শিলালিপিকে সাহিত্যের ধারায় গণ্য করলে বলতেই হয়, কন্নড় সাহিত্যের ঐতিহাসিক মূল কয়েক সহস্রাব্দ প্রাচীন। শ্রবণ বেলগোলার শিলালিপি হোক বা বেসাভার কবিতা, বীরশৈব আন্দোলনের ভক্তিসাহিত্য হোক কি দাসিমল্লার পুথি – কর্ণাটকের সাহিত্যধারা কখনো রাষ্ট্রকেন্দ্রিক আখ্যান বহন করেছে, কখনো আবার তাতে মুখরিত হয়েছে বিদ্রোহের ধ্বনি। তবে এই সমস্ত সাহিত্যকর্মের সুর কিন্তু বরাবরই বাঁধা ছিল পুরুষকণ্ঠেই। ভারতবর্ষের তামাম আঞ্চলিক সাহিত্যে কোনোকালেই এর অন্যথা হয়েছে কি? নারীকণ্ঠ রয়ে যেত প্রান্তিক, দমিত, অনুল্লিখিত। একেবারে ব্যতিক্রমী দু-একটি সাহসী কণ্ঠ শোনা গেছে আলেকালে, তবু সামগ্রিকভাবে, অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষার মতই, কন্নড় সাহিত্যে নারীর ক্রিয়াশীল অংশগ্রহণ ছিল দ্বিধাগ্রস্ত, বাধাগ্রস্ত এবং শেষমেশ তা সম্ভব হলেও তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল যৎসামান্য। তবে নারীকণ্ঠের এই একটানা গুরুত্বহীনতার মোড় ঘুরতে শুরু করে বিশ শতকের মধ্যভাগে। নারী লেখকদের উত্থান ঘটছিল পালাক্রমে। প্রথমে কিছু সমাজসংস্কারমূলক প্রবন্ধের মাধ্যমে শুরু, তারপর সাতের দশক থেকে এক স্বতন্ত্র,আত্মানুসন্ধানী, ভাষাগতভাবে সমৃদ্ধ/ভাষাবিন্যস্ত এবং গভীরভাবে অভিজ্ঞতানির্ভর লেখনীর উদ্ভব।
ভারতবর্ষের আঞ্চলিক সাহিত্যে নারীকণ্ঠের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে নানা পর্বে, নানা মাত্রায়। তবে হাতেগোনা যে গুটিকয়েক মানুষ নিছক ‘নারীবাদী লেখক’ হিসাবে নন, বরং একটি বিকল্প ভাষা নির্মাণের মধ্য দিয়ে নারী যাপনের গভীরতম সত্তা ও সংকটকে তুলে ধরেছেন – বানু তাঁদেরই অনস্বীকার্য প্রতিনিধি। নিজস্ব বাস্তবতার বুননে যিনি সমাজ-ধর্ম-লিঙ্গের গভীর সংকটকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে, নাগাড়ে লিখে গেছেন নারী প্রান্তিকতার রোজনামচা। তাঁর লেখনী কেবলমাত্র সাহিত্যিক অভিব্যক্তি নয়, বরং তার ছত্রে ছত্রে রয়েছে স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান। তা একপ্রকার প্রতিরোধমূলক ইশতেহার – যেখানে শরীর, যৌনতা, ধর্ম, সমাজ এবং নারীত্ব এক অদ্ভুত জটিলতায় আবর্তিত হয়ে নির্মাণ করেছে সাহিত্যের নতুন আঙ্গিক।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
বানু মুশতাকের গল্পের আত্মা জুড়ে রয়েছে সূক্ষ্ম ব্যক্তি যন্ত্রণা, ধর্মীয় আদর্শ ও সামাজিক দ্বিচারিতা এবং নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার আখ্যান। মুসলমান নারীদের দৈন ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সার থেকে গড়া প্রতিটি চরিত্র যেন একেকটি জীবন্ত প্রমাণপত্র, যা কল্পনার জগৎ থেকে উৎসারিত হয়েও চিৎকারসর্বস্ব নারীবাদের আড়ম্বরে আটকে থাকে না। সমাজ-রাজনীতি-ধর্মের প্রতিটা স্তরের অন্তর্বাস নির্বিঘ্নে খুলে ফেলে তাদের অন্তর্নিহিত কঙ্কাল দর্শন করায়।
বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে অন্যতম স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক বুকার বিজয়ী হয়েছেন বানু। তাঁর ছোটগল্প সংকলন হার্ট ল্যাম্প-এর অনুবাদ করে পুরস্কৃত হয়েছেন দীপা ভাস্তিও। আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কারের মত সম্মান শুধুই লেখকের ব্যক্তিগত সাফল্য স্মারক নয়, বরং এক ধরনের সাংস্কৃতিক গ্রহণযোগ্যতা বা বৈধতা প্রদানও বটে। একটি ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বমঞ্চে স্থান করে নেওয়ার জন্য উন্মুক্ত আমন্ত্রণ। ইংরিজিতে অনুবাদ হওয়া সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসাবে এই পুরস্কার দীর্ঘদিন ধরেই এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত। কেবল অনুবাদের কৃতিত্বস্বরূপ নয়, বরং এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনের জন্যও। সলমন রুশদি, অরুন্ধতী রায়রা অনেক আগেই ইংরিজিতে মৌলিক সাহিত্য রচনায় বুকার জয় করেছেন। তবে ভারতীয় আঞ্চলিক ভাষায় লেখা কোনো সাহিত্য যখন আন্তর্জাতিক বুকার অর্জন করে, তখন বিষয়টি কেবল একটি সাহিত্যকর্মের সাফল্য থাকে না, বরং এক সাংস্কৃতিক স্বরকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার মুহূর্ত হয়ে ওঠে। এই স্বীকৃতি ভাবতে সাহস যোগায় যে ভারতীয় আঞ্চলিক ভাষা সাহিত্যে এমন কিছু শক্তি ও সৌন্দর্য নিহিত আছে, যা বিশ্বসাহিত্যের দীর্ঘ ঐতিহ্যের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াতে সক্ষম। এই প্রাপ্তি আশা জাগায়, ভারতীয় ভাষার বিপুল সাহিত্যভাণ্ডার এবার অনুবাদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রবেশ করবে এবং বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রে ভারতীয় ভাষা সাহিত্য নিজস্ব আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠবে – প্রান্তিক সাহিত্য হিসাবে নয়, বরং এক শক্তিশালী, স্পষ্ট ও সমান অংশগ্রহণকারী হিসাবে।
