বাঙালির ইতিহাসে শ্যামাচরণ ঘটক, ঈশ্বরচন্দ্র গোস্বামীর নাম ঝাপসা। বলা ভাল, সে ইতিহাস খুঁজেই দেখিনি আমরা। কালীচরণ বসাক নাকি কলকাতার বাবুদের বাড়িতে দুঁদে দাবাড়ুদের সঙ্গে খেলার আমন্ত্রণ পেতেন আর তাঁদের হারিয়ে আসতেন, এই ছিল তাঁর নেশা। আদৌ কেউ ছিল কি ওই নামে? রবার্ট স্টিলের নেতৃত্বে কলকাতা বনাম লিভারপুল যুগান্তকারী টেলিগ্রাফ দাবা ম্যাচ তথ্যপ্রযুক্তির জগতে আলোড়ন তুলেছিল ১৮৮০ সালে। আমরা সংস্কৃতির শ্লাঘায় সেসব অবজ্ঞায় ভাসিয়ে দিয়েছি। দাবার ছকে ‘ডিসকভার্ড অ্যাটাক’ খুঁজে পেয়ে দাবাড়ু যেমন উল্লসিত হয়, সেরকমই যুগপৎ চমৎকৃত ও আনন্দিত হতে পারেন পাঠক। হুতোমের ভাষায় কলকাত্তাইয়া দাবার “ইন্‌সাইট জানলে, পাঠকের বহুজ্ঞতার বৃদ্ধি হবে”, হয়ত।

১৮৭৮। কলকাতা শহরে প্রথম লিগ ম্যাচ। ১১ ম্যাচের ডাবল রাউন্ড রবিন। “দাবা তো রকের খেলা”, “দাবা খেলায় শেখার কী আছে?” বা “দাবা কর্মনাশা” ইত্যাদি যাঁরা বলেন, তাঁরা হয়ত জানবেন না, যে ১৮৭৯ সালের অগাস্টে ব্রিটেনের বিখ্যাত দ্য ফিল্ড কাগজে একটা কলাম লেখেন উইলহেম স্টেইনিৎজ। স্টেইনিৎজ বিশ্বের অবিসংবাদী এক নম্বর দাবাড়ু তখন, পল মরফিকেও ছাপিয়ে যাচ্ছেন। আর ১৮৮৬ সালে প্রথম সর্বজনস্বীকৃত বিশ্ব খেতাব তিনিই দখল করবেন। স্টেইনিৎজ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে খেলা বিভিন্ন ম্যাচের খবর রাখতেন এবং তা বিশ্লেষণও করতেন। সেই স্টেইনিৎজ কলকাতা শহরের একটি ম্যাচের বিশ্লেষণ করে লেখেন “The subjoined game was played between two Brahmins in last year’s Calcutta tournament. Though the opening is not conducted in accordance with acknowledged rules of development, the style of play in the middle part and the end will be found worthy of attention.”

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এরপর সম্পূর্ণ খেলাটির বিশ্লেষণ। তখন কোথায় অত্যাধুনিক চেস-ইঞ্জিন?

দুই কলকাতাবাসীর ম্যাচ সুদূর ব্রিটেনের কাগজে বিশ্লেষিত হচ্ছে তৎকালীন বিশ্বশ্রেষ্ঠ দাবাড়ুর দ্বারা! মিডল গেম আর এন্ড গেম প্রশংসিত হচ্ছে এক দাবা-তাত্ত্বিকের আলোচনায়। খেলাটা শুরু হয়েছিল কিং-পন ওপেনিং (রাজার সামনের বোড়ে দু ঘর বাড়িয়ে) দিয়ে, তারপর ভিয়েনা ভ্যারিয়েশন। চুয়াল্লিশ চালের গেম, প্রলম্বিত মিডল গেম। স্টেইনিৎজ ঠিকই বুঝেছিলেন, এই গেমের শিল্প মিডল গেম আর এন্ড গেমের নৈপুণ্যে। ভারতীয় দাবাড়ু মানেই রক্ষণাত্মক নীতি কিংবা ‘ইন্ডিয়ান’ সিস্টেমে খেলবে – এটা প্রায় সকলেই জানতেন। কিন্তু, এই দুই কলকাত্তাইয়া দাবাড়ুর খেলায় ‘ইন্ডিয়ান স্ট্রাকচার’ নেই, বরং রয়েছে অর্ধবদ্ধ (সেমি-ক্লোজড) সেন্টার, যা বিশ্বব্যাপী দাবার নতুন তত্ত্ব হিসাবে গৃহীত হতে চলেছে পরের দশক থেকে। ওপেন-সেন্টার গেম থেকে অর্ধবদ্ধ বা ক্লোজড-সেন্টার গেমে বিবর্তনের রাজনীতিও কম চমকপ্রদ নয়, যদিও সে অন্য কাহিনী।

