মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে কিশোরকালের প্রথম নির্বিকল্প বিরাম ও সংলগ্ন ফুর্তির যোগ বোধহয় পরীক্ষাটির জন্মকাল থেকেই খানিক বাধ্যতামূলকভাবে জড়িয়ে আছে। এক বা দুবছরের পড়াশোনাকে পক্ষকাল চলা অভীক্ষায় মূল্যায়িত করার পদ্ধতি ঠিক, না ভুল, তাই নিয়ে বিতর্ক ছিল। কিন্তু সেই পর্ব মিটলে ছেলেমেয়েরা উল্লাসে মাতবে, বেড়াতে যাবে, খানিক বেহিসাবি দামালপনা দেখাবে, দেবে লম্বা ঘুম – এসব বাঁধাধরা ব্যাপার মধ্যবিত্ত বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে একরকম একাত্মই হয়ে গিয়েছিল প্রায়। জীবনবিজ্ঞানের সংজ্ঞা অতিক্রম করে রাতকাবার আরণ্যকের বয়ঃসন্ধি কত যে সংগুপ্ত অলৌকিক ভোর নিয়ে এসেছে বাঙালি কিশোর-কিশোরীর জানলায়, তার অনেকটাই মাধ্যমিক শেষের দিনগুলো জানে।

ছড়ায় ছবিতে চিরদিন কাটে না। মাধ্যমিকও বনস্পতির ছায়া দিয়ে বৃদ্ধ হলেন। ছবিও পাল্টাল সেই জরাঘূর্ণিতে। মোটামুটি আপামর বাঙালিকে চমকে দিয়ে বইখাতা ছিঁড়ে কিছু বাঙালি কিশোর উদযাপন করলেন তাঁদের মাধ্যমিক শেষের প্রথম বিকেল। সোশাল মিডিয়া এবং পরে মূলধারার সংবাদমাধ্যমে সেই ছবি জাতির একপ্রকার গ্লানি হয়ে উঠল। ছিছিক্কারে আকাশবাতাস বিদীর্ণ করে বাঙালি আবিষ্কার করল – দলে দলে কুম্ভস্নানে গিয়েও এই জাতির দুঃসময় ঘোচার নাম নেই; বরং শিশু কিশোররাও সার্বিক ক্ষয়রোগের আক্রান্ত। এককথায়, আমরা গোল্লায় গেছি। কিন্তু এসব কি এই প্রথম দেখছি আমরা? এসব কি একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল? কোনো আভাস ইতিহাস বা মহাকাল কি একেবারেই দেয়নি?

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মাধ্যমিকের বিকেল গড়িয়ে রাত নামে। মারহাব্বা সৃষ্টির কাটা ঘা-পথ আকীর্ণ করে রাখে ছিটে ছিটে নুনসদৃশ শোভানাল্লাহ ছেঁড়া বইখাতা।

প্রাজ্ঞ শিক্ষক আমাদের জানাবেন যে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকের শেষদিনে পরীক্ষার হলের পাখা বাঁকিয়ে পদ্মফুল করে দেওয়া, শৌচালয়ে ভাংচুর চালানো, দেওয়ালে এঁকে দেওয়া টিন এজ জারিত উত্তেজনার সংরাগ – এসব নিবৃত্তির হেঁই সামাল দায়িত্ব তাঁরা পালন করছেন বহুবছর ধরেই। সুতরাং এই বেয়াদবি কোনোভাবেই অর্বাচীন নয়। সংকট বোধহয় এই বেয়াদবির ফলিত রূপটায়। বইখাতার প্রতি খানিক বয়সোচিত স্বাভাবিক বীতরাগ কীভাবে এই জিঘাংসায় রূপ নিল? যে বইখাতা দেবোপম হয়ে প্রতিভাত হয়েছে এতকাল, তাকে সংহারে এত সাবলীলতা এল কোথা থেকে? উত্তর খুঁজতে গেলে এই কিশোরদের দোষ ক্রমসংকুচিত হয়ে আসতে বাধ্য এবং সামনে আসবে এক বৃহত্তর নীল নকশা।

