১৯৬৪ সালের জুলাই মাসের শেষ দিন টোকিও অলিম্পিকের জন্য দল ঘোষণা করল ভারতীয় হকি ফেডারেশন। স্বভাবতই খুশি আক্রমণভাগের বাম প্রান্তিক খেলোয়াড় আলি সৈয়দ। সতেরো জনের দলে স্থান পেয়েছেন তিনি। তারকাখচিত দল, দুর্ধর্ষ ফরোয়ার্ড লাইন। হরবিন্দর সিং, যোগিন্দর সিং,ভিক্টর পিটার, হরিপাল কৌশিক, দর্শন সিং। প্রথম একাদশে জায়গা পাবার আশা অল্প; কিন্তু নির্বাচিত হতে পেরেই আনন্দিত কলকাতা হকি লিগে কাস্টমস দলের প্রধান অস্ত্র আলি সৈয়দ।

কিন্তু আলির হয়তো জানা ছিল না অলিম্পিক দলে স্থান পেয়ে তিনি ইতিমধ্যেই একটা অন্য ধরনের রেকর্ড গড়ে ফেলেছেন। সেই ১৯৪৮ সালে লন্ডন অলিম্পিকে শেষবারের মত কোনো ইসলাম ধর্মাবলম্বী খেলোয়াড় স্থান পেয়েছিলেন ভারতীয় দলে। তারপর থেকে অলিম্পিকগামী হকি দলে কোনো মুসলমান খেলোয়াড় নির্বাচিত হননি। পরপর তিনটি অলিম্পিকে এমনটাই হবার পর শেষ অবধি সেই “ট্র্যাডিশন” ভাঙলেন আলি সৈয়দ। সেখানেই তাঁর কৃতিত্ব।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

১৯৪৮ লন্ডন অলিম্পিকে কী এমন ঘটনা ঘটেছিল, তার সঠিক বিবরণ সংগ্রহ করা আজ এই ৭৩ বছর বাদে এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। কিন্তু পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের কিছু খেলোয়াড় ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছেন, ১৯৪৮ অলিম্পিক দলের দুই গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, আখতার হুসেন ও লতিফুর রহমান নাকি লন্ডন পৌঁছবার পর অলিম্পিক দলের সর্বময় কর্তা পঙ্কজ গুপ্তকে অনুরোধ করেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলা পড়লে তাঁদের যেন না নামানো হয়। ভাগ্যবশত সেবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতকে খেলতে হয়নি, ব্রিটেনকে ফাইনালে হারিয়ে সোনা নিয়ে ঘরে ফেরে কিষেন চাঁদের দল। কিন্তু শোনা যায় ফিরে এসে বিরক্ত পঙ্কজবাবু নালিশ জানান হকি ফেডারেশনে। তারপর থেকেই নাকি মুসলমান খেলোয়াড়দের মুখের উপর বন্ধ হয়ে যায় অলিম্পিকের দরজা।

ঠিক কী কারণে আখতার ও লতিফুর এমন মনোভাব দেখিয়েছিলেন, অথবা আদৌ এই ধরনের বেয়াড়া অনুরোধ তাঁরা করেছিলেন কিনা, তা যাচাই করবার মত আজ আর কেউ বেঁচে নেই। আমরা শুধু এটুকু জানি, দুজনেই ছিলেন অতীব কুশলী খেলোয়াড়, পরবর্তীকালে পাকিস্তানের হয়ে নেমেছিলেন মেলবোর্ন অলিম্পিকে। কিন্তু সেদিনের বিতর্কের ছোঁয়ায় নিঃসন্দেহে অসুবিধায় পড়েন পরবর্তী প্রজন্মের অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড়ই। আলি সৈয়দের সৌভাগ্য, তাঁর বেলায় পুরনো আক্রোশ পুষে রাখবার মত মানসিকতাকে প্রশ্রয় দেননি তৎকালীন নির্বাচকরা।

আজ ৫৭ বছর বাদে ভাবতে অবাক লাগে, ১৯৬৪ সালে অলিম্পিকগামী ভারতীয় হকি দলে আলি সৈয়দ একলা নন, ছিলেন আরও তিনজন বাংলার খেলোয়াড়। টানা চারটি অলিম্পিক খেলা, বাংলার সর্বকালের সেরা তারকা লেসলি ক্লডিয়াস ততদিনে ভারতীয় দলের বাইরে। কিন্তু তাছাড়াও ছিলেন গুরবক্স সিং, যোগিন্দর সিং, রাজেন্দ্রন ক্রিস্টি। শেষোক্ত জন অবশ্য কোনো ম্যাচেই মাঠে নামবার সুযোগ পাননি, প্রথম গোলকিপার শঙ্কর লক্ষণের ডেপুটি হিসাবেই কাটিয়ে দিয়েছিলেন সারা অলিম্পিক।

