কলকাতাকে ভেঙেচুরে দুমড়ে মুচড়ে গড়ে তোলা হচ্ছে এক নতুন শহর, যা আদতে অতীতবিচ্ছিন্ন। এই নতুন কলকাতার শরীর জুড়ে শপিং মল, তাদের বিজাতীয় গঠনশৈলীর সঙ্গে শহরের দীর্ঘদিনের চরিত্রের কোনো মিল নেই। ভাঙা পড়ছে একের পর এক পুরনো বাড়ি, ঐতিহাসিক সৌধগুলির বেহাল দশা, তুলে দেওয়া হচ্ছে ট্রামের মত পরিবেশবান্ধব, ঐতিহ্যবাহী যান। অবশ্য খোদ মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়িই যে শহর সংরক্ষণ করতে পারে না, তার কাছে অন্য কিছু আশা করাই বোধহয় বাতুলতা। তবুও কিছু মানুষ আপ্রাণ চেষ্টা করছেন কলকাতার চরিত্র ধরে রাখতে। ট্রাম উচ্ছেদের পরিকল্পিত সরকারি অপচেষ্টার বিরুদ্ধে তাঁরা বৃহস্পতিবার আওয়াজ তুললেন কলকাতা প্রেস ক্লাবে।

পুরনো কলকাতাকে ধ্বংস করে ফেলার নীল নকশার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ট্রাম পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া। গোটা পৃথিবী যখন পরিবেশবান্ধব এই যানটিকে গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন কলকাতার কর্তাব্যক্তিরা একটু একটু করে মেরে ফেলছেন ট্রামকে। অন্যদিকে কলকাতা ট্রাম ইউজার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা শহরের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই যানটিকে রক্ষা করার জন্য লড়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ধীরে ধীরে একটির পর একটি ট্রাম রুট বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। আদৌ আর কয়েক বছর পরে শহরে ট্রাম চলবে কিনা, তা নিয়েই তৈরি হয়েছে গভীর সংশয়। বছর দেড়েক আগে কলকাতা হাইকোর্ট ট্রামের পুনরুজ্জীবন এবং আধুনিকীকরণের উপায় খুঁজে বের করতে একটি কমিটি তৈরি করে দেয়। কিন্তু ট্রাম ইউজার্স অ্যাসোসিয়েশন সদস্যদের অভিযোগ, কমিটির বৈঠক ডাকাই বন্ধ করে দিয়েছে রাজ্য সরকার। কমিটি যে সুপারিশগুলি করেছিল, সেগুলি মানার তো প্রশ্নই নেই। শহরের বুক থেকে সমূলে ট্রাম উচ্ছেদের চেষ্টা চলছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বৃহস্পতিবার প্রেস ক্লাবে জড়ো হয়েছিলেন ট্রামযাত্রী সংগঠনের সদস্যরা। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক অনীক দত্ত, পরিবেশবিদ সোমেন্দ্রমোহন ঘোষ, চিকিৎসক অরূপ হালদারের মত মানুষ। তাঁদের বক্তব্য স্পষ্ট। পৃথিবীর ১২২টি শহর ট্রাম পরিষেবা তুলে দেওয়ার পরেও তা ফিরিয়ে এনেছে। সিওল, সিডনি, বার্সেলোনা, বোর্দো, ভিয়েনা, টরন্টো, মিউনিখের মত অজস্র আধুনিক শহরে ট্রাম গণপরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বের সাড়ে চারশো শহরে পরিষেবা অব্যাহত রয়েছে। তাহলে কলকাতা থেকে কেন ট্রাম তুলে দেওয়া হবে?

আরো পড়ুন পুঁজি নির্দেশিত উন্নয়ন ভাবনায় কলকাতার ট্রাম দুয়োরানি

ট্রামের বিরুদ্ধে সরকার যে যুক্তিগুলি উত্থাপন করে, তার অন্যতম হল যানজট। ট্রামলাইনের জন্যই নাকি কলকাতায় এত জ্যাম। সরকারের এই যুক্তি উড়িয়ে দিচ্ছেন ট্রামযাত্রী সংগঠনের সভাপতি দেবাশিস ভট্টাচার্য। তাঁর বক্তব্য, ‘ট্রামকে যানজটের জন্য দায়ী করা নির্ভেজাল কুযুক্তি। ইএম বাইপাসে তো ট্রামলাইন নেই। তাহলে সেখানেও যানজট হচ্ছে কেন?’ সংগঠনের পক্ষ থেকে মহাদেব শী তুলে ধরেন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। প্রতিবছর কলকাতায় বায়ুদূষণের জন্য সাড়ে চার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। তাঁর প্রশ্ন, ট্রামের মতো পরিবেশবান্ধব যানের ব্যবহার বাড়লে এই সংখ্যা কি অনেকটাই কমিয়ে আনা যেত না? অনীক হুঁশিয়ারি দিলেন, ট্রাম তুলে দেওয়ার পিছনে কায়েমি স্বার্থ থাকতে পারে। এই সিদ্ধান্ত শহরের মানুষ একেবারেই মেনে নেবেন না।

প্রশাসন এখনো কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ট্রাম পরিষেবা পুরোপুরি বন্ধ করেনি ঠিকই, কিন্তু ধীরে ধীরে নিঃশব্দে তাকে মেরে ফেলা হচ্ছে। দেড় দশক আগেও কলকাতায় সক্রিয় রুটের সংখ্যা ছিল ৪০, নিয়মিত চলত প্রায় ৪০০ ট্রাম। সেই সময় ট্রামলাইনের বিস্তার ছিল ৬৭ কিলোমিটার। আজ শহরে মাত্র তিনটি রুটে ধুঁকে ধুঁকে চালু আছে পরিষেবা।

১৮৬১ সালের মার্চ মাসে লন্ডনের মার্বেল আর্চ এবং নটিং হিল গেটের মধ্যে প্রথম চালু হয় ঘোড়ায় টানা ট্রাম সার্ভিস। তার ঠিক ১২ বছর পরে ১৮৭৩ সালে ২৪ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় শুরু হয় ট্রাম পরিষেবা। হাজার হাজার মানুষের উল্লাসধ্বনির মধ্যে দিয়ে ট্রামের চাকা গড়ায় কলকাতায়। তা টানতে বিশেষ প্রজাতির ঘোড়া নিয়ে আসা হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া থেকে। তারপর বহু দশক কেটে গিয়েছে। পেরিয়ে গিয়েছে শতাব্দী, ট্রামলাইনের বুকে ‘নড়িতে নড়িতে’ চলেছে কলকাতা। ভাড়া বৃদ্ধি প্রতিরোধ আন্দোলনই হোক বা জীবনানন্দ দাশের মৃত্যু – শহরের ইতিহাসের পাতায় পাতায় জড়িয়ে রয়েছে ট্রামলাইন। শুধু স্মৃতিমেদুরতার ব্যাপার নয়, পরিবেশবান্ধব এই যানবাহন চালানোর খরচ কম, ফলে ভাড়াও বেশি নয়, সুবিধা হয় নিম্ন আয়ের মানুষের। এমন যানবাহন উঠে হয়ে যাবে কলকাতা থেকে? গোটা বিশ্ব যখন সামনের দিকে হাঁটছে, আমরা কি তখন পিছনের দিকেই এগিয়ে যাব? প্রশ্ন তুলছেন ট্রাম যাত্রী সংগঠনের সভ্যরা।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.