বাবলা পাতার মতো বিছিয়ে থাকা ইটের সারির ওপর পা ফেলতে ফেলতে সবেদ আলি ধূলার গন্ধের জন্য হাঁসফাঁস করে। সামান্য ক্ষয়ে যাওয়া দৃষ্টি নিয়ে যতদূর তাকায় – কোথাও বাদামি জমিন নজরে পড়ে না। দীর্ঘ রাস্তার শরীর জুড়ে ইটের দ্বি পক্ষল সারি – হালকা কমলারঙা ঘোরের ভেতর তাকে আটকে ফেলে। সবেদ আলি দুই হাতের উলটা পিঠে চোখ ডলে, এদিক-সেদিক ভালো করে তাকিয়ে জোরেশোরে শ্বাস টানে। কিন্তু ধূলার না-সোঁদা, না-ধুলাটে, না-মাটি-মাটি – কীরকম পরিচিত গন্ধটা তার নাকে ভেসে আসে না।

একেকটা বই কেমন আচমকা হাতে উঠে আসে। কোন প্রাক-ভূমিকা ছাড়াই, পাঠকের কোন পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই। অথচ পাতা ওলটাতে গিয়ে কেমন একটা ঝিম ধরানো নেশা ধরায়। পাঠক নিজের অজান্তেই কেমন ওই অজানা গন্ধের পিছু নেয়। এই বই সেই গোত্রের। বইয়ের নাম বয়ন। লেখক পাপড়ি রহমান। বিষয়বস্তু জামদানি শিল্পীদের জীবনকাহিনি।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

শীতলক্ষ্যা পারের নারায়ণগঞ্জের তারাবো, দীঘিবরাবো, মুগরাকুল, পবনকুল, বারাবো, রূপসী – এ হল বাংলাদেশের জামদানি কেন্দ্র। এখানে ঘরে ঘরে পডিঘর, জোলাদের নারী-পুরুষ দুইয়ে মিলে জামদানিতে বুটি তোলে। সেসব কাপড়ের কতই না হরেক নকশা, হরেক রংয়ের জেল্লা। সে শাড়ি বড়লোকের শখ মেটায়। কিন্তু গরীব জোলার পেটের ভাত জোগাতে পারে কি? এলাকার সকল পেটে লাথি খাওয়া জোলার প্রতিভূ যেন এই আখ্যানের জজ মিয়া, আমান, জামান, নূর মহম্মদ, ফৈজু মিয়া প্রমুখ জোলারা।

এই কিসসা সবেদ আলির। অবশ্য সবেদ আলির একার কাহিনী নয় এই উপন্যাস, বলা যায় সবেদ আলিকে কেন্দ্রে রেখে তার বিস্তৃত পরিবারের গল্প। সবেদ আলির প্রথম পক্ষের বিবি পয়রন বিবি ও তার বিবাহিত তিন ছেলে, জজ মিয়া-মোহিতন, আমান-জামিলা, জামান-রেণুবিবি। জোলার ঘরে জন্ম তো বটেই, সবেদ আলি নিজেও একজন দক্ষ জামদানি কারিগর। চাষিকন্যা আতিমুনিকে দেখে তীব্র ভ্রমে পড়ে, প্রথম বিয়ের কথা গোপন করে সবেদ আলি দ্বিতীয়বার নিকায় বসে। ঘরবসতে এসে আতিমুনি দেখে সতীনের ঘর, সে নারাজ হয়, ভাগ না হওয়া মানুষ চাই তার। সংসার ফেলে রেখে সে চলে যায় বাপের ঘর। আবার বিয়ে করে সম্পন্ন চাষি আলাউদ্দিন মিয়াকে, জমিয়ে সংসার পাতে। তবু পডিঘরের কারিগরের গানের সুর কেন যে তার কান জুড়ে থাকে! এদিকে কপালের ফের, আতিমুনি চলে যাওয়ার পরে সেই জোলার ছেলের হাতের থেকে মাকু খসে যায়। সে কিন্তু আর পয়রন বিবির আঁচলের ছায়ায় ফেরে না। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি বিক্রির টাকায় সে আরেকটা বসত বাড়ি কিনে তাতে ছাপড়া ঘর তুলে ভাড়াটে বসায়। সেই ভাড়ার টাকায় তার সংসার সখিনা-জাহানারার পরে মোমেনাতে এসে ঠেকে। সবেদ আলি পালিয়ে বাঁচতে চায়। তবু যতই নিজের গায়ের থেকে জোলার গন্ধ মুছে ফেলতে চাক, মাকুর নলিতে প্যাঁচানো মনকে কি সবেদ আলি পুরো খুলতে পারল?