আসলে বাংলার হকির তখন প্রবল রমরমা। এই ক্রিস্টি খেলতেন মোহনবাগানে। ১৯৬৪ সালে সবুজ মেরুন ছিল ভারত কাঁপানো দল; বেটন কাপ চ্যাম্পিয়ন, লিগে ইস্টবেঙ্গলের পিছনে রানার্স আপ, এরপর মুম্বই উড়ে গিয়ে তারা জিতে নিয়ে এলো মুম্বই গোল্ড কাপ, আগা খান গোল্ড কাপ। দলের প্রধান স্তম্ভ স্ট্রাইকার ইনাম উর রহমান। তাঁর দাপটে কাঁপছে দেশের সেরা ডিফেন্ডাররা। অলিম্পিকের আগে অবধি ইনাম ভারতীয় দলেরও নিয়মিত খেলোয়াড়, অথচ সবাইকে অবাক করে টোকিওর দল থেকে বাদ পড়ে গেলেন তিনি। সম্ভবত তাঁর বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের কিছু নির্দিষ্ট অভিযোগ এনেছিল বাংলার হকি অ্যাসোসিয়েশন, যার জেরে নির্বাচকদের কোপ পড়ে ইনামের ওপর। যাই হোক, সেবার টোকিওর দলে বাংলার দুজন খেলোয়াড়, গুরবক্স ও আলি সৈয়দ, ছিলেন কাস্টমস দলের প্রতিনিধি, ইস্টবেঙ্গল থেকে যোগিন্দর এবং মোহনবাগানের ক্রিস্টি।

১৯৬৪ অলিম্পিক দলের অধিনায়ক নির্বাচিত হন চরণজিৎ সিং। এর ফলে কিছু ভুরু যে একেবারে কুঁচকে ওঠেনি, এমন দাবি মোটেই করা যাবে না। শঙ্কর লক্ষ্মণ, হরিপাল কৌশিক, উধম সিংয়ের মত সিনিয়রদের টপকে চরণজিৎ? কাজটা কি ঠিক হল, প্রশ্ন তুলেছিলেন অনেকেই, কিন্তু দলের কোনো সদস্য প্রতিবাদ না করায় অচিরেই থিতিয়ে যায় বিতর্ক।

গুরবক্সের মতে, “সেবার আমরা ছিলাম মরিয়া। চার বছর আগে রোমে আমরা অলিম্পিক সোনা হারিয়েছি, বেইজ্জত হয়েছি পাকিস্তানের হাতে। সেই সোনা আমাদের ফিরিয়ে আনতেই হবে, এই একটা ব্যাপারে আমরা দলের সবাই ছিলাম এককাট্টা। ১৯৬৪ টোকিও ছিল আমাদের অস্তিত্বের লড়াই। প্রতিদিন টিম মিটিং শেষ হত একটা কথা দিয়ে — জিততে আমাদের হবেই।”

অক্টোবর মাসের ১১ থেকে ২৩ তারিখ — এই ১৩ দিন যে মানের হকি খেলেছিল ভারতীয় দল, তার তুলনা বোধহয় এদেশের হকি ইতিহাসে বিরল। মাত্র ১৩ দিনে নয়টি ম্যাচ খেলেছিল ভারত; শুরু হয়েছিল বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে ২-০ জয় দিয়ে, শেষ হয়েছিল ফাইনালে পাকিস্তানকে এক গোলে হারিয়ে। পৃথ্বীপাল সিংয়ের সপাট পেনাল্টি কর্নার হিট পা দিয়ে আটকে দেবার চেষ্টা করেন মুনির আহমেদ। স্বভাবতই পেনাল্টি স্ট্রোকের নির্দেশ দেন আম্পায়ার। চল্লিশ মিনিটের মাথায় যখন এই স্ট্রোক নিতে এলেন মহিন্দর লাল, তখন দর্শকে পূর্ণ কমাজাওয়া স্টেডিয়ামে একটি শব্দ নেই, দম বন্ধ করে অপেক্ষা করছেন সবাই। বহু বছর বাদে এই প্রতিবেদককে মহিন্দর বলেন, “সেই মুহূর্তে আমার উপর চাপ ছিল প্রবল, কিন্তু আমি জানতাম আমাদের ভবিষ্যত নির্ভর করছে আমার এই একটা শটের উপর। একটু উঁচু করে তেরছা মেরেছিলাম বলটা। আব্দুল হামিদ নড়বার সুযোগ পায়নি।”

ওই এক গোলেই বাজিমাত। ১৯৬০ অলিম্পিকে সোনা ছিনিয়ে নিয়েছিল পাকিস্তান। ১৯৫৮ ও ১৯৬২ এশিয়ান গেমসেও সেই একই কাহিনীর পুনরাবৃত্তি। টোকিওতেও হেরে গেলে ভারতীয় হকির অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ত। বিপদটা টের পেয়েছিল হকি ফেডারেশনও। তাই অন্তত ১৯৬৪ টোকিওর আগে প্রস্তুতিতে কোনো ফাঁকি রাখেনি তারা। বছরের শুরু থেকেই বিদেশ থেকে বিভিন্ন দল এনে একের পর এক “টেস্ট” ম্যাচ খেলা হয়েছে। কলকাতায় কেনিয়া দল এসে খেলে গেছে উপভোগ্য ম্যাচ। মোহনবাগান মাঠে সেই খেলায় হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর ভারত জিতেছিল ইনাম উর রহমানের একমাত্র গোলে। এরপর আগস্ট, সেপ্টেম্বর, টানা দুমাস ভারতীয় দল সফর করেছে নিউজিল্যান্ড ও মালয়েশিয়া, খেলেছে অগুনতি ম্যাচ। তারপর মালয়েশিয়া থেকে সিঙ্গাপুর হয়ে সোজা টোকিও। নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান, কেউ সেদিন আটকাতে পারেনি ভারতকে।

