গত বৃহস্পতিবার (২৮ নভেম্বর, ২০২৪) বাংলার বৌদ্ধিক জগতে এক নক্ষত্রপতন হল। আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমিয়কুমার বাগচী। অমিয়বাবুর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এমন দাবি করা হবে সত্যের অপলাপ। কারণ তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ আমার হয়নি। তবে বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে, অর্থনীতি ছাড়াও অনেক বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা হয়েছে, আর তাতে এক ধরনের নৈকট্য অনুভব করেছি। একদা গৌড়বঙ্গের রাজধানী তথা এক সমৃদ্ধশালী নগর ছিল কর্ণসুবর্ণ। আজ আর সেই শহরের বিশেষ কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় না। তবে সেখানে ছিল বিখ্যাত রক্তমৃত্তিকা বিহার, যার কিছু ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। তার লাগোয়া একটা ছোট গ্রাম যদুপুর। সেখানেই জন্ম অমিয়বাবুর। সে অর্থে মুর্শিদাবাদের এক প্রত্যন্ত গ্রামের অতি সাধারণ পরিবারে জন্ম। অমিয়বাবু যেন প্রকৃত অর্থেই কর্ণসুবর্ণের গুপ্তধন। ওই গ্রাম থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে আর এক প্রত্যন্ত গ্রামে আমার জন্ম। এই ব্যাপারটাই যেন আমাদের সম্পর্কে গভীরতা এনে দিয়েছিল।
কলকাতায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরের পড়াশোনা শেষ করে কিছুদিন তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ান। তারপর পিএইচডি করতে চলে যান কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানকার পড়াশোনা শেষ করে কেমব্রিজেই চাকরি পেয়ে যান। কিন্তু দেশ ছেড়ে বেশিদিন থাকা তাঁর ধাতে সইত না। তাই ফিরে এসে আবার প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াতে শুরু করেন। তবে শুধু দেশ বলে নয়। দেশের মধ্যেও বাংলার বাইরে থাকতে তিনি রাজি ছিলেন না। বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতির পরিমণ্ডলের বাইরে তিনি যেন জল ছাড়া মাছ। রবীন্দ্রসঙ্গীত আর বাঙালি খাবার ছাড়াও তাঁর চলত না। এসব ছেড়ে স্রেফ নিজের কেরিয়ার বানানোয় মনোনিবেশ করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব ছিল।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সাধারণভাবে বলা হয়, অমিয়বাবুর কাজের ক্ষেত্র হল অর্থনৈতিক ইতিহাস। তবে এমন একটা সরলীকৃত অভিধা দিয়ে তাঁর কাজকে বোঝা সম্ভব নয়। তাঁর কাছে ইতিহাস শুধু কিছু ঘটনাবলীর বিবরণ নয়। আসলে ইতিহাসের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা। ইতিহাস বা ইতিহাসবোধকে অগ্রাহ্য করে, শুধুমাত্র অর্থনীতির তাত্ত্বিক ব্যাপারগুলোকে নিয়ে কচকচানি তাঁর মতে ছিল অবান্তর কালক্ষেপ। ইতিহাস আর তত্ত্বের মধ্যে যদি মেলবন্ধন ঘটানো না যায়, তাহলে সেই তত্ত্বের কোন প্ৰয়োজনীয়তা নেই। অমিয়বাবু যখন পিএইচডি করতে যান তখন চলছে অর্থনীতিতে দেদার গণিত ঢুকিয়ে দেওয়ার ঝোঁক। তিনিও তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তবে অচিরেই বুঝতে পারেন যে এমন গণিতনির্ভর অর্থনৈতিক গবেষণা আর যা-ই হোক, ভারতের মত গরিব দেশের নীতি নির্ধারণে খুব একটা কাজে আসবে না। তবে তিনি অর্থনীতিতে গণিত ব্যবহারের বিরোধী ছিলেন এমন নয়। তিনি চাইতেন এ ব্যাপারে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করা হোক। শুধুমাত্র অঙ্ক কষার জন্যই অঙ্ক কষতে তাঁর প্রবল অনীহা ছিল।
ঔপনিবেশিকতার ইতিহাস দিয়েই তিনি বুঝতে চাইতেন বর্তমান গরিব দেশগুলোর অনুন্নয়নকে। আমরা যে প্রায়শই বলে থাকি গরিব দেশগুলো স্বাধীন হয়েছে, সেও তো অনেকদিন হয়ে গেল। কিন্তু আজও কেন আমরা গরিব? তাহলে ঔপনিবেশিক ইতিহাস তথা ঔপনিবেশিক শাসন কি আমাদের অনুন্নয়নে কোনো ভূমিকা পালন করেনি? তিনি বলতেন, ঔপনিবেশিকতা সারা পৃথিবী জুড়ে যে অসাম্য তথা অসম আন্তজাতিক অর্থব্যস্থার সৃষ্টি করেছে, তার থেকে আমরা বেরোতে পারলাম কই? আবার সেদিক থেকে দেখতে গেলে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যে ধনতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চলছে, তার থেকে ঔপনিবেশিকতাকে আলাদা করা যায় না। কথাটা যেমন ইতিহাসগতভাবে সত্যি, তেমনি বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে ঔপনিবেশিকতার যে রূপান্তর হয়েছে সেদিক দিয়ে দেখলেও সত্যি।
