লক্ষ্মীর ভান্ডার বলতে চোখে ভেসে ওঠে ছোটবেলার সেই মাটির ভাঁড়। তাতে মা, মাসিমারা সংসারের খরচ বাঁচিয়ে পয়সা জমাতেন। ক্রমশ ভরে উঠত সেই ভাঁড়। আনন্দে, উৎসবে বা আকস্মিক বিপদ আপদে তাঁরা সেই ভান্ডার ভাঙতেন। এই ভান্ডার ছিল তাঁদের নিজস্ব। ছোটদের জন্যও ছিল এই রকমই ভাঁড় যাতে তাদের সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে ওঠে।

অতীতের সেই স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে, রাজ্য সরকার নিয়ে এল লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্প। পরিবারের মেয়েদের হাতে সরাসরি ৫০০-১০০০ টাকা পর্যন্ত মাসিক ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা। প্রকল্পের নামে যদিও ধর্মনিরপেক্ষতা ফুটে ওঠে না, তা সে না হয় বাদ দিলাম। আজকাল মোটামুটি ধর্মনিরপেক্ষ হলেই চলে, দেশের যা অবস্থা। এখন আসা যাক মূল প্রসঙ্গে বা দাবিতে। এই মাসিক ভাতা সত্যিই কি মহিলাদের স্বাবলম্বী করবে, তাদের ক্ষমতায়নের পথ সুগম করবে? এখানে প্রথমেই বলে নিই, যারা এই প্রকল্পকে ‘ভিক্ষা’ ইত্যাদি বলছেন, তাদের সাথে আমার মতের বিস্তর ফারাক আছে। যে কোনো সরকারি অনুদানই প্রাপকদের ন্যায্য পাওনা, যাকে আমরা entitlement বলি। সুতরাং ভিক্ষা ইত্যাদি কুতর্কের মধ্যে আমি যাব না। আমার কাছে লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পের দুটি দিক গুরুত্বপূর্ণ।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

প্রথমত, এর প্রায়োগিক দিক ও দ্বিতীয়ত, এর কার্যকারিতা।

নাগরিকদের সরাসরি টাকা দেওয়া, অর্থাৎ যাকে বলে direct benefit transfer (DBT), এটা এ দেশে তথা বিশ্বে নতুন নয়। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে ল্যাটিন আমেরিকার নানা দেশে এ নিয়ে বিস্তর পরীক্ষা হয়েছে। ভারতেও ডিবিটি প্রথম নয়। উদার অর্থনীতিতে এই দাওয়াইটি প্রায়ই ব্যবহৃত হয় অর্থনৈতিক মন্দার সময়। শোনা যাচ্ছে যে এ রাজ্যের অর্থনীতির উপদেষ্টারাও সেই পথেই সরকারকে হাঁটার পরামর্শ দিয়েছেন।

কিন্তু আমাদের রাজ্যের প্রেক্ষিতে এরকম ডিবিটির সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করবে প্রযুক্তির উপযুক্ত ব্যবহারের উপর। লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পে আধার সংযুক্তিকরণ বাধ্যতামূলক। অথচ এ দেশে আধারের ব্যবহারগত সীমাবদ্ধতা ও তার ফলে রেশন না পেয়ে অনাহারে দিনযাপনের মত ঘটনা বিরল নয়। আমাদের রাজ্য তথা দেশে সরকারি প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের সনাক্তকরণ প্রক্রিয়া বেশ জটিল এবং বহু ত্রুটিপূর্ণ। লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পেও টার্গেটিংয়ের চিরাচরিত ত্রুটিগুলো থাকতে বাধ্য। প্রকল্পের আওতায় কারা আসবেন তা নির্ধারণে প্রশাসনিক স্তরে স্বচ্ছতা না থাকলে, অনেকেই প্রকল্পের আওতাধীন হতে পারবে না। কাজেই মজবুত প্রশাসনিক কাঠামো ও কার্যকরী প্রযুক্তির মেলবন্ধন এই ধরনের প্রকল্পের সার্থক রূপায়ণের পূর্বশর্ত। অনেক অর্থনীতিবিদ এ ধরনের প্রকল্পকে সার্বজনীন করার কথা বলেছেন। যদিও লক্ষ্মীর ভান্ডারকে প্রায় সার্বজনীন বলা যায়, তবু কিছু মহিলা এর আওতার বাইরেই থাকছেন। এই বাছবিচারের যুক্তি বোঝা গেলেও, ফাঁক থেকেই যায়। আমারই পরিচিত এক পরিচারিকা মহিলার একমাত্র মেয়ে সরকারি চাকরি করে, কিন্তু মাকে দেখে না। প্রশ্ন থেকেই যায়, এসব ক্ষেত্রে মা কি এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন? নাকি মেয়ে ভাল চাকরি করে বলে তিনি বাদ পড়ে যাবেন?