পৃথ্বীপাল সিংয়ের অসাধারণ পেনাল্টি কর্নার হিট ও হরবিন্দর সিংয়ের মেশিনের মত গোল করবার ক্ষমতা, এই দুই অস্ত্রেই বধ হয়েছিল বেশিরভাগ প্রতিপক্ষ। আজ ৭৭ বছর বয়সে পৌঁছে অতি নম্র, নিরীহদর্শন হরবিন্দর কিন্তু একথা মানতে নারাজ।

“আমাদের আসল শক্তি ছিল দলগত সংহতি। মনে আছে অলিম্পিকের মাঝখানে আমার পায়ে চোট, মহিন্দর লাল অসুস্থ। জার্মানির সঙ্গে খেলা ড্র হল। পুরো টিম ম্যানেজমেন্ট দিশাহারা। সেদিন সারা রাত ধরে আমার পায়ে মালিশ করেছিলেন উধম সিং। উধম তখন জীবন্ত কিংবদন্তি, টোকিও আসবার আগেই তিনটি অলিম্পিক খেলা হয়ে গেছে। আমার বয়স তখন মাত্র কুড়ি। আমি সংকুচিত হয়ে পড়ছি দেখে উধমজি বললেন, “লজ্জার কিছু নেই, ভেবে নে তোকে পরের ম্যাচের আগে ফিট হতেই হবে। যেমন করে হোক। এমনই ছিল আমাদের টিম স্পিরিট।”

গল্পকথার মত লাগে, কিন্তু সেদিন ওই ১৭ জন শপথ নিয়েছিলেন সোনা আমাদের আনতেই হবে, যেন তেন প্রকারেণ। আজও যখন ফোনে নিজেদের মধ্যে মাঝেমধ্যে কথা বলেন তিন বৃদ্ধ — গুরবক্স, হরবিন্দর ও দর্শন, তখন অবধারিত উঠে আসে টোকিওর লড়াইয়ের গল্প।

আজ ৫৭ বছর বাদে সেই টোকিওতেই আবার লড়াই; অতিমারির যাবতীয় ভ্রুকুটি অগ্রাহ্য করে, যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে, আঁটঘাট বেঁধেই টোকিও পৌঁছেছেন মনপ্রীত সিং ও তাঁর দলবল। জাতীয় কোচ গ্রাহাম রিড বলেছেন ভারত এই মুহূর্তে বিশ্বের চার নম্বর দল হলেও তারা নাকি সোনা জয় করতে সক্ষম। টানা নয়টি অলিম্পিকে সেমিফাইনালে উঠতে পারেনি আটবারের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন ভারত। তাই তাদের নিয়ে খুব বেশি আশা কেউ করছে বলে মনে হয় না। আসলে হকিতে ভারত, পাকিস্তানের ব্যাকুল বাদল সাঁঝে দিন ফুরিয়েছে, হকির নিয়ন্ত্রণের ব্যাটন এখন ইউরোপীয় দেশগুলির হাতে, পিছিয়ে নেই ল্যাটিন আমেরিকাও। যে আর্জেন্টিনাকে আমরা মূলত দিয়েগো মারাদোনার দেশ নামে চিনি, তারাই কিন্তু গত অলিম্পিকের হকি চ্যাম্পিয়ন। প্রথম দুটি ম্যাচে আমাদের প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া। সেই ফাঁড়া কাটিয়ে উঠতে পারলে, তবেই পদকের স্বপ্ন দেখা শুরু করা যাবে।

এত কিছুর পরেও কিন্তু গুরবক্স বলেন, “সেদিন টোকিওতে যারা জিতেছিলাম, তাদের মধ্যে রয়ে গেছি হাতে গোনা পাঁচ-ছয় জন বৃদ্ধ। আমরা কিন্তু ঘুমোব না, চোখ থাকবে টেলিভিশনের পর্দায়। অধীর আগ্রহে পথ চেয়ে বসে থাকব আর একটি টোকিও স্বপ্ন পূরণের আশায়।”

ফাইনালের একাদশ:

শঙ্কর লক্ষণ; পৃথ্বীপাল সিং ও ধরম সিং; মহীন্দর লাল, চরণজিৎ সিং ও গুরবক্স সিং; যোগিন্দর সিং, ভিক্টর পিটার, হরবিন্দর সিং, হরিপাল কৌশিক ও দর্শন সিং।

১৯৬৪ টোকিও ওলিম্পিক্স ও ভারতীয় হকি টিম – ছবি উইকিপিডিয়া ও ওলিম্পিক্স এর ওয়েবসাইট থেকে।

1 মন্তব্য

Leave a Reply