শ্রাবন্তী ঘোষাল

কবেকার পাঠশালায় পড়া মন্ত্রের মতো সেই সুর
সুর নয় স্মৃতির মধুভাণ্ডার
সেই আমার দেশ মাঠ বন নদী
আমার দেশের জারি সারি ভাটিয়ালি মুর্শিদি
আরও কত সুরের সাথে মিশে আছে আমার মায়ের মুখ
আমার মায়ের গাওয়া কত না গানের কলি!
(‘একুশের কবিতা’/আশরাফ সিদ্দিকী)

বাংলার মাঠঘাট, নদী-হাওর, উঠোন-দাওয়া জুড়ে গানের অবাধ যাতায়াত। নানা ঋতুতে, নানা উৎসবে, নানা অনুষঙ্গে গান বয়ে চলে। এককালে মায়ের মুখের মত চেনা লোকগান আজ অবলুপ্তির পথে। মানুষের প্রতিদিনের যাপনে যে গান স্বাভাবিকভাবে উঠে আসে সেখানে বাজার অর্থনীতি, পুঁজিবাদী আগ্রাসন বাংলার সমন্বয়ী সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে সমর্থ হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে জারি, সারি, ভাটিয়ালি, মুর্শিদির আসর এখন স্পটিফাই বা ইউটিউবে বসে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

রামপ্রসাদী, কীর্তন, পালাগান, পাঁচালী গানের মতো জারি গান বাংলার নিজস্ব সম্পদ। দুঃখের বিষয় এই যে বাংলা সঙ্গীত বা লোকসঙ্গীত বিষয়ক কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গকেন্দ্রিক আলোচনায় এ গানের উল্লেখ প্রায় নগণ্য। সপ্তদশ শতকে নাগরিক ও আধা-নাগরিক নিধুবাবু, আখড়াই-হাফ আখড়াই, কবিগান, শাক্তসঙ্গীত, বাংলা টপ্পার পাশাপাশি পঞ্চদশ শতকে বাংলায় লিখিত জঙ্গনামার পরিবেশনের অপভ্রংশ হিসেবে এই ধারার গানের উদ্ভব হয়েছিল বলে ঐতিহাসিকরা মনে করছেন। ফারসিতে জারি শব্দের অর্থ শোক, বিলাপ বা প্রচার করা। মহরম মাসের প্রথম দশদিন কারবালার প্রান্তরে হজরত ইমাম হোসেন ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুতে গভীর শোক জ্ঞাপন করে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ যে আত্মক্লেশ যাপন করেন তার অপরিহার্য অংশ নাট্যাভিনয়ের আঙ্গিকে গাওয়া এই জারি গান, যা মর্সিয়া নামেও পরিচিত।

১৬৪৫ সালে কবি মুহাম্মদ খান মকতুল হোসেন শীর্ষক কারবালার কাহিনিনির্ভর একটি শোকগাথা রচনা করেন। এই বইটি আখ্যায়িকা কাব্য হিসাবে পরিচিত। এই বইয়ের বিভিন্ন পদ সুর করে আশুরাতে (মহরম মাসের দশ তারিখে) গাওয়া হত। জারি গানের আদি নিদর্শন হিসাবে এই বইটিকেই গণ্য করা হয়। মোগল আমলে সম্রাট জাহাঙ্গীরের সঙ্গে বহু মুসলমান বাংলায় আসেন। তাঁদের অনেকেই এখানে রাজদরবারে উচ্চ পদে আসীন ছিলেন। তাঁদেরই উদ্যোগে মুহরম পালন শুরু হয়। অনবদ্য পরিবেশনরীতির গুণে জারি গানের বিয়োগান্তক করুণ রস জাতিধর্মনির্বিশেষে বাংলার মানুষের মন ছুঁয়ে গিয়েছিল। শিয়া ও সুন্নী – উভয় ধারার মুসলমানদের পাশাপাশি হিন্দুদের মধ্যেও এই গানের ব্যাপক জনপ্রিয়তা পরবর্তী যুগে লক্ষ্য করা যায়। তাই মর্সিয়া আর মাতম জারির পাশাপাশি দুর্গাপুজো ও অন্যান্য উৎসবে যাত্রার পাশাপাশি জারি গানের আসর বসত।

#

তুই কেন ভাই ছেড়ে গেলি
আমায় দিয়ে কাফেরে
বিপদকালে ডাকি তোরে
আবার আসি দেখা দে”
(মর্সিয়া গান)

