চন্দন সাঁতরা

সম্প্রতি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে ভ্যালু অ্যাডেড কোর্স হিসাবে জ্যোতিষশাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত হল। জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার এমন এক কুলীন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিদ্ধান্তে গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন মানুষজন বিস্মিত। যদিও কেন্দ্রের বিজেপি সরকার প্রবর্তিত নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি (২০২০)-তে ‘ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম’ বলে উল্লেখ করে প্রাচীন ভারতের যেসব জ্ঞানসম্ভারের পরম্পরা রক্ষা ও দেশের জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার কাঠামো তৈরির গুরুত্ব বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে, সেখানে বেদ, পুরাণ, গীতার সঙ্গে এই ধরনের জ্ঞানচর্চার ইঙ্গিত স্পষ্ট। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও জানিয়েছেন যে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ মেনেই তাঁদের এই পাঠক্রম। আবার সামাজিক পরিসরে একটা মহলের অভিযোগ দিনদিন বাড়ছে যে দেশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে উপেক্ষা করে বিজ্ঞান শিক্ষায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে আমরা পশ্চিমের গুণকীর্তন করে চলেছি। এটা নাকি বন্ধ হওয়া দরকার। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য বিচার করা আজ খুবই জরুরি।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আমাদের দেশের জনজীবনে জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রভাব অনস্বীকার্য। ভাগ্য গণনা, গ্রহ নক্ষত্রের কুপ্রভাব কাটাতে রত্ন ধারণ অতি সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু এর মধ্যে কোনো বিজ্ঞান আছে কি? একটা বিষয়কে তখনই বিজ্ঞান বলব যখন পরীক্ষানিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ, যুক্তি বিচার বিশ্লেষণ করে তার প্রত্যেকটি সিদ্ধান্ত কার্যকারণ সম্পর্কের ভিত্তিতে গৃহীত হবে। ব্যক্তির ইচ্ছা, অনিচ্ছা বা বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত বদলাবে না। কেবলমাত্র বারবার পরীক্ষায় এই সিদ্ধান্ত সংযোজিত, সংশোধিত ও পরিবর্তিত হতে পারে, এমনকি তা ক্ষেত্রবিশেষে বাতিলও হয়ে যেতে পারে। এই পদ্ধতির ভিত্তিতেই জ্ঞানবিজ্ঞানের উন্নতি হয়। জ্যোতিষে এই পদ্ধতি ব্রাত্য। সেখানে সিদ্ধান্তের মূলে আছে কতকগুলো প্রাচীন বদ্ধমূল ধারণা এবং অন্ধবিশ্বাস, যা ব্যক্তিবিশেষে বদলে যায়। জ্যোতিষ মতে আমাদের ভাগ্যে যা আছে তা হবেই। কেউ খণ্ডাতে পারবে না। অথচ গণৎকাররাই আবার গ্রহ রত্ন, তাবিজ কবচ বেচে আমাদের ফাঁড়া কাটিয়ে দেওয়ার দাবি করেন। অদ্ভুত স্ববিরোধিতা।

সুদূর অতীতে, সভ্যতার একদম গোড়ার দিকে মানুষ রাতের আকাশে জ্যোতিষ্ক সমাহার দেখে যখন বিস্মিত হত, তাদের কৌতূহলী মনে জাগত নানা প্রশ্ন। সেইসময় সেসবের উত্তর জানা ছিল না। যে যার বোধবুদ্ধি মত একটা ধারণাকে ঠিক ভেবে নিয়ে আশপাশের সকলকে বলে বেড়াত। এর মধ্যে কোনো কোনো ধারণাকে মানুষ বিশ্বাস করত শুরু করল। এভাবেই দৈনন্দিন পর্যবেক্ষণ থেকেই উদ্ভব হয় জ্যোতিষশাস্ত্রের। তাই জ্যোতিষশাস্ত্রকে আমরা অভিজ্ঞতালব্ধ প্রাচীন বিজ্ঞান বা (empirical science) বলতে পারি। মনে রাখতে হবে, তখন জ্যোতিষশাস্ত্রে ভাগ্য গণনা, ভবিষ্যদ্বাণী করা – এসব ছিল না। এগুলো এসেছে সমাজবিকাশের ধারায় আরও কিছু পরে। দাস আর দাস মালিকে বিভাজিত সমাজে এবং তারও পরে রাজতন্ত্রে রাজা রাজন্যদের প্রতিপত্তি বৃদ্ধি, রাজ্যজয়, পুত্রসন্তান লাভ প্রভৃতির আকাঙ্ক্ষা থেকে। এই সময় সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মশাস্ত্র জ্যোতিষের প্রচলিত বিশ্বাসগুলোকে অভ্রান্ত সত্য এবং এ নিয়ে সামান্যতম সংশয় প্রকাশকে দণ্ডনীয় বলে ঘোষণা করে। আমাদের দেশেও এই বিষয়গুলোর উল্লেখ প্রথম পাওয়া যায় গুপ্তযুগের বরাহমিহিরেরপঞ্চসিদ্ধান্তিকা গ্রন্থে। এভাবে হাজার বছরেরও বেশি কেটে গেছে অন্ধবিশ্বাস ও প্রশ্নহীন ধর্মীয় আনুগত্যের যুগ হিসাবে – যা জ্ঞানচর্চার সুপ্তিকাল হিসাবে চিহ্নিত।