আরো পড়ুন মলিন মাধ্যমিক পরীক্ষা মলিনতর হচ্ছে, প্রতিকার প্রয়োজন এখনই

নয়ের দশকে খোলা হাওয়া অর্থনীতি চালু হওয়ার পর থেকেই কমবেশি বোঝা যাচ্ছিল, সামাজিক ক্ষেত্র থেকে কল্যাণকামী রাষ্ট্র ক্রমে সরে আসবে। তার জায়গা নেবে ব্যক্তি মালিকানা, পুঁজি ও ফেলো কড়ি মাখো তেলের বিনিময়। যেটুকু রাখঢাক ছিল, ২০০০ সালে প্রথম এনডিএ সরকার তাও দূর করল শিক্ষা বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের কমিটি সৃষ্টির মাধ্যমে। কমিটির শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের নামেই খেলা স্পষ্ট হয়ে আসে। মুকেশ আম্বানি ও কুমারমঙ্গলম বিড়লার নেতৃত্বাধীন সেই কমিটি ২০০০ সালের এপ্রিল মাসে জমা দিল ‘রিপোর্ট অন এ পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম ইন এডুকেশন’। কী ছিল সেই রিপোর্টে?

শিক্ষাক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে; শিক্ষায় সার্বিক ফি বৃদ্ধি কাম্য ও অবশ্যম্ভাবী; ক্যাম্পাস হবে রাজনীতিমুক্ত; বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পথ হতে হবে সুগম ইত্যাদি। সার্বিক ফি বৃদ্ধির বিশল্যকরণীও কমিটিই বাতলে দিয়েছিল – পড়াশোনার জন্য ঢালাও ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং শিক্ষান্তে সেই ঋণ বাজার নির্ধারিত সুদের হারে চোকাতে হবে শিক্ষার্থীকে। পঁচিশ বছর বাদে সেইসব প্রস্তাব, যা সমকালীন প্রগতিশীলদের পিলে চমকে দিয়েছিল, এখন রূঢ় বাস্তব। প্রগতিশীলদের এই নিয়ে গণআন্দোলন, সম্ভব হলে গণঅভ্যুত্থান করার কথা ছিল।

কেউ কথা রাখেনি।

এই কমিটির প্রস্তাবকে কুড়ি কুড়ি বছরের পারে এসে বাস্তবায়িত করল কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষা বিভাগ, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-র মাধ্যমে। ইতিমধ্যে সরকারি শিক্ষার নাভিশ্বাস উঠেছে; আইআইটি, আইআইএমের মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও লাগামছাড়া হারে ফি বাড়িয়েছে, ড্রপআউট বেড়েছে আতঙ্কিত করার মত হারে। সবচেয়ে আশ্চর্য, এসবের নিরসন নিয়ে সরকারি কোনো উদ্যোগ, দু-চারটে স্লোগান ব্যতীত, চোখে পড়ে না। যা চোখে পড়ে, তা হল একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি অনীহা, বিতৃষ্ণা ও একপ্রকার ঘনায়মান ঘৃণা। ক্লাস কামাইয়ের সর্দার, বিন্দুমাত্র শেখার আগ্রহরহিত তরুণ থেকে ইউটিউব ইনফ্লুয়েন্সার, অতি ধনী শিল্পপতি, মায় সর্বোচ্চ সরকারি শিক্ষা আধিকারিক – সব্বাই জানিয়ে যাচ্ছেন, ইস্কুল কলেজ সব ফালতু! কী হবে বীজগণিত শিখে? মেঘনাদবধ তোর বেকারত্ব ঘোচাবে? পেরিকার্ডিয়ামের সংজ্ঞা তোর জীবনের কোন অসুবিধাটা কমাচ্ছে? তার থেকে চল, কাজ শেখ। হাতে কলমে কাজ করার মত যোগ্যতা অর্জন কর। দুনিয়াকে একটু জয় করে নে ভাই; আর কদ্দিন পড়ে পড়ে মার খাবি?

