উৎপল দত্ত নিজেকে ‘প্রোপাগ্যান্ডিস্ট’ বলতেন। টিনের তলোয়ারের ৫০ বছরে পৌঁছে এই তকমাটা উৎপলকে বুঝতে সবচেয়ে জরুরি বলে মনে হচ্ছে। আজ আমাদের কালচার ইন্ডাস্ট্রি ফুলে ফেঁপে ড্রাকুলা হয়ে উঠেছে বেশ, অথচ প্রোপাগ্যান্ডার কি নিদারুণ দৈন্য! কারণ, একই সাথে আদর্শএবং রাজনীতি দেউলিয়া। মিথ্যে কথা বলব এবং বুক বাজিয়েই বলব এবং ‘শিল্পী’ সেজে তাকে জাস্টিফাইও করব— এই প্যাকেজ আজ সস্তায় থাইল্যান্ড যাওয়ার চেয়েও আকর্ষণীয় উইকেন্ড প্ল্যান! সেখানে উৎপলের মত একজন আন্তর্জাতিক দানবীয় স্রষ্টাকে স্মরণ কতটা সম্ভব? আদৌ কি সম্ভব আজ? সারাদিন জনপ্রিয় বলিউডি ছবিতে অভিনয় করে মাচায় সন্ধ্যায় লেনিন সেজে রাতে বাড়ি ফিরে অন্তত ৫০ পাতার ফুটনোট-সহ প্রবন্ধ লেখা! এই রেনেসাঁস ব্যক্তিত্ব তো মিস্টার বা বাবু বা কমরেড উৎপল দত্তকে আবহমান করে রেখেছে আগন্তুক ছবিতে, যার ঘর ছাড়ার অনেক আগে মজ্জার মধ্যে ঢুকে গেছে শেক্সপিয়ার-মাইকেল-বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ-মার্ক্স-ফ্রয়েড, আর তাই তাঁর একমাত্র আক্ষেপ আলতামিরা গুহাবাসীদের মত বাইসন আঁকতে না পারা!

উৎপল দত্তের যুগান্তকারী প্রযোজনাগুলি আমার প্রজন্ম দেখার সুযোগ পায়নি। তাই একদা তাঁর চৈতালি রাতের স্বপ্ন -র সহকারী পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায়েরকাজের মঞ্চের গ্র‍্যাঞ্জারে বারবার খুঁজে পেয়েছি উৎপলকে। কখনও উৎপলের যুগপৎ রেগে যাওয়া ও হিউমার খুঁজে পেয়েছি কবীর সুমনের এককের মঞ্চেও। শুধু মঞ্চই বা কেন! গোটা থিয়েটার প্র‍্যাক্টিসটাই যেন বা একটা ইভেন্টের চেহারা নিচ্ছে বারবার উৎপলের। কথা প্রসঙ্গে সুমন (লাল) বারেবারেই বলেন, স্বাধীনতার এত বছর পরেও থিয়েটারের মূল সমস্যাগুলি আজও কিন্তু বদলাল না। সেই থিয়েটারের শেকড়ের কিছু সমস্যার কথাই কিন্তু ফিরে ফিরে আসে টিনের তলোয়ার নাটকেও। বাবুদের হাত থেকে মিস্টারদের হাত হয়ে কমরেডদের হাতে যেতে যেতে বাংলা থিয়েটারের হাল হকিকত নিয়েই বেফাঁস যেসব কথা বেরিয়ে পড়ে, সেসব কথা— নারী অথবা মদ অথবা ভোগ বা দখল আর শিল্পের আবহমান সম্পর্কে আজও নিত্য দাঁত বসিয়ে চলেছে। এ নাটকে একটা ‘কলকাতার তলা’ আছে, আছে এক বেনিয়া যে বলতে পারে আঙুলের আংটিগুলি দিয়ে শিল্প-ফিল্প দু মিনিটে কিনে নিতে পারি, আছে বাগানবাড়ির বাঈজি আর বায়রন-শেলি ঘেঁটে লেখা স্ক্রিপ্ট দিয়ে ঠোঙা বানানো। উনিশ শতকের রেনেসাঁসকে তথা গিরিশ-বিনোদিনী-স্টারের ছায়াকে এ নাটকে পরতে পরতে ভেসে উঠতে দেখা যায়, সেই পটভূমির সাথে এক রকম সংলাপই চালান উৎপল, কখনও বিদ্রূপ তো কখনও হতাশা ব্যক্ত করে একরকম মহাকাব্যিক পরিহাসের চালচিত্রই যেন বা রচনা করেন, তিনি যেখানে মাইকেল শুনে কিছুটা বিরক্ত হয়েই বাবুর গায়ে কাদা ছিটিয়ে দেয় বারবার কলকাতার তলার লোকটা! আমার প্রজন্মে দাঁড়িয়ে, ক্রমাগত বামপন্থাহীনতা ও আন্তর্জাতিক-আধুনিক মনন হারিয়ে মহিমামণ্ডিত চণ্ডীমণ্ডপ হয়ে ওঠা এ শহর দেখতে দেখতে প্রায়ই মনে পড়ে, ওই লোকটাই আজ নবারুণের ফ্যাতাড়ু, যে এবারে ম্যানহোলের ঢাকনা সরিয়ে উঠে বাজারের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলে যাবে। যে এতটাই বিপদজনক রকমের দেশজ যে তাকে আমরা ‘সাবঅল্টার্ন’ তকমায় ধরতে পারব না, তাই বারেবারে ফিরে যেতে হবে আমাদের উৎপলের ‘প্রোপাগ্যান্ডিস্ট’ কথাটার কাছে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

