কাবেরী কর গুপ্ত
সেই যে ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ঘোষণা করেছিল, তারপর থেকে প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে। এই একটা দিন অন্তত আমাদের মনে করিয়ে দেয়— ভাষা কেবলমাত্র যোগাযোগের প্রকাশভঙ্গি নয়, বরং স্মৃতি, জ্ঞান আর পরিচয়ের এক জীবন্ত সমষ্টি। কিন্তু এ তর্ক আজ হঠাৎ প্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে কেন?
কারণটা গভীর সংকটের। যেখানে সারা বিশ্বে ভাষার সংখ্যা সাত হাজারের আশেপাশে, সেখানে বহু ভাষাই হয় চিরতরে হারিয়ে গিয়েছে, নয়ত হারিয়ে যেতে বসেছে। ভাষাতাত্ত্বিকদের হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রায় ৮,৩২৪টি ভাষার অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে, যার মধ্যে এই মুহূর্তে ব্যবহার্য ভাষার সংখ্যা ৭,১৬৪। তবে সেই ব্যবহারের চিত্রটা চূড়ান্ত অসাম্যের— বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষের কথা বলার ভাষা মাত্র ২৫টি, বাকি কয়েক হাজারের মধ্যে বেশিরভাগই টিকে আছে গুটিকয়েক মানুষের মুখে মুখে।
ভাষাবিদ গ্যারি সিমন্সের মতে, প্রতি ৪০ দিনে একটি করে ভাষা হারিয়ে যায়। সেই একটি ভাষার সঙ্গেই হারিয়ে যায় তার বিপুল জ্ঞানভাণ্ডার। এই মুহূর্তে ভাষার এই মৃত্যুহারও বেশ উর্ধ্বমুখী। কারণটা খুব স্পষ্ট। নতুন প্রজন্ম আর সেই পুরনো ভাষায় আগ্রহী নয়, ওদিকে পুরনো মানুষগুলোও একে একে চলে যাচ্ছেন, ফলে ভাষার সার্বিক অস্তিত্বই ঘোর সংকটের মুখে পড়ছে।
বিজ্ঞানী ও ভাষাবিদরা তাঁদের গবেষণায় জীববৈচিত্র্য আর ভাষাবৈচিত্র্যের মধ্যে এক আশ্চর্য যোগাযোগ খুঁজে পেয়েছেন। দেখা যাচ্ছে, যে অঞ্চলে জীববৈচিত্র্য বেশি, সেখানকার ভাষাও বড় বৈচিত্র্যময়— বহুসংখ্যক ভাষার ভিড়। এহেন সহাবস্থানের প্রকৃত কারণ এখনো পুরোপুরি জানা সম্ভব হয়নি, তবে আমরা যদি ভৌগোলিকতার দিক থেকে বিচার করি, তাহলে দেখব দুক্ষেত্রেই পরিবেশ, সমাজ এবং সংস্কৃতির মিলিত প্রভাব রয়েছে।
২০১২ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, পৃথিবীতে যত ভাষা রয়েছে, তার ৭০ শতাংশেরই ঠিকানা সেইসব অঞ্চলে, যেখানে জীববৈচিত্র্যের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি (অর্থাৎ যেগুলোকে ‘বায়োলজিক্যাল হটস্পট’ বলা হয়)। এই ভাষাগুলোর বেশিরভাগই আঞ্চলিক ভাষা। ফলে জীববৈচিত্র্য বা প্রকৃতি-পরিবেশ যখন ধ্বংসের মুখে পড়ছে, ভাষার পরিণতিও সহজেই অনুমেয়। বেশিদূর যেতে হবে না, এর জোরালো উদাহরণ ভারতেই রয়েছে।