মোটামুটি ষোড়শ শতকের শেষার্ধ থেকে এই সুপ্তি ভাঙতে থাকে। সমস্ত ক্ষেত্রে যাচাই করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা বাড়তে থাকে। জ্যোতিষশাস্ত্রের সিদ্ধান্তগুলোও প্রশ্নের বাইরে থাকল না। প্রশ্নের মুখে পড়ে জ্যোতিষশাস্ত্র ভেঙে পড়তে থাকল। জিওর্দানো ব্রুনো, গ্যালিলিও গ্যালিলেইয়ের মত বিদ্রোহীদের শাস্তি দিয়েও নিজের অভ্রান্ততা প্রমাণ করতে পারল না। নিত্যনতুন প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজতে গিয়ে ক্রমাগত পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে মহাকাশ চর্চায় নতুন এক শাখা হিসেবে জ্যোতির্বিজ্ঞান (astronomy)-এর উদ্ভব ঘটল এবং দ্রুততার সঙ্গেই বিকাশ ঘটতে লাগল। অন্যদিকে ধর্মীয় সংস্কার, গ্রহ নক্ষত্রের শুভ অশুভ প্রভাব আর রত্ন পাথর, তাবিজ কবচের খোলসে আবদ্ধ জ্যোতিষশাস্ত্র (astrology) তার প্রাচীনতার কৌলীন্য রক্ষা করে বেঁচে রইল শুধুমাত্র মানুষের কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস হয়ে। আজ বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সমস্ত পর্যবেক্ষণে, যুক্তি তর্কের সমস্ত বিচারে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে জ্যোতিষশাস্ত্র এক ভ্রান্ত জ্ঞানধারা, বাতিল শাস্ত্র।

তাহলে আবার নতুন করে জ্যোতিষ বা পৌরোহিত্যের মত বাতিল ধারণাকে নতুন করে পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা, শিক্ষানীতিতে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়াস কোন স্বার্থে – তাও পর্যালোচনা করা উচিত। নবজাগরণের চিন্তার উপর ভিত্তি করে যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা চালু হয়েছিল, তার ঘোষিত লক্ষ্য ছিল সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা, ধর্মনিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক গণতান্ত্রিক চিন্তা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিকশিত করে পরিপূর্ণ মানুষ গড়ে তোলা। কিন্তু দেখাই যাচ্ছে তা হয়নি। বরং গুটিকয়েক কর্পোরেট ও আমজনতার মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়তে বাড়তে আজ চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে ডুবে গেছে গোটা সমাজ। মানুষের হাতে কাজ নেই। জ্ঞানবিজ্ঞানের এত উন্নতি, উৎপাদনের এত প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও একটার পর একটা কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে পণ্য বিক্রির বাজার নেই বলে। বেকার সমস্যা সামলাতে সরকার হিমশিম। এ সমাজে কত মানুষ খিদের জ্বালায় বিক্রি হয়, অপুষ্টিতে মরে যায়। তাদের মাথার উপরে ছাদ নেই, বেআব্রু জীবন। অন্যদিকে ধনকুবেরদের বৈভব বেড়েই চলেছে। সমাজের চারদিকে ক্ষোভের আগুন ধিকি ধিকি জ্বলছে। কোনোভাবে বারুদের স্তূপে স্ফূলিঙ্গ উড়ে গিয়ে পড়লেই ঘটবে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ।