প্রশ্ন হল, বানুই কেন? হয়ত হার্ট ল্যাম্প শুধুই সাহিত্যিক উৎকর্ষ নয়, এক বিশেষ জীবনযাত্রার অপরিশোধিত নির্যাস বলে। শুধুই ঘটনাবহুল সাহিত্য পাঠ নয়, পাঠকের মনে এক সামগ্রিক চেতনার উন্মেষ ঘটায় বলে। বানু আসলে শুধুই মুসলমান নারীদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেননি, বরং প্রতিটি চরিত্রের মধ্যে দিয়ে ভারতীয় সমাজে নারীর শরীর ও মনকে ঘিরে যেসব সীমারেখা তৈরি হয়েছে, তা ভেঙে ফেলার সম্ভাব্যতাকে উসকে দিয়েছেন। নারী অভিজ্ঞতার রাজনৈতিক রূপায়ণ ঘটিয়েছেন। মুসলিম নারীর জীবনকে শুধুই ভুক্তভোগী হিসাবে দেখান না তিনি। বরং দেখান, কীভাবে একক নারী সমাজের ভিতরেই প্রশ্ন তোলে, নীরবে প্রতিবাদ করে, ক্ষেত্রবিশেষে প্রচলিত নিয়মকানুনে চিড় ধরায়। কন্নড় ভাষায় লেখা একটি গল্প সংকলন বিশ্বসাহিত্যকে দেখিয়ে দেয় যে ভারতীয় মুসলমান সমাজের আভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতাও আধুনিক নারীবাদ, সমাজতাত্ত্বিক চিন্তাভাবনা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণের অংশ হতে পারে।
বানু যখন কন্নড় সাহিত্যে পা রাখেন, ততদিনে নারীবাদী লেখালিখির একটা ঢেউ উঠেছে। ভৌগোলিক ও ভাষাগত বৈচিত্র্য সত্ত্বেও সমগ্র ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নারীকেন্দ্রিক সাহিত্যের চিত্র তখন প্রায় একইরকম। সময় তার নিজের গরজেই নতুন অভিব্যক্তির খোঁজ চালাচ্ছে। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে বানু মুশতাকের নবীন কণ্ঠস্বর প্রবেশ করছে কন্নড় সাহিত্যে – একজন নারী, তদুপরি একজন মুসলমান, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক শ্রেণির প্রতিনিধি হয়ে। বানু মুশতাকের গল্প পড়ার সময়ে আমরা বারবার লক্ষ করি নারীবাদের সঙ্গে ধর্ম ও শ্রেণির সমন্বয়ে এক নতুন মাত্রার সৃষ্টি। মুসলমান নারী, নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবেশ, সামাজিক অবদমন এবং যৌন রাজনীতির সংমিশ্রণে গড়ে ওঠে একের পর এক গল্প। তাঁর লেখার এই স্বাতন্ত্র্য গল্পসাহিত্যকে এক গভীর সামাজিক বাস্তবতার রূপ তো দিয়েছেই, পাশাপাশি কন্নড় ভাষায় এক নতুন ধারার প্রবর্তন করেছে – যা নারীর শরীর, অভিজ্ঞতা, ভাষা, ধর্ম, কামনা, নিপীড়ন এবং সমাজ-রাজনীতিকে সাহিত্যের প্রবহমান স্রোতে এনে ফেলেছে সরাসরি। শুধু কন্নড় সাহিত্যে নয়, দক্ষিণী আঞ্চলিক সাহিত্যেও সংযোজিত হয়েছে এক ভিন্ন নারীকেন্দ্রিক ও ধর্মসচেতন দৃষ্টিভঙ্গি।
বানু লিখতে শুরু করেন সাতের দশকের একদম শেষভাগে। এই সময়েই তিনি যুক্ত হয়েছিলেন বান্দায়া সাহিত্য আন্দোলনের সঙ্গে, যার মূল লক্ষ্য ছিল দলিত, নারী ও প্রান্তিক সমাজের বাস্তবতাকে সাহিত্যে তুলে ধরা। মূলধারার সাহিত্যকে অভিজাত ভাষার গিঁট থেকে মুক্ত করে ভাষাকে সমাজ বদলের দেহাতি হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। বান্দায়া সাহিত্যের মূলে ছিল প্রতিবাদের চেতনা – জাতিগত নিপীড়ন, শ্রেণিবৈষম্য, লিঙ্গভিত্তিক শোষণ এবং ধর্মীয় ভণ্ডামির বিরুদ্ধে সরাসরি সংঘর্ষ। ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রাতিষ্ঠানিক অবিচার এবং সামাজিক কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের এক মঞ্চ। বানু এই আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করে মুসলিম নারীদের অভিজ্ঞতাকেন্দ্রিক গল্পে পিতৃতন্ত্র, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য এবং ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ সমালোচনা উপস্থাপন করেন, যা বান্দায়া আন্দোলনের প্রতিবাদী চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
তবে বান্দায়া সাহিত্য আন্দোলন শুরুতে যতটা প্রভাবশালী ছিল, পরবর্তীকালে ঠিক ততটাই সমালোচনার সম্মুখীন হয়। কেউ কেউ মনে করেন, এটি অতিরিক্ত রাজনৈতিক হয়ে পড়ায় শৈল্পিক গুণমানের প্রতি পর্যাপ্ত মনোযোগ দেয়নি, ফলে বক্তব্য একঘেয়ে হয়ে অনেকসময় সাহিত্যের চেয়ে রাজনৈতিক স্লোগানের প্রাধান্য বেশি হয়ে গেছে। এছাড়া এই আন্দোলন একটি নির্দিষ্ট আদর্শের প্রতি অতিরিক্ত আনুগত্য প্রদর্শন করে সাহিত্যের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করেছে। তাছাড়া পুরুষ প্রাধান্য তো ছিলই। নারী লেখকদের অবদান থাকলেও তা ছিল তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত। তবে বানুর উত্থানকে এই সমালোচনার জবাব হিসাবে দেখা যেতে পারে। ক্রমে তিনি এই আন্দোলনের এক কেন্দ্রীয় মুখ হয়ে উঠলেন। তবে তিনি নিজেকে কোনো সাহিত্য আন্দোলনের সংকীর্ণতায় বেঁধে রাখেননি। বরং তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টিতে চরিত্রগুলির অস্তিত্ব খুঁড়ে তুলেছেন, তুলে ধরেছেন তাদের মৌলিক সংকট ও নিঃসঙ্গতার ভিতরের সত্তাকে। আর তাই তাঁর গল্পগুলো পুনর্পাঠের আহ্বান জানায়। বানু সেই বিরল কণ্ঠ, যিনি দক্ষিণ ভারতের মুসলিম নারীদের জীবনানুভব, ভাষা ও কথ্যভাষা, দৈনন্দিন সংস্কৃতিকে সাহিত্যের মূলধারায় টেনে এনেছেন। তবে একটু খতিয়ে ভাবলেই স্পষ্ট হয়, ওঁর সাহিত্য কিন্তু কেবল কর্ণাটকের মুসলিম সমাজ-সংস্কৃতির গণ্ডিতে আটকে থাকে না, বরং তা বিশ্বব্যাপী নারীবাদী চেতনা এবং উত্তর-উপনিবেশবাদী ভাবনার সাথেও সমন্বয় সাধন করে। যেখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা রাজনীতি হয়ে দাঁড়ায়, আর স্থানীয় বাস্তবতা ছুঁয়ে যায় একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক দর্শনের সুর।
