এণাক্ষী রায়

অনেকদিন ধরে ক্ষেমঙ্করী দেখছেন, সকাল থেকে ঠাকুরদালানে পাকা ফলের মতো বাদুড়গুলো ঝুলে থাকে। ঢিল মেরে বাদুড় তাড়ানোর খেলা চলে বাচ্চাদের। বেচারা অসহায় বাদুড়গুলো যতক্ষণ পারে চুপচাপ সহ্য করে, তারপর এক জায়গা থেকে সরে পাশেই অন্য জায়গায় গিয়ে ঝুলতে থাকে। ছেলেরা পাথর ছুঁড়তেই থাকে। বাদুড় যে দিনে দেখতে পায় না এই অসহায়ত্বের কথাটুকু ছেলেরাও বুঝতে পারে বিলক্ষণ। ক্ষেমঙ্করী নিজের সঙ্গে মিল পান বাদুড়দের। লেখাপড়া না জানলে তো একরকম কানাই। মেয়েমানুষ মাত্রই কানা। তার ওপর বিধবা মানুষের শতেক জ্বালা। একজন সুখদুঃখের কথা বলার সঙ্গীর অভাব খুব বোধ করেন ক্ষেমঙ্করী।

বাদুড়গুলোর দুঃখের সঙ্গে নিজের দুঃখ মিলে যেতে দেখে ক্ষেমঙ্করীর কল্পনাশক্তি প্রবল হয়ে ওঠে। বাচ্চাদের ছোড়া একটা ঢিল হঠাৎ তাঁর কোলের উপর এসে পড়লে ভাবনাগুলো টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ভাবনাগুলো যেন শুকনো পাতা হয়ে যায়, তারাও বুকে হেঁটে হেঁটে পার হয় ক্ষেমঙ্করীর সীমানা থেকে। ঢিলটা ঠিক কোলের মধ্যে পড়েছে বলে খুব একটা লাগেনি তাঁর। তবু ‘মা গো’ বলে চেঁচিয়ে ওঠেন — এই ছোঁড়া! ঢিল ছুড়লি আমাকে! কতদিন বলিচি বাদুড়দের জ্বালাবি না। কথা শোনে না মোটেও। নে পেন্নাম কর। পেন্নাম কর। বাদুড় হল গিয়ে পুণ্যাত্মা।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ক্ষেমঙ্করীর চ্যাঁচামেচিতে শ্রীকণ্ঠ কোথা থেকে এসে হাজির হয়। তার হাতে খবরের কাগজ একখানা।

— কী হল পিসিমা! কে ঢিল ছুঁড়ল আপনাকে?

— এই ছোঁড়াগুলো। তখন থেকে বাদুড়দের ঢিল মারচে, তার একখানা এসে পড়বি তো পড় আমার গায়ে নেগেচে। এই দ্যাখ কতবড় ঢিল।

শ্রীকণ্ঠ চারদিকে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পায় না। পিসিমার গায়ে ঢিল পড়তে না পড়তেই সব পালিয়েছে। পিসিমার হাতে সত্যিই একটি বড় খোয়ার টুকরো। টুকরোটা হাতে নিয়ে উঠোনের এক দিকে শিউলিগাছটার গোড়ায় ফেলে দেয় শ্রীকণ্ঠ। শ্রীকণ্ঠকে দেখে পিসিমার গলার সুর নরম হয়ে গেছে ততক্ষণে।

— বাদুড় হল গে পুণ্যাত্মা। পাতালে তাদের রাজা থাকে বলে পাতালের দিকে ঠ্যাং করে ঘুমোয় না। বাদুড় তাড়ালে এই বাড়ি ঘর সব ধ্বংস হবে, এই আমি বলে দিলুম।

— ও তোমায় ধ্বংস কত্তে হবে না। এমনিই কোলকেতা থেকে বাদুড় পালাচ্ছে পিসিমা, কদিন পর আর বাদুড়ের দেখা মিলবে না। তকন কেউ ঢিলও মারবে না।

