~সায়ন্তন দত্ত~

 

“ধরো, ধরো সেদিনও এমনই রাত, এই ঋতুবদলের মাস, এই সেপ্টেম্বর,

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ধরো সেদিনও এমনভাবে নিদ্রাহীন বসে থাকা, কৃষ্ণপক্ষ, আর

হঠাৎ এমনই রাতে অরোরা জাহাজে সেই তোপের গুমগুম শব্দ

রাত্রির সমুদ্র চিরে

শোনা গেল গড়বাসুদেবপুর গ্রামে, টাঙ্গি হাতে ছুটে গেল কার্তিক কাহার”

 

কলকাতা শহরের উত্তরতম প্রান্তে কাশীনাথ দত্ত রোড নামে একটি চওড়া রাস্তা রয়েছে। সে রাস্তার এক প্রান্তে সিঁথির মোড়, অপর প্রান্তে বরানগর বাজার — আর সিঁথির মোড় থেকে বরানগর বাজারের দিকে হাঁটতে থাকলে, ডানহাতে পড়ে বরানগর, বাঁ হাতে কলকাতা। কলকাতা আর বরানগরকে দুই পাশে রেখে আপনি যখন এই রাস্তা ধরে হাঁটবেন, ডানহাতে পরপর পড়বে একটি চার্চ, উঠে যাওয়া কারখানা, (যার লোহার গেটের ফাঁকফোকরে চোখ রেখে ভুতুড়ে বিল্ডিংখানা দেখার যারপরনাই ইচ্ছে হবে আপনার), খানিক পরে দেওয়াল জোড়া বেশ খারাপ হাতে আঁকা বাঙালীর নানান প্রিয় মনীষীদের ছবি — রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদি। এই ছবিগুলোই বলে দেবে, আপনি এসে পড়েছেন বরানগর নরেন্দ্রনাথ বিদ্যামন্দিরের কাছে। সে স্কুল প্রায় পঁয়ষট্টি বছরেরও বেশী পুরোনো হওয়া সত্ত্বেও, কাছেই রামকৃষ্ণ মিশনের খ্যাতির কাছে যে ম্রিয়মান, তা আপনি বাইরে থেকেই বুঝতে পারবেন। সোজা হাঁটতে হাঁটতে আপনার চোখে পড়বে অজস্র ছোটখাটো দোকান, যার অধিকাংশই অতিমারীর প্রকোপে ধুঁকছে। মাঝে সাঝে আলো ঝলমলে দু-একটা চকমকে দোকান যে চোখে পড়বে না এমনটা নয়; কিন্তু ছোট পুঁজির সারি সারি দোকানের ফাঁকে তারা যে এখনও সংখ্যালঘু, সে আপনি বিশেষ না ভাবলেও বুঝতে পারবেন।

বরানগর বাজার পৌঁছে, হঠাৎ এসে পড়া ভিড়, তিন দিক থেকে আসা গাড়ির অবধারিত জ্যাম, অজস্র ঝলমলে দোকানপাট, ডানদিকে বরানগর রামকৃষ্ণ মিশন — ইত্যাদির হাতছানি উপেক্ষা করে, যদি বা অকারণে আপনি বাঁদিকে, অর্থাৎ কলকাতার দিকে ঘুরে যান, তাহলে কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্রমশ বদলে যেতে থাকবে চারপাশটা। কয়েক মিনিট পরেই দেখতে পাবেন, অনেক বাস আর অটো সার দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে — আপনাকে বুঝতে হবে, আপনি এসে পড়েছেন চার নম্বর বাসস্ট্যান্ডের কাছে। সময়টা যদি হয় সন্ধে, তবে ধীরে ধীরে ধূসর হয়ে আসবে চারপাশ, নিতান্ত অকাব্যিক, মনমরা, ফ্যাকাশে এক গোধূলি পেরিয়ে ক্রমশ অন্ধকার নামতে থাকবে আপনার চারদিক ঘিরে। আপনাকে কেউ বলতেই পারে, বা আপনি নিজেও হয়ত জানবেন, এ অঞ্চলের সবচেয়ে বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান — কাশীপুর উদ্যানবাটি, রয়েছে সামান্য দূরত্বেই।