বেশ কথা। শিক্ষাকে বাহন করার সুপরামর্শ আমরা সেভাবে তো কাজেই লাগাতে পারিনি কোনোদিন। এবার তার খানিক প্রয়োগমুখী উপযোগিতা পাওয়ার চেষ্টা করলে মন্দ কী? মন্দ সত্যিই সেভাবে ছিল না। কিন্তু নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি যা বারংবার প্রোথিত করতে চাইল, তা কিন্তু একেবারে নিরপেক্ষ শিক্ষার্থীর ক্ষমতায়ন নয়। একটি সুনির্দিষ্ট পথে ক্ষমতায়ন এবং সেটা তথাকথিত দক্ষতা বা ‘স্কিল’ -এর বিকাশের মাধ্যমে। নয়া এই নীতির ৬৬ পাতার নথিতে ‘স্কিল’ শব্দটা ৬৬ বার উচ্চারিত হয়েছে। ‘আউটকাম’ ধ্বনিত হয়েছে ৩৮ দফায়। উচ্চশিক্ষায় জড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ, যার কোনো স্পষ্ট রূপরেখা বা প্রয়োগপদ্ধতি নেই। বারবার উঁচু মহল থেকে নির্দেশ আসছে, যে কোনো উপায়ে শিল্পসংস্থাগুলোকে রাজি করান আপনাদের ছেলেমেয়েদের ইন্টার্নশিপের জন্য। গলায় গামছা দিয়ে অনুরোধ করুন, তাদের যেন কাজে নেওয়া হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চোখের সামনে ‘জব এজেন্সি’ বনে যাচ্ছে। অথচ কেউ প্রশ্ন করতে পারছি না যে, ‘হে মাইবাপ সরকার, আমার ছেলেমেয়েগুলো যে কাজে যাবে সেখানে ন্যূনতম মজুরির শর্ত মানা হবে তো? প্রভিডেন্ট ফান্ড জুটবে? কাজের সময় কতটুকু? ঝুঁকির ইন্টার্নশিপে বা চাকরিতে বিমার ব্যবস্থা আছে?’ মাথা থেকে সরিয়েই দেওয়া হচ্ছে দক্ষতা ও শিক্ষার মধ্যের মৌলিক ফারাক। যে শিক্ষা প্রশ্ন করতে, চিন্তাশীল হতে শেখায় – তার দিন গিয়াছে, এই মর্মে ঘোষণাটুকুই যা বাকি।