— তা পালাবে না কেন? সব পালাবে, থাকবে কেবল লালমুকো সাহেবগুনো। তা ছিরি, তোর হাতের কাগজখানায় কী খপর বেরিয়েচে আজগে, পড় দিনি। শুনি এট্টু রাজা রাজরার খবর।

— খবর বিশেষ কী! কোনো খবর নেই পিসিমা।

— এত্তবড় কাগজ, এত্ত এত্ত নেকা দেখচি, খপর নেই? অমিত্তিবাজার কাগজ না এটা? খপরের কাগজে খপর থাকবে নে, তা কি হয়? দু-এককানা দেশ-বিদেশের খপর শোনা দিকি, ও বাড়ির সতী এলে বেশ করে শুনিয়ে দোবো।

শ্রীকণ্ঠ জানে পিসিমার কাছে খবর মানে সব দেশ-বিদেশের আজগুবি খবর। পাড়ার মেয়ে-বউদের দুপুরের আড্ডায় রান্না-বাড়ার গল্পের মাঝখানে এইসব আজগুবি খবর বলে চমকে দিতে চায় পিসিমা। বেছে বেছে সেইসব খবরগুলোই পিসিমাকে পড়ে শোনায় শ্রীকণ্ঠ।

— এই তো পড়ছি, তোমাদের মেয়েদের আড্ডায় এই খবর বলে চমকে দিও। নিকেচে

দক্ষিণ আফরিকায় বেকলি নামে ষাঁড় আছে। তাঁহারা ঘোড়াপেক্ষা বুদ্ধি বিশিষ্ট, কুকুরের অপেক্ষা প্রভু পরায়ণ। কাফিরা মাটে মেষপাল ছাড়িয়া দিলে, এই সকল ষাঁড় তাহাদের কাছে চরে। কোন জন্তু মেষপাল আক্রমণ করিতে আসিলে, কিংবা তস্করেরা তাহারদিগকে চুরি করিতে উদ্যোগ করিলে ষাঁড়গুলি তৎক্ষণাৎ শত্রুকে আক্রমণ করে। কাফিরা ইহাদের উপর আরোহণপূর্ব্বক অনায়াসে বহুদূর পর্যটন করে। এবং কোন জাতির সহিত যুদ্ধের সময় পালে পালে এই সকল ষাঁড় ছাড়িয়া দেয়। অনেক সময় নিজেরা অস্ত্র ধারণ না করিয়া কেবল সে ইহাদের সাহায্যে জয় লাভ করে।

— আর? অত্তবড় কাগজে এইটুকু মোটে নিকেচে! বললে কেউ বিশ্বেস যাবে?

— পড়চি, পড়চি। যাঃ, ওই তোমাদের জটলার মেয়েরা আসচে, এবার আমাকে রেহাই দাও পিসিমা। তোমাকে ওপরের দালানের মজলিসে ডাকতে এয়েচে।

— তা তুইও খপরের কাগজটা নিয়ে আয় না বাপু, এট্টু খপর শোনাবি। ওই বেধবা বে’র খপরটা!

— তোমাদের মজলিসে? আমার মাতাটা কি একেবারে গ্যাচে! আমায় নিয়ে মস্করা শুরু করবে সব।

— মস্করা কে করবে শুনি! এতটা বয়স হল, বিয়ের যুগ্যি ছেলেপিলে ঘরে থাকলে ও-রকম কতা শুনতেই হয় বাপু। দু-এককানা করে সম্মন্দ আসবে, নেড়ে-ঘেটে দেকব, এইটেই তো সুক।

— তুমি সুক করো। আমি চললুম, রাতে তোমায় বাকি খবর শুনিয়ে দেবখন।

ক্ষেমঙ্করী দেখতে পান লাল ডোরাকাটা শাড়ি পরে ও বাড়ির ফুলমনি আসছে। পান খেয়ে টুকটুকে মুখটা রাঙা করেছে মেয়েটা।

