অতুল সুভাষের অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ও দুঃখজনক মৃত্যুর জন্য দায়ী কে? এই প্রশ্ন ঘিরে উত্তাল সারা দেশ। সোশাল মিডিয়ায় প্রচারিত এক ভিডিওতে আত্মহত্যা করার আগে এই চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন বেঙ্গালুরুর প্রয়াত তরুণ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার অতুল। তাতে উঠে এসেছে নানা অভিযোগ। সেই অভিযোগ মূলত আমাদের দেশের বিচারব্যবস্থার নানা দুর্বলতার বিরুদ্ধে এবং তাঁর স্ত্রী, শাশুড়ি তথা শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে। অভিযোগের খুঁটিনাটি সোশাল মিডিয়া এবং সংবাদমাধ্যমের দৌলতে প্রায় সকলেরই জানা, তাই তার বিস্তারিত বিবরণ নিষ্প্রয়োজন। অতুলের আত্মহত্যার পর থেকে সোশাল মিডিয়া তথা সংবাদমাধ্যমে যে মিডিয়া ট্রায়ালের সূচনা হয়েছে, সেখানে মহিলাদের, বিশেষ করে নারীবাদী বলে পরিচিত বা নারীর অধিকার রক্ষায় ব্রতী মহিলাদের দিকে যে ধরনের আক্রমণ ধেয়ে এসেছে, তাও সর্বজনবিদিত। এই প্রেক্ষাপটে একজন মানবাধিকার কর্মী হিসাবে এবং একজন নারী হিসাবে পুরো বিষয়টাকে যেভাবে দেখছি, তার দু-চার কথা নিয়েই এই লেখা – ভেবে দেখার চেষ্টা, অতুলের মৃত্যুর দায় কার।
অতুলের ভিডিও ভাল করে শুনলে তাঁর সম্পর্কে যে ছবি মনে তৈরি হয় তা মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন মেধাবী সন্তানের, যে পরিবারের এবং নিজের পেশার প্রতি দায়িত্ববান, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, আধুনিক; একই সঙ্গে সাবেকি সংস্কারের প্রতি অনুরক্ত এবং হয়ত বা কাজের খাতিরেই এক বাঁধাধরা যান্ত্রিক জীবনে স্বচ্ছন্দ। এ যুগের ধারা অনুযায়ী সোশাল মিডিয়ার বিবাহ সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন ঘেঁটে অতুল জীবনসঙ্গিনী খুঁজে নিয়ে দাম্পত্যজীবন শুরু করেন। কিন্তু ভিডিও শুনে মনে হয়, তাঁদের যৌথ জীবনের গোড়াতেই গলদ ছিল। অতুলের কথায় ধরা পড়ে যে স্ত্রীর চিন্তাভাবনা ছিল স্বতন্ত্র, স্বাধীন। এখানে কে ভাল বা কে খারাপ সে আলোচনায় যাচ্ছি না। কথা হল, দুজনের মূল্যবোধ ও পারিবারিক রীতিনীতিতে ফারাক ছিল অনেকখানি। ক্রমে সেই ফাঁক দিয়ে দাম্পত্যে আসে মতান্তর, যা পরিণত হয় মনান্তরে। পরিশেষে বিবাহবিচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু হয়।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
বিবাহবিচ্ছেদ আজকের ভারতের শহরাঞ্চলে খুব অস্বাভাবিক বা অপরিচিত ব্যাপার নয়। যদিও সারা বিশ্বের নিরিখে সব থেকে কম বিবাহবিচ্ছেদ হয় ভারতে (২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী ১/১০০), তবু এ দেশের বিভিন্ন শহরের দিকে তাকালে দেখা যায় এই হার দ্রুত বাড়ছে। এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, ২০০৮ সালে শুধুমাত্র দিল্লি শহরেই ১২,০০০ বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে, ২০০৬ সালে বেঙ্গালুরুতে ১,২৪৬ আর ২০০৭ সালে মুম্বাইতে ৪,১৩৮ বিবাহবিচ্ছেদ নথিভুক্ত হয়েছে। এছাড়া ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশের নানা আদালতে চলছে প্রায় ১১,০০,০০০ অমীমাংসিত বিবাহবিচ্ছেদের মামলা। অবশ্য একথাও সত্যি যে আমাদের সমাজ এখনো বিবাহবিচ্ছেদকে ভালো চোখে দেখে না। বিবাহবিচ্ছিন্ন নারী, পুরুষ ও তাদের পরিবারের লোকজনকে নানা অপ্রিয় পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়।
এরকম সামাজিক প্রেক্ষাপটে কোনো দাম্পত্য কলহ ও বিবাহবিচ্ছেদের জটিলতা জনসমক্ষে এসে পড়লে সেই ঘটনাকে ঘিরে যে আলোচনা শুরু হয় তা অনেকাংশেই পক্ষপাতদুষ্ট। অতুলের করুণ মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে আজ বিবাহবিচ্ছেদ তথা নারীর নানা অধিকার নিয়ে যে বিরূপ সমালোচনা হচ্ছে তাতে যতখানি আবেগ আছে, ততখানি যুক্তি নেই। এই আলোচনায় নেমে আমরা ভুলে যাচ্ছি, যে কোনো বিতর্কেই দুই পক্ষের বক্তব্য শোনা দরকার। সে কাজ আদালত করছে বা করবে। অতুলের জন্য শোক করার অর্থ এই নয় যে আমরা আইন ও যুক্তির পথে হাঁটা বন্ধ করে দেব বা চটজলদি কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাব। কাজেই আজ বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত মামলায় আদালতের সাধারণ পদক্ষেপগুলো, যেমন সালিশির মাধ্যমে মীমাংসায় পৌঁছতে উৎসাহ দেওয়া, নিয়েও প্রচণ্ড ক্ষোভ উগরে দেওয়া হচ্ছে। অথচ এর যৌক্তিকতা তো আমাদের সামগ্রিকতার প্রেক্ষিতেই বিচার করতে হবে, আবেগের বশে নয়। খোরপোশ নিয়েও আজ মহিলারা সোশাল মিডিয়ায় আক্রমণের শিকার। কিন্তু আমরা ভেবে দেখছি না, দেশে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের দিক থেকে দেখলে মহিলারা পুরুষদের চেয়ে এখনো অনেক পিছিয়ে। তাই অধিকাংশ বিবাহবিচ্ছেদের মামলায় খোরপোশ বা সন্তানের ভরণপোষণের জন্য মহিলাদের দিক থেকে অর্থ দাবি করা সম্পূর্ণ বৈধ। তবে এইসব আইনের অপপ্রয়োগের ঘটনা কোথায়, কতটা ও কীভাবে বাড়ছে আর তার নিরসনে কী করা দরকার – তা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা ও নীতি প্রণয়ন করা অবশ্যই দরকার। যারা আইনের অপব্যবহার রোধে আইনটাকেই ঢাকি সমেত বিসর্জন দেওয়ার দাওয়াই দিচ্ছে, তাদের বলি, সেরকম পদক্ষেপে আর যা-ই হোক বিচারব্যবস্থার উন্নতি হয় না।
অতুল তাঁর দীর্ঘ ভিডিওতে দেশের বিচারব্যবস্থার চরম দুর্বলতার নানা চিত্র তুলে ধরেছেন। আদালতে তারিখের পরে তারিখ পড়তে থাকা, তুচ্ছ কারণে আদালতের কাজ বন্ধ থাকা থেকে শুরু করে বিচারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত নানা কুশীলবদের দুর্নীতির ধারাপাত। এই অভিযোগ যে কতটা সত্য, তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। একজন চাকরিজীবী সাধারণ মানুষের জন্য এই আইন আদালতের গোলকধাঁধা অতি কঠিন এবং ক্লান্তিকর। তার উপর যদি মামলাটা হয় বিবাহবিচ্ছেদ এবং সন্তানের হেফাজত সংক্রান্ত, তখন