তো, ‘প্রোপ্যাগ্যান্ডিস্ট’ উৎপল জেল খেটেছেন, নকশাল আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছেন, চারুবাবুর সাথে তাঁর ফটোগ্রাফ ততটাই প্রচারিত যতটা কল্লোল-অঙ্গার-টিনের তলোয়ার-ব্যারিকেড-ফেরারি ফৌজের শো গুলোর হাউসফুল ফটোগ্রাফ। বাবাদের প্রজন্মের যৌবনের গনগনে আগুনের আঁচ রাখা রয়েছে এই সুবিশাল নাটকগুলোরপ্রযোজনাকালের ছবির ভিড়ে, রাখা রয়েছে একটা হুমকি — যে কোনও মুহূর্তে গ্রেপ্তার হতে পারেন উৎপল। দর্শক সবসময় একটা এনকাউন্টারের মুখোমুখি যেন, যেন এখুনি দর্শকাসনে ছিটকে পড়বেন তিনি দলা রক্ত হয়ে বা গোটা মঞ্চটাই ভেসে যাবে গঙ্গায় হঠাৎ কল্লোলে… যে মানুষটিকে আমরা ছেলেবেলায় দেখতাম গোলমালএ, কৈশোরে দেখলাম ‘মগনলাল’-এ, তাঁকেই কীভাবে আমরা দেখছি এই ‘পিপলস আর্টিস্ট’ তকমায়! কীভাবেই বা তিনি সপ্তপদীর ওই শেক্সপিয়ারের ইংরেজি উত্তমের কন্ঠে বলে চমকে দিতে পারেন আবার চায়ের ধোঁয়া বা ‘জপেনদা জপেন যা’-তে বারেবারে হাতড়াতে থাকেন স্তানিস্লাভস্কি থেকে ব্রেখট! এই দ্বন্দ্ব নিয়ে আমার ধারণা দিয়ে যেতে হয়েছে আপামর থিয়েটারপ্রেমীকে… আর এখানেই ‘প্রোপাগ্যান্ডিস্ট’ উৎপলের আসল পরিচয়ে সেঁধিয়ে রয়েছে। কী সেই পরিচয়?

এক কালের আইপিটিএ-র কমরেড উৎপলের সাথে মিল পাই ঋত্বিকের প্রবাদপ্রতিম উক্তির: “সিনেমার চেয়ে উন্নত মাধ্যম পেলে লাথি মেরে চলে যাব”। আসলে, ঋত্বিক বা উৎপল ‘কমিউনিকেশন’কেই গুরুত্ব দিচ্ছেন আপোষহীনভাবে রাজনৈতিক চেতনার ক্রমবিকাশের সাথে সাথেই। তাই ‘প্রোপাগ্যান্ডিস্ট’ শব্দটা একরকম “সিনেমার চেয়ে উন্নত মাধ্যম”-এর সমার্থক এক্ষেত্রে। আশ্চর্যভাবে, দুজনেই ‘যান্ত্রিক মার্ক্সবাদ’-এর সামনে পর্যদুস্ত হন,আইপিটিএ ছাড়তে হয় দুজনকেই। টিনের তলোয়ারের শিল্পীর মতই নিজেদের শিল্পের জন্য যথেষ্ট দাম দিতে হয় তাঁদের। উৎপলের বাকি দুই সহযোদ্ধা শম্ভু মিত্র বা অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাজে যখন রবীন্দ্রনাথ তথা আধুনিকতা নানাভাবে উন্মোচিত হচ্ছে, উৎপল সেখানে সরাসরি ট্রিগার রাখছেন দর্শকদের দিকে, আজকের পরিভাষায় একটু বেশিই ‘লোডেড’ উৎপল, তাই বারেবারেই তাঁর কাজ ও জীবনে ঝুঁকি ঘুরে ফিরে আসে। পরবর্তীকালেঅরুণ মুখোপাধ্যায়ের মারীচ সংবাদ ও জগন্নাথ বা বিভাস চক্রবর্তীর কাজে একভাবে সমালোচিত হতে থাকে বামপন্থা,কিন্তু উৎপল যেন বা আগেই বুঝে ফেলছিলেন সেই সংকেত। তাই ভোটের মাঝের পোস্টার-ড্রামাই হোক বা প্রচারের জন্য পথনাটক, বারবার রাস্তায় নেমে পড়ছেন তিনি। এই নেমে পড়া কিন্তু বাদল সরকারের ধারার নেমে পড়া না। সেখানে বাদলবাবু আস্ত একটা নাটক নিয়ে নেমে ইম্প্রোভাইজ করছেন আর উৎপলের নাটকটা তৈরিই হচ্ছে রাস্তায় — আখ্যান একটা আছে কিন্তু সে আখ্যান ততটা জোরালো না, বক্তব্যটাই মুখ্য। কারণ উৎপল মুখ্যত ‘প্রোপাগ্যান্ডিস্ট’, তাই শিল্পের কাছে তাঁর দায় ততটা না,যতটা মানুষের অধিকারের কাছে।

এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে সুমন মুখোপাধ্যায়ের কাছে শোনা একটি গল্প। প্রখ্যাত নাট্য সমালোচক ধরণী ঘোষ বিরূপ সমালোচনা লেখায় তাঁকে স্টেটসম্যান ভবনে রীতিমত গিয়ে মারতে চেয়েছিলেন উৎপল। আপাত এই মজার ঘটনাটি থেকে মানুষটির ভাইব্রেশন ধরা যায় কিছুটা, ধরা যায় সেই কলকাতাকেও যেখানে এই স্টেটসম্যানের পাতাতেই ফ্রিজ শট নিয়ে চিঠি চালাচালি চলে সত্যজিৎ রায় ও মৃণাল সেনের। আসলে আমি বলতে চাইছি, তিরিশ বছর আগেও একটা আন্তর্জাতিক কলকাতার তাপমাত্রার কথা যেখানে জপেনদার মত আঁতেলরা ছিলেন। তাঁরা অর্থকে ততটা গুরুত্ব দেননি যতটা আন্তর্জাতিক চেতনাকে, ইতিহাসহীনতার অন্ধকারে হারাতে হারাতে চূড়ান্ত জলাজমি ভরাট করে উঠে যাওয়া বহুতলের মতোই ফাঁপা আজ সে চেতনা, আর সেই সুযোগেই জলবায়ু পরিবর্তনে চরমপন্থার পদধ্বনি। কিন্তু সেখানেই গল্পটা থামল না। গত ভোটে সেই চরমপন্থার পরাজয়ে মানুষের ধারাবাহিক শিল্প ও প্রতিরোধের মিছিলই জিতল আবারও। তবে কোথায় যেন এরপরেও উৎপলের টিনের তলোয়ারের সাথে আজকের অ্যাপার্টমেন্ট-শপিং মলের বামপন্থার ফারাক থাকছে?

দু দুটো প্যান্ডেমিকের পর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখলাম মেয়ে-মদ-মস্তির প্রলোভনে থিয়েটার কেনার লোক টিনের তলোয়ার-এর মত আজ খুঁজে পাচ্ছি না চট করে। কর্পোরেটরাও মুখ ফিরিয়েছে, বারো লাখের বিয়ের প্যাকেজের ওয়েডিং ফটোশুট করায় লাভ বেশি, তাই আগ্রাসী ভোগবাদের এই প্রবল চাপে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছে ‘প্রোপাগ্যান্ডিস্ট’ শব্দটার দম-দাম। অন্য দিকে যাঁরা অতিবিপ্লবী, তাঁরা ভুগছেন ইতিহাস ও পড়াশোনাহীনতায়, দিনমান খিস্তি করলে পাল্টা ইতিবাচক কাজও যে সমাপতনে অনিবার্য তা তাঁদের মেধায় ধরা পড়ে না। কাজেই উৎপল-মানসের আজ সত্যিই দৈন্য। এই অভাব উৎপল সনাক্ত করেছিলেন গিরিশ ঘোষ বা মধুসূদনকে বারেবারে সমকালে ফিরিয়ে এনে, আজ উৎপলকে ফিরিয়ে আনবে কোন ‘প্রোপাগ্যান্ডিস্ট’? পঞ্চাশ বছর পর কার খাপ থেকে বেরোবে সেই তলোয়ার, তার উত্তরই ডিলানের গান হয়ে ভেসে চলেছে হাওয়ায়…

আরো পড়ুন:

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.