বিন্ধ্যবাসিনী বাড়ির ভেতরপথ দিয়ে দোতলার সিঁড়ির দিকে উঠতে উঠতেই দেখল ফুলমনি পাশে নেই। মেয়েটা এত বড় হল তাও মায়ের আঁচল ছাড়ে না। এই দুপুরের মজলিসে ঠিক পায়ে পায়ে মা-র সঙ্গে চলে আসে। তা আসুক, আর দু-পাঁচজন মেয়েও তো আসে, কিন্তু এতবড় মেয়েকে যে এরকম হঠাৎ হঠাৎ বারবাড়িতে যেতে নেই এ মেয়েকে বোঝায় কার সাধ্যি। ঠিক ঠাকুরদালানে চলে গেছে। ঠাকুরদালানের বাদুড়গুলো নিয়ে এই মেয়ের আর কৌতূহল মেটে না। জানে রোজ ক্ষেমঙ্করী দিদি এ সময় ওখানে থাকে। তাকে ধরে নিয়ে আসার জন্য সোজা ঠাকুরদালানে চলে যায়। ন বছরের মেয়ে, এখনো বুদ্ধিসুদ্ধি হল না। আঁচলের পানের খিলিগুলো সাবধানে ধরে একাই সিঁড়ি ভাঙে বিন্ধ্যবাসিনী। আজ সে একটু তাড়াতাড়িই এসেছে। সবাই এসে পড়ার আগে এ বাড়ির গিন্নির সঙ্গে একটু পরামর্শ করতে চায়।

ওপর দালানে এ বাড়ির ছোট গিন্নি পানের বাটা সাজিয়ে বসেছে সবে। পান পাতায় বোঁটা দিয়ে চুন লাগাচ্ছে একমনে। পানের জন্য চুন নাকি কোন ঝিনুক পুড়িয়ে বানানো হয়। তাই বড় গিন্নি বিধবা হবার পর পান খাওয়া ছেড়ে দোক্তা ধরেছেন। খড় পুড়িয়ে গুঁড়ো করে তাতে দোক্তা দিয়ে ডলে মুখে ঠুসবেন বলে দলা পাকাচ্ছেন। বড় গিন্নির ধবধবে গায়ের রঙের সঙ্গে সাদা থানটা যেন চেপে বসেছে একেবারে। তুলনায় এক গা গয়না পরা ছোটগিন্নি যেন খানিকটা জৌলুসহীন। এ পাড়ায় বড় গিন্নির কথার দাম আছে সবার কাছে। তাই বিন্ধ্যবাসিনী আজ একটু তাড়াতাড়িই নিজের আর্জি নিয়ে ওপর দালানে এসেছে। কিন্তু কীভাবে কথা শুরু করবে বুঝতে পারছে না। বড় গিন্নির থেকে একটু তফাতে বসে আঁচল থেকে একটি পান বের করে মুখে দেয় বিন্ধ্যবাসিনী। পানটা কিছুটা চিবিয়ে দলা করে মাড়ির পেছনে চালান করে, ঘোমটাটা সামান্য নামিয়ে ঠিক করে নিতে নিতে বিনা ভূমিকায় বলেই ফেলে কথাটা।

— আর তো চুপ করে বসে থাকা যায় না দিদি।

বড় গিন্নি মুখ ভরা দোক্তার থুথু নিয়ে কার্নিশের দিকে যেতে যেতে উঁ উঁ করে কী যেন বলতে চান। কার্নিশের থেকে ঝুঁকে ঝোপঝাড়ে থুথু ফেলে আসতে আসতেই বিন্ধ্যবাসিনী বাকি কথাটা টুক করে বলে ফেলে।

— ফুলির ন-বচর বয়স হল দিদি। মেয়েটার এবার বে না দিলে সমাজে কতা উঠবে। এদিগে মেয়েটা আমার ছ-সাত বচরের বাচ্চার মতন হয়ে রয়েচে। কী করি বলো দিনি!