আরো পড়ুন যুক্তিবোধ সমূলে উৎপাটিত করতেই ডারউইন বিদায়

কে না জানে একটা সমাজের শিক্ষিত সম্প্রদায় সেই বারুদের স্তূপ? তাই বৈষম্যমূলক সমাজে প্রকৃত শিক্ষিত সম্প্রদায় সবসময় শাসকের মাথাব্যথার কারণ। জ্ঞানচর্চা বৃদ্ধি শাসকের আতঙ্কের কারণ। নিজেদের সামাজিক অর্থনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তি অটুট রাখতে তারা চায় প্রশ্নহীন আনুগত্য, যেমন করে একদিন রাজারা চেয়েছিল। আজ পুঁজিপতিরাও সেই ধারার অনুসারী। তাই যে পুঁজিপতি শ্রেণি একদিন সমাজের সমস্তরকম কুসংস্কার, অতীন্দ্রিয়বাদ ও তমসাচ্ছন্ন ধারণার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, আজ সংকটের যুগে সেইসব ভাবনার সঙ্গেই তারা আপোস করছে, সেগুলোকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। কিন্তু আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞানকে বাদ দিয়ে কেবল ধর্মকথায় মানুষকে ভোলানো যায় না। তাই ধর্মীয় সংস্কারগুলোকে বিজ্ঞানের, যুক্তির মোড়কে মানুষের চিন্তায় চালান দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। বিজ্ঞানের মর্মবস্তু আড়াল করে, সুবিধামত তাকে কাটছাঁট করে, কারিগরি দিকটাকে ব্যবহার করে ধর্মীয় চিন্তার মিশেলে কুসংস্কারাচ্ছন্ন চিন্তাকে পুষ্ট করার এই নীতি ফ্যাসিবাদেরই অঙ্গ। ও জিনিস কায়েম হলে মানুষ আর মানুষ থাকে না। নিজের অজান্তেই যুক্তি বিবর্জিত, উগ্র অসহিষ্ণু মনের, বিবেকহীন এক যন্ত্রে রূপান্তরিত হযয়। নিঃশর্ত উগ্র আনুগত্য থাকায় শাসক সেই মানুষকে সহজেই নিজের স্বার্থে কাজে লাগাতে পারে। আমাদের দেশে কেন্দ্রে, রাজ্যে ক্ষমতাসীন কর্পোরেট বন্ধু সরকারগুলো সেই কাজই করে চলেছে। বর্তমানে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার প্রবর্তিত জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ চালু হওয়ার পরে বিজ্ঞানের পাঠ্যসূচি থেকে ডারউইনের বিবর্তনবাদ, পর্যায় সারণির মত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বাদ পড়ছে। ইতিহাস বিকৃত হচ্ছে, বাদ পড়ছে মোগল দরবারের আলোচনা। পৌরাণিক চরিত্র রামচন্দ্র ঐতিহাসিক চরিত্র হিসাবেই পাঠক্রমে ঠাঁই পাচ্ছেন। সমাজবিজ্ঞানে বাদ পড়ছে গণতন্ত্র, আসছে জ্যোতিষশাস্ত্র নামক এক বস্তাপচা বাতিল ধারণা। এ সবই এক সূত্রে বাঁধা। এ হল শিক্ষার গৈরিকীকরণের মধ্য দিয়ে সমাজে ও চিন্তার পরিসরে ফ্যাসিবাদ কায়েমের গভীর ষড়যন্ত্র।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে জ্যোতিষশাস্ত্রের অন্তর্ভুক্তিও ঘোষিত শিক্ষানীতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে একদিন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, ডঃ মেঘনাদ সাহা, ডঃ সত্যেন্দ্রনাথ বসুদের মত বরেণ্য বিজ্ঞানীরা পদচারণা করেছেন, সরাসরি জ্যোতিষশাস্ত্রের বিরোধিতা করেছেন, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সেনেট সদস্য ছিলেন এদেশের নবজাগরণের পুরোধা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, সেই বিশ্ববিদ্যালয় আজ তার অতীত ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণ জলাঞ্জলি দিয়ে প্রতিষ্ঠানকে এক ঘৃণ্য চিন্তাধারার কাছে নির্দ্বিধায় সঁপে দিচ্ছে। শিক্ষাদানের নাম করে ছাত্রসমাজকে পুনরায় অন্ধকার যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে তারা। এর বিরুদ্ধে সমাজের সর্বস্তরে প্রতিবাদ ধ্বনিত করা আমাদের সামাজিক দায়িত্ব।

নিবন্ধকার বিজ্ঞান আন্দোলনের সংগঠক। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.