অর্ক মুখার্জি

মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ঘোষণা মত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী নতুন করে স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে শিক্ষা দফতর। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ২০১৬ সালে আয়োজিত পরীক্ষার ফল অনুসারে তৈরি শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগের গোটা প্যানেল যে গত ৩ এপ্রিল বাতিল হয়ে গেছে তা সকলেই জানেন। কলকাতা হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট – এই মামলার রায় মোটের উপর সব জায়গায় একই থেকেছে। গতবছর ২২ এপ্রিল কলকাতা হাইকোর্ট যখন প্রথমবার ২৫,৭৫৩ জন শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিল করে, সেই নির্দেশকে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করার সময়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি চাকরিহারাদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, তিনি কাউকে কারোর চাকরি খেতে দেবেন না। এই বক্তব্যের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা অবশ্যই ছিল, কারণ বাংলায় লোকসভা ভোট শুরু হয়েছিল ১৯ এপ্রিল, দ্বিতীয় দফার ভোটদান ছিল ২৬ এপ্রিল। অর্থাৎ প্রথম দফা এবং দ্বিতীয় দফার ভোটের মাঝে এই রায় ঘোষিত হয়। ফলে তৃণমূল প্রধান হিসাবে সেই পরিস্থিতিতে পাশে থাকার বার্তা দিয়ে সেই মুহূর্তে সম্ভাব্য চাকরিহারাদের বিক্ষোভ অন্তত তখনকার মত প্রশমিত করতে ওই বক্তব্য জরুরি ছিল। সেই মুহূর্তে জেলায় জেলায় বিক্ষোভ কর্মসূচি সংগঠিত হলে তৃণমূলের নির্বাচনী ফলাফলে যে তার প্রভাব পড়তে পারত তা বলাই বাহুল্য।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

তারপর এক বছর ধরে ওই মামলার শুনানি চলেছে সুপ্রিম কোর্টে। কুড়িবার শুনানি এবং ৪০০ আইনজীবীর যুক্তি-প্রতিযুক্তি শোনার পর সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্না এবং বিচারপতি সঞ্জয় কুমার গোটা প্যানেল বাতিলের রায় দেন। চাকরিহারাদের অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্ট বারবার যোগ্য, অযোগ্যদের আলাদা তালিকা দিতে বললেও এসএসসি তা পেশ করেনি। ফলে গোটা প্যানেল বাতিলের রায় দিতে বাধ্য হয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। রায়ে আদালত বলেই দিয়েছে যে ইতিমধ্যেই দাগি (‘tainted’) হিসাবে চিহ্নিত ব্যক্তিরা ফের পরীক্ষায় বসতে পারবেন না। বাকি চাকরিহারারা পারবেন এবং পরীক্ষায় পাশ করে আবার চাকরিতে যোগ দিতেও পারবেন।

এখন প্রশ্ন হল, এসএসসি আদালতে কিছুতেই যোগ্য-অযোগ্যের তালিকা দিল না কেন? চাকরিহারাদের অনেকের মতে, অযোগ্যদের বাঁচাতে বা আড়াল করতেই এই ইচ্ছাকৃত লুকোচুরি খেলা হয়েছে। মামলার রায় বেরিয়ে যাওয়ার পর কিন্তু এসএসসি দাবি করেছে তাদের কাছে তালিকা আছে। চাকরিহারা শিক্ষকরা বারবার আন্দোলন করেছেন, বিকাশ ভবন ঘেরাও কর্মসূচি নিয়েছেন এবং এখনো অবস্থান বিক্ষোভ চলছে। দাগি নন এমন শিক্ষকদের বড় অংশ কোনোমতেই আবার পরীক্ষায় বসতে রাজি নন। তাঁদের মতে, তাঁরা যোগ্যতার প্রমাণ একবার দিয়েছেন, পরীক্ষায় পাশ করেছেন এবং সেই সুবাদে চাকরিও পেয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে সরকার কিন্তু রিভিউ পিটিশনের আশ্বাস দেওয়া ছাড়া এঁদের জন্যে কিছুই করে উঠতে পারেনি। গত ৭ এপ্রিল মুখ্যমন্ত্রী নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে প্রচুর আশ্বাসবাণী শুনিয়েছিলেন, আইনিভাবে তাঁদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছিলেন। যদিও চাকরিহারাদের স্বার্থরক্ষা করার মত সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব তিনি সেদিনও দিতে পারেননি।

শেষপর্যন্ত গত ২৭ এপ্রিল (মঙ্গলবার) মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিক সম্মেলন করে জানান যে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি জারি হতে চলেছে। সত্যি কথা বলতে, তিনি আগে যা-ই বলে থাকুন, তাঁর সরকারের সামনে আর কোনো রাস্তা খোলা ছিল না। তিনি অবশ্য বলেছেন, রাজ্য সরকার রিভিউ পিটিশন দায়ের করেছে। তাতে সদর্থক রায় পেলে শিক্ষকদের আর পরীক্ষায় আর বসতে হবে না। আরও কিছু কথা বলেছেন। প্রশ্ন জাগে, সেগুলোর বাস্তব ভিত্তি কতখানি?