— কী বলিস রাঙা বউ! ফুলি নয়ে পড়েচে? এই তো সে দিন হল।

— সে দিন হল কী বলচ! সেই যেবার ভিক্কোরিয়া আমাদের মহারানি হলেন, সে সময় ফুলি আমার কোলে, হামা দিচ্ছে। ফুলির বাবা পোস্টাপিস ঠেনে নতুন রকম কাগজ এনে দু-লাইন নিকে দিল আমার বাপের বাড়িতে। ওই যে পোস্টোকাড উটল পোত্থম, সেই সেবার তো হল ফুলি। মনে নেইকো?

ছোট বউ ঘাড় গুঁজে সব কথা শুনছিল এতক্ষণ। রাঙা বউ বড় জাকে লক্ষ করে কথাটা বললেও, কথাটা যে তার বরের কানে তোলবার জন্যই ফাঁদতে এসেছে সে কথা সে জানে। এতক্ষণ বড় জায়ের রকমসকম দেখে ভ্রূটা কুঁচকোতে কুঁচকোতে ভ্রূ দুটোকে জোড়া করে ফেলেছে সে। সামান্য ফাঁক পেয়ে সে বলেই ওঠে — এই সেদিন হল কী গো দিদি! আমাদের ছিকণ্ট যেবার বড় ইসকুলে ভর্তি হতে গেল, সেইবারই তো হল ফুলি!

— অ, তা বাপু পোস্টোকাড কবে উটল মনে নেইকো। মহারানি মনে আচে। ছিকণ্টর ইস্কুলের কতাও মনে আচে। তা নয় হয়ে গেল? তবে তো ভাবনারই কতা রাঙা বউ। দেকে তো মনে হয় সাত পেরোয় নে।

— তাই তো বলচি দিদি। কিছুই তো বোজে না। এদিকে বয়স পেরচ্চে, বিয়ের কতাখানা এবার তো তুলতে হয়। তুমি ছোটঠাকুরের কানে কতাটা একবার তুলে দ্যাকো কী বলে।

পেছনের বাড়ির সতী ঠাকুরন আর তার দুজন ভাইবউ এসে যাওয়াতে বিন্ধ্যবাসিনীর আর এ প্রসঙ্গে কিছু বলা হয়ে ওঠে না। কত কথাই তো বলার ছিল, বলা যায় নালিশ ছিল কর্তার নামে। কর্তার এ ব্যাপারে একেবারেই উদ্যোগ নেই। নইলে কী আর এ বাড়ির ছোটঠাকুরের কানে কথাটা তোলবার জন্য তাকে ব্যবস্থা নিতে হয়! সতী ঠাকুরন আর তার ভাইবউদের পেছন পেছন আরও লোক আসার শব্দ আসছে। সব বাড়ির মেয়ে-বউরা এসে পড়ল বলে। দুমদাম করে শব্দ করে ফুলির সঙ্গে এসে পড়েন ক্ষেমঙ্করীও। এই ক্ষেমঙ্করী দিদিকে বড় ভয় পায় বিন্ধ্যবাসিনী। তাদের দুপুরের আড্ডায় যারা আসে, তাদের মধ্যে এই ক্ষেমঙ্করী দিদিরই সবচেয়ে বেশি জ্ঞানগম্যি। তাঁর কাছে নিজেদের সামান্য বিদ্যা নিয়ে কুণ্ঠিত হয়ে থাকতে হয়। ক্ষেমঙ্করী দিদিকে কিছুটা হলেও কথায় জব্দ করতে পারেন একমাত্র সতী ঠাকুরন। সতী ঠাকুরন সধবা, কিন্তু কী এক গণ্ডগোলে শ্বশুরবাড়ি থেকে তেজ দেখিয়ে ফিরে এসেছিলেন বাপের বাড়িতে। সেই থেকে ভাইরা সব মাথায় করে রাখে। সতী ঠাকুরন বসতে না বসতেই পাড়ার অন্য বউদের দেওয়ার আগেই, আঁচল খুলে একটা পানের খিলি এগিয়ে দেয় বিন্ধ্যবাসিনী।