অরুণাচল প্রদেশের কথাই ধরা যাক। যে বৈচিত্র্যময়তা নিয়ে কথা বলছি, উত্তর-পূর্বের এই রাজ্যটি তার বিশুদ্ধ দৃষ্টান্ত। যেমন সেখানকার জীববৈচিত্র্য, তেমনই সেখানে অসংখ্য ভাষাগোষ্ঠীর বসবাস, তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিও বড় বিচিত্র। ১৯৯২ সালে যখন ওদিকে ফিল্ডওয়ার্ক করতে যাই, ওখানকার আরণ্যক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ হয়েছিল। স্থানীয় মানুষজন তো বটেই, সরকারি আধিকারিকদের সঙ্গেও নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। অরুণাচল পাহাড়িয়া রাজ্য, কিন্তু সমতলে যেটুকু যা বনজঙ্গল ছিল, ততদিনে সেসব কাটা পড়ছে। সগর্বে মাথা তুলেছে অসংখ্য কাঠ চেরাইয়ের কল। জঙ্গলবাসী মানুষ ক্রমশ শহরের দিকে সরে যাচ্ছেন।
ওই একই সময়ে, সরকারের উদ্যোগে শুরু হয়েছে আদিবাসী মানুষকে ‘মূল’ স্রোতে ফেরানোর প্রকল্প। প্রমিত সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় তাঁরা জায়গা পেয়েছেন। সরকার-নির্দিষ্ট ভাষায় পড়াশোনা করতে হয়েছে। এসবের চক্করে দিব্যি হারিয়ে গিয়েছে তাঁদের নিজস্ব পরিবেশ ভাবনা, অকৃত্রিম, আদিম ভাষাগুলো।
জঙ্গলবাসী মানুষকে আমাদের মত বই পড়ে পরিবেশ সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করতে হয় না, তার চারপাশের পরিবেশ থেকেই সে জ্ঞান রপ্ত করতে হয়। এটা আরও বেশি লক্ষ করেছি দক্ষিণ ভারতে কাজ করতে গিয়ে। তামিলনাড়ুর কালাক্কাড়-মুন্ডানথুরাই টাইগার রিজার্ভে আমি প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করেছি। সেইসময় অরণ্যবাসী মানুষের সঙ্গেই থেকেছি, তামিল ভাষা শিখেছি। তাতে সুবিধাও হয়েছে বিস্তর। ওখানকার যাঁরা স্থানীয় শিক্ষক, তাঁরাই আমার ফিল্ড সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। গাছগাছড়ার নাম, তাদের ব্যবহার, ভেষজ গুণাগুণ, স্থানীয় ভূমি-প্রকৃতি— সেসব সহকারীদের থেকে এমন নানা বিষয় শিখতে পেরেছিলাম। স্থানীয় মানুষের এহেন সহযোগিতা ছাড়া গবেষণা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না।
আজ যখন জঙ্গলবাসী মানুষকে ক্রমশ শহরের দিকে সরে আসতে হচ্ছে, বাধ্য হয়েই, আদিম সে ভাষাগুলোর বিপুল শব্দভাণ্ডারও ক্রমশ মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছে। দেখা গিয়েছে, যাঁরা জীবনের দীর্ঘ সময় জঙ্গলে কাটিয়েছেন, তেমন কিছু প্রবীণ লোকজনের মুখেই ওই আদিম শব্দগুলো কোনোমতে টিকে থাকে। তবে তাঁদের সংখ্যা আর কতটুকুই বা! আর বাস্তুচ্যুতি মানে তো কেবল ভাষার বিলুপ্তি নয়, সাংস্কৃতিক অভ্যাসেরও বিলুপ্তি।
অরুণাচল প্রদেশের কথা বলছিলাম। উত্তর-পূর্বের ওই রাজ্যটিতে ভাষাবৈচিত্র্য এক সময়ে এত বেশি ছিল যে, প্রায় প্রতিটি উপত্যকায় আলাদা জনগোষ্ঠীর আলাদা ভাষা (উপভাষা নয় কিন্তু)। ভাষাগত এই পার্থক্য বা নিজস্বতার সঙ্গে পরিবেশের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
