অর্ক মুখার্জি

সকলেই জানেন যে পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু, সাংবাদিক সম্মেলন করে, ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আয়োজিত স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা ঘিরে বিভিন্ন আইনি জটিলতা, বিক্ষোভ, সমালোচনার দায় পুরোপুরি বিরোধীদের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন। তাঁর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ – আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস যাতে শিক্ষক নিয়োগ করে কোনো সুবিধা করতে না পারে, তাই নিয়োগ বানচাল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিরোধীরা।

ব্রাত্যবাবু বাম আমলে ‘বিদ্বজ্জন’ বলে পরিচিত ছিলেন। শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার অনেক আগে তিনি নাট্যকার হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এবং আজও রাজনৈতিক বৃত্তের বাইরে সংস্কৃতি জগতের লোক হিসাবে তাঁর আলাদা সম্মান এবং প্রভাব প্রতিপত্তি আছে। সুতরাং ব্রাত্যবাবুর স্মৃতি আশা করি দুর্বল নয়। আমরা স্মৃতির সরণি বেয়ে কয়েক বছর আগে ফিরে যাই।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

২০১৬ সালের যে এসএসসি পরীক্ষা ঘিরে এত বিতর্ক, এত প্রশ্ন এবং প্রথমে হাইকোর্ট, পরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে নিয়োগ সম্পূর্ণ বাতিল হয়েছে, সেবছর মে মাসে দ্বিতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় এসেছিল তৃণমূল। তখনকার প্রধান বিরোধী, অর্থাৎ বাম-কংগ্রেস জোট, দ্বিতীয় হয়েছিল অনেকখানি পিছিয়ে থেকে। ওই জোটে প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছিল কংগ্রেস – ৪৪ আসন নিয়ে। সিপিএম পেয়েছিল ২৬ আসন, ফরওয়ার্ড ব্লক দুই, আরএসপি তিন এবং সিপিআই এক। বাংলার মানুষের প্রবল সমর্থন নিয়ে ২১১ আসন পেয়ে, অর্থাৎ ২০১১ সালের থেকেও ২৭ আসন বেশি পেয়ে, উন্নয়নের বার্তার উপর ভিত্তি করে ক্ষমতায় এসেছিল তৃণমূল। এখনকার বিরোধী দল বিজেপি সেবার পেয়েছিল তিনটে আসন। ব্রাত্যবাবু ২০১১-২০১৪ শিক্ষামন্ত্রী থাকলেও, তখন পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে ওই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তখনকার বিভিন্ন শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মী নিয়োগের পরীক্ষায় জালিয়াতি, দুর্নীতি, টাকার বিনিময়ে চাকরি পাইয়ে দেওয়া, এমনকি করোনার সময়ে উৎসশ্রী প্রকল্পে বদলির বিনিময়ে টাকার অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। প্রসঙ্গত, শহরবিশেষে বদলির মূল্য কোথাও চার লাখ, কোথাও পাঁচ লাখ, আবার কোথাও সাত লাখ ছিল – এরকম বাতাসে বিস্তর উড়ে বেরিয়েছে।

একথা ঠিক যে ব্রাত্যবাবু সেইসময় শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন না। কিন্তু ব্রাত্যবাবু বা তাঁর দল এ বিষয়ে কি কিছুই জানত না, যেখানে একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে ক্ষমতায় ছিল তৃণমূল কংগ্রেস? শিক্ষামন্ত্রী পার্থবাবু একা একাই সমান্তরাল দুর্নীতির সিন্ডিকেট তৈরি করে দিলেন সবাইকে আড়ালে রেখে? হ্যারি পটার রচয়িতা জে কে রাউলিংও বোধহয় এরকম ভোজবাজির কথা লেখার সাহস করতেন না। পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ মানুষের কাছেও এটা কষ্টকল্পনা।

যা-ই হোক, ব্রাত্যবাবু শিক্ষামন্ত্রীর পদে ফিরে এলেন ২০২১ সালে। ফিরে আসার পর তাঁর শিক্ষা দফতর নিয়োগ ক্ষেত্রে আগের মন্ত্রীর আমলে হওয়া বিভিন্ন অন্যায়, বেআইনি পন্থা অবলম্বনে ইত্যাদির জন্য মামলায় জর্জরিত হল, তিনিও মোটামুটি সংস্কৃতি চর্চাকেই প্রাধান্য দিয়ে গেলেন। কৌশলী বার্তায় সব দায় চাপিয়ে দিলেন পূর্বসরির ঘাড়ে। তিনি সাদা পোশাকের স্বচ্ছ ব্যক্তিত্ব। চলছিল ভালোই। মাঝেমাঝে সংবাদমাধ্যমে আসতেন, কিছু বলতেন, আবার মঞ্চে ফিরে যেতেন। প্রাইমারি টেট দুবার আয়োজিত হয়েছে তাঁর সময়ে, নিয়োগ হয়নি। পরীক্ষার্থীরা কেবল নম্বর জানতে পেরেছেন, শংসাপত্র পেয়েছেন। এবারে ইন্টারভিউ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ও হ্যাঁ, ভোট আসছে।