মোমেনার সন্তান সাধুর জন্য প্রবীণ সবেদ আলির মন উপচানো মায়া। বাপে তাঁতের কাজ ছেড়ে দিলে কী হয়, জোলাদের শাস্ত্র চিলুনিকইন্যার কাহিনির প্রতি সাধুর তীব্র আকর্ষণ। সাধু যেন এই উপন্যাসের অবয়বে এক মায়াবী শৈশবের বিধুর ছায়া বোনে। সাধুর হাত ধরে এই কাহিনিতে এসে জোড়ে সাধুর বন্ধু রইসুদ্দি, পরান, ভোম্বল। পরানের মা চারুবালা। চিলুনিকইন্যার শেখানো বিশকরমের ব্রতকথা সে এখনো পালন করে। চারুবালাই সাধুকে জানায় যে তাঁতিদের বিশকরমের ব্রত যে ঠাকুরকে নিয়ে, সেই একই বিশকরম খুঁটির কাছে জোলার ছেলের বয়ন্তির (শাগরেদ থেকে মূল তাঁতি হওয়ার কাজে পদোন্নতি পাওয়ার অনুষ্ঠান) সময় মানত করা হয়। এই কথাটা আসে অতি অনাড়ম্বরভাবে। আলাদা করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বয়ান তৈরি করতে হয় না লেখিকাকে।

বরং ঝোঁকের মাথায় তিন তালাক উচ্চারণের পর নিজেরা না চাইলেও দশজন পড়শির দাবিতে ছাড়কাট করতে বাধ্য হয় আতিমুনি আর আলাউদ্দিন মিয়া। গ্রামীণ সংস্কারের বদ্ধ জলা কেমন করে দুজনের মিলন আকাঙ্ক্ষাকে দম আটকে মারার চেষ্টা করে, সেই বেদনার কথা খুবই তীব্রভাবে বাজে।

এই কাহিনির অন্যতম আকর্ষণ মুল্লুকচান-কমলাসুন্দরীর অসমবয়সী মিথোজীবি দাম্পত্য। স্ত্রীর মৃত্যুর পর মুল্লুকচানেরও দরকার ছিল এক দরদি নারীসঙ্গ, বাঁজা মেয়েমানুষ বলে প্রথম স্বামী তাড়িয়ে দেওয়ার পর কমলারও দরকার ছিল মুল্লুকচানের আশ্রয়। সাত বছর বয়স থেকে যার তাঁতের সঙ্গে ঘরবসত, সেই মুল্লুকচানও তাঁতে বসা ছেড়ে দিয়েছে। তবু রাত নামলেই পাখির ডানা ঝটপট আওয়াজ তাকে নিত্য ভয় দেখায়। এ কি অবদমিত বাসনার ছটফটানি? শুধু জীবিত মানুষ তো নয়, এই উপন্যাসে ঠাঁই পেয়েছে মৃত মানুষেরাও। পয়রন বিবির অকালমৃত কন্যা রোশনার উপস্থিতি যদি বা একটু আবছা, মুল্লুকচানের আগের পক্ষের মৃত স্ত্রী আয়রননেছা কিন্তু তার মনকে পাকে পাকে জড়িয়ে থাকে। পাখির দঙ্গলের ওড়াউড়ি, আয়রননেছার নিকট উপস্থিতি তার মনকে সদাসন্ত্রস্ত করে রাখে। ক্রমাগত ভয়ের তাড়সে সে আশ্রয় নিতে যায় কমলাসুন্দরীর নগ্ন শরীরে। শেষ পর্যন্ত মুল্লুকচানও বেহেশতে পাড়ি জমায়, শুধু নিজের একটি কণা জমা রেখে যায় কমলাসুন্দরীর কাছে। আগামীর সন্তান।

আরও আছে নূর মহম্মদ, রং নকশা-কারুকাজে জামদানির সেরা কারিগর – তার বোনা গোলাপচরপাড়-জুঁইফুল, কাঁচিপাড়-পোনাফুল, চালিতাপাড়-বড়োলাঙ্গইল্যা এই সব নকশার সৌষ্ঠবে ডেমড়ার হাটের দালালদের চোখ ফেরে না। কিন্তু সে অন্য কারোর কাজের সুখ্যাতি সহ্য করতে পারে না। জজমিয়ার কাপড় হাটে সবার নজর কাড়লে, নূর মহম্মদ ঈর্ষার আগুনে জ্বলে ওঠে। সেই আগুন বজ্র হয়ে নেমে আসে অন্য দুজন মানুষের জীবনে। শুধু যে ব্যক্তিগত জীবনে আঘাত হানে তা তো নয়, এই ঈর্ষার আগুনের দহন এই জোলা-তাঁতিদের জীবনের প্রজন্মবাহিত ধ্রুব সত্য। এই কারণেই এরা এককাট্টা হতেও পারে না। নিজেদের সমিতি বানানোর চেষ্টাও কিছুতেই সফল হয় না। মাঝখান থেকে লাভ হয় শুধু মহাজন-ফড়ে-দালালের।

