মেঘালয়ে মধুচন্দ্রিমা করতে গিয়ে বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই তরুণ রাজা রঘুবংশীর হত্যার খবর আমাদের অনেককেই ব্যথিত করেছে। কিন্তু সেই ব্যথার থেকে বেশি পীড়াদায়ক হয়ে উঠছে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনলাইন ঘৃণার চাষ। সোশাল মিডিয়ায় এই ঘৃণার প্রচারকে খুব নিপুণভাবে সাহায্য করছে দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো।

আমরা প্রথম যখন রাজা এবং সোনম রঘুবংশী নিখোঁজ হওয়ার খবর পড়ি, তখন চিন্তিত হয়েছিলাম। কিন্তু সেই চিন্তাকে পুঁজি করে মেঘালয় এবং দেশের সম্পূর্ণ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের বিরুদ্ধে যেভাবে ঘৃণা ছড়ানো চলতে লাগল, তা থেকে আরও একবার প্রমাণিত হল যে আমরা দেশের কিছু অংশের মানুষের কতখানি অপরায়ন করে রেখেছি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে মেঘালয়ে পর্যটকরা ভিড় করে থাকেন, পর্যটন সে রাজ্যের এক বড় শিল্প। রাতারাতি মেঘালয় কতটা বিপজ্জনক জায়গা – তা নিয়ে প্রচুর লেখালিখি শুরু হয়ে গেল। সেখানকার মানুষ, বিশেষ করে উপজাতিগুলো, কতটা নৃশংস হয় তা নিয়ে জল্পনা শুরু হল। রাজার স্ত্রী সোনমকে সেখানকার মানুষ ধরে নিয়ে গিয়ে যৌন নির্যাতন করছে – এ সম্পর্কে বহু লোক সোশাল মিডিয়ায় নিঃসন্দেহ হয়ে গেল, তা নিয়ে দিনরাত চর্চা চলতে লাগল। এমনকি বেশকিছু মানুষ বলে দিলেন – দেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্ত থেকে এই দুজন নববিবাহিত দম্পতিকে বাংলাদেশে পাচার করে দেওয়া হয়েছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

রহস্য উপন্যাস যেরকম পাতায় পাতায় চমক নিয়ে আসে, এই সত্যি ঘটনাকেও আমাদের দেশের সংবাদমাধ্যম ঠিক সেভাবেই প্রচার করতে থাকল। কিছুদিন পর যখন রাজার মৃতদেহ পাওয়া গেল এবং পুলিসের সন্দেহের তীর সোনমের দিকে ঘুরে গেল, তখন ভোল পালটে গেলে টিভি চ্যানেল ও অনলাইন মিডিয়ায় সোনম সম্পর্কে নানারকম মুখরোচক তথ্য প্রচার হতে থাকল। সে কীভাবে বিয়ের আগের প্রেমিকের সঙ্গে বিয়ের পরেও যোগাযোগ রেখেছে বা বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরেও স্বামীর সঙ্গে যৌনসঙ্গমে রাজি হয়নি – এই নিয়ে নানা তথ্য টেলিভিশন সিরিয়ালের মত করে পরিবেশিত হতে থাকল। এত বিস্তারিত তথ্য তদন্তকারী পুলিস কিন্তু সংবাদমাধ্যমকে দিচ্ছিল না। ফলে এর মধ্যে যে কল্পনা মিশে নেই তা হলফ করে বলা যায় না। সোনমের প্রেমিকের সঙ্গে তোলা এক সেলফি প্রকাশ করে এক সংবাদপত্রের অনলাইন শাখায় লেখা হল ‘ব্রেকিং নিউজ – রাজ-সোনম একসাথে তোলা সেলফি খুঁজে পাওয়া গেল’।

