রেডিওর সান্ধ্য খবরে ঘোষণা হল, “মাধ্যমিকে প্রথম হয়েছেন রাজিবুল ইসলাম।” সেটা ২০০০ সালের কথা। স্থানীয় সংবাদের পর মা খুব খুশি হয়ে বললেন, “এবার হলদিয়ার একটা মুসলিম ছেলে ফার্স্ট হয়েছে রে আব্বু।” রাজিবুল ইসলামের ‘মুসলিম’ পরিচয়টা সেই শৈশবেই ভাবিয়েছিল। বুঝিয়েছিল মুসলিমরাও এভাবে সফল হতে পারেন। মেধা তালিকায় জায়গা করে নিতে পারেন। মহাকাশ গবেষণার ইচ্ছে নিয়ে বাঁচতে পারেন। রাজিবুলের ধর্মীয় পরিচয় নাম ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবে মানুষ জানতে পারেন। মধ্যশিক্ষা পর্ষদকে আলাদাভাবে “ও মুসলিম” বলে চিনিয়ে দিতে হয়নি। নাম এবং স্কুলের উল্লেখ না করে এভাবে “ও মুসলিম” দাগিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বিপজ্জনক। এই কারণেই ‘মুসলিম’ পরিচয় খুঁচিয়ে ভোট ব্যাংক প্রভাবিত করার কৌশল নিন্দনীয়। যেটা বর্তমান সরকার ধারাবাহিকভাবে করছে। রাষ্ট্রও আজকাল পোশাক দেখে ধর্ম চিনছে। ধর্ম দিয়েই পৃথক করছে। অপদার্থতা ঢাকছে৷ ভোট চাইছে। আমাদের সবাইকে জোড়ার কাজটা করতে হবে। মানুষ দিয়ে মানুষ জুড়তে হবে।

অতীতে মাধ্যমিকের মেধা তালিকায় উঠে এসেছিলেন মুর্শিদাবাদের আরিফ শেখ। আল আমিন মিশনের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাঁর সাফল্যের প্ল্যাটফর্ম গড়ে দিলেও আরিফের পরিবারের আর্থিক অবস্থা ছিল খুবই সাধারণ। এলাকার অনুন্নয়ন, অশিক্ষার সঙ্গে লড়াই করে উঠে আসা বোঝাতে কখনোই ‘মুসলিম’ শব্দটির উল্লেখ করতে হয়নি। কান্দি থানার হাটপাড়া গ্রাম পরিচিত ছিল ‘ক্রিমিনালদের গ্রাম’ হিসাবে। সেই গ্রামের ছেলের সাফল্যের খবরের হেডলাইন হয়েছিল ‘টালির ঘরে চাঁদ।’ এরপর বিভিন্ন সময়ে রাজিবুল এবং আরিফের অসমাপ্ত লড়াইয়ে শরিক হয়ে সংখ্যালঘু পরিবারের ছেলেমেয়েরা মেধা তালিকায় উঠে এসেছেন। উচ্চমাধ্যমিকে দ্বিতীয় হয়েছেন কাকদ্বীপের মহম্মদ মাসুম আখতার। কয়েকটি ক্ষেত্র বাদ দিলে দেখা যাবে অধিকাংশ ছেলেমেয়ে খুব সাধারণ পরিবারের। যেখানে দুমুঠো ভাত জোগানোর লড়াই দিয়ে দিন শুরু হয়, তারপর বইখাতা কেনার খরচ, গৃহশিক্ষকের মাইনে, স্কুলের ফি জমা দিতে পারা না পারার আশঙ্কা ঘিরে থাকে। দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে প্রতিভা থাকলেও প্রয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ না পাওয়ার আক্ষেপ। পড়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো ঘরই নেই। কিছু বছর আগেও হ্যারিকেনের আলো সম্বল ছিল। ছাত্রীদের ক্ষেত্রে লড়াইটা আরও কঠিন। অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার তোড়জোড়, মেয়েদের পড়ানোর প্রতি অনীহা, হিজাবে মুড়ে রেখে বাড়ির বাইরে বেরোতে না দেওয়া রক্তচক্ষুর সামনে শিক্ষাকে ঢাল করে এগোতে হয় তাঁদের। তাই এই সাফল্য অবশ্যই বাড়তি কৃতিত্ব দাবি করে। এবার উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম স্থান অর্জন করা রুমানার পরিবার আর্থসামাজিক দিক থেকে অনেক এগিয়ে। তাই তাঁর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা কম থাকলেও মুর্শিদাবাদ সহ অন্যান্য জেলার সংখ্যালঘু মেয়েদের প্রবল সংগ্রাম করে উঠে আসতে হয়। এই অসম অবস্থান থেকে যাঁরা সফল হচ্ছেন তাঁরা লড়াই করে উঠে আসাটা কাজের মাধ্যমে তুলে ধরবেন। অন্যদের উঠে আসার রাস্তা তৈরি করে দেবেন। অহেতুক হিন্দু-মুসলমান করার দরকার আছে কি? তাতে বিদ্বেষ বাড়বে। ধর্মপরিচয় দিয়ে কারো লড়াইকে বোঝাতে হবে কেন! সেটা তুলে ধরার অনেক রাস্তা আছে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কৌশলে ব্যবহৃত রাজনৈতিক ‘ইনশাল্লা-সুভানাল্লা’ রাজনৈতিক ‘জয় শ্রীরাম’-কে ধীরে ধীরে প্রাসঙ্গিক করেছে৷ বিদ্বেষ বাড়িয়ে নাগপুরকেন্দ্রিক ধর্মীয় বিদ্বেষের রাজনীতির পথ সুগম করেছে। ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষ ক্ষতিগ্রস্ত করছে ‘বাঙালি’ পরিচয়কে। ‘ওরা কবে বাঙালি হল?’ প্রশ্ন কিন্তু এতকাল এত সংগঠিতভাবে ওঠেনি। মাসুদুর রহমান বৈদ্য, রহিম নবি, মীর আফসার আলিদের ‘মুসলিম’ হিসাবে তুলে ধরার খুব প্রয়োজন পড়েনি।

