সিয়াচেনে শহিদ ক্যাপ্টেন অংশুমান সিংয়ের সামরিক সেবার জন্য প্রাপ্য উত্তরাধিকার ও সামরিক সম্মানের দাবিদার কে – এ নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় যে বিতর্ক দানা বেঁধেছিল কয়েকদিন ধরে, তা মূলত আমাদের সমাজের অন্তর্নিহিত একাধিক সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অথচ আজ গোটা সোশাল মিডিয়া এবং সংবাদমাধ্যমে এই আলোচনা যে খাতে প্রবাহিত হচ্ছে, তার মূল সুর হল দোষারোপ। একপক্ষ নেমেছেন শহিদ ক্যাপ্টেনের বিধবা স্ত্রীর উপরে দোষারোপ করতে, অন্যপক্ষ শহিদের মা-বাবার উপর খড়্গহস্ত। এই প্রেক্ষিতেই সোশাল মিডিয়ায় ক্ষোভের শিকার হয়েছেন রেশমা সেবাস্টিয়ান নামের এক কেরালাবাসী ইনফ্লুয়েন্সার, যিনি ইন্সটাগ্রামে নিয়মিত নানা ছবি পোস্ট করেন। নেট দুনিয়ার মানুষ তাঁকেই ক্যাপ্টেন অংশুমানের বিধবা স্ত্রী স্মৃতি সিং ভেবে, বিধবা হয়েও নানা রঙিন ছবি পোস্ট করার জন্য তীব্র কটাক্ষ ও গালিগালাজ করেছে। সহ্যের সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পর রেশমা নিজের এক পোস্টে, সমস্ত আক্রমণের জবাবে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন। অন্যদিকে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে স্মৃতির অস্ট্রেলিয়ায় চলে যাওয়ার তথাকথিত ষড়যন্ত্রের কথাও। কিন্তু এত সব হইচইয়ের পিছনে যে মৌলিক প্রশ্নগুলো চাপা পড়ে যাচ্ছে, সেগুলো নিয়ে ভাবনাচিন্তার ফুরসত ও সদিচ্ছা যে কারোর আছে, তা মনে হচ্ছে না। কাজেই এই পারিবারিক বিবাদ কিছু মানুষের জন্য হয়ে দাঁড়িয়েছে নিছক মুখরোচক শাশুড়ি-বউমার মেগাসিরিয়াল মার্কা কোন্দল। আর সোশাল মিডিয়া ভরে গেছে দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অসংবেদনশীল নানা মন্তব্যে, যার মূল সুর নীতি পুলিসের এবং তাতে আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজের চোখরাঙানি স্পষ্ট।
এখন দেখা যাক, আসল বিবাদ ও বিতর্ক কী নিয়ে? সামরিক নিয়ম অনুযায়ী শহিদ সেনানীর পেনশনের অধিকারী তাঁর নিকটতম আত্মীয় (নেক্সট টু কিন) এবং সব বিবাহিত পুরুষের ক্ষেত্রেই স্ত্রীকে নিকটতম আত্মীয় হিসাবে ধরা আমাদের দেশের সামরিক ব্যবস্থার নিয়ম। পেনশন ছাড়া অন্যান্য প্রাপ্য সাহায্য বন্টন করা হয় শহিদের করে যাওয়া উইল অনুসারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উইলেও থাকে স্ত্রীর নাম। এক্ষেত্রে প্রয়াত সৈনিকের মা-বাবা সেভাবে কোনো আর্থিক সাহায্য পান না। সামরিক নিয়ম অনুযায়ী মরণোত্তর সম্মান, খেতাব ইত্যাদিও তুলে দেওয়া হয় শহিদের বিধবা স্ত্রীর হাতেই। এক্ষেত্রেও মা-বাবা থেকে যান পিছনের সারিতে। ক্যাপ্টেন অংশুমানের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি আর বিতর্কও দানা বেঁধেছে তা নিয়েই।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