আজকাল যখন সাধারণভাবে বন্ধুবান্ধব বা ক্লাসমেটের সঙ্গে দেখা হলেও মানুষ সেলফি তুলে রাখে, সেখানে এই ছবি কী করে ‘ব্রেকিং নিউজ’ হতে পারে, তা সাধারণ বুদ্ধিতে বোঝা অসম্ভব। সমস্যা হল, এই উত্তেজক হেডলাইন পরিবেশন যত বেশি হচ্ছে, তত বেশি করে সাধারণ ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীরা উত্তেজিত হয়ে উঠছে এবং বিদ্বেষপূর্ণ পোস্ট ও মন্তব্যে সোশাল মিডিয়া ভরিয়ে দিচ্ছে। সোনমকে কলকাতা বিমানবন্দর হয়ে আবার শিলঙে নিয়ে যাওয়া হবে – এই খবরের তলায় এক বাঙালি যুবক মন্তব্য করেন ‘কলকাতাতেই যখন আনছেন, তখন আর জি কর হাসপাতালে পাঠিয়ে দিন। বাকিটা আমরা বুঝে নেব।’ এই মন্তব্য থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রাজার খুনের শাস্তি চাওয়া হচ্ছে না, বরং সোনমের মত এক তরুণীর শরীরকে আর জি কর হাসপাতালের হতভাগ্য মৃত ডাক্তারের মত ধর্ষণের ইচ্ছা এই ব্যক্তির মধ্যে তৈরি হয়েছে।

একদিকে নববিবাহিতা তরুণীর যৌন জীবন নিয়ে নানারকম জল্পনা কল্পনা, তাকে ভোগ করার ইচ্ছা যখন এইভাবে প্রকাশিত হচ্ছে, অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে প্রচুর পুরুষ সোশাল মিডিয়ায় লিখছেন যে এবার থেকে বিয়ে করতে ভয় করবে। যেন দেশের সব মেয়েই অস্ত্র হাতে বসে আছে এবং কখন কীভাবে বরকে খুন করা যায় সেই ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। অথচ ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য দেখলে এদেশের কোনো মেয়ের আর বিয়ের সাধ হবে না। এনসিআরবি-র ২০২২ সালের পরিসংখ্যান আমাদের জানায় যে বিয়ের পর স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির লোকেদের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে সেবছর ৬,৪৫০ জন মহিলা মারা যান। জাতীয় মহিলা কমিশনের ওয়েবসাইট জানাচ্ছে, সবথেকে বেশি অভিযোগ আসে গার্হস্থ্য হিংসার। এই ঘটনাগুলোর অধিকাংশই পণ না দিতে পারার জন্যে বধূহত্যার ঘটনা। এই সামাজিক চিত্র সম্পূর্ণ অবহেলা করে দু-একজন পুরুষের স্ত্রীর দ্বারা অত্যাচারিত হওয়ার খবর এলে তা নিয়ে অতিরিক্ত হইচই করে আধুনিক নারীরা কত বিষাক্ত – তা নিয়ে আলোচনার ঝড় তুলে দেওয়া হচ্ছে।

আরও একটা ভুল তথ্য সোশাল মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। তা হল, ভারতের সব আইন মহিলাদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে থাকে। অথচ খুন বা চুরি ডাকাতির মত ফৌজদারি মামলায় অপরাধীর লিঙ্গ দেখে আইনের ধারা বদলে যায় না। এদেশের পণপ্রথা বিরোধী আইন বলছে, পণ দেওয়া এবং নেওয়া দুটোই অপরাধ। পারিবারিক হিংসা থেকে নারীকে সুরক্ষিত রাখতে আলাদা করে আইন তৈরি করতে হয়েছে তার কারণ এই ধরনের প্রচুর মামলা নথিভুক্ত হচ্ছিল। ২০০৫ সালের ন্যাশনাল ফ্যামিলি অ্যান্ড হেলথ সার্ভে অনুসারে, ৩৩.৫% মহিলাকে গার্হস্থ্য হিংসার শিকার হতে হয়। ১৯৬১ সালের পণপ্রথা বিরোধী আইনকে আরও শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে ১৯৮৩ সালে ভারতীয় দণ্ডবিধিতে নতুন ধারা ৪৯৮এ যোগ করা হয়। কিন্তু দেখা যায়, অনেক ভারতীয় মহিলাই পুলিসের কাছে গিয়ে নিজের পরিবারের নামে নালিশ করতে রাজি নয়। এই কারণেই আরেকখানা দেওয়ানি আইন তৈরি করা হয়। ২০০৫ সালে গৃহীত এই আইনের নাম গার্হস্থ্য হিংসা থেকে নারীদের সুরক্ষা আইন। সেই আইন অনুসারে, মেয়েদের পুলিশে অভিযোগ করার প্রয়োজন নেই। প্রত্যেক জেলায় ‘প্রোটেকশন অফিসার’ থাকবেন, যাঁরা মহিলাদের হিংসামুক্ত জীবনযাপন করতে সাহায্য করবেন। সেই আইনে বলা আছে, ওই আইন শুধুমাত্র একজন পুরুষের স্ত্রী ব্যবহার করতে পারবেন তা নয়। কারোর মেয়ে, মা বা বোনও পরিবারে নির্যাতিত হলে নালিশ জানাতে পারবেন। এই আইনগুলো তৈরির পিছনে ইতিহাস, বর্তমান প্রয়োগ – কোনোকিছুই জানার চেষ্টা না করে ‘মেয়েদের জন্যই দেশের সব আইন’ ইত্যাদি বলে এক ধরনের মত তৈরি করতে সাহায্য করছে কিছু টেলিভিশন চ্যানেল।

