অর্ক মুখার্জি
গত বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্না ও সঞ্জয় কুমার প্রায় নজিরবিহীন এক রায়ে ২০১৬ সালের স্কুল সার্ভিস কমিশনের একাদশ-দ্বাদশ, নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষক এবং গ্রুপ সি ও গ্রুপ ডি শিক্ষাকর্মী নিয়োগের সম্পূর্ণ প্যানেল বাতিল করেছেন। স্কুলে নিয়োগের ক্ষেত্রে গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরুদ্ধে বহু দুর্নীতির এবং কারচুপির অভিযোগ উঠলেও এইভাবে সম্পূর্ণ প্যানেল বাতিলের ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। স্বাভাবিকভাবেই এই রায়ের অভিঘাত আলোচনার এক বিশেষ অভিমুখ তৈরি করেছে। এর আগে এই প্যানেলকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ প্রথম ওঠে ২০১৮ সালে। তখন থেকেই বিক্ষিপ্তভাবে বিকাশ ভবনের সামনে রাস্তায় ছোটখাটো প্রতিবাদ, বিক্ষোভ শুরু হয়। ২০১৯ সালের লোকসভার নির্বাচনের আগে আন্দোলনকারীরা নিজেদের আরও বেশি মাত্রায় সংঘবদ্ধ করে। মার্চ মাসে প্রেস ক্লাবের সামনে টানা ২৯ দিন অবস্থান বিক্ষোভ করেন দুর্নীতির জন্য নিয়োগে বঞ্চিত হওয়া চাকরিপ্রার্থীরা। ২০২১ সালের ৫ আগস্ট কলকাতা হাইকোর্টে প্রথম স্কুলে নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে মামলা রুজু হয়। একটি গ্রুপ সি নিয়োগ আর একটি গ্রুপ ডি নিয়োগ নিয়ে। তারপর নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও মামলা করা হয়।
অধিকাংশ মামলাই গিয়েছিল হাইকোর্টের তৎকালীন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের এজলাসে। তিনিই প্রথম সন্দীপ প্রসাদ বলে এক বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীর করা মামলায় গ্রুপ ডি শিক্ষাকর্মী নিয়োগ পদ্ধতি খতিয়ে দেখতে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেন। ২০২১ সালে অধুনা বিজেপি সাংসদ অভিজিৎ শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত মামলার তদন্তভারও সিবিআইকে দেন এবং পরবর্তীকালে মোট দশটি মামলার তদন্তভার সিবিআইকে দেওয়া হয়। পাশাপাশি নিয়মের কারচুপি করে হওয়া বেআইনি নিয়োগ বাতিল করার নির্দেশও দেন বিচারপতি। পরে অবশ্য তাঁর বেশকিছু রায়ের উপর স্থগিতাদেশ দেয় কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি হরিশ টন্ডনের ডিভিশন বেঞ্চ। অভিজিতের সিঙ্গল বেঞ্চের কিছু রায় বহাল রাখে বিচারপতি সুব্রত তালুকদারের ডিভিশন বেঞ্চ। সেইসব নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করা হয়। ২০২৩ সালের ৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি অনিরুদ্ধ বসু ও বিচারপতি বেলা ত্রিবেদীর বেঞ্চ এই মামলাটি দেখার জন্য কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করার নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশ মেনে ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি বিচারপতি দেবাংশু বসাক ও বিচারপতি মহম্মদ শব্বর রশিদির বিশেষ বেঞ্চ এই মামলার শুনানি শুরু করে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
২০২৪ সালে জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে মোট ১৭টি শুনানি হওয়ার পর ২২ এপ্রিল ২৮২ পাতার রায়ে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বাতিল ঘোষণা করা হয়, অর্থাৎ চাকরিহারা হন ২৫,৭৫২ জন। ব্যতিক্রম কেবল ক্যান্সারে আক্রান্ত সোমা দাস। ২০২৪ সালের লোকসভার ভোটের আগে এই রায় বিরোধীপক্ষের কাছে সরকারের দুর্নীতির প্রমাণপত্র হয়ে উঠতে পারত। তা আটকাতে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে রাজ্য সরকার। মামলাটি ২৯ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়, বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা ও বিচারপতি মনোজ মিশ্রের বেঞ্চে শুনানির জন্য ওঠে। ২০২৪ সালে ৭ মে হাইকোর্টের রায়ের উপর স্থগিতাদেশ জারি করে সুপ্রিম কোর্ট। অবশেষে গত ৩ এপ্রিল কুড়িবার শুনানির পর এবং ৪০০ আইনজীবীর যুক্তি-প্রতিযুক্তি শোনার পর কলকাতা হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে দুর্নীতির অভিযোগকে স্বীকৃতি দিয়ে নিয়োগ বাতিল করে সুপ্রিম কোর্ট।
এতজন শিক্ষক, শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিল হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষায় এক অভূতপূর্ব সংকটজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এমনিতেই ২০১৬ সালের পর থেকে আর কোনো শিক্ষক বা শিক্ষাকর্মী নিয়োগের পরীক্ষা পশ্চিমবঙ্গ সরকার নিতে পারেনি। ফলে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর অপ্রতুলতা প্রায় সব স্কুলেই। তার উপর হঠাৎ এতজন মাস্টার এবং শিক্ষাকর্মী উধাও হয়ে যাওয়ায় স্কুলগুলোর পরিকাঠামো যে একবারে ভেঙে পড়েছে তা বলাই বাহুল্য। প্রশ্ন জাগে, এমতাবস্থায় নাভিশ্বাস উঠে যাওয়া সরকারি স্কুলশিক্ষাকে টিকিয়ে রাখার উপায় কী?
