ছোটবেলায় একটি নাটক পড়েছিলাম। তার মূল প্রতিপাদ্য, শহরের ভিতরে ম্যানহোল খুলে একটি তরুণ ছেলে ড্রেন পরিষ্কার করতে নেমেছে এবং তার সঙ্গী উপরে প্রতীক্ষারত। বেশ কিছু সময়ের পরও তরুণ সাফাই কর্মীটি যখন ওপরে উঠে আসছে না, তাই দেখে উপরের ছেলেটি চিৎকার করে পথচারী মানুষদের কাছে সাহায্য চাইল তার বন্ধুটিকে তোলার জন্য। অনেকে থমকে দাঁড়াল, অসহায় ছেলেটিকে কিছু জ্ঞান দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। কয়েক ঘন্টা পর দমকল এল এবং ড্রেনের ভিতর থেকে তরুণ সাফাই কর্মীটির নীল হয়ে যাওয়া দেহটি উপরে তুলে আনল। হাইড্রেনের মধ্যেকার জমা বিষাক্ত গ্যাসে তার মৃত্যু হয়েছে। শিবঠাকুর বিষ পান করে অমৃত পেয়েছিলেন বেঁচে থাকার জন্য। শহরের নীলকন্ঠের জন্য কোনো অমৃত মজুত নেই। মৃত্যুই তার অনিবার্য সত্য। এই ঘটনাটি নাটকের উপাদান হলেও বাস্তবে এই ধরনের ঘটনা প্রায়শই খবরের কাগজের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি।

কয়েক মাস আগেই পশ্চিমবঙ্গের বুকে পৌর নির্বাচন হয়ে গেল। সেই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সমস্ত রাজনৈতিক দলই ইশতেহার প্রকাশ করেছিল। সে সব ইশতেহারে বিস্তৃতভাবে লেখা ছিল শহরকে সুন্দর করার পরিকল্পনা। রাজ্য সরকার গ্রীন সিটি প্রোজেক্ট চালু করেছে শহরকে পরিবেশবান্ধব করার জন্য। শহরকে পরিষ্কার রাখার অন্যতম শর্ত জঞ্জাল অপসারণ, তার সুষ্ঠু বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা ও তৎসহ নিকাশিব্যবস্থার পরিকাঠামোগত উন্নতিবিধান। কিন্তু এই কাজটি করার প্রধান কুশীলব হলেন সাফাই কর্মীরা। সব শহরেই সাফাইকর্মীরা আসেন মূলত প্রান্তিক পরিবারগুলো থেকে, যেখানে দারিদ্র্যই তাঁদের আবিষ্ট করে রেখেছে। আমরা যখন ভোরবেলায় বিছানায় শুয়ে থাকি, তখন সাফাই কর্মীরা রাস্তায় বেরিয়ে জঞ্জাল অপসারণ করেন। কারোর হাতেই থাকে না কোনো গ্লাভস বা মুখে কোনো আচ্ছাদন। যাঁরা নিকাশিব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত, তাঁরা খালি পায়ে ড্রেনের পাঁকে নেমে সেখান থেকে ময়লা তুলে নিকাশিব্যবস্থাকে সচল রাখার চেষ্টা করেন। শহরের আবর্জনার দুর্গন্ধ তাঁরা টেনে নেন বুকের পাঁজরে, কারণ এই কাজটি না করলে পেটের ভাত জুটবে না। এই সমস্ত সাফাই কর্মীর বৃহদংশই অস্থায়ী কর্মী হিসাবে যৎসামান্য অর্থের বিনিময়ে কাজ করে থাকেন। এঁরাই আমাদের সমাজের নীলকণ্ঠ।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বিধানসভা বা পুরভোটের ইশতেহারগুলি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, সাফাই কর্মীদের পেশাগত দুরবস্থা দূর করতে বিশেষ কোনো কথাই উচ্চারিত হয়নি, কারণ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের যে মেধাবী ব্যক্তিরা ইশতেহার তৈরি করেন, তাঁদের কাছে এই সাফাই কর্মীরা ব্রাত্য। ওঁদের কষ্ট, ওঁদের যন্ত্রণা রাজনৈতিক দলগুলিকে স্পর্শ করে না। করোনাকালে সবাই যখন আতঙ্কিত, তখনো নীলকণ্ঠ সাফাই কর্মীরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন শহর পরিষ্কার রাখতে, তবু থেকে গেছেন আমাদের ভাবনার বৃত্তের বাইরে।

আরো পড়ুন পৌরনির্বাচন আসে যায়, সুশীল জানাদের দিন বদলায় না

কিন্তু নাগরিক সমাজ? এই নীলকণ্ঠদের নিয়ে কিছু কথা কি আমরা বলতে পারি না, ভাবতে পারি না? রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, এঁরা সভ্যতার পিলসুজ। শহরের সৌন্দর্যরক্ষার দায়িত্বে থাকা এই মানুষগুলি থেকে যান এক অবাঞ্ছিত জীবনের আবর্তে। শহরের অগ্রগতির অংশ হতে এঁরা কখনোই পারেন না। তাই ঐতিহাসিক শহর চন্দননগরের লালদীঘির ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে সৌন্দর্যায়ন হয়, কিন্তু সাফাই কর্মীদের বাসস্থানের পরিকাঠামো অবহেলিতই থেকে যায়। কেবলমাত্র চন্দননগর, কলকাতা বা শিলিগুড়ি নয়, কোনো পৌর এলাকার সাফাই কর্মীদের বাসস্থান উন্নত করারই কোনো উদ্যোগ কখনো চোখে পড়ে না। তাই নাগরিক সমাজকেই উদ্যোগ নিয়ে তুলে ধরতে হবে এঁদের দুর্ভাগ্যের কথা।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.