আরো পড়ুন রণজিৎ গুহ: আজীবন লড়েছিলেন নিজের বিরুদ্ধেই
অর্থনীতিবিদ অমিয় বাগচী কত বড় মাপের মানুষ ছিলেন তা নিয়ে কিছু বলা হয়ত আমার জন্যে হবে চরম ধৃষ্টতা। তাই ব্যক্তি হিসাবে যেভাবে দেখেছি সেটা একটু বলার চেষ্টা করব। অমিয়বাবুর সঙ্গে আমার আমার প্রথম দেখা গত শতাব্দীর নয়ের দশকের মাঝামাঝি একটা সময়ে দিল্লির এক সেমিনারে। তবে তার অনেক আগে থেকেই তিনি ছিলেন আমার অনুপ্রেরণা। তাই এগিয়ে গিয়ে পরিচয় দিলাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, আমার সম্পর্কে নাকি আগে থেকেই জানেন। আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজের মনোজকুমার সান্যাল এবং জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও আমার পিএইচডি পথপ্রদর্শক দীপক নাইয়ারের থেকে নাকি আমার সম্পর্কে শুনেছেন। যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
যা-ই হোক, এর কিছুকাল পরেই আমার ভাই আমাকে একদিন জিজ্ঞেস করে বসল, ওরা ওদের কলেজে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা নিয়ে একটা আলোচনা করতে চায়; ওই বিষয়ে বলার জন্য আমি কোনো কলকাতাভিত্তিক বক্তার সন্ধান দিতে পারব কিনা। আমি যথারীতি অমিয়বাবুর নাম বললাম। ভাই বলে বসল ‘কিন্তু উনি তো অত্যন্ত বড় মাপের মানুষ, আমাদের কলেজের সামান্য একটা অনুষ্ঠানে আসবেন কেন?’ আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল ‘তুই গিয়ে বল যে তুই মুর্শিদাবাদের ছেলে এবং আমার ভাই।’ বলে তো দিলাম, তবে মনে একটা সংশয় থেকেই গেল। সত্যিই কি উনি ওদের কলেজের অনুষ্ঠানে যাবেন? তবে কয়েকদিনের মধ্যেই জানতে পারলাম, উনি আমার সংশয় দূর করে দিয়ে ওদের কলেজে বক্তৃতা দিয়ে এসেছেন এবং কলেজের সকলেই অত্যন্ত খুশি হয়েছে।
ব্যক্তিগতভাবে অমিয়বাবু ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক মানুষ এবং সবাইকে খুব সম্মান দিয়ে কথা বলতেন। তবে সেই অমিয়বাবুই আবার ছিলেন অর্থনীতি মহলের ত্রাস। সোজা কথাটা সোজাভাবেই বলতেন। অনেক সেমিনারে দেখেছি, অনেক বড় বড় রথী মহারথী অমিয়বাবুর প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হয়ে ধরাশায়ী হয়েছেন। তাই অমিয়বাবু থাকলে তাঁর সামনে বক্তব্য রাখতে বুক দুরুদুরু করত। দক্ষিণপন্থীরা অবশ্য বলতেন যে অমিয়বাবু নিজে বামপন্থী ছিলেন বলে সচরাচর দক্ষিণপন্থীদের সঙ্গেই অমন করতেন। কথাটা কিন্তু সত্যি নয়। একবার এক বামপন্থী অর্থনীতিবিদের বক্তৃতার পরেও তিনি যা বলেছিলেন তার মর্মার্থ ছিল – অঙ্ক তো অনেক কষেছেন, কিন্তু নতুন কিছু কি বেরোল? আপনি যা বললেন সেসব কথা তো অনেকেই ৫০ বছর ধরে বলে আসছেন।
অমিয়বাবু ছিলেন প্রকৃত অর্থে পণ্ডিত। অধীত বিষয়ের প্রতি গভীর ভালবাসা ছিল এবং কিছুটা যেন অধিকারবোধও। আর সেকারণেই উনি চাইতেন যে যা কাজ করছে সেটাই যেন মনপ্রাণ দিয়ে করে। তবে আমাকে কখনো তাঁর প্রশ্নবাণের সম্মুখীন হতে হয়নি। দু-একবার অবশ্য আলাদা করে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন।
অমিয়বাবুর সঙ্গে আমার শেষ দেখা ২০১৮ সালের শেষদিকে কলকাতার এক সেমিনারে। সেমিনারের কর্মসূচিতে অমিয়বাবুর নাম ছিল না। কিন্তু মঞ্চে বলতে উঠে দেখি অমিয়বাবু দর্শকাসনে বসে। যথারীতি বুক কেঁপে উঠল। আবার মনে হল, এ আমি কী দেখছি! অমিয়বাবুর মত একজন দিগ্গজ ব্যক্তি, বক্তা হিসাবে নয়, শুধুমাত্র শোনার জন্য এই বয়সেও সেমিনারে এসে হাজির হয়েছেন! এটা অমিয়বাবুর মত অত বড় পণ্ডিতদের মধ্যে সত্যিই বিরল। যা-ই হোক, প্যানেলে আমি ছাড়া আরও দুজন ছিলেন। কিন্তু দেখলাম উনি কাউকেই কোনো প্রশ্ন করলেন না। আমার বলা শেষ হতেই অমিয়বাবুর পাশে গিয়ে বসলাম। অনেক কথা হল। জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোন প্রশ্ন করলেন না কেন। উত্তর দিলেন ‘আমি তো শুধু শুনতে এসেছি আজ।’ তবে পরে একটা প্রশ্ন করেছিলেন একজন খ্যাতনামা অধ্যাপককে। যথারীতি সে প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দেওয়া যায়নি। তা আমি জিজ্ঞেস করে বসলাম, সবাইকে এত কঠিন প্রশ্ন করেন, আমাকে সবসময় ছেড়ে দেন কেন? আমি নিশ্চয় অন্তত কিছু ভুলভ্রান্তি করি। উনি জবাব দিলেন ‘ভুলভ্রান্তি যা-ই করো না কেন, তোমার মধ্যে সৎ চেষ্টাটা দেখতে পাই। কোন ওপরচালাকি দেখি না।’
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