বানুর বেড়ে ওঠা কর্ণাটকের এক মধ্যবিত্ত মুসলমান পরিবারে। জীবনের বিরাট অংশ কেটেছে ধর্মীয় রক্ষণশীলতার অনুশাসন ও শৃঙ্খলার ঘেরাটোপে। বিবাহ পরবর্তী সময়েও তাঁর উপর আরোপিত হয় একের পর এক নিষেধ, এমনকি মতপ্রকাশের ক্ষেত্রেও ছিল অজস্র বিধিনিষেধ। বাধ্য হয়ে ছাড়তে হয় স্কুলের শিক্ষকতার চাকরিও। অবিরাম দমনই তাঁকে উপলব্ধি করায় – ধর্ম, লিঙ্গ ও শ্রেণি কীভাবে একত্রে নারী জীবনকে এক অনিবার্য বদ্ধ ত্রিভুজে কয়েদ করে রেখেছে। এই অমোঘ উপলব্ধিই তাঁকে ঠেলে দিয়েছিল সৃজনের দিকে – যেখানে নিজস্ব ক্ষোভ, আক্ষেপ ও প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পেয়েছেন। তাঁর লেখালিখির শুরু যেন ছিল এক আত্মরক্ষার কবচ, নিজের অস্তিত্বকে লিপিবদ্ধ রাখা। কিন্তু তা শুধু আত্মজৈবনিক প্রকাশে থেমে থাকেনি, বরং তাঁর লেখা হয়ে উঠেছে এক বৃহত্তর নারীকণ্ঠ।
বানু ছিলেন পেশায় আইনজীবী ও সাংবাদিক। কর্মক্ষেত্রই তাঁকে অসাম্য, বৈষম্য এবং তথাকথিত নিরপেক্ষ কাঠামোগুলোর ভিতরে সেঁধিয়ে থাকা ক্ষমতার রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। ধর্ম যেমন নারীর উপর নিষেধাজ্ঞা লাগু করে, তেমনি রাষ্ট্র, আইন এবং পারিবারিক কাঠামোও নারীকে নিয়ন্ত্রণ ও নিঃশব্দ করতে চায়। এই উপলব্ধি তাঁর গল্পের সর্বত্র প্রতিফলিত।
বানুর পন্থা ভীষণ স্পষ্ট। তিনি কেবল ‘নারীর জন্য’ লিখছেন না, বরং নিজেই হয়ে উঠছেন সেই নারীর নিজস্ব কণ্ঠস্বর। নারী অভিজ্ঞতা এখানে শুধু মাত্র বিষয় নির্বাচনে আটকে থাকে না, হয়ে ওঠে গল্পের আভ্যন্তরীণ কাঠামো। বানুর নারী চরিত্ররা সেখানে একমাত্রিক নয়। তারা নিপীড়িত বটে, কিন্তু একেবারে স্তব্ধ নয়। ভীষণ ক্ষোভে ফেটে পড়তে না পারলেও তারা দেখে, বোঝে, প্রশ্ন তোলে। সুযোগ পেলে কৌতুক করে, নিজের শরীর ও অভিজ্ঞতাকে গোপন না রেখে তা সাহস করে উচ্চারণ করে। অবলা নয়, এরা পর্যবেক্ষক। নীরব, কিন্তু তীক্ষ্ণ; অনুচ্চারিত, অথচ বিদ্রুপপ্রবণ। পুরুষের অবান্তরতায় সে সজোরে আঘাত না করলেও মুচকি হেসে উপহাস করতে জানে।
বানুর সাহিত্যকীর্তির অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য হল তাঁর ভাষার নির্মাণ এবং আখ্যান বিন্যাসের কৌশল। এই ভাষা কোনো আড়ম্বরপূর্ণ সাহিত্যিক প্রদর্শন নয়, বরং তাঁর ভঙ্গিমা সরল, সংবেদনশীল। তীক্ষ্ণ বুদ্ধিদীপ্ত এবং সূক্ষ্ম কৌতুকবোধে পরিপূর্ণ। তাঁর লেখায় একদিকে যেমন দেখা যায় গ্রামীণ কন্নড় শব্দভাণ্ডারের সহজাত ব্যবহারের আত্মবিশ্বাস, তেমনই অন্যদিকে মুসলিম ঘরানার কথ্যরীতি, নারীর ঘরোয়া বাক-প্রবাহ, আভ্যন্তরীণ সংলাপ ও সামাজিক ইঙ্গিতের এক অভিনব মিশেল। এই ভাষা কোনো নির্ভেজাল সাহিত্যিক পরিসর থেকে আসেনি। এসেছে নির্মম অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ এবং রোজকার কথোপকথন থেকে। এই ভাষা-আঙ্গিক স্বতঃস্ফূর্ত অথচ মননশীল, সমসাময়িক প্রচলিত কন্নড় সাহিত্যের প্রধান ধারার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সহকালীন প্রচলিত সাহিত্যের চলন তখন ছিল একরৈখিক, বাকরীতি ছিল কাঠামোবদ্ধ এবং পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নির্মিত। সেখানে বানু আনলেন ভাঙন – এক অন্তর্গত প্রতিবাদ, এক বিকল্প চেতনা নিয়ে। শুরু হল এক বিকল্প ভাষার নির্মাণ। কন্নড় সাহিত্যে যে ধরনের নির্মিত বাস্তবতা বা নিটোল বর্ণনার পরম্পরা ছিল, মুশতাক সেখানে অসম্পূর্ণতা, বিচ্ছিন্নতা ও প্রতিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। তাঁর ভাষা ঘটনা বর্ণনার বাহক ছিল না। এক ধরনের আভ্যন্তরীণ সংলাপ, যেন এক অন্তর্লীন লড়াইয়ের সরঞ্জাম। এই ভাষাকে কোনো নিটোল ছন্দের দুলকি চালে সীমাবদ্ধ করেননি তিনি। অলঙ্কারপ্রেমী ছন্দের বাহারে ভাসিয়ে দেননি। রয়েছে ছন্দের ভাংচুর, অপ্রত্যাশিত নীরবতা, পরস্পর সংযুক্তিহীন সংলাপের আলগা কোলাজ। কখনো কখনো পুরো গল্পই যেন একটি দীর্ঘশ্বাস বা কিছু অস্ফুট বিরোধ। এই ভাষা পাঠককে চুম্বকের মত টানে না, বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত চমকেও দেয় না। তবে পাঠককে কেবল দর্শক বা শ্রোতা নয়, বরং নারীর অন্তর্গত অভিজ্ঞতার শরিক করে তোলে। পাঠক নিজেই যেন গল্পের আভ্যন্তরীণ সংলাপের সক্রিয় অংশীদার হয়ে ওঠেন। শব্দের মধ্যেই ঘনীভূত হতে থাকে সংবেদন, প্রতিক্রিয়া, এমনকি রাজনৈতিক প্রতিবাদও।
বানুর প্রকৃত স্বাতন্ত্র্য এই যে, তাঁর লেখায় ধর্ম ও লিঙ্গ রাজনীতি এক আভ্যন্তরীণ জিজ্ঞাসা। যা শুধু সংঘাতের নয়, অনুসন্ধানেরও বিষয়। শুধু কন্নড় সাহিত্যেই নয়, হয়ত সমগ্র ভারতীয় আঞ্চলিক সাহিত্য পরিসরেও এ জিনিস বিরল। বানুর নারীবাদ পুরুষবিরোধিতার সরল ছকে বাঁধা নয়; বরং এক গভীর কাঠামোবিরোধিতা। যেখানে পরিবার, শরীর, ধর্ম, ভাষা এবং চিন্তার প্রতিটি স্তর নির্মম বিশ্লেষণের আওতায় আসে। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি পিতৃতন্ত্রকে ব্যক্তি নয়, একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিন্যাস হিসাবে দেখার সাহস রাখে। শুধুই ভারতবর্ষ নয়, উপমহাদেশের সাহিত্যভাণ্ডার তোলপাড় করে ফেললেও মূলত দেখা যায় – মুসলমান নারী জীবনের গল্প মানেই মৌলবাদের তীব্র প্রতিচ্ছবি। কিন্তু বানু দেখিয়েছেন, একজন মুসলমান নারীর জীবনের মানে কেবল বোরখা, তালাক, পর্দা কিংবা জমি-সম্পত্তির হিসাবনিকাশ নয়; এই জীবনে থাকে মাতৃত্বের অনুভব, দুঃস্বপ্নের ঘনঘোর, শরীরের ক্ষরণ ও ক্ষোভ, ধর্মীয় শাসনের প্রতি অমত, যৌনতার অনির্বাচিত উন্মোচন, শিশুকালের বিষাদ আর নিঃসঙ্গতায় ঈশ্বরের সঙ্গে একান্ত কথোপকথন।