আরো পড়ুন অতুলের আত্মহত্যা পিতৃতন্ত্রেরই ফল, নারীবাদের দোষ নয়

ওদিকে মেঘালয়ের বেশকিছু সংগঠন দাবি জানিয়েছে, সংবাদমাধ্যম এবং সোশাল মিডিয়া ট্রোলরা মেঘালয় সম্পর্কে যে মিথ্যাচার চালিয়েছে, তার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। সেখানকার সরকার ক্ষুব্ধ, কারণ অন্য রাজ্যের মানুষ এসে সেই রাজ্যে খুন করল আর বদনাম হল তাদের রাজ্যের। পর্যটকদের স্বাভাবিক চলাফেরা বজায় রেখেও রাজ্যবাসীকে কী করে আরও বেশি নিরাপত্তা দেওয়া যায় – তা নিয়ে মেঘালয় সরকার নতুন করে ভাবনাচিন্তা শুরু করেছে।

মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব ইতিমধ্যে এক অদ্ভুত মন্তব্য করেছেন। সাংবাদিকরা তাঁকে এই খুন নিয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এটা খুবই দুঃখজনক ঘটনা এবং এই ঘটনা থেকে এটাই শেখা উচিত যে বাচ্চাদের বেশি দূরে যেতে যেতে নেই। অবশ্যই নববিবাহিত দম্পতি বাচ্চা নয়, তারা প্রাপ্তবয়স্ক এবং কোথায় মধুচন্দ্রিমা করতে যাবে সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাদেরই। কিন্তু মধ্যপ্রদেশ থেকে মেঘালয়ে যেতে দেওয়া উচিত নয় – এই মন্তব্য করে মন্ত্রীমশাই আবার উত্তর-পূর্ব ভারত সম্পর্কে ওঁদের ধারণা প্রকাশ করলেন। এদিকে সোশাল মিডিয়া বড় শক্ত ঠাঁই। সেখানে এ তথ্যও প্রকাশ হয়ে পড়েছে যে মোহনের নিজের মেয়েই মালদ্বীপে মধুচন্দ্রিমায় ব্যস্ত। অর্থাৎ এসব ‘সংস্কারী’ মতামত কেবল অন্যের ছেলেমেয়েদের জন্য নির্দিষ্ট।

সোনম ও তার প্রেমিকের চক্রান্তে রাজার খুন হওয়ার এই দুঃখজনক ঘটনা থেকে যদি আমাদের সত্যিই কিছু শেখার থাকে, তা হল প্রাপ্তবয়স্ক নারী পুরুষকে তাদের নিজেদের পছন্দের মানুষকে বিয়ে করার স্বাধীনতা দেওয়া দরকার। সোনমের পরিবার কেন তার প্রেমিকের সঙ্গে বিয়ে না দিয়ে তার অপছন্দের মানুষকে বিয়ে করতে বাধ্য করল – তা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে অসুবিধাটা জাতপাতের ছিল, নাকি শ্রেণিগত, তা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। এও মনে রাখা উচিত যে আমাদের দেশে অসবর্ণ বিবাহে সরকারি অর্থসাহায্য দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। সেই প্রকল্পে কারা উপকৃত হয়েছিলেন, বিয়ের ক্ষেত্রে কীভাবে জাতপাতের বাধা দূর করা যায় – সেসব নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন আছে। সোনম যদি দোষী সাব্যস্ত হন, তবে তাঁর উপযুক্ত শাস্তি হোক। কিন্তু ভবিষ্যতে বড়লোকের মেয়ে গরিব ঘরের ছেলেকে যেন বিয়ে করতে পারে এবং জাতপাত, ধর্ম ইত্যাদি কোনো বিয়েতে বাধা হয়ে না দাঁড়ায় – সেই লক্ষ্যে কাজ করে করে যাওয়া অনেক বেশি জরুরি।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.