কিন্তু চার নম্বর বাসস্ট্যান্ড পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই আপনার চকিতে মনে পড়তে পারে, কাশীনাথ দত্ত রোডে আপনি কি এক ঝলক ডানদিকে তাকিয়ে সরু এক গলির প্রান্তে একটি ক্লাবঘর দেখতে পেয়েছিলেন, যেখানে নীল অ্যাসবেস্টাসের উপর সাদায় লেখা — নবজীবন যুবক সংঘ? কেন চার নম্বর বাসস্ট্যান্ডের কাছে এসে আপনার হঠাৎ নবজীবন যুবক সংঘের কথা মনে পড়বে, আপনি ঠিক বুঝতে পারবেন না। বরং হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার ধারে জীর্ণ এক জিলিপির দোকান থেকে নিতান্ত দয়াপরবশ হয়েই আপনার জিলিপি কিনতে ইচ্ছে করবে। আর সেই ঠোঙা হাতে নিয়েই দেখতে পাবেন, ডানদিকে ধূসর নীল রঙের বাড়িটা। অন্ধকার ততক্ষণে ঘন হয়ে উঠেছে, ভেপার ল্যাম্পের হলুদ আলো জ্বলে উঠবে এদিকে সেদিকে। সেই আলোয় আপনি দেখতে পাবেন হাসপাতালের নাম – নর্থ সুবার্বান হাসপাতাল। হাসপাতালের উল্টোদিকের চওড়া রাস্তাটায় আপনি নিজে থেকেই ঘুরে যাবেন, কারণ ততক্ষণে আপনি টের পেতে শুরু করেছেন, আপনার মস্তিষ্কের কোন গোলকধাঁধায়, আপনার এবং আপনাদের কোনো এক যৌথ নির্জ্ঞানের ভাণ্ডারে তখন সুদূর গঙ্গার পার থেকে হু হু হাওয়া এসে ঝাপটা দিচ্ছে। সে গঙ্গা, সে হাওয়া, আপনি দেখতে পাবেন না — টের পাবেন, খানিক চেতনের পরপারে — সে আপনাকে বলে দেবে, ‘নবজীবন যুবক সংঘ’, ‘চার নম্বর বাসস্ট্যান্ড’, ‘নর্থ সুবার্বান হাসপাতাল’ — এসব নামের মধ্যে কিছু না কিছু সংযোগ রয়েছে। হাসপাতালের উল্টোদিকের রাস্তাটার দিকে ঘুরতেই নীল সাদা নামফলকে চোখ পড়বে আপনার, রতনবাবুর ঘাট রোড। চকিতে চেতন আপনাকে জানান দেবে শ্মশানের কথা। রতনবাবুর ঘাটের কাছে শ্রীরামকৃষ্ণ মহাশ্মশানের নাম কে না জানে! অবশ্য শ্মশান শব্দটিকে নিয়ে আপনি ভাবতে বাধ্য হবেন, শব্দটি আপনার স্মৃতিকে, বাস্তবতাকে এবং সময়কে নানাভাবে প্রশ্ন করতে থাকবে। এমন সময়েই, নিছক কৌতূহলবশত, স্মার্টফোনে সময় দেখতে গিয়ে আপনি দেখে ফেলবেন, বা আপনাকে এতক্ষণের অস্বাভাবিক মুহূর্তগুলো দেখিয়ে নেবে, আজকের তারিখ — ১৩ই আগস্ট, ২০২১।

 

“সেদিনও এমন রাত, থমথম, ভূতুড়ে বাতাস;