একপাল বাচ্চাকাচ্চা ছাদের একদিকে জমা হয়ে গেছে এতক্ষণে। সতী ঠাকুরনের ভাইবউরা তাদের বাকি বাচ্চাগুলোকে ঘুম পাড়িয়ে, কোলেরগুলোকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। বোসজা গিন্নির বড় মেয়ে সাবিত্রী পোয়াতি, সে বাপের বাড়িতে এসে আছে। সেও এসেছে আজ। তার তেরো বছরের রোগা শরীরে উঁচু পেটটা দেখে বিন্ধ্যবাসিনীর মনে কেমন শঙ্কা জাগে। ফুলির দিকে তাকিয়ে ফুলির এই রূপ কল্পনা করে ভয় হয়। লম্বা ছাদের এক কোণে আমগাছটা গোটা শরীর নিয়ে হেলে পড়েছে, তার থেকে আমের কুশি ছিঁড়ছে ছোট মেয়েদের দল। ফুলিও মা-কাকিমাদের দলে না এসে যোগ দিয়েছে ওদের সঙ্গে। সাবিত্রী উঁচু পেট নিয়ে ঠিক গিয়ে ভিড়েছে মেয়েদের দলে।

মেয়েদের আমের কুশি ছিঁড়তে দেখে ক্ষেমঙ্করী চিৎকার করছে এদিক থেকে — আমের কুশিগুলো সব ছিঁড়ে ফেললে আমের সময় আম পাবি না বলে দিলুম। সাবিত্রী, তুই না বড়! আমের কুশিগুনো ছিঁড়ছিস?

বিন্ধ্যবাসিনীর মনে হয় সাবিত্রীর পেটেও একটা আমের কুশি বড় হচ্ছে। ঠিক এই বয়সেই প্রথম মা হয়েছিল বিন্ধ্যবাসিনী। সে বাচ্চাটা বাঁচেনি। কিন্তু সে যন্ত্রণাটা তার মনে থাকবে চিরকাল।

সতী ঠাকুরন প্রথমবার পানের পিক ফেলে আর পিক ফেলতে ওঠেন না। তিনি কার্নিশ থেকে ঘুরে এসেই বিনা ভূমিকায় প্রশ্ন করে বসলেন — আজ কী রেঁধেচ?

প্রশ্নটা কার উদ্দেশ্যে করলেন বুঝতে না পেরে সবাই চুপ করে থাকলেও মুখ খুললেন বড় গিন্নি — তা সতী ঠাকুরঝি, মনে হচ্ছে আজ ভাল কিছু রেঁদেছ? তা তুমি কী রাঁদলে শুনি।

কে কী রেঁধেছে সে গল্প রোজই হয়। তবে যার বাড়িতে যেদিন সরেস জিনিসটি আসে, সে যেন রান্নার কথাটা আগেভাগে তোলার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সতী ঠাকুরন যে এক্ষুনি দাগা দাগা মাছের কথা বলবেন সে কথা সবাই বুঝে গেছে এতক্ষণে। তা যাই হোক সে কথা তুলতে সতী ঠাকুরনকে কেউ বারণ করবে না। বরং কীভাবে রান্না করেছেন সেটা জেনে নেবে সবাই। সতী ঠাকুরনের রান্নার হাত চমৎকার। এই যে বিধবা হওয়া ইস্তক বড় গিন্নি আমিষ ছেড়েছেন, বড় গিন্নিও কিন্তু শুনতে চান রান্নার প্রণালী। সেদিন সতী ঠাকুরন বড় গিন্নিকে যে দুধ দিয়ে মুগডাল রান্না শিখিয়েছিলেন তা মুখে লেগে আছে বাড়ির সকলের। নিরামিষ এঁচোড় রান্নায় চালকুমড়োর দানা বেটে দিয়ে যেভাবে স্বাদ আনা শিখিয়েছিলেন গত বছর, এ পাড়ার সবাই একবার করে রেঁধে দেখেছে। কর্তারা খেয়ে ধন্য ধন্য করেছিল সেবার। সতী ঠাকুরন একটু গুছিয়ে বসে ছোট গিন্নির বাটা থেকে এক খিলি পান মুখে দিয়ে দোক্তার জন্য হাত পেতেছেন বড় গিন্নির কাছে। দোক্তাটুকু ছিঁড়ে মুখে নিতে পানের দলাটিকে জিভ দিয়ে একদিকে সরিয়ে গলা খাঁকারি দিতেই বোঝা গেল এইবার বলা শুরু করবেন তিনি।