মহরম মাস হিজরী সনের প্রথম ও অত্যন্ত পবিত্র মাস। এই মাসের প্রথম দিন থেকে দশম দিন বা আশুরা পর্যন্ত পয়ার ছন্দে লেখা ছোট যে পদ গাওয়া হয় তার নাম মর্সিয়া। জঙ্গনামা এবং মকতুল হোসেনের কাহিনি থেকে নেওয়া এই ছোট পদের বিষয় কারবালার প্রান্তরে হজরত ইমাম হোসেন ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের করুণ মৃত্যুর ঘটনা। মর্সিয়া ছাড়াও জারি গানের মূল গায়ক বা বয়াতি বিস্তৃত আকারে আলাদা সুরে এই বিষয়ে যে গান পরিবেশন করেন সেটাই জারি গান। আবার ধুয়ার সুরে ছোট ছোট ঘটনা যখন মূল গানের সাথে যুক্ত হয় তাকে বলে ধুয়া গান। মহরম উপলক্ষে এই তিন ধরনের গান একসাথে গাওয়া হত।

এভাবে জারি গান ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠলে এই গানের বিষয় হিসাবে যুক্ত হয় মক্কার জন্মকথা, সাদ্দাদের জারি, শাহজালালের জারি, জহরনামা, সোহরাব-রোস্তমের জারি ইত্যাদি এবং শুধুমাত্র মহরম নয়, সারা বছর জুড়ে এ গানের আসর বসত।

দুর্গাপুজো উপলক্ষে পালাগানের আকারে জারি গানের আঙ্গিকে যে আসর বসত সেখানে সমসাময়িক রাজনৈতিক, সামাজিক বিষয় নিয়েও পদ গাওয়া হত। এ প্রসঙ্গে মেরি ফ্রান্সিস ডানহাম তাঁর জারিগান বিষয়ক ক্ষেত্র সমীক্ষার আলোচনায় বলেছেন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের কথা সমসাময়িক জারি গানে পাওয়া যায়।

জারিগান দলবদ্ধভাবে পরিবেশন করা হয়। যিনি মূল গায়েন তাঁকে বলা হয় বয়াতি। তাঁর গানের রেশ ধরে দোহারের দল, যারা বৃত্তাকারে মঞ্চে অবস্থান করে। তারা হাতে লাল রুমাল বা গামছা বাঁধে। এই বৃত্তের মাঝে থাকেন বয়াতি। দোহারের দলকে ঘিরে থাকে বাজনদার ও ধুয়াগানের দল। বয়াতি প্রয়োজন অনুসারে স্থান পাল্টে সহশিল্পীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ বা ইঙ্গিত দেন। জারি গানে বয়াতি নিজে দোতারা, সারেঙ্গী, বেহালা, ডুগডুগি বাজান। তালযন্ত্রীরা বাজায় ঢোলক। সঙ্গে থাকে বাঁশি, হারমোনিয়াম, কাঁসি, ঘুঙুর ইত্যাদি। জারি গানের অন্যতম অঙ্গ নাচ। গুরুসদয় দত্ত তাঁর বইতে ‘জারিনৃত্য’ সচিত্র বর্ণনা করেছেন। মহরমের জারি গানে গায়েনরা সাদা পোষাকে নিজেদের বুক চাপড়ে করুণ রসের আবহ ফুটিয়ে তোলেন। এছাড়া জারি গানের আরেকটি আঙ্গিক হল ‘জোটক’, যেখানে দুই দল জারিয়াল বা জারি গানের শিল্পী পারস্পরিক প্রশ্নোত্তরের প্রতিযোগিতা করে আসর জমান। এই ধারার জারি গানের বিষয় নারী-পুরুষ, জীবাত্মা-পরমাত্মা,শরিয়ত-মারফত, রাম-হনুমান, গুরু-শিষ্য, আদম-শয়তান, গণতন্ত্র-রাজতন্ত্র ইত্যাদি। এই দুই ধারার জারি গানেই প্রথমে বন্দনা গীত গাওয়া হয়। তারপর মূল ধারার গান শুরু হয়। মূল ধারার বিষয়ভিত্তিক গানের পর বয়াতি ভণিতা যোগ করেন বা আল্লাহর অনুগ্রহ প্রার্থনা করে পরিবেশনা শেষ করেন। বাংলার জারি গান দেশজুড়ে সংগ্রহ করে পল্লী কবি জসীমউদ্দীন ১৯৬৮ সালে জারীগান নামক গ্রন্থ প্রকাশ করেন। তিনি দেখিয়েছেন অঞ্চলভেদে জারি গানের বিষয়ের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ দেহতত্ত্বের ধুয়া গান দিয়ে জারি গানের আসর শেষ হত।

