিকার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।

আদিবাসী কুড়মি সমাজ ও কুড়মি সেনা জঙ্গলমহলের অন্যতম বড় জনগোষ্ঠী কুড়মি সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে। ২০১৫ সাল থেকে এঁরা তফসিলি উপজাতি হিসাবে সংরক্ষণ দাবি করছেন। এই আন্দোলন ঝাড়খণ্ডে শুরু হয়ে বাংলার জঙ্গলমহলে ছড়িয়ে পড়েছে। এইসব সংগঠনের নেতারা প্রাথমিকভাবে বাংলায় সরকারবিরোধী বিজেপির সহায়তা গ্রহণ করলেও ২০১৮ পরবর্তী সময়ে বিজেপি দলের স্বার্থে পরিচালিত হতে অস্বীকার করেছেন সংগঠনের নিচুতলার কর্মীরা। ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিজেপি এই সংগঠনগুলোর আন্দোলন থেকে ফায়দা তুলতে পারলেও পরবর্তীকালে তৃণমূলের জমি উদ্ধারের সফল কৌশলে নেতারা তৃণমূলের দিকেই ঝুঁকেছেন। তাঁরাই গত মাসে পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া জেলায় রেল ও সড়ক অবরোধ করেন, যা ৯৬ ঘন্টা পেরিয়ে যায়। নেতারা অবরোধ তুলে নিলে সাধারণ কর্মীরা প্রকাশ্য বিরোধিতায় নামেন। আগামীদিন বলে দেবে সাধারণ কর্মীরা পার্টির নিয়ন্ত্রণের বাইরে বেরোতে পারছেন কিনা, তবে ওই চার জেলায় গত পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা বলে, সাধারণ কর্মীদের সামনে থাকা বিকল্পগুলোর মধ্যে কোনো রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ অস্বীকার করে কাজ করা গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসাবে উঠে আসবে। সাঁওতালি ভাষা আন্দোলন ঝাড়খণ্ড আন্দোলনের সমসাময়িক। সুতরাং ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা ও ঝাড়খণ্ড দিশম সেই আন্দোলনে পার্টির নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে পারত ২০১১ পরবর্তী সময়ে। কিন্তু তারা তা পারেনি।

এখন ওই দুই দলই বাংলার সরকারি দলের সহযোগী হিসাবে কাজ করছে। তৃণমূল জঙ্গলমহলের সামাজিক আন্দোলনগুলোর মধ্যে পার্টির ভূমিকা প্রকট করে তুলতে চাইছে যাতে নিয়ন্ত্রণ করতে সুবিধা হয়। চাইছে এই আন্দোলনগুলোর মধ্যে বিভাজন ঘটিয়ে শাসন চালিয়ে যেতে। আদিবাসী ও আদিবাসী হতে চাওয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে সারি ও সারনা ধর্মের বিবাদ ঘটিয়ে একদিকে বিজেপির হিন্দুত্ব এজেন্ডাকে ভোটের অঙ্কে ভোঁতা করতে চাওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগঠিত আন্দোলনকে লক্ষ্যচ্যুত করার চেষ্টা চলছে। সে কাজে সরকারের হাতিয়ার আদিবাসী পার্টি বলে পরিচিত এই পার্টিগুলোই। জেডিপি সুপ্রিমো সালখান মুর্মুর আদিবাসী সেঙ্গেল অভিযান কলকাতায় পনেরো হাজার মানুষের জমায়েত করেছে গত মাসে। পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে জেডিপির নাম নয়, সেঙ্গেল অভিযানের সামাজিক মুখকেই ব্যবহার করতে চাইছে সরকার। তবে জঙ্গলমহলের জনমানসে এই সংগঠনের প্রভাব অত্যন্ত সীমিত ও গণ্ডিবদ্ধ বলেই ওই জমায়েত কোনো আন্দোলনের উপর দাঁড়াতে পারেনি, কোনো গণআন্দোলনের বার্তাও দিতে পারেনি।

ঝাড়খণ্ড পার্টির দুবারের নির্দল বিধায়ক নরেন হাঁসদা জঙ্গলমহলের আইকন হয়ে উঠেছিলেন আন্দোলনের দিনগুলোতে। সেই প্রয়াত নেতার মেয়ে বীরবাহা হাঁসদা এখন তৃণমূল সরকারের বন ও স্বনিযুক্তি মন্ত্রকের দায়িত্বপ্রাপ্ত পূর্ণমন্ত্রী। জঙ্গলমহলের ভোট তৃণমূলে আনার কৃতিত্ব অনেকখানি তাঁর। তিনি ও তাঁর পরিবার ঝাড়খণ্ড পার্টিকে অন্তত খাতায় কলমে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন নরেন খুন হওয়ার পর। কিন্তু সেই খাতায় কলমের ঝাড়খণ্ড পার্টির মানুষের ভাবনার উপর প্রভাব আজকের মন্ত্রী বীরবাহা প্রভাবের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। ফলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তৃণমূল সামাজিক হতে চাইছে সামাজিক মুখ ভাঙিয়ে এনে।