ওই দুই কলকাত্তাইয়া দাবাড়ুর নাম কী? অনেক কুইজ মাস্টারও বোধহয় খোঁজ রাখেননি। সাদা ঘুঁটিতে ছিলেন এন চৌবে আর কালো ঘুঁটিতে ঈশ্বরচন্দ্র গোস্বামী (IC Gossain)। গোঁসাই জিতেছিলেন। ওই লিগের ১১ জন দাবাড়ুর মধ্যে ছজন ব্রিটিশ আর পাঁচজন ভারতীয় দাবাড়ু। প্রত্যেকে প্রত্যেকের সঙ্গে দুবার করে খেলবে, অর্থাৎ ডাবল রাউন্ড রবিন। প্লে-অফ ফাইনালে ঈশ্বরচন্দ্র হেরে যান রবার্ট স্টিলের কাছে। দু’জনেরই পয়েন্ট ১৫.৫, কিন্তু প্রথম লিগের চ্যাম্পিয়ন রবার্ট স্টিল। ১৮৮০ সালে শোভাবাজার রাজবাড়ির পৃষ্ঠপোষকতায় ঈশ্বরচন্দ্র আর রামমোহন চক্রবর্তীর ১১ রাউন্ডের ম্যাচ হয়েছিল। আধুনিক বিশ্ব খেতাবি লড়াইয়ের কলকাতা সংস্করণ বলা যেতে পারে। জিতেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র। রামমোহন চক্রবর্তী বীরভূম থেকে কলকাতায় এসেছিলেন অর্থান্বেষণে, উত্তর কলকাতার অলিগলিতে দাবা দেখতে দেখতে শিখেও ফেলেছিলেন অচিরেই। তাঁর এক অদ্ভুত দক্ষতা ছিল। বোর্ডে বিশপ বা গজের ব্যবহারে ছিন্নভিন্ন করতে পারতেন প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা। তাঁর নামই হয়ে যায় ‘গজপতি’। যে যুগে রায়বাহাদুর উপাধির জন্যে ইংরেজ তোষণের দেখনদারি চলত, সে যুগে গজপতি উপাধিলাভ তাৎপর্যপূর্ণ বটে।

১৮৫১। মহেশচন্দ্র ব্যানার্জ্জী ক্যালকাটা চেস ক্লাবে পীতাম্বর মুখার্জ্জীকে পরাজিত করেন ৭-৪ ফলাফলে। কলকাতায় সেই প্রথম নথিভুক্ত দাবা প্রতিযোগিতা। ‘ইন্ডিয়ান সিস্টেম’ তত্ত্বের প্রবক্তা হিসাবে তাঁর নাম এখন সমস্ত বিশ্ব জানে। বিশ্ব দাবায় পল মরফির যুগ শুরু হচ্ছে তখন। আর ঊনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে কলকাতা কাঁপাচ্ছেন কালীচরণ, শ্যামাচরণ, দ্বারকানাথ মুখার্জ্জীরা। কালীচরণ বিখ্যাত কম্বিনেশন বিশেষজ্ঞ, কৌশলধর্মী দাবাড়ু। পরবর্তী শতকে ববি ফিশার বা মিখাইল তাল যে কম্বিনেশনের জন্যে জগৎজোড়া খ্যাতি পাবেন, তা কালীচরণের অনায়াস আয়ত্তে। কম্বিনেশন মানে প্রতিপক্ষের জন্যে সুচিন্তিত ফাঁদ পেতে দানের পর দান সাজিয়ে চলা রাখা কিংবা দশ-বারো চাল পরে কিস্তিমাত করার প্রস্তুতিতে কোনো হাতি-ঘোড়া-মন্ত্রী স্যাক্রিফাইস করা। নান্দনিক মুহূর্ত তৈরি হয় দাবার বোর্ডে। যাঁরা দাবা ভালবাসেন না, তাঁদেরও দাবার প্রেমে পড়িয়ে দিতে পারে এক একটা কম্বিনেশন বা স্যাক্রিফাইস। কালীচরণের দাবা খেলার নিত্য সঙ্গী ছিলেন পাথুরিয়াঘাটার প্রসন্ন কুমার ঠাকুর।