তিনি বলেছিলেন, চাকরিহারা শিক্ষকদের অভিজ্ঞতার জন্য নতুন বিজ্ঞপ্তিতে কিছু ছাড় দেওয়া যায় কিনা তা ভেবে দেখছেন। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, ছাড় দেওয়াও হয়েছে।

এই ছাড় নিয়ে প্রশ্ন তোলার জায়গা আছে। অবৈধ বলে যে চাকরি বাতিল হয়ে গেছে, সেই চাকরি করার অভিজ্ঞতা কী করে গণ্য হতে পারে কোনো পরীক্ষা পাশের মাপকাঠি হিসাবে? এই দুর্নীতির জন্য যাঁরা আদৌ চাকরি পাননি, তাঁরাও তো বঞ্চিত। অথচ এই নতুন বিজ্ঞপ্তিতে তাঁরা আবার বৈষম্যের শিকার হলেন। যাঁরা চাকরি পেয়েছিলেন, তাঁরা এতদিন পড়ানোর জন্য আলাদা নম্বর পাবেন, আর যাঁরা দুর্নীতির কারণে চাকরি পাননি সেইসময়, তাঁদের পিছিয়ে থাকতে হবে।

মুখ্যমন্ত্রী আরও একটা কথা বলেছিলেন যা এক অর্থে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেবে। বলেছিলেন, যাঁদের টাকা ফেরত দিতে বলা হয়েছে এবং কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী যাঁরা নতুন করে পরীক্ষায় বসতে পারবেন না, তাঁরা অন্য সরকারি বিভাগে যোগ দিতে পারেন। তাঁর দাবি, কোর্টের রায়ে নাকি এরকম বলা আছে। অথচ সুপ্রিম কোর্ট মোটেই এমন কোনো নির্দেশ দেয়নি। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যখন টাকা দিয়ে চাকরি কেনা ব্যক্তিদের মদত দিয়ে এমন কথা বলেন তখন আশ্চর্য হতে হয়। আবার এই মুখ্যমন্ত্রীই কিন্তু রাজ্যের শিক্ষিত বেকারদের চপ, তেলেভাজা, ঘুগনি ইত্যাদি বিক্রি করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন নিয়মিত। তাহলে আদালত যারা অসদুপায়ে চাকরি পেয়েছে বলে রায় দিয়েছে, তাদের চাকরি রক্ষার দায় কেন নিজের ঘাড়ে নিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী?

আরো পড়ুন নিয়োগ দুর্নীতি: বাংলার যুবসমাজের সামনে কোনো আশার আলো নেই

এসএসসি দুর্নীতি যে প্রাতিষ্ঠানিক তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। নেতা, মন্ত্রী, আমলা থেকে সরকারি আধিকারিক, এঁদের শাগরেদ, দালাল – অনেকেই যুক্ত। অনেকে জেলে গেছেন, কেউ কেউ বাইরে আছেন। অনেকের নাম প্রকাশ্যে এসে পড়েছে, অনেকে সবকিছু ‘ম্যানেজ’ করে এখনো ভেসে বেড়াচ্ছেন। মুখ্যমন্ত্রী অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। তিনি আইন জানেন না এমনটা হতে পারে না। তিনি জানেন যে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর নতুন নিয়োগের ব্যাপারে তাঁর সরকারের বা এসএসসির হাত-পা বাঁধা। তাঁর চিহ্নিত অযোগ্যদের আগলে রাখার এইসব প্রচেষ্টা এই দুর্নীতির ফলে আদৌ চাকরি না পাওয়া ২০১৬ সালে পরীক্ষা দেওয়া প্রায় ২২ লক্ষ ছেলেমেয়ের জন্য হতাশার, লজ্জার, ভয়ের, এবং আশঙ্কার। দশ বছর ধরে বহু শিক্ষিত ছেলেমেয়ে বঞ্চনা ভোগ করছে, অনেকের অনেক স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। তবু তারা আজও শিক্ষকতা করার স্বপ্ন দেখে, অনেক কষ্ট করে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তার জন্যে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের রায় তাদের সামনে আবার রাস্তা খুলে দিয়েছে। সে পথ কঠিন, পিচ্ছিল এবং পাথুরে হলেও তারা জেদি, দৃঢ় এবং একগুঁয়ে মনোভাব নিয়ে সে পথে হাঁটতে চলেছে। সরকারের কোনো দায় থাকলে থাকা উচিত এঁদের প্রতি। দায় থাকা উচিত, যেসব যোগ্য প্রার্থী এসএসসি যোগ্য-অযোগ্যের তালিকা না দেওয়ায় চাকরি হারিয়েছেন তাঁদের প্রতি, ঘুষ দিয়ে চাকরি কেনা প্রার্থীদের প্রতি নয়।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.