মরণোত্তর কীর্তি চক্র পেয়েছেন অংশুমান। এক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি সেই সম্মান তুলে দেন তাঁর স্ত্রী স্মৃতির হাতে, পাশে ছিলেন শহিদের মা মঞ্জু সিং। এই কীর্তি চক্র গ্রহণ উপলক্ষে সদ্য বিধবা তরুণী তাঁর স্বামীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে যে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন, তা দেশবাসীর হৃদয় স্পর্শ করে এবং বহু মানুষই সেদিন সমব্যথী হিসাবে চোখের জল সামলাতে পারেননি। এর অনতিকাল পরে সংবাদমাধ্যমের দৌলতে প্রকাশিত হয় ক্যাপ্টেন অংশুমানের মা-বাবা – রবি প্রতাপ সিং এবং মঞ্জুর অভিযোগ। তাঁরা বলেন, শহিদ পুত্রের পেনশন ইত্যাদি দূরে থাক, পুত্রের কীর্তি চক্রটিকে পর্যন্ত একবার ছুঁয়ে দেখতে পারেননি তাঁরা। তাঁদের অভিযোগ, সদ্যবিধবা স্মৃতি সামরিক সেবার উত্তরাধিকার হিসাবে পাওয়া অর্থ ও সম্মান (কীর্তি চক্র) নিয়ে নিজের মা-বাবার কাছে ফিরে গেছেন এবং অচিরেই পাকাপাকিভাবে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমানোর পরিকল্পনা করছেন নতুন জীবন শুরু করার আশায়।
এই অভিযোগের পরেই আবার সরগরম হয়ে ওঠে সোশাল মিডিয়া। এবার স্মৃতি হয়ে ওঠেন আক্রমণের নিশানা। সেই আক্রমণ যে কতটা নির্মম ও কুৎসিত হতে পারে, রেশমার প্রোফাইলে করা মন্তব্যগুলো দেখলেই তা বোঝা যায়। হাজার হাজার বছর ধরে লালিত নারীবিদ্বেষের বিষমাখা মন্তব্য অনেক ক্ষেত্রেই এসেছে মহিলাদের প্রোফাইল থেকেও, যা ফের বুঝিয়ে দিল পিতৃতান্ত্রিকতা এক মানসিকতার নাম, তাতে নারী-পুরুষ ভেদ নেই। এই আক্রমণ স্পষ্ট করে দেয় যে হাজার হাজার বছর ধরে লালিত সামাজিক বৈষম্য আজ এমন এক স্তরে পৌঁছে গেছে, যেখানে নারীরাও নারীদের অধিকার খর্ব করার পক্ষেই সওয়াল করে, বৈষম্যের কাঠামোকেই মনে করে সুস্থ সামাজিক সংস্কৃতি।
নেক্সট অফ কিন বা উত্তরাধিকার বিষয়টি নিয়ে শহিদ সৈনিকের মা-বাবার অভিমান তথা ক্ষোভ নতুন নয় এবং এ দেশের বাস্তবতার প্রেক্ষিতে সম্পূর্ন অন্যায্যও নয়। এই বিতর্কের প্রেক্ষিতে সামনে আসা পরিসংখ্যান থেকে আমরা দেখি, ভারতের গ্রামাঞ্চল থেকে বড় সংখ্যক তরুণ (বর্তমানে তরুণীরাও) সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এঁদের অনেকেই আসেন দরিদ্র পরিবার থেকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই সব পরিবারে পুত্রসন্তানের উপরেই থাকে পারিবারিক দায়দায়িত্ব। মা-বাবাকে শেষ বয়সে দেখার দায়িত্ব পুত্রসন্তানের। সেই আশাতেই বুক বেঁধে সংসারের শেষ কপর্দকটিও তার ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য নির্দ্বিধায় খরচ করা হয়। কন্যাসন্তানের স্বাস্থ্য থেকে শিক্ষা – সবকিছুই পুত্রের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় উপেক্ষা