বানু ইসলাম ধর্মকে কখনো ভয়, কখনো আশ্রয়, আবার কখনো প্রশ্নের উপযুক্ত ক্ষেত্র হিসাবে স্থাপন করেছেন। তাঁর সাহিত্যে ধর্ম শুধু বিশ্বাসের বিষয় নয়। তা আলোচনার, বিশ্লেষণের, এমনকি বিরুদ্ধতারও জায়গা। ফলে তাঁর লেখালিখি ধর্মীয় মৌলবাদীদের রোষে বহুবার পড়েছে। ফতোয়া জারি হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে, হুমকি এসেছে মৌলিক অধিকার খর্ব করার। শুধু তাই নয়, কন্নড় সাহিত্যের পিতৃতান্ত্রিক মূলধারাও তাঁকে আক্রমণ করেছে, তাঁর লেখাকে ‘অসৌজন্যমূলক’, ‘পরিবারবিরোধী’ এবং ‘ভাষাগত বিশৃঙ্খলা’ বলে অপবাদ দিয়েছে। তবু তিনি থামেননি। থেমে যাওয়া তাঁর স্বভাবই নয়।
তাঁর প্রতিটি গল্পেই ধর্ম ও নারীর সম্পর্ক এক অন্তরঙ্গ, অথচ সংঘাতময় প্রেক্ষিতে উপস্থাপিত হয়। তিনি বিশ্বাস করেন – ইসলাম নিজ গঠনে মানবিক, কিন্তু সমাজ ও পিতৃতান্ত্রিক চর্চায় তা প্রায়শই নারীর প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ নয়, দমনমূলক। এই দ্বৈততা – আস্থার আর দ্বন্দ্বের – বানুর সাহিত্যিক ভাবনার মূল স্তম্ভ। তিনি ধর্মীয় কুসংস্কার ও রক্ষণশীলতাকে দ্বিধাহীনভাবে চ্যালেঞ্জ করেন। কখনো প্রশ্ন করেন পর্দার অনুশাসনকে, কখনো তালাকের একতরফা বিধানকে, কখনো ধর্মীয় নেতৃত্বের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণকে। তবে এই প্রশ্ন করা ধর্মবিরোধী অবস্থান নয়, বরং ধর্মের অন্তঃস্থলে গিয়ে মানবিক মূল্যবোধের খোঁজ, এক মানবিক জিজ্ঞাসা। তাঁর সাহিত্যে ধর্ম একটি অনিবার্য সামাজিক বাস্তবতা, কিন্তু তা প্রশ্নাতীত নয়। তিনি নারী অভিজ্ঞতাকে ধর্মীয় বলয়ের মধ্যে নিয়ে গিয়ে দেখান – এই বলয় নারীকে আচ্ছন্ন করতে চাইলেও নারী তার ভিতর থেকেই প্রতিবাদ জানাতে শিখছে। কখনো শারীরিক ভাষায়, কখনো আত্মপ্রত্যয়ে। এই ধর্মীয় টানাপোড়েনের ভিতরে আমরা এক অন্য ঈশ্বরের দেখা পাই – যে ঈশ্বর শুধু মাওলানার বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নন, বরং এক ক্লান্ত মায়ের চোখে, এক প্রেমহীন স্ত্রীর দীর্ঘশ্বাসে, এক প্রশ্নমুখর কন্যার আত্মজিজ্ঞাসায় স্থিত। বানু সেই ঈশ্বরকে চেনার দুঃসাহস দেখান। তাঁর কাছে ধর্ম ও নারী কোনো প্রতিপক্ষ নয়। তারা সহযাত্রী, তবে একে অপরের অবস্থানকে মেনে নেওয়ার উদারতা চাই। এই দ্বন্দ্ব উন্মোচন করা, এই প্রশ্ন তোলাই একজন লেখকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব, এবং বানু এই দায়িত্ব পালনে বিশেষজ্ঞ।
