ভবতারণ কুমার

মৃতদেহ দাহ করে শিবন মেথর চিৎকার করতে করতে রাঁচি জেলের দিকে দৌড়ে আসছে ‘উলগুলানের শেষ নাই, বিরসা ভগবানের মরণ নাই।’

শিবনের আকুতি ভরা চিৎকার রাঁচি জেলের দেওয়ালগুলো ভেঙে খানখান করে দিতে চাইছে। যেন বলতে চাইছে তোমরা পারোনি, পারবেও না। যার নাম মুছে ফেলতে, যার জীবন শেষে করে দিতে নিখুঁত চিত্রনাট্য মঞ্চস্থ করল জেল কর্তৃপক্ষ, জমিদার, কোম্পানি, তাকে কিন্তু শেষ করা গেল না। সমস্ত ষড়যন্ত্র, সমস্ত পরিকল্পনা ব্যার্থ হয়ে গেল। জেলের অভ্যন্তরে সহজ সরল উলগুলানের বীর যোদ্ধাদের মধ্যেও প্রতিধ্বনিত হতে থাকল শিবনের বলা কথাগুলো। শুধু কি জেলের ভিতর? না। ভিতরে বাইরে, সমগ্র ছোটনাগপুর জুড়ে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে থাকল, এবং গত ১২৫ বছর ধরে প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে সেই চিৎকার। যা শুনে জেল সুপারিনটেনডেন্ট রাগে, ক্ষোভে, পরাজয়ের জ্বালায় টেবিলে ঘুঁষি মেরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলেছিলেন ‘Birsa… Birsa… hell with your Birsa. An uneducated, uncultured person…disgusting। তথাকথিত অশিক্ষিত, অসংস্কৃত বিরসাকে মুছে ফেলতে সেদিনও যেমন চেষ্টার ত্রুটি ছিল না, আজও নেই। যত তাঁকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে, তত তিনি মানুষের মনে গেঁথে গিয়েছেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আজ বিরসা শুধুমাত্র একটা নাম নয়, বিরসা মানে একটা চেতনা। বিরসা মানে ছোটনাগপুর, বিরসা মানে জল জঙ্গল জমি, বিরসা মানে অনুপ্রেরণা, শপথের উচ্চারণ, চেতনায় শান দেওয়া।

ছটু আর নগুর নামাঙ্কিত ছোটনাগপুর অঞ্চলে তাদেরই বংশধররা জমিদারের খাজনা আর মহাজনের ঋণ শোধ করতে পারেনি বলে গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হতে হয়েছিল। এইরকম ঋণের দায়ে ১৮৭৫ সালে সুগনা মুন্ডা কারমি মুন্ডাকে খুঁটি থানার উলিহাতু গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয়ে আশ্রয় নিতে হয় বামবা গ্রামে। সেই বছরেরই ১৫ নভেম্বর জন্ম হয় বিরসার। গোটা ছোটনাগপুর অঞ্চল জুড়ে জমিদারের খাজনার জাঁতাকল আর মহাজনের ঋণের নাগপাশে ছটফট করতে থাকা অসহায় মানুষগুলো ভেবে কূলকিনারা করতে পারেনি কেন এমন হল। তাদের বাপদাদারা জঙ্গল কেটে, পাথর ভেঙে হিংস্র জন্তু জানোয়ারের সঙ্গে লড়ে গ্রাম পত্তন করল, আবাদি জমি তৈরি করল। বিরূপ প্রকৃতি তাদের রক্তে, ঘামে সরস হয়ে উঠল। তারপরেও তাদের পেটে দানাপানি নেই, অন্ধকারে আলো জ্বালানোর তেল জোটে না। উপরন্তু জমিদারের চাবুক, মহাজনের শাসানি সহ্য করতে হয়। কেন? এই নিদারুণ শোষণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভ, যা এই শোষণকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। ১৮৬৯ সালের জুলাই মাসে ক্যালকাটা রিভিউ লেখে ‘… when the oppressor wants a horse the Kol must pay; when he desires a palki, the Kols have to pay and afterwards bear him therein. They must pay for the musicians, for his milch cows, for his pan. Does someone die in his house? He taxes them. Is a child born? Again a tax. Is there a marriage or puja? A tax. Is the thikadar found guilty at ‘cutchary’ sentenced to be punished? The Kol must pay the fine…And this plundering, punishing, robbing system goes on till the Kols run away.’