আরো পড়ুন বিড়ি শ্রমিক: যার কাজ আছে তার ভাত নেই

এক শীতে কাহিনীর শুরু। পরের বাদলের এক ভোরে মহাসর্বনাশের খবর আসে। জজমিয়ার পডিঘর থেকে ছটা তাঁত একেবারে ঝেড়ে পুঁছে চুরি করে নিয়ে যায় এক অজানা শত্রু। সমাধানের উপায় হাতড়ে বেড়ায় জজ মিয়া-জামান-আমান। হঠাৎই মিলে যায় মুশকিল আসান। সবেদ আলি প্রথম পক্ষের সন্তানদের গোপনে টাকা দিতে রাজী হন।

আর এর পরে পরেই তৈরি হয় মুগরাকুল তাঁতি সমিতি। অবশেষে। ঊদ্দেশ্য, ব্যক্তিগত সমস্যার ঘূর্ণিপাক থেকে উদ্ধার পাওয়া ও জোলাদের একত্রিত করা। ঐতিহ্যবাহী জামদানি শিল্প রক্ষা আর সেই শিল্পের নিপুণ শিল্পীদের বাঁচানোর জন্য বিনিয়োগ চাওয়া হল। না, কোনো তীব্র রাজনৈতিক চেতনার কারণে এই জোট বাঁধা নয়, এর পিছনে আছে নিতান্ত জাগতিক টিকে থাকার ইচ্ছা। তবু শুরু তো। ন্যায্য মজুরি আদায়ের দাবিটাও সংগঠকদের মনের মধ্যে ঘুরছে, ফিরছে। একদা পালিয়ে বাঁচতে চাওয়া সবেদ আলির আবার নিজের জোলা পরিচয়ে ফিরে আসার কাজও এতদিনে সমাপ্ত হল। শিকড়ে ফেরা।

বয়ন শব্দের অর্থ যেমন বোনা, আরেকটি তুলনায় অপ্রচলিত অর্থ হল মুখ। এই উপন্যাস এক অর্থে মুগরাকুলের বয়নজীবীদের মুখ। এখানে স্পষ্ট করে কোনো সময়সীমা উল্লেখ করা নেই, তবু ঘটনাক্রম যেন ইঙ্গিত করে পাকিস্তানের করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পাওয়া স্বাধীন বাংলাদেশ এই উপন্যাসের পটভূমি। তাঁতবোর্ড চালু হওয়ার পরের পর্ব। উপন্যাস হিসাবে এর ব্যাপ্তি তেমন বিপুল নয়। বরং বলা যায়, ছোট পরিসরে সীমিতসংখ্যক চরিত্রের ঘাত প্রতিঘাতে গড়ে উঠেছে এই উপন্যাস। তবে এখানে সমাজের ছবি আঁকতে লেখক যত না তৎপর, তার থেকে অনেক বেশি উৎসুক চরিত্রগুলোর গভীরে ডুব দিতে। বড় সহানুভূতির সঙ্গে তিনি নির্মাণ করেছেন পয়রন বিবির চরিত্র। নাতনি ঝুম্পাড়ির সঙ্গে তার সহজ অন্তরঙ্গতা, দাদির খাবার জোগাড়ের জন্য ঝুম্পাড়ির চেষ্টা কেমন যেন ইন্দির ঠাকরুন-দুর্গার জুটিকে জায়গায় জায়গায় মনে করায়। পয়রন বিবির তেজহীন আত্মসমর্পণের পাশে জ্বলজ্বল করে ঝাঁঝাঁলো আতিমুনির দৃপ্ত তেজের কথা, হেরে না যাওয়ার কাহিনি। সম্পূর্ণ বিপরীত দুটো চরিত্র, তবু লেখকের সচেতন প্রসাদ থেকে কোনোটিই বঞ্চিত হয়নি।