বানু যে নারী অভিজ্ঞতা লিখেছেন তা নিটোল বা একরৈখিক নয়। এই অভিজ্ঞতা নির্মিত হয়েছে শরীরের ভাঙন, বিধ্বস্ত মনন এবং সমাজ দ্বারা ধার্য করা নারী পরিচয়ের ছেঁড়াখোঁড়া টুকরো থেকে। ভাঙন এখানে কেবল বহির্জগতেই ঘটে না। ঘটে চলে আত্মার গভীরে, অস্তিত্বের পরতে পরতে। তাঁর নারীচরিত্রগুলির সমূহ প্রান্তিকতার ভিতরেই নিহিত থাকে প্রতিরোধ। প্রতিটি নিঃশব্দ মুহূর্তে তারা লালন করে প্রতিবাদের সম্ভাবনাকে। এই দ্বৈত, সংকর, সংকটগ্রস্ত চরিত্রগুলি দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় নিজের অজান্তেই। সমাজ তাদের জন্য যেসব পরিচয়ের ছাঁচ গড়ে রেখেছে – মা, স্ত্রী, কন্যা, ধর্মনিষ্ঠ নারী – তারা সেসবের আবরণ ভেদ করে বেরিয়ে আসতে চায়। মুক্তির এই আকাঙ্ক্ষা কোনো শোরগোল বা বজ্রনিনাদ নয়; বরং ছোট ছোট অস্বীকৃতি, তুচ্ছ প্রতিরোধ, নিঃশব্দ প্রতিবাদ – যা আসলে এক গভীর আত্মসন্ধানের অনিঃশেষ যাত্রা। নিজেকে আবিষ্কারের নিরন্তর খোঁজ।
আরো পড়ুন কবিতা এবং অকবিতাকে অনন্তর সঁপে যাওয়া জীবন দেবারতির
লেখার শুরুতে আমরা বলছিলাম আঞ্চলিক সাহিত্যের কথা। এই শব্দবন্ধটিকেই বানু নস্যাৎ করে দিয়েছেন। পুরস্কার হাতে বলেছেন ‘কোনো গল্পই আঞ্চলিক নয়।’ সত্যিই তো! সাহিত্য ভূগোল ভেঙে একটি বৃহত্তর মানবিক সংলাপের দরজা খুলবে, তেমনই তো কাম্য। বানু কি আমাদের মনে করিয়ে দেন না, যে ভারতের অন্যান্য ভাষার সাহিত্য, এমনকি উপমহাদেশের প্রতিটি আনাচ কানাচের যে নিজস্ব জীবন ও গল্প, যদিও তা ভিন্ন, তবু একত্রে একটি মূল সুরকেই তা আরও সমৃদ্ধ করে? বানু তাঁর কাজের মধ্যে আমাদের মনে করিয়ে দেন ‘আঞ্চলিক’ বলতে আমরা অনেকসময় যা বুঝি, তা আসলে ‘মূলগত’ নয়, বরং ‘প্রসঙ্গগত’। অর্থাৎ গল্প শুরু হয় এক ভূগোলে, তারপর তা সমস্ত ভৌগোলিক বেড়া তছনছিয়ে গিয়ে থামে বিপরীত পৃথিবীর কোনো পাঠক মনে। স্থান-কাল-সংস্কৃতির সীমা মিলিয়ে যায় অনুভবের গভীরতায়। বানুর গল্পের ছায়ায় হয়ত একদণ্ড জিরিয়ে নিতে পারেন কোনো আফ্রিকা বা আমেরিকার কোনো কৃষ্ণাঙ্গ তরুণী। হয়ত অলীক শুশ্রূষা খুঁজে পান কোনো শ্বেতাঙ্গিনীও। যে বোধ জন্মায় শীর্ণ চালাঘরে, তা যে এখন, এই মুহূর্তে এক মস্ত অ্যাপার্টমেন্টে অনুরণিত হচ্ছে না – একথা জোর দিয়ে বলা যায় কি? জীবনের কতটুকুই বা আমরা জেনেছি! কে বলতে পারে, তাঁর লেখার সুঘ্রাণ কর্ণাটকের মাটি থেকে উঠে এলেও তা হয়ত বুক ভরে নেওয়া যায় ইরানের কোনও ক্যাফে, বা কম্বোডিয়ার কোনও বুকস্টোর কিংবা কেনিয়ার কোনো লাইব্রেরিতে!
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