আমার বেশ মনে পড়ছে, একজন সরকারি আধিকারিক আমায় বলেছিলেন, উচ্চ ফলনশীল ধানের বীজ নিয়ে স্থানীয় গ্রামবাসীরা খুব একটা আগ্রহী নয়। ওই একই আলোচনায় তিনি অবশ্য একথাও বললেন, শুধু অরুণাচলেই বুনো ধানের সংখ্যা পাঁচশোর কাছাকাছি— স্বাভাবিক পরিবেশ যত নষ্ট হয়ে আসছে, এসব বুনো ধানও আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষতি তো কেবল সাংস্কৃতিক ক্ষতি নয়, এ তো পরিবেশের সংকট।
ইতিহাস ঘাঁটলেও দেখা যাবে, ভাষার বিলুপ্তি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়।
দেশে দেশে যখন ইউরোপীয়দের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা হয়েছে, উপনিবেশবাদের অন্যতম অস্ত্র হিসেবে উঠে এসেছে ভাষা। ভাষাকে সেখানে ব্যবহার করা হয়েছে কৌশলে— শোষিত মানুষকে ক্রমশ শিকড়-বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে, ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের ইতিহাস, ঐতিহাসিক পরিচিতি। রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতেও জরুরি হয়ে উঠেছে ভাষাগত ক্ষমতা। বিরাট অংশের মানুষ নিজস্ব মাতৃভাষা হারিয়েছেন, তার ফলে শাসকের পক্ষে শিকড়-বিচ্ছিন্ন করার কাজটাও সহজ হয়েছে।
ঔপনিবেশিক মডেলের পরিবেশ সংরক্ষণ নীতিতেও সেই বিচ্ছিন্নতারই অনুশীলন আমরা দেখে এসেছি। মানুষকে সেখানে প্রকৃতির অংশ হিসাবে ধরা হয় না। ন্যাশনাল পার্ক বা জাতীয় উদ্যানের ধাঁচে অরণ্য সংরক্ষণের যে প্রাতিষ্ঠানিক চেহারার সঙ্গে আমরা কমবেশি পরিচিত, তার উৎপত্তি উনিশ শতকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক উপত্যকা অঞ্চলে। ওই অঞ্চলটাকে এখন আমরা ইয়োসেমিটি ন্যাশনাল পার্ক বলে চিনি।
মার্কিন প্রবাসকালে আমার দশ বছরের বেশি কেটেছে ইয়োসেমিটি ন্যাশনাল পার্কের কাছেই। স্থানীয় পরিবেশ বা মানুষের উপর এ ধরনের সংরক্ষণ নীতি কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা স্পষ্ট লক্ষ করেছি।
১৮৬৮ সালে জন মিউয়ার ক্যালিফোর্নিয়ার সিয়েরা নেভাদা পার্বত্য অঞ্চল অভিযানে যান। জন ছিলেন স্কটিশজাত মার্কিন পরিবেশবিদ, জাতীয় উদ্যানের ভাবনা তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত। সিয়েরা নেভাদার অসামান্য প্রাকৃতিক নৈসর্গ তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। কিন্তু সভ্য, শিক্ষিত জন মিউয়ার জানতেন না, ওই বিশুদ্ধ সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে সর্বগ্রাসী বিপদ। অঞ্চলটা বরাবরই দাবানল-প্রবণ, কিন্তু ওখানকার নর্দার্ন পাইয়ুট আর সিয়েরা মিওয়াকের জনগোষ্ঠীর মানুষজনের কাছে সে আগুন নিয়ন্ত্রণের কৌশল জানা ছিল।
যদিও, ১৮৫১ সালেই দুই জনগোষ্ঠীরই বহু মানুষকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাঁদের জায়গা হয়েছে সরকার-নির্দিষ্ট জমিতে, পরে অবশ্য সেখান থেকেও উৎখাত হয়েছেন তাঁরা। আজ নর্দার্ন পাইয়ুট টিকে আছে মাত্র কয়েকশো মানুষের মুখে, সিয়েরা মিওয়াক ভাষায় কথা বলেন গুটিকয়েক লোক।