থেকে থেকে পিস্তলের শব্দ হল, এইবার

হেলায় অলিন্দযুদ্ধে অন্য নামে জিতে গেছে বিনয় বাদল,

শীতাতপ ভেদ করে সূর্য সেনের ছেলে ঢুকে গেছে ঝলমল ক্লাবে;

অন্য নামে ততক্ষণে কলকাতা পৌঁছে গেছে সিধু কানহু চাঁদ ও ভৈরব;

ষাট হাজার সিপাহি মঙ্গল পাঁড়ে স্থির ও সঠিক লক্ষ্যে

ঘোরাল বন্দুক”

 

কী এক আশ্চর্য জাদুতে, হাঁটতে হাঁটতে টের আপনি টের পাবেন, চারপাশটা বদলে যাচ্ছে ক্রমশ। সময় যে সরলরেখায় নদীর মত বহমান, নদীর একটি ঢেউ যেমন একবার চলে গেলে আর ফেরে না, তেমন প্রতিটা সেকেন্ড মিনিট ঘন্টা যে একটিবারের জন্যই আপনার অভিজ্ঞতায় আসে, এ আপনি ক্রমশ ভুলে যেতে থাকবেন। ২০২১-এর এই অতিমারী আক্রান্ত, মাস্ক পরা বা না পরা অজস্র কঙ্কালসার মানুষ রাস্তার দুপাশ থেকে অদৃশ্য হয়ে যাবেন না, কিন্তু আপনি বুঝতে পারবেন, আপনার চেতনায় সময়ের পথ যেন বদলে যাচ্ছে। সরলরেখার সহজ নিরাপত্তার বদলে সময় যেন থমকে গেছে, কখনও বাঁক খেয়ে পিছনে, বা কুণ্ডলী পাকিয়ে, সাপের মতন, কিছুক্ষণ আগের আপনার হাতের জিলিপির মতন গুটিয়ে যাচ্ছে। ২০২১ থেকে একধারে আপনার অবচেতনায় সময় যাচ্ছে পিছিয়ে, বর্তমানের নানান চিহ্নক, যেমন মা-মাটি মানুষ বা পদ্মফুলের পোস্টার, বাড়ির ছাদের টেলিভিশনের অ্যান্টেনা কিংবা বাংলা সিরিয়ালের শব্দ, যেন সাপের গা থেকে খসে পড়া খোলসের মত ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ছে আপনার চারপাশ থেকে। আবার একইসঙ্গে, আপনার পকেটে আছে স্মার্টফোন, আপনার স্মৃতিতে আছে কিছুক্ষণ আগে দেখা বরানগর বাজারের জমকালো দোকানপাট, শপিং মল। আপনি সময়ের এই দুই সরণি বেয়েই, ক্রমশ যেন নদীর দুই মুখের মত ভেসে যাচ্ছেন দুই নৌকায়, একইসাথে।