এই অবস্থার সলতে পাকানোর কাজও শুরু হয়েছিল ওই ২০০০ সালের রিপোর্টেই। স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল যে পাঠ্যবস্তু ও বিষয় একান্তভাবেই বাজার নির্দিষ্ট হবে। এক্ষণে বাজার মজেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায়। ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে সাংবাদিকতা, এন্ট্রি লেভেল প্রোগ্রামিং থেকে কন্টেন্ট রাইটিং, গ্রন্থাগারিকের কাজ থেকে মার্কেটিং কৌশল নিরূপণ – সর্বত্র তার অবাধ গতি। কাতারে কাতারে কাজ হারানো, কাজের সুযোগের ক্রমসংকোচনে বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে স্থবির থেকে যাওয়া মূল মজুরি, নতুন কাজের সুযোগ নেওয়ার মত উপযুক্ত অর্থবল ও পরিকাঠামোর নাগাল না পাওয়া মূঢ় ম্লান মুখের মিছিলকে কৃত্রিম বুদ্ধির সভ্যতা দাগিয়ে দিচ্ছে নিম্ন মেধা, মধ্য মেধার দল বলে। ইতিহাসের স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী ফুলস্ট্যাক ওয়েব ডেভেলপমেন্ট শেখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে এক বিমর্ষ বিকেলে আত্মধিক্কারে ফোন করে জানাচ্ছে, ‘আসলে স্যার মাথাটা মোটা তো আমার…সবকিছু বুঝতে পারছি না।’ ভূগোলের পিএইচডি রত সামান্য মাইনের অতিথি অধ্যাপক কুনিয়ে উঠে অক্ষম আত্মপ্রতিষ্ঠার আশায় বলে চলেন, ‘আমরা কিন্তু বিজ্ঞানী। আমরা সলিড ডেটা নিয়ে কাজ করি; রিসার্চ করি…!’ বোধহয় শিক্ষার গৈরিকীকরণেরই সমান ভয়াবহ এই ‘ডেটা’-বাহিত ‘আউটকাম’-ধর্মী শিক্ষার প্রয়াস। আসলে যে ‘আউটকাম’ এই আধুনিক শিল্পক্ষেত্রনির্ভর সভ্যতা ছাত্র ও গবেষককুলের কাছে চাইছে, তাকে হতে হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার খাদ্য। অনেক তথ্য, অনেক ‘আউটকাম’ দিয়ে পুষ্ট করতে হবে জেমিনি, চ্যাটজিপিটি বা ডিপসিককে। যাতে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তাতে ভর করা টেকনো-সামন্তপ্রভুরা তথ্যদানব হয়ে কর্তৃত্ব চালাতে পারে আমাদের জীবনের প্রতিটি পলের উপর। ফলে উচ্চশিক্ষায় গবেষণামূলক বইয়ের গুরুত্ব কমে হঠাৎই বেড়ে যায় অনলাইন জার্নালের দাপাদাপি। মানবিকীবিদ্যা ও সমাজবিজ্ঞান, বিশেষত ভাষা সাহিত্যের জার্নাল, ক্রমে বিরল হয়ে আসে নামজাদা ইনডেক্সগুলোর তালিকায়। ভাবা প্র‍্যাকটিস করার পবিত্র অনুজ্ঞা তথ্য ও পরিণামের চোরাবালিতে মিলিয়ে যেতে থাকে।

তবে এ তো গেল প্রদীপের উপরের আঁধার। প্রদীপের তলার অবস্থা স্বাভাবিকভাবেই আরও সঘন গহন রাত্রি। যাঁরা পাতা ছিঁড়ে ওড়ালেন, তাঁদের অনেকেই একেবারে আর্থসামাজিক ও অধুনা অবজ্ঞাসর্বস্ব রাজনীতির কারণেই উচ্চশিক্ষার চৌহদ্দিতে আসবেন না, বা এলেও বেশিদিন টিকবেন না। তার ব্যবস্থাও অবশ্য শিক্ষানীতি পাকা করে রেখেছে। কলেজে ঢোকার প্রথম বছরের পরেই সে বেরিয়ে যেতে পারে। যেমনটা পারে দ্বিতীয় বা তৃতীয় বছরে। পোশাকি নাম ‘মাল্টিপল এক্সিট’। আলখাল্লার আবডাল ঢাকে ড্রপআউটের নগ্ন বাস্তব। শর্ত একটাই, মুখ বুজে ইন্টার্নশিপটি করে নিতে হবে; হবেই। যা-ই হোক, যদি সে উচ্চশিক্ষায় না আসে তাহলে সে কী করবে? তাদের জন্য ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন বা জনশিক্ষণ সংস্থানের মত প্রতিষ্ঠানের নাম শোনা যায়। গ্রামে গঞ্জে তাদের কাজের দেখা বড় একটা মেলে না। অগত্যা শিক্ষার্থীদের জন্য পড়ে থাকে তাঁদের আদিমতম ‘স্কিল’ ও ‘আউটকাম’ – শরীর। এই মাধ্যমিকের পরেই লক্ষাধিক ছাত্রছাত্রী উধাও হয়ে যাওয়ার খবর আসে। উচ্চমাধ্যমিকে উদ্বেগজনকভাবে কমে যায় তাদের সংখ্যা। খোদ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকে ভর্তি কোভিডকালের পর কমে গেছে প্রায় ২০%। অন্যদিকে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে কিশোরীদের বিবাহ, কম বয়সে গর্ভবতী হয়ে পড়ার ঘটনা। প্রবাসী শ্রমিক হয়ে ঘাম ও শোষণে মিলিয়ে যাচ্ছে কিশোরবেলা। লটারি, নেশা ও বেকারত্বের ত্র‍্যহস্পর্শ কুপকুপে অন্ধকারে আমাদের গ্রাম পতনের শব্দ শোনায়। আর শহর ও ইন্টারনেটের মুখরিত সখ্য কেবল শুনিয়ে যায় – এসব লেখাপড়ার দিন গেছে। কাজ শিখে নিতে হবে, সাহিত্য-ইতিহাস-বিজ্ঞান তখনই কার্যকরী যখন সে প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ সুনিশ্চিত করছে…