— আজ আমার বিশু দাগা রু যা এনেচিল! আমি তো অবাক। তা পাঁচ-ছ সেরের কম কিচুতেই হবে নে। ইয়া মোটা দাগা, এত্ত বড় করে কোলের মাচ কাটলুম, তা সেটাও কিচু নয়। কতা হল, রান্নাটা কেমন হয়েচে! তা বউদের জিগ্যেস কর দিনি, কেমন রেঁদেছিলুম!

সতী ঠাকুরনের বড় ভাইবউ বেশ মিষ্টি স্বভাবের, বাড়ির বড় বউ হয়েও একটু দমে থাকে। সে উত্তর দেওয়ার আগেই আহ্লাদী ছোট বউ তড়িঘড়ি উত্তর দিয়ে বসে — রান্না যা হয়েচিল, অম্মিত্ত, ছেলেদের পাতে দিয়েই কুলোতে পারিনি। শেষে, এককানা ন্যাজা আমরা দুই জা ভাগ করে খেলুম। সর্ষে বাটা দিয়ে রুই মাচ জম্মেও খাইনি বাবা, আজই পত্থম। আমি আর দিদি তো বেশ অনেকটা ঝোল চেটে চেটে খেলুম চাটনির মতন।

বিন্ধ্যবাসিনী এতক্ষণ চুপচাপ নিজের রান্নার কথা ভাবছিল, আজ বেশি কিছু রান্না করেনি সে, অন্যেরা জিজ্ঞেস করলে কি বানিয়ে বানিয়ে কিছু বলবে! এর মধ্যেই সর্ষেবাটা দিয়ে রুই মাছের গল্পে সবার চক্ষু ছানাবড়া হতে দেখে একটু স্বস্তি পেল। আজ এই রান্নার নিয়মকানুনই শুনতে চাইবে সবাই। অন্যদের কার বাড়িতে কী রান্না হল আজ আর সে কথা উঠবে না বোধহয়।

রান্নাবান্নার কথাবার্তা হচ্ছে দেখে ক্ষেমঙ্করী বিরক্ত মুখে ছেলেপিলেরা আমের কুশি ছেঁড়ে কিনা পর্যবেক্ষণ করছিলেন এতক্ষণ। এই মাছের গল্প শুরু হলে আর থামতে চায় না সতী। মাছের কথা শুনলেই আবার আঁশটে গন্ধখানা নাকে এসে ঝাপটা মারে যেন। সতীর হাবভাব দেখে বিরক্ত লাগে ক্ষেমঙ্করীর। ভাগ্য দেখ! বরের সঙ্গে ঘর করল না সাতদিনও এদিকে সধবা হওয়ার আনন্দে যেন ডগমগ। সামনে দু-দুজন বেধবা বসে আছে খেয়াল নেই, মাছ রান্নার গল্প ফেঁদে বসেছে। এদিকে ছোট ভাইবউ যে কোলের ছেলেটাকে নিয়ে এসেছে, তার তো কাশতে কাশতে ভিরমি খাওয়ার জোগাড় হয়েছে। আর থাকতে না পেরে ঝাঁঝিয়ে ওঠে ক্ষেমঙ্করী — থাম লো সতী, তোর ছিষ্টির মাছ রান্নার কতা অনেক হয়েচে। বিশুর বাচ্চাটার যে বুকে কফ বসে গেচে দেখিসনি! বাড়িতে পুরনো ঘি নেই! মালিশ দিতে পারিসনি!

