সুমিত ঘোষ
দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ কারণগুলো আদতে প্রথম কারণ, অর্থাৎ বর্ণাশ্রম প্রথার ফলশ্রুতি। ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত দেখিয়েছেন যে শূদ্ররা শিবাজীর সৈন্যবাহিনীতে যোগদান করে ক্ষত্রিয়ত্ব দাবি করতেই ব্রাহ্মণ-মারাঠা দ্বন্দ্বের সূচনা হয়। তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের প্রাক্কালে গায়কোয়াড় ও হোলকারদের ব্রাহ্মণ সেনাপতি সদাশিব রাও ভাউ পেশোয়ার অধীনে কাজ করার ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয়তাও ওই যুদ্ধে মারাঠাদের আহমদ শাহ আবদালির হাতে পরাজয়ের অন্যতম কারণ। বর্ণাশ্রম ভারতের ইতিহাসে হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক পরাজয় ও পরাধীনতার অন্যতম কারণ। বৃহৎ ধর্ম সংস্কারের অভাব, মুসলমান শাসকদের আমলে বিবর্তিত সামন্ততন্ত্র এবং ইংরেজ শাসনকালে এই সামাজিক গঠন পরিবর্তনে ঔপনিবেশিক স্বার্থে সদিচ্ছার অভাবই ভারতীয় সমাজের স্থবিরতার কারণ। এবারের হোলিতেও উত্তরপ্রদেশের ফারুখাবাদ জেলায় দলিতদের উপর দুষ্কৃতিদের গুলি চালানোর ঘটনা সেই বর্জনীয় ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা।
মারাঠাদের লুঠপাট এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদী বক্তৃতা দিয়ে নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার প্রবণতা প্রসঙ্গেও কয়েকটা কথা বলা দরকার। যদুনাথ সরকার বলেছেন যে শিবাজী দুবার সুরাট লুণ্ঠন করেন। একবার লুণ্ঠনের সময়ে নিকটবর্তী সুহায়িলী বন্দরে ইংরেজদের কুঠীতে সুরাটের মুসলমান, হিন্দু ও আর্মেনীয় বণিকরা আশ্রয় নিয়েছিল। লুকনো ধনসম্পত্তির হদিশ পেতে মারাঠারা সুরাটবাসীদের চাবুক মারা, হাত-পা কেটে নেওয়া, এমনকি হত্যার পথও অবলম্বন করে (শিবাজী; প্রথম সংস্করণ)। যদুনাথ শিবাজীর চৌথ নীতির সমালোচনা করেছেন এবং মোগল সাম্রাজ্য বাদে বাকি সব রাজত্বের নিরিখে তাকে লুণ্ঠন প্রক্রিয়া হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
‘শিবাজী তাঁর প্রতিবেশীদের লুণ্ঠনের ন্যায্যতা প্রমাণ করতে সুরাটের মোগল গভর্নরকে (১৬৭২) বলেছিলেন, “তোমার সম্রাট আমাকে আমার জনগণ এবং দেশের প্রতিরক্ষার জন্য একটি সেনাবাহিনী রাখতে বাধ্য করেছেন। সেই সেনাবাহিনীর খরচ তাঁর প্রজাদেরই বহন করতে হবে।” এই ধরনের যুক্তি তাঁর কর্মজীবনের শুরুতে এবং কেবল মোগল অঞ্চলের ক্ষেত্রেই খাটতে পারে। কিন্তু বিজাপুর, গোলকোন্ডা, কানাড়া এবং তাঞ্জোরে তাঁর অভিযানের ব্যাখ্যা দিতে পারে না। পেশোয়াদের বৈদেশিক নীতির সমর্থনে যুক্তি হিসেবে এটি সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ।’ (দ্য হিস্ট্রি অফ ঔরঙ্গজেব; ৪র্থ খণ্ড)
১৭৪১ সালে মারাঠা সর্দার রাঘোজি ভোঁসলে তৎকালীন বাংলার পশ্চিমাংশ আক্রমণ করেন। তাঁর সেনাপতি ছিলেন ভাস্কর পণ্ডিত। আহমদনগরের পেশোয়া মালিক অম্বরের অশ্বারোহী গেরিলা যুদ্ধ নীতি বা বর্গীগিরি, মারাঠারা বাংলা আক্রমণের সময়ে ব্যবহার করে বাঙালিদের কাছে বর্গী নামে চিহ্নিত হয়। ওলন্দাজদের লিখিত সূত্র অনুযায়ী, দশ বছর ধরে বাংলায় বর্গীরা প্রায় চার লক্ষ বাঙালিকে হত্যা করে, মুর্শিদাবাদ লুঠ করে, এমনকি হিন্দু অভিজাত জগৎ শেঠের সম্পত্তিও ছিনিয়ে নেয়। শেষ পর্যন্ত নবাব আলিবর্দী খাঁয়ের হাতে মেদিনীপুর (১৭৪৬) ও বর্ধমানের যুদ্ধে (১৭৪৭) পরাজিত হয়ে মারাঠাদের ঝটিকা আক্রমণ বন্ধ হয়।