দ্বারকানাথ শুধু কলকাতায় নয়, ১৯১০ সালে এলাহাবাদের দাবা প্রতিযোগিতার পুরস্কার তালিকায় তৃতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন। ১৮৯৯ সালে পুলিশ কমিশনার হেনরি হ্যারিসন একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন দেশী-বিদেশী প্রতিযোগীদের নিয়ে। দ্বারকানাথ সেই প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। ওই বছরেই কলকাতায় আরেকটা বড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করে সদ্য প্রতিষ্ঠিত স্টন্টন চেস ক্লাব, যাদের ঠিকানা ছিল পার্ক স্ট্রিট। ব্রিটিশ সরকারের তৎকালীন অর্থসচিব স্যার জেমস ওয়েস্টল্যান্ডের সভাপতিত্বে টাউন হলে অনুষ্ঠিত হয় বর্ণাঢ্য দাবা প্রতিযোগিতা। কলকাতার নামী দাবাড়ুরা তো বটেই, অন্যান্য রাজ্য থেকেও দাবাড়ুরা অংশগ্রহণ করেছিলেন। দ্বারকানাথ এই প্রতিযোগিতায় ব্রিটিশ দাবাড়ু রবার্টসনকে হারিয়ে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। ঊনিশ শতকে দাবা খেলার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন প্রসন্ন ঠাকুর এবং শোভাবাজারের দেব পরিবার। প্রসন্ন ঠাকুরের প্রতিবেশী ঘোষ পরিবারের দাবার আসর মাতিয়ে রাখতেন পুঁটে গোঁসাই, রঘুনন্দন চৌবের মতো নামকরা দাবাড়ুরা, যাঁরা ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে চৌষট্টি ঘরের যুদ্ধে বিধ্বস্ত করতেন রবার্ট স্টিল, কখরেন, হেনরি কটনদের দুর্গ।

কলকাতা দাবার সূত্রে আরেকটা ইতিহাসের সাক্ষী। ১৮৮০ সালের ২৮ অক্টোবর, লিভারপুল বনাম ক্যালকাটা। লিভারপুল ফুটবল ক্লাব পত্তনের বহু দশক আগে, ১৮৩৭ সালে লিভারপুল চেস ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সম্ভবত বিশ্বের প্রথম টেলিগ্রাফে খেলা আন্তঃমহাদেশীয় দাবা ম্যাচ। কলকাতার সঙ্গে খেলাটা হয়েছিল টেলিগ্রাফের মাধ্যমে। দুটো খেলা চলেছিল প্রায় পাঁচ মাস। কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরত্বে দুটো শহরের সেরা দাবাড়ুদের মিলিত দল দাবার চাল দিচ্ছে – ইন্টারনেটের যুগে আজ এটা জলভাত। অথচ ১৮৮০ সালে লিভারপুলের উইলিয়ম রাদারফোর্ড নতুন কোড তৈরি করেছিলেন দাবার চাল পাঠানোর জন্যে। এর আগেও টেলিগ্রাফ ম্যাচ হয়েছে। ১৮৭১ সালে রবার্ট স্টিলের নেতৃত্বে কলকাতা ২-০ ফলাফলে হারিয়ে দিয়েছে বোম্বেকে। তারও আগে টেলিগ্রাফ ম্যাচ হয়েছে ১৮৬১ সালে। লিভারপুল ক্লাব খেলেছে ডাবলিন লাইব্রেরি ক্লাবের বিরুদ্ধে, লন্ডন খেলেছে ভিয়েনার বিরুদ্ধে। কিন্তু ১৮৮০ সালের ম্যাচ দুটো কারণে ঐতিহাসিক। এর আগে দুই মহাদেশের মধ্যে টেলিগ্রাফ ম্যাচ হয়নি, তাও আবার প্রায় ১৩,০০০ কিলোমিটার দূরের দুই শহরের মধ্যে। আর লিভারপুলের রাদারফোর্ড এমন একটা কোড তৈরি করেছিলেন, যা লাতিন শব্দে প্রকাশযোগ্য এবং যে কোনও দুটো চাল একটাই শব্দে পাঠানো যায়। এরপরে এই কোড ব্যবহার করে অনেকগুলো আন্তঃমহাদেশীয় দাবা ম্যাচ হয়েছে। তার মধ্যে ১৮৯০ সালে একটা বিখ্যাত খেলা হয় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্টেইনিৎজ আর তাঁর রুশ প্রতিদ্বন্দ্বী চিগোরিনের মধ্যে। রবার্ট স্টিলের নেতৃত্বাধীন কলকাতার দলে চারজনের মধ্যে দুজন ছিলেন বাঙালি।