— দিচ্চি তো, কালকেই তো তুমি বললে, ফের বাড়ি গিয়েই দিয়েচি। ছোটবউ বাসকপাতাও বেটে খাইয়েচে খানিক। এখন ভ্যাড়ভেড়িয়ে বেরচ্চে সব ভিতর থেকে।

ক্ষেমঙ্করীর মনে পড়ে তাই-ই তো, বুকে কফ বসলে কী করতে হয়, কাল তো নিজে থেকেই জানতে চেয়েছিল সতী। ছোট বউ আর ছেলেটা দুদিন আসেনি কেন খোঁজ নেওয়াতে নিজেই বলেছিল বিশুর কোলেরটার অসুখ। অত কিছু আর খেয়াল ছিল না ক্ষেমঙ্করীর।

কত কেউ কত কথা জানতে চায়! এই তো দীনতারিণী চুপ করে বসে আছে একপাশে, সবার মধ্যে  সবচেয়ে নিরীহ বউ। তাদের অবস্থাও সবথেকে খারাপ। কালই তো বলছিল ছেলেটার যদি একটা কিছু চাকরি-বাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়া যায়। সংসার আর চলছে না। দীনতারিণীর ওপর আলাদা একটা মায়া আছে ক্ষেমঙ্করীর। ওকে মাঝেসাঝে বাগানের কলাটা মুলোটা দিয়ে সাহায্য করেন তিনি। কিন্তু মেয়েটা যেন মরমে মরে যায় তাতে। কালই বলছিল ছোটকর্তাকে বলে ছেলেটার একটা চাকরির ব্যবস্থা যদি করে দেওয়া যায়। কথাটা দাদার কাছে তোলা হয়নি এখনো। বারঘরের আড্ডায় কত বড় বড় লোক আসে, সেখানে কথা উঠলে একটা হিল্লে হবেই। হাজার হোক এ পাড়ার গণ্যমান্য পরিবার তারা।

আড়চোখে সতীকে দেখেন ক্ষেমঙ্করী। সতী সর্ষে রুইয়ে পোস্তবাটা কতটা মেশাতে হবে, তাতে আমরুল পাতা বেটে দিলে স্বাদ কতটা বাড়বে, তার গল্প করছে আবারও। বারণ করলেও শোনার পাত্রী না সতী। ক্ষেমঙ্করীকে ওই সাবিত্রীর বয়সেই বিধবা হয়ে বাপের বাড়িতে ফিরে আসতে হয়েছিল এক কাপড়ে। গল্পের থেকে মুখ ফিরিয়ে, অন্য দিকে মন দেওয়ার চেষ্টা করেন ক্ষেমঙ্করী।

বাইরে খাঁ খাঁ করছে দুপুর, উঠোনে সকালে গোবর ছড়া দেওয়া হয়েছিল, সেই গোবর শুকিয়ে মাটিতে এখন ফাটা ফাটা দাগ কেটে বসেছে। ক্ষেমঙ্করী নিজের হাতের দিকে তাকান, শূন্য রোদে ফেটে যাওয়া উঠোনের মতো তাঁর হাত। নখ চালালে সাদা সাদা লম্বা দাগ তাকিয়ে থাকেন হাঁ করে। উঠোনের পাশে গাছটা থেকে পাতা ঝরে ঝরে পড়ছে, আবার সড়সড় করে গা ঘষটে ঘষটে বুকে হেঁটে এদিক থেকে ওদিকে ছুটে যাচ্ছে পাতারা।