সিয়েরা নেভাদা বা লস অ্যাঞ্জেলেস অঞ্চলে গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকবার ভয়াবহ দাবানলের ঘটনা ঘটেছে। সমস্যাটা উত্তরোত্তর বাড়ছে। নিয়তির এমনই পরিহাস, এ সমস্যার পাকাপাকি সমাধান যাঁরা দিতে পারতেন, সেই জঙ্গলের মানুষগুলোকেই তাড়িয়ে ছেড়েছে ‘সভ্য’ রাষ্ট্র। মার্কিন মুলুকের অন্যত্রও নগরায়নের প্রভাব মোটামুটি একই। নয়ের দশকের মাঝামাঝি অ্যারিজোনার সোনোরান মরুভূমিতে যাই। তখনই দেখছি, ফিনিক্সের (অ্যারিজোনার রাজধানী শহর) আশেপাশে ব্যাপক সম্প্রসারণ শুরু হয়েছে, পরিবেশ ক্রমশ বদলাচ্ছে।
আরো পড়ুন বাংলা শব্দগুলো যথাসময়ে আমার মনের বাগানে ফুটে উঠেছে
গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, মেসকোয়াইট আর কটনউডের সংখ্যা কমে আসার ফলে কেবল পরিবেশেরই ক্ষতি হয়েছে তা নয়, আতান্তরে পড়েছেন স্থানীয় মানুষও। কারণ এই গাছগুলোর সঙ্গেই যে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তাঁদের প্রাত্যহিক জীবন, আচারবিচার, সবকিছুই!
ভূমি-প্রকৃতি যত বদলায়, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ততই অর্থহীন হয়ে ওঠে লোকাচার, লোকগান। পরিস্থিতি এমন, ভাষাবিদরা সতর্ক করছেন, এই মুহূর্তে যদি পুনরুজ্জীবনের সদর্থক উদ্যোগ না নেওয়া হয়, একুশ শতক শেষ হতে হতে ৯০% ভাষাই মোটামুটি হারিয়ে যাবে।
এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয়, ভাষার ক্ষেত্রেও বহুত্বের অনুশীলনই যেখানে স্বাভাবিক চিত্র— প্রায় ৬০% মানুষ একাধিক ভাষায় কথা বলতে পারেন— সেখানে রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রদর্শনের হাতিয়ার হয়ে উঠছে ‘এক দেশ, এক ভাষা’ মার্কা বহুত্ববিরোধী নীতি। ‘বহুভাষা নীতি শিক্ষার অন্তরায়’ কথাটা যে সর্বৈব মিথ্যা, তা অনেক আগেই প্রমাণিত। গবেষণায় বরং দেখা গিয়েছে উল্টোটা। একাধিক ভাষাজ্ঞান বহু ক্ষেত্রেই বাড়তি সুবিধা দেয়।
লেখক ও দার্শনিক র্যালফ ওয়াল্ডো এমার্সন বলেছিলেন, ভাষা আসলে ইতিহাসের লেখ্যাগার। ভাষাবিদ নিকোলাস ইভান্স লিখেছিলেন, ভাষা কেবল মানব মস্তিষ্কের ভাবক্ষমতারই প্রকাশ নয়, ভাষার আধারেই ধরা থাকে সমৃদ্ধ মানবেতিহাস। তাঁদের কথার সূত্র ধরেই বলা যায়, একটা ভাষা হারানো মানে জগতকে বোঝার সুদীর্ঘ যাত্রায় আরও একটি রাস্তা হারানো।
ভাষা কেবল ব্যক্তি-অবহেলায় হারায় না— ভাষা হারায় যখন বন কে বন একেবারে সাফ হয়ে যায়, যখন নদীর পথ রুদ্ধ হয়, যখন শিকড় উপড়ে ফেলা হয়, এবং অবশ্যই, যখন মানুষ ঘরছাড়া হয়। ফলে ভাষার বিলুপ্তি কোনো দুর্ঘটনা নয়, এমনকি স্বাভাবিক ঘটনাও নয়। একথা আমাদের স্বীকার করতেই হবে, ভাষার বিলুপ্তি একটি আপাদমস্তক পরিকল্পিত ঘটনা।
নিবন্ধকার পেশায় বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল সায়েন্সেসের সঙ্গে যুক্ত। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