করা এই সামাজিক পরিসরে স্বাভাবিক ঘটনা, যা নিয়ে প্রশ্ন করার কথা মহিলারাও ভাবেন না। এই প্রেক্ষাপটে যদি পরিবারের মূল উপার্জনকারী পুত্রের অকালপ্রয়াণ হয়, তাহলে পুরো পরিবারের মাথাতেই আকাশ ভেঙে পড়ে। প্রয়াতের বিধবা স্ত্রীর মত তার মা-বাবার অসহায়তাও তীব্র ও বাস্তব। এসব ক্ষেত্রে প্রয়াত সন্তানের সম্পত্তি/উপার্জনের উত্তরাধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হলে মা-বাবার ভরণপোষণের দায়ভার কে নেবে – এই প্রশ্ন যুক্তিসঙ্গত। অথচ দেশের আইনে এই সমস্যার কোন সুরাহা নেই। উত্তরাধিকারের সামরিক নিয়মেও বিবাহিত সৈনিকদের মা-বাবার আর্থিক স্বার্থরক্ষার কোনো বন্দোবস্ত নেই। অন্যদিকে আমাদের দেশের সামাজিক কাঠামোয় আজও বাড়ির বউদের অবস্থান অধিকারের নিরিখে বেশ পিছনেই। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, তবে সেই সামান্য ব্যতিক্রমী ঘটনাগুলো আমাদের মূলধারার সমস্যার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। ‘কন্যা সন্তান শৈশবে পিতার অধীন, যৌবনে স্বামীর ও বার্ধক্যে পুত্রের’ – এই সনাতন সামাজিক আদেশ আজকের প্রযুক্তি-কৌশলে অভ্যস্ত আধুনিক ভারতীয় সমাজেও একইভাবে প্রচলিত। ক্ষেত্রবিশেষে তার বাহ্যিক রূপ হয়ত আলাদা। এককথায় আজও নারীর নিজের সত্তা, অধিকারবোধ, স্বপ্ন না থাকাই বাঞ্ছনীয়। তবেই পুরুষশাসিত সমাজে সে আদর্শ নারী। এহেন সমাজে বিধবা স্ত্রীও যেহেতু সম্পূর্ণ নির্ভর করে স্বামীর উত্তরাধিকারের উপরে, তাই স্বামীর পেনশন বা অন্য সম্পদের উপরে তার অধিকারও প্রশ্নাতীত। উভয়পক্ষের আর্থিক নির্ভরতার সুষ্ঠু আইনি সমাধানের অভাবেই সমস্যা জট পাকিয়েছে।
আরো পড়ুন দহাড়: চিৎকার কর মেয়ে, দেখ কতদূর গলা যায়
আমাদের সমাজে অবশ্য অনেকসময় উপরোক্ত সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা হয়েছে – বিধবা স্ত্রীর অধিকারকে সংকুচিত করে, তার স্বপ্ন দেখার, নতুন করে জীবন শুরু করার আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে। তাই এই একবিংশ শতাব্দীতেও আমাদের সমাজ চায় একজন স্বামীহারা যুবতীর জীবনের একমাত্র সম্বল হয়ে থাকবে তার স্বামীর স্মৃতি। বিধবার একমাত্র কর্তব্য হবে স্বামীর পরিবারের দেখভাল করা, সন্তান থাকলে তাদের লালনপালন। এসবের বাইরে নিজের মত এক জীবন তৈরি করার স্বপ্ন দেখাও পাপ। আদর্শ নারীর সংজ্ঞায়িত আচরণের থেকে বিচ্যুতি আজও যে আমাদের সমাজ মেনে নেয় না, তার জ্বলন্ত প্রমাণ সোশাল মিডিয়ায় স্মৃতির বিরুদ্ধে ওঠা সমালোচনার ঝড়, ভ্রান্তিবশত হলেও। শহিদ ক্যাপ্টেন অংশুমানের স্ত্রী যতদিন সমাজ সমর্থিত পথে হেটেছেন ততদিন পেয়েছেন অকুন্ঠ সমর্থন, আর যেদিন সমাজের মনে হয়েছে তিনি বাঁধাধরা ছকের বাইরে পা ফেলতে চাইছেন, সেদিন সমাজ তাঁকে ছেড়ে কথা বলেনি। এখানে বলে রাখা ভাল, স্মৃতির বর্তমান পদক্ষেপ তথা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে খবরাখবরের একমাত্র উৎস সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর। এই লেখার এই সীমাবদ্ধতা স্বীকার্য।
পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোয় শুধু নারীরাই নন, পুরুষরাও ধারাবাহিকভাবে বঞ্চনার, শোষণের শিকার হন। অনেকসময় নিজের অজান্তেই। এই সমাজ পুত্রসন্তানদের উপর চাপিয়ে দেয় সমস্ত অর্থনৈতিক কর্তব্যের বোঝা। পরিবারের বয়স্কদের করে তোলে পুত্রের মুখাপেক্ষী। আবার এই সমাজেই শ্বশুড়বাড়িতে ছেলের বউকে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিপক্ষ হিসাবে দেখা হয়। কারণ সে পরিবারের মূল আশাভরসার মানুষটির, অর্থাৎ ছেলের কাছের লোক। অথচ সে এসেছে অন্য পরিবার থেকে। তাকে কঠিন শাসনের বেড়াজালে ঘিরে রাখতে না পারলে পুরো পরিবারের বিপদ। ফলে ঘরে ঘরে গার্হস্থ্য হিংসার ও অশান্তির শিকার বহু নারীকে মেনে নিতে হয়েছে এই বঞ্চনার জীবন। ক্যাপ্টেন অংশুমান ও তাঁর পরিবারকে ঘিরে দানা বাঁধা বিতর্ক আরেকবার আমাদের দেশের পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক বৈষম্যের চিত্রটাই চোখের সামনে তুলে ধরে। একথা অবশ্যই উল্লেখ্য যে সমাজের আর্থিক স্তর ভেদে বৈষম্যের রূপ বা তীব্রতা হয়ত ভিন্ন, কিন্তু মূল সুরটা থাকে অভিন্ন। এক ক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার স্ত্রী, তো অন্য ক্ষেত্রে বঞ্চিত হন মা-বাবা। এই বঞ্চনার নকশা আমাদের সমাজ বুনে চলেছে যুগ যুগ ধরে। আশু প্রয়োজন এই সামাজিক বৈষম্যের অবসান ঘটানো। তা না হলে ক্যাপ্টেন অংশুমানের স্ত্রী বা মা-বাবার মত পরিস্থিতির শিকার মানুষের আর্থসামাজিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান হওয়া কঠিন।
এই পুরো বিতর্কে যে মৌলিক প্রশ্নটা উঠে আসছে, তা হল ন্যায়ের ও সাম্যের প্রশ্ন। বস্তুত প্রশ্ন উঠছে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও। যথাযথ আইনি পরিকাঠামো তৈরি করা এবং নীতি প্রণয়ন তথা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উচিত সব নাগরিকের জন্য সাম্য তথা ন্যায় নিশ্চিত করা এবং এমন এক সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে বিভেদের স্থান থাকবে না। এই আলোকে সামরিক উত্তরাধিকার নিয়মাবলীর পুনর্বিবেচনা করা সময়ের দাবি। পরিশেষে এটাও বলা দরকার যে সোশাল মিডিয়ায় আমাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেন দায়িত্বজ্ঞানহীন স্বেচ্ছাচারিতায় পরিণত না হয়। সোশাল মিডিয়ায় আমাদের অংশগ্রহণ যেন সামাজিক ন্যায়ের দাবিকে মজবুত করে, সেদিক লক্ষ রাখা প্রয়োজন।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








