আমরা যারা পশ্চিমবঙ্গের উচ্চশিক্ষার সঙ্গে যুক্ত, তারা অনেকেই জানি যে কোভিড অতিমারীর কারণে লকডাউনের সময় থেকেই উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে অন্ধকার কীভাবে আস্তে আস্তে আমাদের, বিশেষত সরকারি বা সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে, গ্রাস করতে শুরু করেছিল। কলেজছুটের সংখ্যা বাড়া, ছাত্রদের ক্লাসবিমুখতা – এসব নিয়ে আমরা গুরুগম্ভীর আলোচনা সভা ও গবেষণাপত্রের ভার বাড়াইনি এমনটা নয়। কিন্তু কোথায় যে তাল কাটছে তা বুঝতে যে ব্যর্থ হয়েছি – একথা অনস্বীকার্য। এরপর এসে গেল জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০। কিমাশ্চর্যম তৎপরম! প্রবল ‘বিরোধিতা’ করেও, অন্তত উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ওই নীতিটিই হঠাৎ চাপিয়ে দিলেন শিক্ষক ও ছাত্রকুলের উপর। মহা আড়ম্বর করে যে সিবিসিএস পাঠক্রম শুরু হয়েছিল, তা কারিকুলাম অ্যান্ড ক্রেডিট ফ্রেমওয়ার্ক (সিসিএফ) নামক বেড়ালে পরিণত হল। এতে যা হল, পার্ট সিস্টেম থেকে সিবিসিএস সিস্টেমের যে অথৈ পরিবর্তন, তা কোনোমতে গলা দিয়ে নামার আগেই এসে গেল আরেকটা অত্যন্ত জটিল সিস্টেম।
প্রথম থেকেই এই সিস্টেম নিয়ে অন্তত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় নাকানি চোবানি খেয়ে চলেছে। শেষ মুহূর্তে পাঠক্রমে পরিবর্তন, ইন্টার্নশিপ নামক উদ্ভট বিষয়ের দিশাহীনতা, সর্বোপরি সময়ের অভাব এই সিস্টেমকে ছাত্র ও শিক্ষক – উভয়ের কাছেই সমস্যাসংকুল করে তুলেছিল। কিন্তু পিকচার তো তখনো বাকি ছিল। গতবছর থেকেই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিক্ষা দফতর কলেজে ভর্তির একটা কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার ঢক্কানিনাদ করছিল। উদ্দেশ্য খুবই মহৎ – ভর্তি সংক্রান্ত দুর্নীতি দমন। এদিকে নতুন সিসিএফ পাঠক্রম এতটাই জটিল এবং সময়সাপেক্ষ যে মফস্বলের কলেজের ভাল ফল করা ছাত্রছাত্রীরাও আর অনার্স নিতে চাইছে না, বরং তিনবছরের কোর্স করে কোনো একটা চাকরির খোঁজই তাদের উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে (এখানে অবশ্য গত কয়েক বছরে টেট বা এসএসসি-তে নিয়োগ না হওয়াও একটা বড় ইস্যু, কিন্তু সেকথা অন্যত্র আলোচনা করা যাবে)। যা-ই হোক, ২০২৪ সালে শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু সমেত শিক্ষা দফতর দুই পা এগিয়ে, তিন পা পিছিয়ে শেষপর্যন্ত কলেজগুলোর হাতেই ছাত্র ভর্তির রাশ ছেড়ে দেয়। তাই শেষ মুহূর্তে খানিক দেরি করে হলেও, অগাস্টের শেষদিক থেকে ক্লাস শুরুর দিশা পাওয়া গিয়েছিল। যদিও সিসিএফ অনুসারে এটাও নির্ধারিত সময়ের তুলনায় অনেকটা বিলম্ব। তাই বারবার প্রশ্ন ওঠে সিলেবাস শেষ করা, সময়ে পরীক্ষা নেওয়ার সমস্যা ইত্যাদি নিয়ে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
তারপর এল ২০২৫। আমাদের উচ্চশিক্ষিত, শিল্পী শিক্ষামন্ত্রী ঠিক করলেন – আর দেরি না করে এবছর থেকেই সরকারি বা সরকারি মদতপুষ্ট কলেজগুলোতে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে রাজ্য সরকারের কেন্দ্রীয় পোর্টাল দ্বারা। সেইমত উচ্চমাধ্যমিক বা ওই স্তরের পরীক্ষার ফল বেরোবার পর ছাত্রছাত্রীরা প্রস্তুতি নিতে থাকল। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে পোর্টাল খোলা পাওয়া গেল না। একইসঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো, যারা শিক্ষাকে একটা অর্থকরী ব্যবসা মনে করে, তাদের দরজা দরাজভাবে খোলা। শুধু পকেটে কড়িটি থাকলেই হল। প্রায় একমাস পর সরকারের ভর্তির পোর্টাল খুললেও শুরু হল আবেদনপত্র গ্রহণের দিন বাড়ানোর খেলা। প্রতি সপ্তাহেই দিন বাড়ানো হচ্ছে, কারণ ‘যথেষ্ট আবেদন জমা পড়ছে না’। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী সহ অন্য মান্যগণ্য পদাধিকারীরা বোধহয় ভুলেই গেছিলেন, যে কোভিডের পর থেকেই, বিশেষ করে সরকারি কলেজগুলোতে, ভর্তির হার উদ্বেগজনকভাবে কমছিল। তারপর জাতীয় শিক্ষানীতির আগমনে সেই হার তলানিতে ঠেকেছে। আর এবছর সরকারি পোর্টাল খোলার আগেই বেসরকারি ও স্বশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাওয়ায় উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা অনেকেই আর সরকারি কলেজের অপেক্ষায় বসে থাকেনি। এমনিতেও জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-র মধ্যে বেসরকারিকরণের ধারা সুস্পষ্ট। তার উপর সরকারের এমন অযাচিত সাহায্যের ফায়দা যে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তুলতে পারবে, তা বলাই বাহুল্য। মধ্যবিত্ত তো অনেকদিন আগেই সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার উপর বিশ্বাস হারিয়েছে। তারা মনে করে – যাহা বেসরকারি তথা দামি, তাহাই উচ্চমানের। আর কিছু না হোক, উচ্চমানের বিজ্ঞাপন তো আছেই।
তাহলে সরকারি ব্যবস্থার এই ভঙ্গুর অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কারা? প্রাথমিকভাবে আমার আপনার ঘরের ছেলেমেয়ে নয়, কারণ তারা তো সরকারি ব্যবস্থার মুখাপেক্ষী নয় (প্রসঙ্গত, নিবন্ধকার নিজে সরকারি উচ্চশিক্ষাই পেয়েছেন এবং প্রবলভাবে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার সমর্থক)। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্নবিত্ত পরিবারের ছাত্রছাত্রীরা, যাদের এমনিই অহরহ শুনতে হয় ‘পড়াশুনো করে আর কী হবে? চাকরি তো পাওয়া যাবে না (চাকরি পাওয়া যত শক্তই হোক, যে শ্রেণি মূলত এই উপদেশ দেয়, তারা কিন্তু নিজেদের সন্তানসন্ততিকে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে হলেও ‘শিক্ষিত’ করে তুলতে ছাড়ে না)। কিন্তু ক্ষতি শুধু এদের মধ্যেই সীমিত থাকবে, তা নয়। আমরা, যারা শিক্ষাজগতের সঙ্গে চাকরি সূত্রে যুক্ত এবং মনে করছি ‘আমার কী, আমার সন্তান তো আছে দুধেভাতে’, তাদেরও বিপদ কিন্তু কম নয়।
পশ্চিমবঙ্গে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার হাল হকিকত কী, একটু চোখকান খোলা রাখলেই টের পাওয়া যায়। বস্তুত, প্রাথমিক ও তৎপরবর্তী রাস্তা ডিঙিয়ে যে ছাত্রছাত্রীরা আমাদের কাছে আসে, তাদের শিক্ষার অবস্থা আমরা সকলেই জানি। তাদের জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে, কোনো স্কুলে দুজন শিক্ষক, কোথাও একজন। শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়ার মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মিড ডে মিল। পাঠক মনে করবেন না, মিড ডে মিলে এই লেখকের কোনো আপত্তি রয়েছে, কিন্তু পাশাপাশি শিক্ষাটাও তো প্রয়োজন। কিন্তু বহুবিধ কারণে স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ হয় না, বা হলেও বাতিল হয়ে যায়। এই হারে ছাত্র ভর্তি কমলে, আমরা কলেজ শিক্ষকরা কি তাহলে সুরক্ষিত? আমাদের চাকরি, পেনশন ইত্যাদির কী গতি হবে ভেবে দেখেছেন?
আরো পড়ুন মাধ্যমিক: শিক্ষা ফুরায় ফুচকার প্রায়, পড়ে থাকে ছেঁড়া পাতা
গত ২৫ বছরে এবছর সর্বাধিক বিলম্বে পশ্চিমবঙ্গে কলেজে ভর্তি শুরু হল। এ প্রসঙ্গে একটা কথা উল্লেখযোগ্য। আদালতের এক বিচারপতির বেঞ্চের অদ্ভুত রায়ের জটে ওবিসি সংরক্ষণ বিধি নির্ধারণ এবছরের অনাবশ্যক দেরির জন্য অনেকটাই দায়ী। কিন্তু তাও প্রশ্ন ওঠে, ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে কেন্দ্র-রাজ্যের দড়ি টানাটানি সম্পর্কে শিক্ষামন্ত্রক সম্যক অবহিত ছিল নিশ্চয়ই। তা সত্ত্বেও কেন ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে না, কেন এই দীর্ঘসূত্রিতা – তা নিয়ে রাজ্য সরকারের বা শিক্ষামন্ত্রীর তরফ থেকে কোনোরকম বক্তব্য বা আশ্বাস কেন থাকবে না? যদি জানাই থাকে, শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বার্থে ভর্তি বানচাল করার চেষ্টা করবে কোনো কোনো পক্ষ, তাহলে বিকল্প পরিকল্পনা কেন তৈরি রাখবে না রাজ্য সরকারের শিক্ষা দফতর? সেসব কিছুই ছিল না। তাই আজ এতদিন বাদে তাই রিপ ভ্যান উইংকলের মত জেগে উঠে কেন কম ছাত্র ভর্তি হল – এই নিয়ে দুশ্চিন্তা প্রকাশ খুবই মেকি লাগে। গোড়ায় পচন ধরা গাছের ডাল পাতা ছেঁটে বাহারি আলো লাগালে শোভাও বাড়ে না, গাছও বাঁচে না।
অতএব পাখি যে বহুদিন আগেই মরেছে, সেকথা মেনে নেওয়াই ভাল। পাখি এবং পণ্ডিত, উভয় পক্ষেরই বারোটা বেজেছে বলা চলে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