এরকম দুপুরে মনটা খারাপ হয়ে যায় ক্ষেমঙ্করীর, খুব অল্প চেনা মানুষটার অস্পষ্ট মুখ কল্পনা করতে করতে একেকদিন একেকজন চেনা পুরুষের মুখের আদল পায়। তখন নিজের মনেই খুব লজ্জা করে ক্ষেমঙ্করীর। সদর দালানের আড্ডায় যেসব মানুষেরা আসে ঝিকের আড়াল থেকে তাদের যে দেখে ফেলেন ক্ষেমঙ্করী, আর কার কী নাম তাও জানার প্রবল চেষ্টা করেন। কয়েকজনের নামও জানেন। এ বৃত্তান্ত আর কেউ জানে না। নিজের মরে যাওয়া বরকে কল্পনা করলে তাদের একজনের মুখ ভেসে আসে আজকাল। তখন মনটা নরম হয়ে আসে, দীনতারিণীর জন্য মায়া হয়। বিন্ধ্যবাসিনীর মেয়ে ফুলমনির জন্য মায়া হয়। বোসজা গিন্নির বড় মেয়ে সাবিত্রীর উঁচু পেটের দিকে তাকিয়ে মায়া হয়।

বাইরে বাইরে যত কঠিনই দেখাক, পৃথিবীর সবার জন্য মায়া জমে থাকে ক্ষেমঙ্করীর মনে। শুধু, প্রায় সমবয়সী, পাশাপাশি বাড়ির সতীকে দেখলে মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে। সধবা হওয়ার গর্বে মটমট করতে থাকা সতীর লাল পাড় শাড়ি, মাথা ভর্তি সিঁদুর। আর মাছ মাংস খাওয়ার গল্পগুলো বুকে ছ্যাঁচা দিয়ে তার মধ্যে এক খাবলা নুন ডলে দিতে থাকে। সতীর গায়ের গয়নাগুলো দুপুরের কর্কশ আলোতে ঝকমক করছে। নাকে মুক্তোর নাকছাবি পরা সতী মুখ নেড়ে নেড়ে পান চিবোচ্ছে, কষের দু পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে লাল লালা। কপালের টিপটা যেন ক্ষেমঙ্করীকে দেখানোর জন্যই কপাল জুড়ে পরে আছে সতী। যতই মুখ ফিরিয়ে থাক, দুপুরের উঠোন থেকে, ঠাকুরদালানের উলটো হয়ে ঝুলে থাকা বাদুড়দের থেকে ক্ষেমঙ্করীর চোখ বিচ্ছিন্ন হয়ে চলে যাচ্ছে সতীর দিকে। সতীর গা থেকে বিকট আঁশটে গন্ধ এসে ঢেকে দিচ্ছে দুপুরটা। ক্ষেমঙ্করীর গা গুলিয়ে ওঠে। তখনই মুকুলভরা আমগাছের আড়াল থেকে দেখতে পান, এক চিলতে আকাশের মাঝখান দিয়ে পথ করে করে বারবাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছেন চিত্তবাবু। চিত্তবাবুকে লুকিয়ে রোজ দেখেন ক্ষেমঙ্করী। চিত্তবাবুর মুখটা ক্ষেমঙ্করীর খুব চেনা, খুব আপন। হঠাৎ ক্ষেমঙ্করীর মাছ নয়, মাংস নয়, পান খেতে বড় সাধ হয়। সতীর নাকি ওর বরের মুখটাও মনে নেই! সতীর দিকেই তাকিয়ে বলেন ক্ষেমঙ্করী, বেশি করে খয়ের দিয়ে একটা পান সেজে দে তো লো সতী। চুন দিসনি আবার মুখপুড়ি।

আরো পড়ুন সুখেন মুর্মুর চদরবদর: অচেনার আনন্দ, অজানার সংকট

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.