পরতে পরতে জটিলতা ও তিক্ততা বাড়ে, শুনানিও শেষ হতে চায় না। বহু পরিবার এই দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে চলেছে। এর থেকে নিষ্কৃতি পেতে জীবনের অনেকখানি অমূল্য সময় চলে যায়। কখনো বা চলে যায় আস্ত জীবনই, যা অতুলের ক্ষেত্রে হয়েছে। এই সর্বজনবিদিত সমস্যা নিয়ে কেন আমাদের সংবাদমাধ্যম, আইনপ্রণেতারা, বিচারবিভাগ বা প্রশাসন সক্রিয় হয়ে ওঠে না? কেন আজও পারিবারিক মামলার (ফ্যামিলি কোর্ট) আদালতে নয় লক্ষের বেশি মামলার শুনানি চলছে দীর্ঘদিন ধরে? কেন বিচারক নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা? কেন বিচারব্যবস্থার তথা পুলিসি ব্যবস্থার সংস্কারের প্রশ্নে সোশাল মিডিয়া থেকে সংবাদমাধ্যম – কোথাও কোনো গঠনমূলক আলোচনা হয় না? কেন সমাজের সর্বস্তরের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যম সতত সক্রিয় থাকে না? কেন আমরা, আমজনতা, বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের লক্ষ্যে একজোট হই না? এই মৌলিক প্রশ্নগুলোই তো আজ বারবার ওঠা দরকার।

অথচ আজ অতুলের মৃত্যুকে ঘিরে যে বিতর্কের ঢেউ উঠেছে, সেখানে যতখানি ব্যক্তি আক্রমণ হচ্ছে, যতখানি অহেতুক নারীবাদের সমালোচনা হচ্ছে তার কণামাত্র সময় ব্যয় হচ্ছে না সামাজিক অবক্ষয় কী করে থামানো যায় তার আলোচনায়। যেসব মৌলিক সমস্যার দিকে অতুলের ভিডিও আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তাকে নারী বনাম পুরুষের লড়াই হিসাবে দেখার ভুল না করে সার্বিক মানবাধিকারের লড়াই হিসাবে দেখে সমাধানের পথ খোঁজার আগ্রহ তেমন দেখা যাচ্ছে কোথায়?
আরো পড়ুন কমলা ভাসিন: নারীবাদী লড়াইয়ের অদম্য কর্মী
যেসব আলোচনা চোখে পড়ছে, তার অন্যতম মূল অভিমুখ হল – দেশের আইন কেন পুরুষবিদ্বেষী? এক্ষেত্রে নারীর অধিকার ও সুরক্ষার জন্য প্রণয়ন করা আইনের নানা অপব্যবহারের ঘটনা তুলে ধরা হচ্ছে। আমরা ভুলে যাচ্ছি, এইসব আইন প্রণয়ন করা হয়েছে কোটি কোটি নারীর অধিকার হরণের পরিপ্রেক্ষিতে, নারীর উপর নেমে আসা পিতৃতান্ত্রিক সমাজের শোষণ ও বঞ্চনার ইতিহাস রয়েছে এর পিছনে। অতুলের ঘটনার প্রেক্ষাপটে এই আইনগুলোর অপপ্রয়োগের সমালোচনা করতে গিয়ে অনেকে আজ আবেগে ভেসে এইসব আইন প্রণয়নের যাথার্থ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। অথচ যদি আমরা সরকারি পরিসংখ্যান দেখি, তা থেকে বাস্তব অবস্থার খানিক হদিশ পাওয়া যায়। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর ২০২২ সালের তথ্য বলছে যে দেশে পণপ্রথার বলি ৬,৪০০ জন মহিলা। ২০২৪ সালে এ পর্যন্ত পণপ্রথার বলি হয়েছেন ৫৯ জন। ২০২১ সালের তথ্য বলছে, দেশের প্রায় ৬৫% মহিলা গার্হস্থ্য নির্যাতনের শিকার এবং এই প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখী।