সেই সময় লন্ডন থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত দ্য চেস মান্থলি পত্রিকায় এই দুটো খেলার বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছিল। ওই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন বিখ্যাত দাবাতাত্ত্বিক জুকারটর্ট, যিনি ওপেনিং-এর কয়েকটা তত্ত্ব উদ্ভাবন করেন। জুকারটর্ট প্রথম দাবা বিশ্বকাপে স্টেইনিৎজের প্রতিপক্ষও ছিলেন। প্রথম খেলায় কলকাতার ছিল সাদা, ৩৬ চালে সন্ধি (ড্র) করে নেন কলকাতা ও লিভারপুলের দাবাড়ুরা। জুকারটর্টের বিশ্লেষণে “কলকাতা অসাধারণ দক্ষতায় খেলার রাশ হাতে নিয়েছিল, কিন্তু ৩৫ নম্বর চালে গজের চাল দিয়ে পজিশন সমান সমান হয়ে যায়। নয়ত অনায়াসে কলকাতা জিতে যেত।” পরের খেলায় কালো নিয়ে হার হয় কলকাতার, মাত্র ছয় চালে বোড়ে স্যাক্রিফাইস করে দুর্দান্ত আক্রমণ শানিয়েছিল লিভারপুল।

আরো পড়ুন ফরাসি বিপ্লবের বাঙালি সৈনিক

চেস-ইঞ্জিন আর ইন্টারনেট দাবার সমৃদ্ধির যুগে এগুলো রূপকথার মতো শোনায়। বিশ শতকের শেষ দশকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন গ্যারি কাসপারভকে হারিয়ে দেয় ডিপ ব্লু, কৃত্রিম মেধার জয়যাত্রা শুরু হয়। আর উনিশ শতকের শেষে ওই কলকাতা-লিভারপুল টেলিগ্রাফ ম্যাচ আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থার বিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে। উনিশ শতকে যখন একদিকে পাশ্চাত্য আধুনিকতার ব্রাহ্মমুহূর্ত ও জাতীয়তাবাদী উত্থানের প্রস্তুতিপর্ব চলছে, তখন দুঁদে অফিসার তথা স্কটিশ দাবাতাত্ত্বিক জন কখরেনকে পরাজিত করছেন মহেশচন্দ্র ও শ্যামাচরণ ঘটক। ১৮৫৫ সালে ডাচ ডিফেন্স ওপেনিং পদ্ধতিতে খেলেও কখরেন মাত্র ২৯ চালে হেরে গিয়েছিলেন শ্যামাচরণের মিডল গেম নৈপুণ্যের কাছে।

কলকাতার নবজাগরিত সংস্কৃতির রুমাল থেকে বেড়াল নিয়ে এত গবেষণা হল, কিন্তু দাবা নিয়ে কি আমরা ভাবলাম কিছু? ফুটবল, ক্রিকেটের মত জনপ্রিয় খেলায় দেশীয় খেলোয়াড়দের দাপটের কয়েক দশক আগেই চৌষট্টি বর্গক্ষেত্রের যুদ্ধে ব্রিটিশদের কিস্তিমাত করেছেন মহেশচন্দ্র, কালীচরণ, শ্যামাচরণ, ঈশ্বরচন্দ্র বা দ্বারকানাথের মতো দাবাড়ুরা। এঁরা কেউই অভিজাত রক্তের লোক নন, কিন্তু পরিশ্রম আর মেধা সম্বল করে তৎকালীন ক্রীড়ামোদী জনসমাজের হৃদয়হরণ করেছিলেন। প্রথম লিগ ম্যাচ আর ঐতিহাসিক টেলিগ্রাফ ম্যাচের পালকও কলকাতার মুকুটে। কবে এই আখ্যানগুলো ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে আমাদের নজরে পড়বে?

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.