অদ্ভুতভাবে দেখা যাচ্ছে, মুখ্যমন্ত্রী থেকে আরম্ভ করে শিক্ষামন্ত্রী বা বিরোধী দলনেতা এবং সংসদীয় রাজনীতিতে অংশ নেওয়া বাম দলগুলিও এ প্রসঙ্গে নীরব। এঁদের যাবতীয় বক্তব্য বাতিল শিক্ষকদের ঘিরে। অথচ শিক্ষকের অভাবে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাও যে আস্তে আস্তে সাধারণ মানুষ বাতিল করে দেবেন, সেই ভাবনায় কোনো দলই ভাবিত নয়। এরপর দেখা যাবে, যেখানে সুযোগ রয়েছে সেখানে নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষও সাধ্যের বাইরে টাকা খরচ করে ছেলেমেয়ের জন্য বেসরকারি স্কুলশিক্ষাকেই বেছে নেবেন। মুখ্যমন্ত্রী এখন পর্যন্ত চাকরি যাওয়া শিক্ষকদের স্বেচ্ছাশ্রম দেওয়ার আবেদন করা ছাড়া স্কুলগুলো কীভাবে সচল থাকবে তা নিয়ে কোনো পরিকল্পনার কথা বলেননি। শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু সরকারি স্কুল পরিচালনাকে বোধহয় নিজের দায়িত্বের মধ্যে ধরেন না, বা হয়ত আরও গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজে ব্যস্ত থাকেন। মুখ্যমন্ত্রীর আবেদনের ভিত্তিতে তো কোনো ব্যবস্থা চলতে পারে না, বিশেষ করে যার সঙ্গে অধিকার জড়িয়ে আছে। শিক্ষার অধিকার যে সাংবিধানিক অধিকার তা কতজনের মনে আছে অবশ্য বলা মুশকিল। মুখ্যমন্ত্রীর আবেদনে সাড়া দেওয়া বা দেওয়া ঐচ্ছিক। কিন্তু স্কুলশিক্ষা তো ঐচ্ছিক হতে পারে না।
আরো পড়ুন এসএসসি: অপরাধীদের বাঁচাতে নিরপরাধদের বিপদে ফেলা হল
রাজনীতির অন্যতম প্রধান কাজ হওয়া উচিত জনস্বার্থ রক্ষা করা। চাকরি যাওয়া শিক্ষকদের মধ্যে যোগ্যদের জন্য আন্দোলন করা যেমন রাজনৈতিক দলগুলির কাজ, তেমনই স্কুলশিক্ষার অন্যতম অংশীদার ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ার যাতে ক্ষতি না হয় তার জন্যও আন্দোলন করা উচিত। একদিকে মুখ্যমন্ত্রী চাকরিহারা মাস্টার ও শিক্ষাকর্মীদের স্কুলে গিয়ে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে বললেন, অন্যদিকে বুধবার জেলাভিত্তিক আন্দোলনে নেমে রাজ্য পুলিসের হাতে তাঁরা মার খেলেন। এভাবে এই সংকট কী করে কাটবে?
অল্প কিছু জায়গায় সাড়া পাওয়া গেলেও বেশিরভাগ জায়গায় স্বেচ্ছাশ্রমের আহ্বান সাড়া ফেলবে বলে মনে হয় না। মনে রাখতে হবে, কোন মাস্টার যোগ্য আর কে অযোগ্য তা বোঝা না গেলেও সমস্ত ছাত্রছাত্রীই কিন্তু যোগ্য, এবং সঠিক শিক্ষা পাওয়ার অধিকার এদের প্রত্যেকের আছে। আজ যদি সরকার এ বিষয়ে উদাসীন থাকে, অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলি যদি এ বিষয়ে চুপ থাকে, বিশেষ করে বাম দলগুলি, তাহলে শহুরে এবং মফস্বলের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণি বাধ্য হবে তাদের ছেলেমেয়েদের জন্য মহার্ঘ শিক্ষা বেসরকারি বিদ্যালয় থেকে কিনতে। বস্তুত তাতে স্কুলছুটের সংখ্যা বাড়বে, অনেকের লেখাপড়াই বন্ধ হয়ে যাবে। তাদের লেখাপড়ার করার বয়সে প্রবাসী বা অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক হয়ে যাওয়ার দায় তখন কিন্তু কেবল ব্রাত্য বসু বা সরকারের উপর চাপবে না। বিরোধীরা, বিশেষ করে বামেরা, নিজেদের দায় অস্বীকার করতে পারবেন না।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