অহেতুক ‘মুসলিম’ উল্লেখটা একসময় অন্য ন্যারেটিভ তুলে ধরবে। মানতে না চাইলে মানবেন না, কিন্তু এটাই সত্যি। সমাজের সর্বস্তরে আরোপিত ‘মুসলিম’ শব্দটি যোগ করলে কী হবে ভাবুন! সংখ্যালঘু মহিলাদের নিয়ে ছবি বানিয়ে জাতীয় পুরস্কার পেলেন ‘মুসলিম’ ফারহা খাতুন। পোশাক বিতর্ক মুছে ডাবলসে খেতাব জিতলেন ‘মুসলিম’ সানিয়া মির্জা। মুর্শিদাবাদের সংখ্যালঘু ছাত্রীদের শিক্ষা বিস্তারে অনন্য নজির রেখে চলেছেন ‘মুসলিম’ শিক্ষিকা মুর্শিদা খাতুন। অথচ তাঁদের পরিচয় ‘মুসলিম’ না হয়ে শুধু মানুষ হতে পারত। এদেশে মহিলারা প্রত্যেকেই নিজের লড়াই লড়ছেন। যত হিন্দু-মুসলমান হবে সেটা বিদ্বেষের রাজনীতির আগুনে পেট্রোলের সঞ্চার করবে। ‘মানুষ’ হিসাবে বাঁচলে বিভেদটা সহজ হবে না। ‘মানুষ’ পরিচয়ে বাঁচাটা মানব সভ্যতার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ।

সাম্প্রতিক অতীত ঘাঁটলে দেখা যাবে সরকার ‘মুসলিম’ শব্দটির ব্যবহার করে ভোটব্যাংক সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করেছে বহুবার। সংখ্যালঘু উন্নয়ন করার চেয়ে মুসলিমদের ‘মসীহা’ প্রমাণের চেষ্টা বেশি। ‘মুসলিম’ করে রাখার উদ্যোগ সর্বত্রই। ‘মানুষ’ হলেই ভাগাভাগি করায় সমস্যা হবে। ‘মুসলিম’ শব্দটিকে কেন্দ্র করে মূলত দুই ধরনের রাজনীতি হচ্ছে। ১. “মুসলিম ভাইদের জন্য এই করেছি, ওই দিয়েছি…।” ২. “মুসলিমদের সব দিয়ে দিল। ইসলামিকরণ হয়ে গেল।”