একদিকে কুণ্ডলী পাকানো সময় আপনাকে ক্রমশ আকর্ষণ করছে অতীতের দিকে। অন্যদিকে হাঁটতে হাঁটতে, সজ্ঞানে, সম্পূর্ণ সচেতনে আপনি দেখতে পাচ্ছেন আপনার চারপাশ, রাস্তাঘাট, পদ্মফুল আর ভেঙেচুরে আসা ঘরবাড়ি। সচেতনেই আপনি প্রায় নির্জন বিরাট এক জমিদার বাড়ি দেখতে পাচ্ছেন; মরচে ধরা, শ্যাওলায় ঢাকা, ‘বিশ্বাসবাড়ী’ লেখা নামফলক আপনার দৃষ্টির গোচরে না আসলেও সে বাড়ির সামনে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আপনি দাঁড়িয়ে পড়ছেন অকারণে। ভাঙাচোরা পাঁচিল থেকে, দেয়ালের গা বেয়ে, ফাঁকফোকর, চিড় থেকে, যেন কুণ্ডলী পাকানো সময়ের স্রোত ধরে চুঁইয়ে পড়ছে কত গুঞ্জন, কত মর্মর — মানুষের গলার গোপন, ফিসফিস কন্ঠস্বর। দেয়াল থেকে হ্যাঁচকা টানে নিজেকে সরিয়ে এনে মাঝরাস্তায় পড়তে পড়তে আপনি টের পাচ্ছেন, পিছিয়ে যাওয়া সময় আপনাকে টেনে নিয়ে গেছে আগের শতাব্দীতে; নব্বই, আশি পেরিয়ে একেবারে সত্তরের দশকে। পঞ্চাশ বছর আগেকার সময়, যাকে আপনারই পূর্বপুরুষেরা চিহ্নিত করেছে ১৯৭১ সংখ্যাটি দিয়ে। অর্ধশতাব্দীর দুই প্রান্তে, ১৯৭১ এবং ২০২১ – এই দুই চিহ্নকে একসাথে নিয়ে কাশীপুর-বরানগরের এই ভূতুড়ে রাস্তাঘাট ধরে হাঁটতে থাকার জন্য যে আপনিই নির্বাচিত হবেন, তা তো আপনি আজ সকালেও জানতেন না। কিন্তু একবার যখন এসেই পড়েছেন, আপনি আন্দাজ করতে পারছেন, বইয়ের পাতার পাঁচ শব্দের গ্রামের মতন এই জায়গাতেও নিজের ইচ্ছায় বারবার আসা যাবে না। বা এলেও সময় এই পঞ্চাশ বছরের এপার-ওপারের নৌকো আপনার জন্য একইসাথে প্রস্তুত রাখবে না প্রতিদিন। তাই আপনি ফিরে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন।

আপনি হাঁটতে থাকবেন। কাঁপা কাঁপা হলুদ আলোয় ঘেরা মাঝারি, সরু, অতি সরু গলিঘুঁজি এবং দু পাশে প্রায় ভেঙেচুরে যাওয়া, কার্নিশ বেয়ে ওঠা গাছ সহ বাড়ি আর বন্ধ জানলার ওপারে বৃদ্ধ, স্থবির মুখের সারিকে সঙ্গে নিয়ে। সে মুখের কোনোটা পঞ্চাশ বছর আগে আজকের দিনে যখন যুবতী ছিল; সে মুখ যখন পঞ্চাশ বছর আগে আজকের দিনে এই রাস্তায় অজানা অচেনা বাড়িতে আশ্রয়ের সন্ধানে মধ্যরাত্রে ছুটে বেড়িয়েছে; সে মুখ যখন ছেলের, ভাইয়ের, স্বামীর, কখনও বা বোনের বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় থেকেও পঞ্চাশ বছর আগের আজকের রাতে আতঙ্কে দরজা জানলা বন্ধ করে রেখেছে; সেইসব মুহূর্তের কথা একদিকে আপনাকে সামনে ভেসে উঠবে চলমান চিত্রের মত। অন্যদিকে ঝাপসা হয়ে যাওয়া, কাঁপা কাঁপা সেই চিত্রমালার সামনে আপনার শুধু মনে পড়বে ‘শ্মশান’ শব্দটা, যা রতনবাবু রোডে ঢোকার মুখেই আপনাকে উপহার দেওয়া হয়েছিল।