কেন? তার উত্তর বিরসাও জানেন না। কিন্তু এই প্রশ্ন তাঁকে বারবার ধাক্কা দেয়। চাইবাসা মিশনে পড়ার সময়েই তিনি জানতে পারেন ইউরোপের কৃষকদের কথা। তাদের এত বিপুল পরিমাণ খাজনা দিতে হয় না। আমাদের দিতে হবে কেন? এর উত্তর কেউ দিতে পারেনি, এমনকি তাঁর প্রাণের বন্ধু অমূল্যও নয়। এই জিজ্ঞাসা শতগুণ বেড়ে যায় যখন সর্দার আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে ফাদারের কুৎসার প্রতিবাদ করে মিশন স্কুল থেকে বিতাড়িত হয়ে জমিদারের খাস নায়েব আনন্দ পাঁড়ের ঘরের কাজে যোগ দেন বিরসা। সেইসময় জমিদার জগদীশ সাউয়ের অন্দরমহলে তাঁকে যেতে হত। সেখানে তিনি দেখেছেন অর্থের প্রাচুর্য, সম্পদের পাহাড় আর খাদ্যের অপচয়। অন্যদিকে না খেতে পাওয়া মানুষের হাহাকার। অশান্ত অস্থির বিরসার প্রশ্নের উত্তর মেলেনি, মন আরও চঞ্চল হয়ে ওঠে। কিছুই যেন তাঁর ভাল লাগে না। এমন সময় নতুন জঙ্গল আইন বলবৎ হয়। তাতে বলা হয়

ক) জঙ্গলের কাট, পাত, ফলমূলে হাত দেওয়া বন্ধ।
খ) জঙ্গলের ভেতর গোচারণ বন্ধ। এর অন্যথা হলে জেল, জরিমানা দুটোই হবে।

এই আইন জঙ্গলনির্ভর ছোটনাগপুর অঞ্চলের মানুষের দুর্দশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। বিরসা কয়েকশো মানুষকে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গল অফিস ঘেরাও করেন, প্রবল বচসা হয়। ফিরে আসেন চালকাদে। নিজের চোখে দেখেন মানুষের যন্ত্রণা, চোখের জল, বনদেবীর দীর্ঘশ্বাস। অস্থির বিরসা পথ খুঁজতে খুঁজতে একদিন পথ খুঁজে পান, দেখতে পান মুক্তির দিশা। কিন্তু সে পথে হেঁটে মুক্তি পেতে প্রয়োজন বিরাট শক্তির। গড়ে তুলতে হবে মানুষের ঐক্য। হাড়িয়ার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা শতধাবিভক্ত মানুষকে এক সুতোয় বাঁধতে নতুন আর্দশ, নব চেতনার জন্ম দেন বিরসা, যা বিরসাইত নামে খ্যাত।

তিনি বললেন

ক) বিভিন্ন বঙা নয়, এক বঙা। অর্থাৎ সিং বঙার পূজা করতে হবে।
খ) হাড়িয়া বা যে কোনো ধরনের নেশা করা নিষিদ্ধ।
গ) চুরি করা চলবে না।
ঘ) মিথ্যা কথা বলা চলবে না।
ঙ) বিরসাইতরা একে অপরের অতি আপনজন, ভাই ভাই।

গোটা ছোটনাগপুরকে নবচেতনায় উদ্বুদ্ধ করে এক সুতোয় বাঁধলেন। রোগে, শোকে আক্রান্ত মানুষের সেবায় দলবল নিয়ে এগিয়ে এলেন। প্রতিবছর কলেরা আর বসন্তে মড়ক লাগে, গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে যায়। এবার কিন্তু বিরসার সেবা আর পথ্যের জোরে মানুষ মরল খুব কম। মানুষের মধ্যে গুঞ্জন উঠল – বিরসা অসহায় মানুষের মুক্তির দূত বা অবতার হিসাবে অবতীর্ণ হয়েছেন। সাধারণ মানুষ ‘ধরতি আবা’ বলে মানতে শুরু করল তাঁকে। জনপ্রিয়তা বাড়তে লাগল, বিরসাইতের সংখ্যাও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে লাগল। দলে দলে মানুষ তাঁকে দেখতে ভিড় জমাতে শুরু করল। ক্রমে জনপ্রিয়তা এমন জায়গায় পৌঁছলো যে জমিদার, মহাজন ভয়ে নালিশ জানাল পুলিশের ডেপুটির কাছে, ডেপুটির কাছ থেকে খবর গেল ছোটলাটের কাছে। বিরসা গ্রেফতার হলেন। গোটা এলাকা ক্ষোভে ফেটে পড়ল, দলে দলে মানুষ তাঁকে ছাড়াতে ভিড় করল রাঁচি থানার সামনে। বিরসা তাদের বুঝিয়ে ফেরত পাঠালেন। ভয়ে থানা থেকে তাঁকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হল। গোটা ছোটনাগপুর জুড়ে পালিত হল অশৌচ, বন্ধ হল পূজাপার্বণ। কারণ তাঁদের ভগবান এখন জেলে।