স্বাধীনতার এত বছর পরও সংখ্যালঘুরা পিছিয়ে আছেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্রাত্য এবং বঞ্চিত। কিছু ক্ষেত্রে বিদ্বেষের শিকার। সেই সূত্র ধরেই পিছিয়ে থাকা মানুষদের তুলে আনতে হবে। ‘মানুষ’ শব্দটায় জোর দেওয়া দরকার। হিন্দু-মুসলমান লাইনে খেলাটা অবিলম্বে থামানো জরুরি। নইলে পাল্টা খেলাটা আরও ভয়ঙ্কর হবে। বিদ্বেষের রাজনীতির পূজারীরা বলতে থাকবেন, “যারা হাসপাতালে নার্সের পেটে লাথি মারে, নোট জাল করে, শিরশ্ছেদের ফতোয়া দেয়, জঙ্গি কার্যকলাপ চালায় তারাও তো মুসলিম। সেগুলোও বলুন।” তখন কী হবে? রাজনৈতিক মুসলিমের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হবে আরেকজন রাজনৈতিক হিন্দুকে। যেখানে বৈরিতা অনিবার্য। ছাত্রীর ‘মুসলিম’ পরিচয় তুলে ধরার তাৎক্ষণিক ফলশ্রুতি হিসাবে উচ্চমাধ্যমিকে ফেল করা স্টুডেন্টদের পথ অবরোধের খবরের কমেন্ট বক্সে কেউ লিখে আসছেন, “তোমরা মুসলিম হলে ফেল করতে হত না বোন। ঠিক পাশ করিয়ে দেওয়া হত।” এই ভুল বার্তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চালিত হবে। হতে বাধ্য।

সিএএ-র প্রতিবাদে ভিটেমাটি থেকে বিতাড়িত হওয়ার ভয়ে যে সংখ্যালঘু মানুষগুলো প্রতিবাদ করেছিলেন, তাঁদের পরিচয়কে শুধু ‘মুসলিম’ করে রাখা যায়? বিরোধী ন্যারেটিভ এসেছিল “এসব মানুষের লড়াই টড়াই কিছু না। শুধু মুসলিমরা ঝামেলা করছে।” এজন্যই অপ্রয়োজনীয় ‘মুসলিম’ শব্দের ব্যবহার দেশের বর্তমান পরিস্থিতির নিরিখে ক্ষতিকর।

অনেকেই ‘মুসলিম’ শব্দটির ব্যবহার কেন প্রয়োজন সে বিষয়ে মতামত জানিয়েছেন। সভ্যতার প্রয়োজনে ভিন্ন মত থাকা উচিত। কিন্তু তারপরও কয়েক হাজার পাতার ফিরিস্তি লিখলেও সত্যিটা বদলাবে না। সাংবাদিকদের সামনে সংসদ সভাপতি রুমানাকে তুলে ধরেননি। শুধু ধর্মপরিচয়, অর্থাৎ ‘মুসলিম’-টাকে তুলে ধরেছেন। তিনবার শুধু ‘মুসলিম’ কথাটা ব্যবহার করেছেন। যেখানে রুমানা শুধু একজন ‘মুসলিম।’ এতবড় সাফল্যের পরও নামহীন, মুখহীন। এই মারাত্মক ভুলের কোনও জাস্টিফিকেশন হতে পারে না। রুমানার বিবৃতির পর ভুলটাকে আর ডিফেন্ড করার দরকার নেই সম্ভবত। তিনি জানিয়েছেন, ‘বিতর্ক চান না। তবে ‘মুসলিম’ নয়, ‘ছাত্রী’ পরিচয়েই তিনি খুশি হতেন।’ সংসদের দুঃখপ্রকাশ করা উচিত৷ কারো নাম মনে রাখার প্রয়োজন বোধ না করা, পর্ষদের ওয়েবসাইট থেকে নাম দেখে নিতে বলা আসলে সংশ্লিষ্ট ছাত্রীটির প্রতি নির্লজ্জ অসম্মান প্রদর্শন। তাঁর কষ্টার্জিত সাফল্যকে অসম্মান। এটাকে ডিফেন্ড করা যায় না।