এই মেয়াদে চার বছর এসএসসি ছাড়াও কাটছিল বেশ। মাঝে একবার একটা বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল স্কুল সার্ভিস কমিশন, তারপর আবার শীতঘুমে চলে গিয়েছিল। শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্যবাবু ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নীরব থেকেছেন। পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষকতার চাকরিপ্রার্থীদের কাছে এই মৌনতা কতটা যন্ত্রণাদায়ক, কতটা অস্থিরতার, কতটা হতাশাব্যঞ্জক – তা বোঝার মত সংবেদনশীলতা শিল্পী ব্রাত্যবাবু বোধহয় হারিয়ে ফেলেছেন রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায়। ডিসেম্বর আসছে। ‘ডিসেম্বরের শহরে’ বলে একটি গানের এক হৃদয়স্পর্শী লাইন হল ‘সব শীতের শেষে বসন্ত আসে না।’ তেমনই পশ্চিমবঙ্গের বঞ্চিত, অবহেলিত, স্বচ্ছ নিয়োগের দাবিতে রাস্তায় কাটানো, পুলিশের লাঠি খাওয়া চাকরিপ্রার্থীরা বসন্তের অপেক্ষায় থাকলেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় শীত কাটতেই চাইছিল না।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে স্কুল সার্ভিস কমিশন বাধ্য হল এসএসসি পরীক্ষার আয়োজন করতে। ব্রাত্যবাবু প্রথম থেকেই দাবি করছিলেন যে পরীক্ষা হবে স্বচ্ছভাবে। এমনই স্বচ্ছতার নমুনা যে, মামলার পর মামলা হল গেজেট প্রকাশের দিন থেকেই। পরীক্ষার পর এবং ফলাফল প্রকাশের পর বিভিন্ন বিষয়ে অস্বচ্ছতা, আইনভঙ্গ করা এবং কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগেও বিভিন্ন আদালতে মামলা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট প্রথমেই বলে দিয়েছিল – চিহ্নিত অযোগ্য প্রার্থীরা পরীক্ষায় বসতে পারবেন না। পরীক্ষা শেষে যখন ইন্টারভিউয়ের জন্য যাচাই তালিকা বের হল, তখন দেখা গেল, চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও একজনের নাম বিশেষভাবে সক্ষম তালিকায় রাখা হয়েছে। ব্রাত্যবাবু বললেন, ওটা এসএসসি-র ব্যাপার। সুপ্রিম কোর্টে যখন কমিশন এই পরীক্ষা নিয়ে ধমক খাচ্ছে, ব্রাত্যবাবু তখন পর্যবেক্ষণ আর রায়ের মধ্যে পার্থক্যের আইনি বিশ্লেষণ করছেন। দায় ঠেলছেন বিরোধীদের দিকে। বলছেন এই পরীক্ষার ফল বেরিয়ে নিয়োগ যাতে না হয়, তার জন্যে বিরোধীরা চক্রান্ত করছে।

কমিশন কেন অযোগ্যদের তালিকা দিতে এত গড়িমসি করল? কিসের জন্য চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও বিশেষভাবে সক্ষম কোটায় একজনের নাম উঠে গেল? ব্রাত্যবাবু কেন বলছেন, সাত লাখের মত ওএমআর ওয়েবসাইটে আপলোড করতে হলে ওয়েবসাইট ক্র্যাশ করতে পারে? সুপ্রিম কোর্ট প্রশ্ন তুলেছে, কমিশন কোন যুক্তিতে ২০১৬ সালের পরীক্ষার্থীদের একেবারে নতুন পরীক্ষার্থী হিসাবে পরীক্ষায় বসাল? শিক্ষা দফতর আর কমিশন তো পরীক্ষার আগে পর্যন্ত, চিহ্নিতরা যাতে আবার পরীক্ষায় বসার সুযোগ পায়, তার জন্য আদালতের দোরে দোরে ঘুরে ব্যর্থ হয়েই ফিরেছিল।

আরো পড়ুন নতুন বিজ্ঞপ্তিতে ফের বৈষম্যের শিকার কখনো চাকরি না পাওয়া প্রার্থীরা

সরকার ব্রাত্যবাবুদের, প্রশাসন ওঁদের, পরীক্ষা চালানোর দায়িত্বও ওঁদের। তবুও এত মামলা হল, বেনিয়মের অভিযোগ উঠল। এর দায় কি কেবল বিরোধীদের উস্কানির উপর চাপিয়ে দিয়ে খালাস পাওয়া যায়? ব্রাত্যবাবু সংস্কৃতি জগতের লোক। উনি নিশ্চয়ই জানেন যে যাত্রায় বিবেক বলে একটা চরিত্র থাকে। সে ন্যায়ের কথা বলে, অন্য চরিত্রগুলো নৈতিক বিচ্যুতি ঘটলে তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। বিরোধীদের উপর দায় চাপিয়ে দিয়ে হয়ত রাজনৈতিক ফায়দা হবে, কিন্তু বিবেকের কাছে কি পরিষ্কার থাকা যাবে?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.