এই উপন্যাস কাহিনি হিসাবে কার কেমন লাগবে তা বলা মুশকিল। চোখে আঙুল দেওয়া ঘটনার ঘনঘটা সেই অর্থে নেই হয়ত। অকারণ মৃত্যুমিছিলের সংবাদও কারোর কারোর মতে উপন্যাসের কাঠামোকে নড়বড় করে দিয়েছে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একটা স্বচ্ছতোয়া আপাত-নৈর্ব্যক্তিক জীবনের জয়গান কিন্তু পশ্চাৎপট হিসাবে রয়েই যায়। জজ-মিয়ার কন্যা ঝুম্পাড়ির অবিবাহিত মাতৃত্বের দায়িত্ব নিয়ে ফৈজু মিয়া তাকে বিয়ে করে। ফৈজু ঝুম্পাড়িকে বলে,

মানু মনে রাহে মানুর কাম। মানুর খাইলসত। আর মানুর কথাই হইল মানুর খাইলসত। খাইলসত যদি পচা-গন্ধা অয়, কে তুমারে মনে করব? তুমার কথা যুদি হয় বিষে-ভরা, কে তুমারে লগে নিব? কেউই নিব না। কেউই লগে ভিড়ব না। মানুর লিগ্যা ময়া থাহন আসল কথা। তুমি ময়া না করলে কেডায় তুমারে আর মনে রাখব?

অতি সহজভাবে বলা কথাগুলোর ওজন কিন্তু কম না। সকল বিরোধ, বিদ্বেষের পরে জেগে থাকে শুধু মানবতাবোধ।

এই বইয়ের ভাষা প্রমিত বাংলা নয়। বরং বাংলাদেশের কোনো এক উপভাষা। সেটা কারোর পাঠে সামান্য অনভ্যাসজনিত অসুবিধার সৃষ্টি করতে পারে হয়ত। তবে এই পাঠকের ভরসা আছে যে সেই অসুবিধা নিতান্ত সাময়িক। লেখার মধ্যে ডুবে যাওয়ার কাজে তেমন বড় অন্তরায় নয়। আর একবার ডুবে যেতে পারলে পাপড়ির ভাষার কাব্যসুষমা মনে ঢেউ তুলবে।

শীতের আগমনী হাওয়া হঠাৎ সুর ভাসিয়ে আনে –
ভালো কাপড় বুনতে জানি
চিরুন কোটা শালের বোটা ঢাকাই জামদানি
তার ঢের কানি তা বুঝে দেয় কেটা
কুবির চরণ ভেবে বলে
এবার এ-দফাতে নাই খোঁটা…

কোথা থেকে ভেসে এল এই গান? কে গায়? এত চেনা এই সুর! এই গলা! এমনকী গাওয়ার ভঙ্গিটা পর্যন্ত চেনা মনে হয়। তারাবিবি কান ঢেকে রাখা চাদর সরিয়ে দেয়। গানটা ভালো করে শোনার চেষ্টা করে। শুনতে শুনতে সুরের ঢেউ এসে ঢুকে পড়ে সানার ভিতর, দকতির ভিতর, নরতের ভিতর, খিলির ভিতর, নলির ভিতর, পুঁতির ভিতর, টাউক্কা ডিমের ভিতর, নাচনি কাঠির মাথায়, কান্ডুলের আহায়। ওই সুরের ঢেউ তারাবিবির বুকের মধ্যে ঢুকে পড়লেও সে ভয় খায় না। সাদা রেশমের উপর নিপুণ হাতে কান্ডুল চালায়। পাতা-সবুজ সুতোয় নকশাটা দ্রুত ফুটে উঠে। তারপর সাপের মতো এঁকেবেঁকে এগিয়ে যায়!

তারাবিবির আঙুল চলে ক্ষিপ্রতার সঙ্গে। তার শক্ত চোয়াল দেখে বোঝা যায়  – এই নকশার অনেকখানিই আজ সে বুনে ফেলবে। মুল্লুকচান এই নকশা তুলতে পারে নাই, চাঁদ বিবি পারে নাই, এমনকি আকাইল্যাও না। তারাবিবিকে পারতেই হবে, এবং সে পারবে। সে পারে!

নবপ্রজন্মের অভিষেক! আশার আলো!

পাপড়ি রহমানের লেখা মনের গভীর থেকে তুলে আনে আরেকটি বই পাঠের সুখস্মৃতি। সমরেশ বসুর টানা পোড়েন। দুই বাংলার দুই ছবি – কত আলাদা, তবু কত যে এক!

বয়ন
লেখক: পাপড়ি রহমান
প্রকাশক: তবুও প্রয়াস
দাম: ৪০০ টাকা

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.