চুল্লিতে ঢোকার আগের মুহূর্তে জ্যান্ত শরীর আর মৃত আত্মা, নাকি মৃত শরীর আর জ্যান্ত আত্মা জেগে থাকে? আটশো থেকে হাজার ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় শরীর না আত্মা বিনষ্ট হয়, আপনি আর ধারণা করতে পারবেন না। আপনার শুধু মনে হবে, জীবিত আর মৃত — অস্তিত্বের এই দুই রূপকে সহজে আলাদা করা যায় না। বরং চোখের সামনে ঘটে যাওয়া দৃশ্য নিয়ে আপনি ভাবতে থাকবেন তারা উদ্বর্তনের এমন এক মধ্য অবস্থানে স্থিত হয়ে আছে, যাকে জ্যান্ত বা মৃত, কোনোটাতেই আর আটকে রাখা যাচ্ছে না। আগেকার শ্মশান শব্দটার মত, এবার আপনার বাস্তবতায় হানা দেবে ইংরেজি specter শব্দটা, আর হয়ত মনে পড়লেও পড়তে পারে, পঞ্চাশ বছর আগেকার এই শ্মশান হয়ে যাওয়া যে তরুণ তরুণীদের ছায়াচিত্র আপনার সামনে উদ্ঘাটিত হচ্ছে, তাদের ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে পড়বার পথে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল একটা বই, ম্যানিফেস্টো — যার প্রথম লাইনে ভূতের মতই specter শব্দটা দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে বসে আছে।

 

“ভাবো; ভাবো সেদিনের উৎসব! বরানগরের গঙ্গার জল থেকে

আবার এসেছে উঠে

তিনশো তরুণ”

 

হলুদ আলোয়, ঝিম ধরা নিথর গলির মধ্যে আপনি দেখতে পাবেন পঞ্চাশ বছর আগেকার, ১৯৭১ সালের আজকের রাতের সেই অভিশপ্ত দৃশ্যকাব্য। একাত্তর সালের সে রাত বস্তুত একটা রাত নয়, সে রাতের শুরু ১২ই আগস্ট রাতে, শেষ ১৪ই আগস্ট দুপুরে। পরদিন ১৫ই আগস্ট দিনটির বাঁকা তাৎপর্য ভাবতে ভাবতেই আপনার খেয়াল হতে পারে, মাত্র আটদিন আগে, ৫ই আগস্ট, ময়দানে ঘটে যাওয়া সেই বিখ্যাত হত্যাকান্ড — ভারী হয়ে নামা কুয়াশায়, ভস্মে ভরে যাওয়া আকাশে সরোজ দত্তের এনকাউন্টার। সাতদিন পরেই, ১২ই আগস্ট দুপুরে কংগ্রেস নেতা নির্মল চট্টোপাধ্যায় খুন হবেন নকশালদের হাতে। নবজীবন যুবক সংঘের এককালীন প্রেসিডেন্ট, ক্ষমতাশালী কংগ্রেস নেতা নির্মল চট্টোপাধ্যায়ের হত্যার পর কংগ্রেসী ছেলে বা গুন্ডারা কীভাবে দুই রাতের মধ্যে প্রায় দুশো জন নকশাল যুবক, আর সামান্য কিছু যুবতীকে সাবাড় করে ফেলবে, আপনি তা কল্পনাও করতে পারবেন না। আপনি যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, সেই বড়াল পাড়া লেন, কাশীশ্বর চ্যাটার্জী লেন বা ভোলানাথ স্ট্রীট থেকে কলকাতা বা বরানগরের দিকে যাওয়ার সব রাস্তা ঘিরে রাখা হলে আপনার যাওয়ার উপায় শুধু গঙ্গায় — আর এই দুই দিক থেকেই হত্যালীলা চালাতে চালাতে কংগ্রেসের গুন্ডারা এগিয়ে যাবে জলের দিকে। চার নম্বর বাসস্ট্যান্ডে সারাক্ষণ আগুন জ্বলার ছবি, নর্থ সুবার্বান হাসপাতালে ১৩-১৪ বছরের কিশোরের প্রাণভিক্ষা চাইতে আসার ছবি আপনার মস্তিষ্কে প্রবেশ করবে। ঝাপসা দেখতে পাবেন কংগ্রেসের সমর্থক হওয়া সত্ত্বেও ডিউটিতে থাকা কম্পাউন্ডার বা হাসপাতালের ডোম — কেউই দুবার ভাবছেন না সেই কিশোরকে রোগী হিসাবে লুকিয়ে রাখার কথা। হাসপাতালে চড়াও হয়ে প্রতি পেশেন্টের চাদর তুলে তুলে অবশেষে তাদের শিকার কিশোরকে নিয়ে গুন্ডাদের উন্মাদ হত্যালীলার ছবি আপনি আর দেখতে পাবেন না, কারণ আতঙ্কে চোখ খুলে রাখার শক্তি ততক্ষণে আপনি হারিয়ে ফেলেছেন। নবজীবন যুবক সংঘ, চার নম্বর বাসস্ট্যান্ড আর নর্থ সুবার্বান হাসপাতাল — এই তিনটি নাম কেন আপনাকে অনেকক্ষণ আগে আন্দোলিত করেছিল — আপনি হয়তো তার আঁচ পাবেন। কিন্তু ততক্ষণে সেই অঞ্চলের আনাচে কানাচে কাটারি, শাবল, দা আর আলকাতরা হাতে কংগ্রেসের গুন্ডাদের তান্ডবের ছবি আপনাকে ক্রমশ অবশ করে দেবে। সত্তরের দশক, মুক্তির দশক, নকশালবাড়ি — যাবতীয় স্মৃতিমেদুরতার উপাদান খানিক আগের পরিপার্শ্বের মতন আপনার শরীর থেকে খোলস হয়ে খসে পড়বে। আপনি টের পাবেন, খুঁড়ে তুলতে চাইলে অতীত কখনও কখনও আক্রমণও করে বসে। বাড়ি খুঁজে খুঁজে প্রায় আড়াই দিনরাত ধরে চলা এই গণহত্যা সেই সময়ের কলকাতা এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের অনেক গণহত্যার একটি। তার প্যাটার্ন, তার ছক, তার ছন্দ — সেও যে খুব আলাদা নয়, আরেকবার আপনাকে মনে করিয়ে দেবে সময়ের এক নৌকা।