শিবাজীর পুত্র শম্ভুজির চরিত্র যেমনই হোক না কেন, মারাঠা সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য তাঁর সংগ্রাম সম্পর্কে মহারাষ্ট্রবাসীর আবেগ থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু তাঁর কীর্তি পিতা শিবাজী আর পুত্র সাহুর আঞ্চলিক রাজনৈতিক সাফল্যে ঢেকে যাওয়াও স্বাভাবিক। আবার এই আবেগ সমগ্র ভারত ভূখণ্ডের ক্ষেত্রে একেবারেই প্রযোজ্য নয়। এই উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে মারাঠাদের প্রতি জাতিগতভাবে আলাদা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি আছে। বাংলায় তারা রীতিমত দস্যু হিসাবে পরিচিত। মারাঠা শাসকরা হিন্দু হলেও এই উপমহাদেশের হিন্দুদের নিজেদের লুণ্ঠন প্রক্রিয়া থেকে মোটেই রেহাই দেয়নি। তেমন অন্য এলাকায় কর আরোপ করে পুণা-সাতারার সমৃদ্ধিও নিশ্চিত করতে চেয়েছিল। আজকের দিনে পশ্চিমবঙ্গের এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আর জি করে ধর্ষিত ও মৃত মেয়েটির জন্য ন্যায়বিচার চেয়ে আন্দোলনে পড়ুয়াদের অংশগ্রহণে কর্তৃপক্ষ বাধা দিলেও গেরুয়া উত্তরীয় পরে ছাওয়া-র প্রচারে তাঁরাই সিলমোহর দিচ্ছেন। এ কাজ বাঙালির নিজস্ব ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়ার এবং ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক স্বার্থে কৌম ধর্মচেতনা প্রতিষ্ঠার প্রকল্পেরই অংশবিশেষ বলে মনে হয়।
ভূপেন্দ্রনাথ বলেছেন যে মোগল সাম্রাজ্য দুর্বল হওয়ার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভারত ভূখণ্ডে মারাঠারা নিজেদের প্রধান শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে। মোগল সম্রাট ফারুখশিয়রের আমলে সৈয়দ ভ্রাতৃযুগলের মধ্যস্থতায় মোগল সাম্রাজ্যকে জাতিরাষ্ট্রে পরিণত করার শেষ চেষ্টার অংশ হিসাবে তথাকথিত সম্রাট ছত্রপতি সাহুর অধীনে মহারাষ্ট্র, এবং পরবর্তীকালে রাজপুতদের অধীনে রাজপুতানার, স্বাধীনতা মেনে নেওয়া হয়েছিল। বিদেশ থেকে আগত ব্যক্তিদের আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালাতে মোগল সম্রাটের এই পদক্ষেপ ব্যর্থ হয় হায়দরাবাদের শাসক নিজামদের স্থপতি চিন কিলিচ খাঁ দ্বারা সৈয়দ ভ্রাতৃযুগলের পরাজয় ও মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে। তারপর তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধে উত্তর ভারতের মুসলমান অভিজাতরা আবদালির পক্ষ নিয়ে মারাঠাদের সর্বভারতীয় হিন্দু সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার পথে বাধা দেয়।
কিন্তু ওই যুদ্ধের সাত বছর পর মারাঠা সর্দার মাধোজি সিন্ধিয়া উত্তর ভারতের বিরাট অংশ মারাঠা সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। দিল্লির তৎকালীন মোগল সম্রাট মারাঠাদের হাতের পুতুলে পরিণত হন। মারাঠারা তথাকথিত সম্রাট শাহ আলমের নামে আঞ্চলিক মুসলমান শাসকদের না চটিয়ে উত্তর ভারতে মারাঠা আধিপত্য বজায় রাখে। ভূপেন্দ্রনাথ বলেছেন, কথিত আছে যে ভারত ভূখণ্ডে ইংরেজদের আধিপত্য বিস্তারের সময়ে মারাঠাদের নেতা মাধোজি সিন্ধিয়া মহীশূরের টিপু সুলতানের সঙ্গে জোট তৈরি করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু টিপুর মৃত্যুর পর তিনি হতাশ হয়ে পড়েন এবং ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টাও দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গোটা ভারত ভূখণ্ডে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করলে সিপাহী বিদ্রোহের মাধ্যমে ভারতীয় হিন্দু ও মুসলমান অভিজাতরা নিজেদের আধিপত্য পুনরুদ্ধারের শেষ চেষ্টা করে। সেই প্রচেষ্টাও বিফল হলে পরাজিত ভারতীয় অভিজাতদের অনেকেই ইংরেজ শাসন স্বীকার করে নেন (ভারতীয় সমাজ পদ্ধতি; ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত)।
আরো পড়ুন মোগল আমল ইতিহাসে থাকলে বিদ্বেষের রাজনীতির বিপদ