অতুলের ভিডিওতে ৪৯৮এ ধারার অপব্যবহারের কথা এসেছে। একথা নিঃসন্দেহে সত্যি যে আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধ করা দরকার। তার জন্য দরকার আইন সংশোধন, দরকার জনসচেতনতা, প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন। সে পথে না হেঁটে মহিলাদের অধিকার রক্ষার জন্যে তৈরি একটা আইনকে এককথায় কালা কানুন বলে দাগিয়ে দেওয়া আসলে সামাজিক বৈষম্য ও শোষণকে গ্রহণযোগ্যতা দেওয়ার নামান্তর। যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যকে স্বীকৃতি দেয়, সেই সমাজের কাছে অতুলের মত পুরুষদের ন্যায় পাওয়ার আশা দুরাশা মাত্র।
অতুল যে অবস্থার শিকার হয়ে চরম পথ বেছে নিয়েছেন, সেই অবস্থা সযত্নে লালন করে পিতৃতান্ত্রিক সমাজই, নারীবাদী চিন্তাভাবনা নয়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ যেমন মেয়েদের চাওয়া পাওয়া নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনই পুরুষের উপরেও দায়িত্ব, কর্তব্যের এমন ফরমান জারি করে যা কেবলমাত্র তার লিঙ্গের জন্যেই তার উপর প্রযোজ্য। পিতৃতন্ত্র লিঙ্গ বৈষম্যের উপর প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার কোনো লিঙ্গভেদ নেই। তাই অনেক ক্ষেত্রে মহিলারাই হয়ে ওঠেন পিতৃতান্ত্রিকতার ধারক ও বাহক। যেমন অতুল দাবি করেছেন, তাঁর স্ত্রী স্বনির্ভর হওয়া সত্ত্বেও বিপুল টাকা খোরপোশ এবং সন্তানের দেখভাল করার জন্য চেয়েছেন। আবার অতুলের কথা মত, তাঁর স্ত্রী আসলে তাঁকে বিয়ে করতেই চাননি, বাড়ির চাপে রাজি হয়েছিলেন। সুতরাং তাঁর স্ত্রীও সেই পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কদাচারের শিকার, যেখানে বিয়ে করা একজন নারীর জীবনের আবশ্যিক ও প্রধান সত্য।
অতুলের ভিডিওতে আমরা আরও দেখি – একজন আদর্শ স্ত্রী এবং মায়ের যে ছবি সামাজিক সংস্কারের সূত্রে তাঁর মন জুড়ে ছিল, তার সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার মিল না হওয়ার যন্ত্রণা। অন্যদিকে একজন স্বামীর কর্তব্য সম্পর্কেও অতুলের মনে ছিল কিছু সমাজস্বীকৃত ধারণা। তার মধ্যে প্রধান হল অর্থোপার্জন এবং স্ত্রী, সন্তানের অর্থনৈতিক দায়িত্ব নেওয়া। ঘরের কাজকর্ম, যা আমাদের সমাজে মূলত মহিলাদের কাজ বলেই ধরা হয়; সে প্রসঙ্গে তাঁর গলায় শুনছি অভিমানের সুর। অতুলকেই ঘরদোর গোছাতে হয়েছে, বাচ্চা সামলাতে হয়েছে, যা নাকি স্ত্রীর কাজ। অন্যদিকে অতুলের কথা অনুযায়ী, শ্বশুড়বাড়ি থেকে তাঁর উপর নিত্য টাকাপয়সার জন্য চাপ দেওয়া হয়ত, নানা মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে হেনস্থা করা হয়েছে দীর্ঘকাল। নারী-পুরুষে এই যে বৈষম্য, প্রত্যাশা যে একটি প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়ির ধাঁচে তার স্বভাব বদলে ফেলবে বা মেয়ের বাড়ির চাহিদা অনুযায়ী স্বামী অফুরান অর্থের যোগান দিয়ে যাবে আর সেইজন্য স্বামীকে নিয়ত নিয়ন্ত্রণে রাখবে স্ত্রী – এগুলো কি নারীবাদ? এ তো সেই বৈষম্যমূলক পিতৃতান্ত্রিক চিন্তাধারারই ফসল। নারীবাদ তো পুরুষকে দোহন করার কথা বলে না, বরং নারী-পুরুষের সমান অধিকার, সুযোগ ও সমান দায়িত্বের কথা বলে। সুতরাং অতুলের করুণ পরিণতির জন্য নারীবাদ বা নারী সুরক্ষার জন্য সৃষ্ট আইনগুলোকে দায়ি করা অর্থহীন। দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা চলে – অতুল আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বিভেদ ও শোষণের শিকার।