এই ‘মুসলিম’ পরিচয়কে আবার ধর্মীয় পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করার চেষ্টাও হচ্ছে। একজন বেশ উচ্চস্তরের তথাকথিত শিক্ষিত সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দিয়েছেন, “রুমানাকে নিয়ে আপত্তির জায়গাটা এটাই যে সে প্রকৃত মুসলিম নয়। মিডিয়ার সামনে টি-শার্ট পরে আছে, মাথায় ঘোমটা নেই। তার মায়ের মাথাতেও কাপড় ছিল না।”

প্রথমে সারকাজম ভেবে ভাল লাগছিল। পরে দেখা গেল সিরিয়াসলি লিখেছেন। কিছু ‘ধর্মের ষাঁড়’ গলা মেলাচ্ছেন। কার্যত “রেখেছ মোসলমান করে মানুষ করোনি।”

ধর্মীয় রাজনীতির প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়েছিল ‘দুধেল গাই’ শব্দ। এই শব্দের টিটকারি একটি ধর্মের মানুষকে আরও কয়েক প্রজন্ম শুনতে হবে। কী তীব্র অপমান রয়েছে এই আক্রমণে তা উপলব্ধি করতে সেই পরিস্থিতিতে আসতে হবে। যুক্তি বা যোগ্যতায় পেরে উঠলে না বাসে-ট্রেনে, কর্মস্থলে, সোশ্যাল মিডিয়ায়, মন্ত্রীর প্রত্যুত্তরে থাকে এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করে আক্রমণ। এরপর সফল হলেও সাফল্যে জুড়ে দেওয়া হবে, “মুসলিম বলেই হতে পেরেছে” -র অদৃশ্য খাদ। মেধা, পরিশ্রম ইত্যাদি চাপা দেওয়া হবে ধর্মের মোড়কে। তাই নিছক ‘মুসলিম’ পরিচয়ে মহৎ হওয়ার দরকার নেই, আবার ‘মুসলিম’ পরিচয়ের কারণে সাফল্যকে খাটো করার রাস্তা খোলা রাখারও দরকার নেই। ধর্মপরিচয় থাক ধর্মপালনে। ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাসের নিজস্ব গণ্ডীতে। নইলে আজমল কাসভের ‘মুসলিম’ হওয়ার দায়টাও সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলিমকে অলিখিতভাবেই নিতে হবে। নিতে বাধ্য করা হবে। খুব বেদনাদায়ক হলেও এদেশে এটাই সত্যি।

রুমানার মতো মেয়েরা ধর্মপরিচয় দিয়ে নয়, নিজ সাফল্যের মাধ্যমে উদাহরণ হবেন। রুমানার সাফল্যের সঙ্গে উল্লেখ থাক, কিছুদিন আগেও যে জেলায় কোনও বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, সেই জেলা থেকে উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম হয়েছেন তিনি।

‘ভোটব্যাংক’ করে রাখার রাজনৈতিক চেষ্টা ব্যর্থ হোক। আমাদের আরও অনেক রুমানাদের তুলে আনতে হবে। রুমানারা গবেষণা করবেন, লিখবেন, গাইবেন, আঁকবেন, রাজনীতি করবেন, মহাকাশে যাবেন, অলিম্পিক মেডেল আনবেন, ছবি বানাবেন, সংকীর্ণতা এবং ধর্মীয় রাজনীতির কফিনে পেরেক পুঁতবেন। ধর্মীয় পরিচয়ের উর্ধ্বে উঠে কর্মের মাধ্যমে ইতিহাস লিখতে হবে।

1 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.