#

কী ফুল ফুটিলো রে মক্কায়।
ফুলের গন্ধে প্রেমানন্দে উজাল মদিনা।
চার রংয়ের চার ফুল ফুটেছে,
কোন ফুলেতে কে বা বসে গো।
কোন ফুলেতে আল্লাহর রাসুল
কোন ফুল পেল আব্দুল্লাহ।
নবীজির এই ভাঙ্গা তরী শরিয়তে বোঝাই ভারি রে।
ইমাম হাসান, হোসেন দুই ভাই তারা
তরী খুলে লাগাই কিনারাই।
পাগলা কানাই ভেবে বলে ফুল ফুটেছে অচিন দলে রে।
ও তার ফুলের গন্ধে লাগলো মেলা ফেরেশতাগন ভাবে তাই।
(পাগলা কানাইয়ের পদ)

জারি গানের মুকুটহীন সম্রাট ঝিনাইদহের পাগলা কানাই। ঝিনাইদহ, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা অঞ্চল জারি গানের আদি বিকাশের জায়গা। আধ্যাত্মিক চিন্তক কানাই শেখ পুঁথিগত শিক্ষায় শিক্ষিত না হলেও বাল্যকাল থেকেই মুখে মুখে গীত রচনা করতেন। লালন শাহের প্রায় সমসাময়িক কানাই প্রায় হাজারখানেক পদ রচনা করেছিলেন বলে শোনা যায়, যার মধ্যে মাত্র তিনশো লিখিত আকারে সংগৃহীত হয়েছে। জলধর সেন স্মৃতিকথায় লিখেছেন কানাইয়ের আসরে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়ে কীভাবে মন্ত্রমুগ্ধের মত তার গান শুনত।

বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রামে মেয়েরা মহরমের একাদশ ও দ্বাদশ দিনে জারি গান করেন। মেয়েদের গাওয়া এমন একটি গান হল

সেই না যাদু রণে গেইলো
শূন্য হইলো মায়ের কলিজা
আর কাইন্দো না গো মা
আর ভাইব্যো না
কান্দিলে সোনার যাদু আর পাইবা না

উত্তরবঙ্গে প্রচলিত এই জারি গানটি সংগ্রহ করেছেন নারীর গান, শ্রমের গান বইয়ের লেখক চন্দ্রা মুখোপাধ্যায়। ফতিমার দুঃখে সমব্যথী মেয়েরা মহরমের মাতম গানে এভাবেই নিজেরা পদ রচনা করে স্বতঃস্ফূর্ত ও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। গান গাইবার সময় জোরে শ্বাসাঘাত প্রয়োগ করে মর্ম বেদনা বোঝানো হয়। দক্ষিণ বাংলায় প্রচলিত এমনই একটি গানে ভাই হারানোর শোক প্রকাশ পেয়েছে।

এত রঙিন হয়ে কোথায় গেলি
ও ভাই হোসেন আলি
তোর গায়ে নি কেন সোনার গয়না
কোথায় রেখেয়ালি?
ও তোর গায়ে কেন বা রক্ত ঝরে?
চোখে কেন কালি?
(দক্ষিণবঙ্গের জারি)

কেঁদো না জান্নাতের রাণি ধুধু মরুর কারবালায়
সিমার যখন হোসেন শাহের বুকেতে বসেছিল
সারা জাহান আসমান জমিন
থরেথরে কাঁপিল।
জান্নাতেরই মালিক যিনি কাঁদে বসেন জান্নাতে
ওগো সিমার ছাড়ো তুমি আমার প্রাণের হোসেনকে
(প্রচলিত পদ)

দুঃখ, বিষাদ, মৃত্যু জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। করুণ রস জীবনের অন্যতম সম্পদ। অন্যের দুঃখে সমব্যথী হতে পারলে যে সমষ্টিবোধ মানুষের মনে জেগে ওঠে তা সামাজিক জীবনের মূল ভিত্তি। তাই স্বজনহারা ফতিমার দুঃখ দেশ, কাল, ধর্মের কাঁটাতার পেরিয়ে সর্বজনীন হয়ে ওঠে জারি গানে। নিরক্ষর মানুষের মুখে মুখে এভাবেই ফেরে পারস্য দেশে প্রচলিত কাহিনী, যার ছন্দ পঞ্চদশ শতকের কৃত্তিবাস ওঝার শ্রীরাম পাঁচালীর পয়ার।

আরো পড়ুন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ: গতায়াতের ভুবন

জারিগান অবিভক্ত বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে জনপ্রিয় লোকসংস্কৃতির অঙ্গ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অন্যতম দৃষ্টান্ত। ক্রমেই বেড়ে চলা জাতপাত, হিংসা, হানাহানির যুগে যুদ্ধের বিরুদ্ধে যূথবদ্ধতার বার্তা দিতে এমন গানই হতে পারে শক্তিশালী হাতিয়ার।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.