অবশ্য প্রত্যাশিতভাবেই সংবাদমাধ্যম বিষয়টাকে নারী বনাম পুরুষের লড়াইয়ের সংকীর্ণ ফ্রেমেই দেখাচ্ছে। বিচারবিভাগের ফাটল নিয়েও মুখে কুলুপ এঁটে আছে সমাজ। অতুলের স্ত্রীর বক্তব্য না শুনেই তাঁকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে সোশাল মিডিয়া। পাশাপাশি এই সমাজেই প্রতিদিন সর্বস্তরে বেড়ে চলবে দুর্নীতি, মানবাধিকার হরণ; নারীর অধিকার হরণের ঘটনা। মাঝেমধ্যেই নানা ঘটনার জন্য নারীবাদীদের আক্রমণ করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা চলতেই থাকবে। ফলে পিতৃতান্ত্রিকতার শিকড় মজবুত হবে, যার বলি হবেন না জানি আরও কত অতুল এবং জানা, অজানা বহু নারী।
পরিশেষে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলি, যা মূল স্রোতের আলোচনায় আসছে না। তা হল অতুলের মানসিক স্বাস্থ্যের দিক। পরিবার পরিজন ও সহকর্মীদের মধ্যে থেকেও কী প্রচণ্ড নিঃসঙ্গ হয়ে গিয়েছিলেন তিনি, যার ফলে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন! এ থেকে বোঝা যায়, আমাদের চারপাশের সামাজিক সম্পর্কগুলো কতখানি অন্তঃসারশূন্য হয়ে গেছে। আজকের সমাজ চূড়ান্ত সাফল্য ও চূড়ান্ত ব্যর্থতার মাঝের যে কঠিন লড়াই তাকে অবহেলা করে, শুধু পরিণতি নিয়েই তার মাথাব্যথা। তাই হয়ত অতুল বুঝতে পারেননি, আত্মহত্যা ছাড়া আর কী করলে তাঁর অভিযোগের প্রতি সাধারণের তথা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাবে।
বিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রতিষ্ঠান। একে মজবুত করার জন্য দরকার নারী-পুরুষের পারস্পরিক বোঝাপড়া, সহমর্মিতা এবং সংহতি। আর সেজন্যই দরকার পিতৃতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে একসাথে লড়াই। লড়াই দুর্নীতির বিরুদ্ধে, লড়াই আইনের অপব্যবহার বন্ধ করতে, লড়াই এমন এক বৈষম্যহীন সমাজের জন্য যেখানে নারী-পুরুষ একসাথে বৃহত্তর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করবে। অতুলের আত্মহত্যা যদি আমাদের সেই চেতনায় ঘা দেয়, তবে হয়ত একদিন অতুলের অন্তিম ইচ্ছা – সকলের জন্য ন্যায় – রূপায়িত হবে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।









অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখা। একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার সঠিক বিশ্লেষণ। প্রতিনিয়ত এ দেশে মেয়েরা নির্যাতনের শিকার বিশেষ করে যারা সুবিধা বঞ্চিত তাদের বিষয়টি এই একটি ঘটনা দিয়ে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া যায় না।