সময়ের অপর নৌকাটি তখন আপনাকে দেখিয়ে দেবে পলেস্তারা খসে আসা সারি সারি দেওয়াল, সামান্য ঝোড়ো বাতাসেই ভেঙে যাবে এমন দরজা-জানলা আর মাটির খোঁদলে বসে যাওয়া বাড়ির সামনের এক চিলতে বারান্দাগুলোকে। বিধ্বস্ত, অবসন্ন আপনি হাঁটতে থাকবেন, এ গলি ও গলি — প্রায় একই রকম হলুদ অলৌকিক আলো, টিমটিমে চায়ের দোকান আর বন্ধ দরজার প্রায় ভেঙে পড়া বাড়ির উপরে ‘এই চিহ্নে ভোট দিন’ পোস্টারের পাশ কাটিয়ে। আপনার মনেই হবে না, এখান থেকে দশ মিনিট হাঁটলেই বরানগর বাজারের ঝাঁ চকচকে, জমজমাট বিপণির কথা। সময়ের কুণ্ডলীসম আকৃতি কি স্থানকেও আক্রান্ত করে নিচ্ছে? আপনার সন্দেহ হবে! ২০২১ আর ১৯৭১-র সময়ের দ্বৈত অবস্থানে আপনি রয়েছেন, আপনার ক্রমশ মনে হবে, উপন্যাসে পড়া মেহিকোর কোনো এক প্রান্তরের মত এই অঞ্চলেও যেন স্থান থেকে স্থানে সময় বদলে বদলে যাচ্ছে। দশ মিনিট দূরত্বেই যেখানে ১৯৭১-কে সার্থকভাবে পিচরাস্তার নীচে চাপা দিয়ে গজিয়ে উঠেছে নিরাপদ, নিশ্চিন্ত যাপন, সেখানে এই গলিঘুঁজির মধ্যেই, বাতাসে লুকনো অজস্র দীর্ঘশ্বাসকে সঙ্গে নিয়ে সারি সারি আলকাতরা মাখা লাশ পড়ে আছে। সময়ের চলমান ২০২১ এখানে বুকে আঁকড়ে ধরে রয়েছে অর্ধশতাব্দী আগের ১৯৭১-কে। জীবিত ও মৃতের মাঝামাঝি অবস্থানের মত ভূতুড়ে সেই specter হয়ে আছে গোটা স্থান আর কাল।