ইতিমধ্যেই আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখছি যে করোনা পরিস্থিতিতেও লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার আশায় স্থানীয় ক্যাম্পে মহিলাদের ঢল নেমেছে। কাজেই প্রকল্পটি যে মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অনেকে দরখাস্ত জমা করতে পারলেও, অনেক মহিলা এখনো দরখাস্ত দাখিলের অপেক্ষায়। আর এই ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্থানীয় নেতা, কর্মীদের ভূমিকাও প্রশ্নের উর্ধ্বে নয়। অনেক ক্ষেত্রেই নানা নিয়মভঙ্গের অভিযোগ আসছে, যার মোকাবিলায় প্রশাসনের আরও সক্রিয় হওয়া দরকার।

প্রয়োগের আরেকটা চ্যালেঞ্জ হল মহিলাদের নামে ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খোলা। যদিও এর একটা সদর্থক দিক অবশ্যই আছে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই অ্যাকাউন্ট খোলা নিয়েও মানুষের হয়রানি কম হচ্ছে না। আর এরপর প্রকল্প চালু হলে ১০০ দিনের কাজ বা অন্যান্য প্রকল্পের মতই, এক্ষেত্রেও যে ফড়েদের লক্ষ্মীছাড়া কার্যকলাপ গৃহলক্ষ্মীদের মাথাব্যথার কারণ হবে না, সে কথা দায়িত্ব নিয়ে কে বলতে পারে? এই চিত্র তো নতুন নয়।

বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে, যেখানে সরকারি ব্যাঙ্ক পরিষেবা সীমিত, আজ যখন ব্যাঙ্কের বেসরকারিকরণ চলছে পুরোদমে, তখন আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, ব্যাঙ্কে গিয়ে টাকা তুলে আনার খরচ ও পরিশ্রমে ঢাকের দায়ে মনসা বিক্রির দুর্ভাবনা থাকছে। আর এসব ক্ষেত্রেই গ্রামের দালাল বা ফড়েরা দাঁও মেরে থাকে। এছাড়া ব্যাঙ্কের লেনদেনের গোলমাল যদি হয়, প্রান্তিক মহিলারা কাদের কাছে সাহায্যের জন্য যাবেন, কত দ্রুততার সাথে অভিযোগের নিষ্পত্তি হবে, সেসব প্রশ্নও অবান্তর নয়। তবে এটা বলতেই হবে, উপরে উল্লিখিত প্রয়োগ সংক্রান্ত ত্রুটিগুলো প্রশাসনের তৎপরতায় ও রাজনৈতিক সদ্দিচ্ছায় মোকাবিলা করা সম্ভব।

এবার দেখা যাক নীতিগতভাবে এই প্রকল্পের সমালোচনায় যে কথাগুলো সমাজবিদ ও অর্থনীতিবিদেরা স্মরণ করাচ্ছেন, সেগুলো কী কী। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে, মেয়েদের নামে কোনো সম্পদ লিখে দিলেই, আর বিশেষ করে তা যদি টাকা হয়, তার উপর পুরো কর্তৃত্ব যে মেয়েদেরই থাকবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং উল্টো প্রমাণ অনেক আছে। আজও পঞ্চায়েতে ৩৩% মহিলা আসন সংরক্ষণের পরেও এবং মহিলারা নির্বাচনে জিতে আসার পরেও, তাদের বকলমে ‘সরপঞ্চ পতি’-রা কাজ চালাচ্ছেন, এই ঘটনা বিরল নয়। তবুও মানছি, কোথাও একটা দেয়াল ভাঙার কাজ শুরু করা দরকার। তাই মহিলাদের হাতে সরাসরি কিছু টাকা পৌঁছে দেওয়ায় হয়ত কিছুটা লাভ হবে, কিন্তু তাকে মহিলাদের ক্ষমতায়ন বলা ঠিক নয়। ক্ষমতায়ন তো শুধু টাকা দিয়ে হয় না, তার জন্য লাগে নারী-পুরুষ সমান অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা, লাগে উন্নয়নের যাত্রায় পরিবার থেকে বৃহত্তর সমাজে, তাদের সমান সুযোগ পাওয়ার নিশ্চয়তা। লিঙ্গভেদের উর্ধ্বে উঠে গণতান্ত্রিক অধিকার ও কর্তব্যবোধের বিকাশ।

কাজেই স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা করার সাময়িক দাওয়াই হিসেবে, মহিলাদের হাতে কিছু টাকা পৌঁছে দেওয়া একটা পদক্ষেপ, যার সাথে বৃহত্তর লিঙ্গসাম্য বা মহিলা ক্ষমতায়নের প্রত্যক্ষ যোগ খুঁজতে যাওয়া অপ্রাসঙ্গিক।