পরিশেষে বলি, মুসলমানবিদ্বেষের চাষ করতে ছাওয়া-র মত বিকৃত ইতিহাসসম্পন্ন চিত্রনাট্য আজকের ভারতে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করতে বাধ্য। আমাদের দেশ স্বাধীনতার পর থেকে সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখার ফলেই এই উপমহাদেশের একমাত্র দেশ হিসাবে টানা গণতন্ত্র বজায় রাখতে পেরেছে। এদেশের সমাজব্যবস্থার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যস্বরূপ যে অর্থনৈতিক শোষণ চলে, তাকে পুষ্টি জোগায় বর্ণাশ্রমভিত্তিক নিপীড়ন। ফলে সামগ্রিক অগ্রগতি ঘটাতে গেলে প্রয়োজন খেটে খাওয়া মানুষের হিতকামী ব্যবস্থা কায়েম করা, যার ভিত্তি হবে বর্ণভেদ প্রথা নির্মূল করা এবং ইতিহাসের বহুমুখী চরিত্র অনুধাবন। এই প্রসঙ্গে ভাবতে হবে, ৩০০-৪০০ বছর আগের রাজাদের আমরা কেমনভাবে দেখব? এর সাথে জুড়বে আরও কিছু প্রশ্ন। আজকের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতির কি আদৌ মিল আছে? মোগল বা মারাঠা শাসনে এই উপমহাদেশের আমজনতার অবস্থা কেমন ছিল? মোগল-মারাঠা দ্বন্দ্ব নিয়ে উগ্র দক্ষিণপন্থীরা মাতামাতি করে কিন্তু অ্যাংলো-মারাঠা যুদ্ধ প্রসঙ্গ কেন তাদের শিবিরে আলোচিত হয় না? বহিরাগত শব্দটি কি একমাত্রিক, না পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী তার অর্থ আলাদা?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর ইতিমধ্যেই আলোচনা করা হয়েছে, তবু কয়েকটি কথা বলা বাকি আছে।
ভারত ভূখণ্ডে এসে লুঠপাট করে দূরদেশে ফিরে যাওয়া শাসক (যেমন গজনির সুলতান মামুদ) অবশ্যই বহিরাগত, কিন্তু এখানে এসে এখানেই রাজত্ব কায়েম করে এখানকার অর্থনীতি পরিচালনা করা শাসককে তো বহিরাগত বলা যায় না। আবার সেই শাসকই নিজের রাজ্যের সীমার বাইরে অন্য রাজ্য আক্রমণ করার মুহূর্তে সেখানকার মানুষের কাছে বহিরাগত। অন্যদিকে দূরদেশ থেকে এসে শাসন কায়েম করে এখানকার সম্পদ অন্যত্র স্থানান্তর ঔপনিবেশিকতার বৈশিষ্ট্য (ব্রিটিশ, ফরাসি, পর্তুগিজ, ওলন্দাজরা যা করেছে)।
তাছাড়া রাজতন্ত্র মানেই অভিজাতদের লুণ্ঠন কায়েম থাকা। কিন্তু তার মধ্যেও বিভিন্ন শাসনকালে প্রজাদের বিভিন্ন সামাজিক অধিকার স্বীকৃত হয়, জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠে, অর্থনৈতিক পরিবর্তন সূচিত হয়। একই সম্রাটকে তাঁর সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশের প্রজা বা পড়শি রাজ্যের জনতা তাদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী আলাদা চোখে দেখেছে। মারাঠারা মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, আবার সময়ের পরিবর্তনে তাদেরই হাত ধরেছে ইংরেজদের বিরুদ্ধে। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান স্বাধীন ভারত রাষ্ট্রের সূচনা লগ্নের জাতীয়তার ভিত্তি ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্তি। স্বাধীন হওয়ার ৭৮ বছর পূর্তির মুহূর্তে এদেশের সাধারণ জনতার ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে পারস্পরিক ঐক্যই আজকের সময়ের দাবি। পিছিয়ে পড়াকে এগিয়ে দেওয়ার দাবি, সংখ্যালঘুর প্রতি সহিষ্ণুতার দাবি, সব মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির দাবি কি খুব অন্যায্য? আজকের অভিজাতদের স্বার্থ রক্ষার্থে সামাজিক বিভেদ কামনা আমাদের জাতীয় ঐক্যের পথে অন্তরায়। এই অপচেষ্টা রুখে দেওয়ার বহু পথের মধ্যে একটি হল ইতিহাসের বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্য খেয়াল করা।
নিবন্ধকার বামপন্থী আন্দোলনের সংগঠক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