জেল থেকে ছাড়া পেলেন, এবার শুরু হল শক্তি সঞ্চয়, সম্মুখসমরের জমি তৈরি। দুবছর ধরে চলল গ্রামে গ্রামে বেঠক। শরীরে ও মননে প্রস্তুত হতে হবে, গড়ে তুলতে হবে সশস্ত্র বাহিনী। ১৮৯৯ সালের ২৪ জানুয়ারি এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বড়দিনের আয়োজনে ব্যস্ত ইংরেজরা, আলোর রোশনাই, মদ আর বাজনা সমেত নাচগান চলছে। এমন সময় বিরসাইতরা ঝাঁকে ঝাঁকে তির ছুড়তে লাগল মিশন, পুলিশ ফাঁড়ি এবং বিদেশি অফিসগুলোতে। রাঁচি থানার ২১টি গ্রাম, তামার থানার দুটি, তোরপ ও বুন্দু থানার একটি গ্রামে তির চলে, ১৫ জনকে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ২৪-২৮ ডিসেম্বর চক্রধরপুর থানার ৩৪টি গ্রামে আগুনে দুজন নিহত, ৩৫ জন আহত হয়। এই ঘটনায় কেঁপে ওঠে সরকার, রক্ত হিম হয় জমিদার আর মহাজনদের। উপদ্রুত এলাকায় সেনা মোতায়ন করা হয়। বিদ্রোহ চলতে থাকে, ৯ জানুয়ারি শৈলরাকাব পাহাড়কে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে ব্রিটিশ সৈন্য। গোটা রাত লড়াই চলে। একদিকে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, অন্যদিকে দেশিয় তির, ধনুক, বল্লম, ফার্শা, কুঠার, দা, টাঙ্গি, গাঁইতি, কোদাল। শতশত বিদ্রোহীর রক্তে ইতিহাস তৈরি করে শৈলরাকাব।

দ্য স্টেটমেন্ট লিখল ৪০০ মুন্ডা নিহত, পুলিসের গোয়েন্দা রিপোর্ট বলে ৭০০ মুন্ডা নিহত। যদিও বিদ্রোহীরা বলেন আসল সংখ্যা ছিল তার থেকে অনেক বেশি। মৃতদের মধ্যে পিঠে বাচ্চা বাঁধা মহিলারাও ছিলেন।

বিরসার মাথার দাম ধার্য হয় ৫০০ টাকা। ১৯০০ সালের ৩ মার্চ বিরসাকে পুলিস গ্রেফতার করে। তারপর চলল বিচারের নামে প্রহসন। জেলের ভিতরে রচিত হল নিখুঁত চিত্রনাট্য। ৯ জুন তাঁর নাড়ি ক্ষীণ হতে হতে স্তব্ধ হয়ে গেল। পরিবার বা অনুগামীদের হাতে মৃতদেহ দেওয়ার সৌজন্য বা সাহস দেখাতে পারেনি ইংরেজ সরকার।

বিরসাকে হত্যা করা হল, যদিও জেল কর্তৃপক্ষ বলল কলেরা। কিন্তু তাঁর আপোসহীন লড়াই, গরীব শোষিত মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা উলগুলানের যে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল, তাকে মুছে ফেলার হিম্মত কারোর নেই। তাঁর মৃত্যুর পর ক্ষোভের আগুন জ্বলতেই থাকে। অনেকটা তার ফলেই ১৯০৮ সালে ছোটনাগপুর টেন্যান্সি অ্যাক্ট প্রণয়ন করে বহিরাগতদের আদিবাসী এলাকায় জমির মালিক হওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। বলা হয়, আদিবাসীদের জমি হস্তান্তর করা যাবে না।

আরো পড়ুন লিভিং রুমের বুনো ফুল হয়ে থাকতে অস্বীকার: সেলাম জেসিন্তা

সেই আইন আজ বদলানো হচ্ছে। ভাতের লড়াই শুরু করেছিলেন বিরসা, সেই ছোটনাগপুরে আজও অনাহারে মানুষ মরে। কুসংস্কারের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে কলেরা, বসন্তকে হার মানিয়েছিলেন। সেই ছোটনাগপুরের বিভিন্ন এলাকায় আজও বসন্ত হলে মানুষ রাতে গ্রাম পাহারা দেয়, আমিষ খাওয়া নিষেধ করে, রাতে গ্রামের বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ করে। ডাইনি অপবাদে নির্যাতন চলে। জল জঙ্গল জমি রক্ষার আন্দোলনের জন্য বিখ্যাত ছোটনাগপুরের জল জঙ্গল জমি চলে যাচ্ছে পুঁজি হাঙরের পেটে। জঙ্গলের সন্তানদের দুর্দশা দিন দিন বেড়েই চলেছে। জঙ্গলের কাঠ, পাতা, মধুতে তাদের অধিকার নেই, গোচারণও বন্ধ। পাহাড়ের মাটি, নদীর বালির অধিকার আগেই গিয়েছে। বন্ধ হচ্ছে হাজার হাজার সরকারি স্কুল; হাসপাতালগুলোতে আর চিকিৎসা হয় না।

বিরসার লড়াই বিদেশি শাসকের বুকে কাঁপন ধরিয়েছিল। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে আলো আর উত্তাপ দিয়েছিল। তাই তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নির্দেশে ১৯৩৮ সালে রাঁচিতে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনের মূল তোরণ বিরসার নামে উৎসর্গীকৃত হয়। উলগুলানের মহানায়ক, ছোটনাগপুর অঞ্চলের শোষিত মানুষের অভিভাবক, বিরসা মুন্ডার প্রয়াণের ১২৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে প্রায় নীরবে। যদিও সেটাই শেষ কথা নয়। এখনো একদল মানুষ বিরসার চেতনায় নিজেদের বিবেক শানিত করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে। তারা বিরসাকে ভোলেনি, ভুলতেও দেয়নি।

নিবন্ধকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মী। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

1 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.