কয়েকটি বাঁক ঘুরে আপনি টের পাবেন গঙ্গার হাওয়া। যদি বাতাসের গায়ে কান পাতেন, ২০২১-এর কোলাহল, স্মার্টফোন, টেলিভিশন বা দোকানপাট নিস্তব্ধ হয়ে গিয়ে ঝিঁঝির ডাক ভেসে উঠবে আবারও, আর শুনতে পাবেন ১৯৭১-এর ঠেলাগাড়ির শব্দ। আলকাতরা মাখা সেই লাশের পাহাড় ঠেলাগাড়িতে করে এনে ফেলে দেওয়া হয়েছিল গঙ্গায় — একের পর এক, অগুন্তি। যা সংখ্যার চিহ্নকে ধরে রাখা যায় না। বাতাসের বুকে ওঠা অর্ধশতাব্দী প্রাচীন এই শব্দ, আর অর্ধশতাব্দী পরের আপনি হাঁটতে হাঁটতে গঙ্গার ঘাটের একদম কাছে এসে পড়বেন। সিঁড়ি দিয়ে নামলেই সামনে জলরাশি, যা এই অবস্থাতেও আপনাকে খানিক স্বস্তি না দিয়ে পারবে না। সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাওয়ার আগে যদি একবার আপনি ফিরে তাকান — অবশ্য আপনাকে তাকাতেই হবে — দেখতে পাবেন ঘাটের উল্টোদিকে রাস্তার উপরে ছোট্ট সাদা-লাল পাথরের একটি শহীদ বেদি। কাছে গিয়ে আপনি তার গায়ে লেখা ছোট ছোট অক্ষরগুলো পড়ে নেবেন — এ অঞ্চলের একমাত্র শহীদ স্মারক, যা পঞ্চাশ বছর আগে কাশীপুর-বরানগর গণহত্যায় নিহত ছেলেমেয়েদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত।

 

টীকা:

১) এই বাক্যটি হুয়ান রুলফোর লেখা উপন্যাস পেদ্রো পারামো-র একটি বাক্যকে ভেঙে লেখা। মানবেন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের তর্জমায় প্রকাশিত বই, হুয়ান রুলফোর কথাসমগ্র-র ৫৩ নং পৃষ্ঠায় পাওয়া যাবে।

২) এই বাক্যটি জাক দেরিদার বই Specters of Marx: The State of the Debt, the Work of Mourning and the New International -এর একটি বাক্যের বাংলা অনুবাদ। আমি উদ্ধৃতিটি পেয়েছি দীপেশ চক্রবর্তীর প্রবন্ধ ‘ভারতবর্ষে আধুনিকতার ইতিহাস ও সময়-কল্পনা’ (মূল বই, মনোরথের ঠিকানা) -র ২১৬ নং পৃষ্ঠা থেকে। এই প্রবন্ধটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য আমি আমার বন্ধু শিমুল সেনের কাছে ঋণী।

 

এছাড়া তথ্যঋণ: অমলেন্দু সেনগুপ্ত, জোয়ারভাঁটায় ষাট-সত্তর, পার্ল পাবলিশার্স।

লেখায় উদ্ধৃত কবিতার লাইনগুলি মৃদুল দাশগুপ্তের কবিতা ‘আগামী’ থেকে নেওয়া (মূল কাব্যগ্রন্থ: জলপাইকাঠের এসরাজ)

2 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.