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার এই নিশ্চুপ অন্তর্জলী যাত্রার সঙ্গে সঙ্গেই চিরাচরিত মূল্যবোধও গুলিয়ে যায়। লেখাপড়া ছেড়ে দিতে চাওয়া ছেলেটাকে কিছুতেই বোঝানো যায় না জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা। বিয়ে করে ফেলতে নাছোড় ছাত্রীকে শিক্ষিকা হাত ধরে বোঝাতে গিয়েও ব্যর্থ হন। সে বুঝতেই পারে না পড়াশোনা কীভাবে তার ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত ও জীবনের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত কর্মশালায় যখন বলা হয়, আগামী ন্যাক মূল্যায়নে সিলেবাস নির্ধারিত ইন্টার্নশিপের ছাত্রছাত্রীদের বাইরে আরও আরও ইন্টার্নশিপ করাতে (এবং তা প্রায় সবক্ষেত্রেই বিনা মজুরিতে) পারলে তবেই উজ্জ্বলতর হবে উচ্চতর গ্রেডপ্রাপ্তির সম্ভাবনা, তখন একজন শিক্ষকও প্রশ্ন তোলেন না যে মূল পড়াশোনাটা তাহলে কখন হবে? কবে ছাত্রছাত্রী তার বিষয়ের মূল প্রতিপাদ্যগুলোর সঙ্গে মিতালী করবে?

ঠিক যেমন আমরা প্রশ্ন তুলি না, প্রায় ৯০,০০০ কোটি টাকার শিক্ষা সেসের হিসেব কেন দিতে পারছে না সিএজি? কোন ঔদ্ধত্যে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ কোঠারি কমিশনের কথা অনুযায়ী না বেড়ে আম্বানি কমিটির পরামর্শ অনুযায়ী গুণিতকে হারে কমতে থাকে?

প্রশ্ন করার অভ্যাসের এই ক্রমহ্রাসমানতার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ে পাঠশালা বন্ধের আড়ম্বর। ব্যক্তি পুঁজির ঝলমল স্কুলে যখন ছাত্রছাত্রীর পাশাপাশি বাড়তে থাকে মুনাফা, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পুঁজির অনলনিশ্বাসী রথযাত্রায় শ্রমনিবিড়, অনুদাননির্ভর গিগ-প্রজা হয়ে থাকা ছাড়া কতটুকু সম্ভাবনা তাঁদের জন্য বাকি থাকে – তা এই পাতাঝরানো কিশোর-কিশোরীরা বিলক্ষণ জানেন।

হীরক রাজার হেরে যাওয়ার একটা ভয় ছিল। কারণ পাঠশালা তিনিই বন্ধ করেছিলেন। টেকনো-সামন্তপ্রভুদের ও তাঁদের দাসানুদাস রাজনীতিবিদদের সেই ভয়ও আর বোধহয় নেই। ছেলেমেয়েদের তাঁরা বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন – এই পাঠশালা মূল্যহীন। এই বইখাতা তামাদি হয়ে গেছে।

বিশ্ব উষ্ণায়ন আমাদের অজান্তেই ধীরে ৪৫১ ফারেনহাইট ছুঁয়ে ফেলল…

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.