সরাসরি ব্যাঙ্কে টাকা পাঠানোর সমালোচনা করেন, এমন অর্থনীতিবিদরা এছাড়াও একাধিক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। যেমন খাদ্য বন্টন ব্যবস্থার পরিপূরক হিসাবে কোনোদিনই সরাসরি টাকা দেওয়ার বিষয়টা মেনে নেওয়া যায় না। তাতে অনাহার আরো বাড়বে, সরকারের দায়বদ্ধতা কমবে। একই যুক্তি প্রযোজ্য সবরকম গ্রামোন্নয়ন প্রকল্পের জন্য। যদি পঞ্চায়েতের ভূমিকাকে খর্ব করা হয়, তাহলে প্রকারান্তরে তা মানুষের সম্মিলিত ক্ষমতাকে হ্রাস করাই হবে। কাজেই সরাসরি টাকা পাঠালেও মূল পরিকাঠামো গঠন, মৌলিক মানবাধিকার সম্পর্কিত পরিষেবাগুলো (লেখাপড়া, স্বাস্থ্য, রাস্তাঘাট, পানীয় জল, বাসস্থান ইত্যাদি) সরকারি তত্ত্বাবধানে, সরাসরি প্রদান করা উচিত। সেগুলোর বাজেট বরাদ্দ কমানো কখনোই যুক্তিযুক্ত নয়।

এছাড়াও, সরাসরি পাওয়া টাকার ব্যবহার নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, সংশয় প্রকাশ করেছেন, টাকা সংসারের কল্যাণে না লেগে অপপ্রয়োগ (খাবারের বদলে মদ ইত্যাদি কেনার খরচে) হতে পারে ইত্যাদি। এক্ষেত্রে অবশ্য আমি সাধারণ মানুষের শুভবুদ্ধির উপর বিশ্বাস রাখারই পক্ষপাতী। তবে যাঁরা ব্রাজিল ইত্যাদির উদাহরণ দিয়ে সরাসরি টাকা দেওয়া সমর্থন করেন, তাঁদের মনে রাখা উচিত, এই রাজ্যের তথা দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, বিশেষ করে গ্রামীণ খাদ্য সরবরাহের বাজার প্রায়শই ত্রুটিপূর্ণ, যার ফলে দরিদ্র মানুষ হয়রানির শিকার হন। খাদ্যের বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম যখন রোজ লাফিয়ে বাড়ে, তখন একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেওয়ার মাধ্যমে আসল সমস্যার সমাধান হওয়া সম্ভব নয়। কাজেই সরাসরি টাকা দেওয়ার প্রচেষ্টা তখনই সফল হবে, যখন এর পাশাপাশি বাজারের উপরে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকবে, সরাসরি নাগরিকদের সহায়তা করার বর্তমান প্রকল্পগুলোর উপরেও সরকার আরও জোর দেবে, এবং প্রয়োজনে নতুন প্রকল্প রূপায়ণের পথে হাঁটবে। এটা তখনই সম্ভব যখন সরকারের কাছে ভবিষ্যতের উন্নয়নের রূপরেখা স্পষ্ট থাকে।

কাজেই একদিকে যেমন এ ধরনের প্রকল্পকে স্বাগত জানাতে দ্বিধা নেই, তেমনি অন্যদিকে আশা করি কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সরকার আরও নিবিড়ভাবে মনোনিবেশ করবে। শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থান — সব ক্ষেত্রেই নারী-পুরুষ সমতা প্রতিষ্ঠার প্রয়াসকেও জোরালো করবে।

পরিশেষে বলি, আরেকটা সমালোচনার গুঞ্জন সব থেকে বেশি কানে আসে। সেটা হল, প্রকল্পের টাকাটা আসবে কোথা থেকে? ব্যক্তিগতভাবে আমি এই সমালোচনায় কান দিতে নারাজ। সব জনমুখী প্রকল্পই চলে করের টাকায়। আর কোন খাতে সরকার কত ব্যয় করবে সেটা নির্ভর করে সরকারের উন্নয়নের অভিমুখের উপরে বা অগ্রাধিকারের উপরে। আমি মনে করি জনকল্যাণমুখী প্রকল্পগুলোর অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। মহিলাদের স্বাবলম্বী করার প্রকল্পের অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। তবে ৫০০-১০০০ টাকা দিয়ে মহিলাদের সামাজিক তথা পারিবারিক স্বীকৃতি হয়ত কিছুটা বাড়ানো যাবে, কিন্তু তাদের স্বাবলম্বী করা যাবে কি? এটাই লাখ টাকার প্রশ্ন।

এত কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্বের পরেও আমি লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পকে স্বাগতই জানাব, কিন্তু প্রতিবারই এটাও মনে করিয়ে দেব, মহিলাদের স্বাবলম্বী হওয়া বা ক্ষমতায়নের পথে এটা একটা ছোট পদক্ষেপ মাত্র, আমাদের অনেক পথ হাঁটতে হবে। আর তার জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সুসংহত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও সামাজিক মূল্যবোধ, যার স্থান হতেই হবে ভোটবাক্সের রাজনীতির অনেক উর্ধ্বে।

আরো পড়ুন : নারীর ক্ষমতায়নের পথে সদর্থক পদক্ষেপ লক্ষ্মীর ভান্ডার

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.