তবে জঙ্গলমহল অঞ্চলের সমাজ নিজের মত করে আড় ভাঙছে। আসেকার মত দীর্ঘদিনের লড়াকু সংগঠনও কলকাতায় সভা করেছে এই সেপ্টেম্বরেই। সেখানেও উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মত। আসেকার প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনের অনেক গভীরে। আসেকা একসময় বাম প্রভাবিত বলে চিহ্নিত হলেও তার সামাজিক স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছে। এই সংগঠনকে দলভুক্ত করার চেষ্টা করে সব পার্টিই ব্যর্থ হয়েছে। ভূমিজ সংগঠন আদিবাসী ভূমিজ সমাজের মধ্যে বিজেপির প্রভাব প্রকট হয়ে উঠেছিল ২০১৪ সালের পর থেকে। সে প্রভাবও ক্রমশ কমছে। এই সংগঠনের নেতৃত্ব বাংলা, ঝাড়খণ্ডে বিধায়ক অথবা সাংগঠনিক পদ পেয়েছে বিজেপিতে।

তবে এখানেও ২০১৮ পরবর্তী সময়ে সাধারণ কর্মীদের মধ্যে এবং নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পার্টির নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা উঠে এসেছে সজোরে। ভূমিজ, সান্তাল, কোড়া, লোধা সমাজের মানুষ নানা জেলায় নিজেদের মত সংযুক্ত আন্দোলন ও সংগঠন তৈরি করছেন, একে অপরের ইস্যুতে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। বাউরি সমাজের মধ্যে পার্টির প্রভাব এখনও তুঙ্গে থাকলেও, বিজেপি ও তৃণমূল – উভয়ের সাংগঠনিক পদে এবং বিধায়কদের মধ্যে এই সমাজের লোক থাকলেও, এখানেও রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে কিছু নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে। যদিও তা অন্য সমাজগুলোর তুলনায় কম।

ভূমিজ, সাঁওতাল, কোরা, লোধা, কুড়মি সমাজের মানুষ জঙ্গলমহলের কোণে কোণে সাধারণভাবে বন, পাহাড়, নদীর অধিকার রক্ষার আন্দোলনে, তিলাবনী পাহাড়, অযোধ্যা পাহাড়ের আন্দোলনে, বীরভূমের দেউচা পাঁচামি আন্দোলনের সমর্থনে এবং বনাধিকার রক্ষার আন্দোলনে প্রয়োজনভিত্তিক গোষ্ঠী নির্মাণ করছেন।

আরো পড়ুন জনবিরোধী সর্বনাশা বন সংরক্ষণ বিধি

২০০৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বামফ্রন্টের মন্ত্রিসভায় পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন মন্ত্রী দেবলীনা হেমব্রমকে পরবর্তীকালে সিপিএমের ব্রিগেডের মুখ হয়ে উঠতে দেখা গেছে। জঙ্গলমহলের আন্দোলনকে এইভাবে বাম রাজনীতিতেও জায়গা দেওয়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু জঙ্গলমহল এলাকার সমাজের পার্টির নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকার চেষ্টার ধরন কোনো রাজনৈতিক দলই বুঝতে পারছে না, পারার কথাও নয়। সবমিলিয়ে জঙ্গলমহল ক্ষমতাকে শক্ত চোয়ালে আবার ধাক্কা দেবে বলেই মনে হচ্ছে। এবারের ধাক্কা কোনো পার্টির ছাতার তলায় হবে না, নতুন কোনো চরিত্র নেবে বলে মনে হয়। সেই চরিত্র শুধু সংসদীয় নয়, অসংসদীয় পার্টির কাঠামোরও বিরোধিতা করতে চাইবে সম্ভবত।

সম্প্রতি বেলপাহাড়ি, অযোধ্যা, শিলদা, সিমলাপাল, কেশপুর প্রভৃতি জায়গায় মাওবাদী পোস্টারের যে খবর সংবাদমাধ্যমে আমরা দেখছি তার অনেকাংশই না-মাওরা করেছে। মাও পার্টিকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়ত তৃণমূল, বিজেপি, সিপিএম, জেএমএম, জেডিপিদের শেষতম অস্ত্র হতে পারে যাবতীয় আন্দোলন পার্টির ছাতায় নিয়ে আসা এবং কলকাতা, দিল্লির নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার জন্য সুবিধাজনক অবস্থা তৈরী করতে। মাত্র এক দশক আগের তিক্ত অভিজ্ঞতা দিয়ে সামাজিক আন্দোলনগুলোর সংগঠকরা তার মোকাবিলা করতে পারবেন কিনা তা ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের আগে পরিষ্কার হয়ে যাবে বলে মনে হয়।

নিবন্ধকার প্রকৃতি আন্দোলনের কর্মী, পেশায় শিক্ষক। মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.