বাংলার রাজনীতিতে খুব স্বল্প বিষয়ই আছে, যাতে দেশগৌরব সুভাষচন্দ্র বসুর দীর্ঘ ছায়া পড়েনি। আসন্ন কলকাতার পৌর নির্বাচনও এর ব্যতিক্রম নয়। এরই মধ্যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে আমরা অনেকেই শুনে নিয়েছি, যে সুভাষচন্দ্র একদা কলকাতার মেয়র ছিলেন। কিন্তু এই একটি তথ্য ব্যতীত তিনি মহানগর ঠিক কিভাবে পরিচালনা করেছিলেন তার ইতিহাস আলোচনার অভাব আছে। অভাব আছে পৌর প্রশাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর যে একটি বিশেষ ভাবনা ছিল, তা নিয়ে আলোচনারও। সেই অভাব পূরণ করতেই এই সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনের অবতারণা।

বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশক। অহিংস অসহযোগ আন্দোলন ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি কাঁপিয়ে দিলেও চৌরিচৌরার ঘটনার পর গান্ধীজীর এই আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলে জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দ তখন অত্যন্ত হতাশ। এই হতাশা থেকেই দেখা দেয় কংগ্রেসে আড়াআড়ি বিভাজন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর মন্টেগু-চেমসফোর্ড, সংক্ষেপে মন্ট-ফোর্ড শাসন সংস্কার আইন ভারতীয়দের জন্য রাজ-এর প্রশাসনিক কাঠামোর একটা জায়গা উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। একথা অনস্বীকার্য যে ভারতীয়রা যা আশা করেছিল, তার তুলনায় এই সংস্কার প্রায় কোনো অধিকারই প্রদান করেনি। কিন্তু অহিংস অসহযোগের ব্যর্থতার পর অনেক কংগ্রেস নেতাই এই মত পোষণ করতেন যে যেটুকু সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে, প্রশাসনিক ক্ষেত্রে প্রবেশ করে ভারতীয়দের তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা উচিৎ। প্রো-চেঞ্জার নামে পরিচিত এই গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাত দেখা দেয় গান্ধী প্রভাবিত নো-চেঞ্জার গোষ্ঠীর, যারা পূর্বের মতোই সরকারী পদ বয়কট করতেই আগ্রহী ছিল। এই বিভাজন গয়া কংগ্রেসের পর পার্টি বিভাজনের আকার নেয়। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, মোতিলাল নেহেরু প্রমুখ নেতারা কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে গঠন করেন স্বরাজ্য দল। এই পার্টি মন্ট-ফোর্ড শাসন সংস্কারের সুযোগ গ্রহণ করে প্রশাসনের মধ্যে থেকেই ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতার কৌশল গ্রহণ করে। সেই সূত্রেই বাংলার ‘স্থানীয় স্বশাসন’ বা ‘Local Self-Government’ সংক্রান্ত মন্ত্রী রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় যখন ১৯২৩ সালে ‘Calcutta Municipality Act’-এর মাধ্যমে কলকাতা পৌরসভা প্রতিষ্ঠা করেন, স্বরাজ্য দল তার পূর্ণ সুযোগ নেয়। নির্বাচনে বিজয়ের পর ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা পৌরসভার প্রথম মেয়র হন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ও ডেপুটি মেয়র সুরওয়ার্দী। কিন্তু আদতে প্রধান কার্যনির্বাহী পদটি ছিল ‘চিফ এক্সেকিউটিভ অফিসার’-এর পদ। এই পদ কে পাবেন তা নিয়ে সুভাষচন্দ্র বসু ও বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের মধ্যে বিরোধ ছিল। অমলেশ ত্রিপাঠী লিখেছেন – ‘…প্রধান নির্বাহকের পদ নিয়ে বিরোধ বাধল সুভাষ বসু ও বীরেন শাসমলের মধ্যে…মুসলমান দল ও যুগান্তর দল বসুকে সমর্থন করে।‘ শেষ পর্যন্ত সুভাষই এই পদ পান। ঐতিহাসিক সত্যতার খাতিরে এ বলে রাখা ভালো, এই লড়াই কোনো নীতিগত বিরোধ ছিল না, মধ্যবিত্তমনস্কতা থেকে উদ্ভূত ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল। সুভাষচন্দ্র তখন তরুণ, রাজনীতিতে সদ্য পদার্পণ করেছেন, এইসকল টানাপড়েনের তিনি তখনও ঊর্ধ্বে ছিলেন না। কিন্তু চিফ একজিকিউটিভ অফিসারের পদে নির্বাচিত হয়েই সুভাষ সংকীর্ণ দলাদলির ঊর্ধ্বে উঠে স্বরাজ্য দলের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সচেষ্ট হন।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কি ছিল সেই প্রতিশ্রুতি ? চিত্তরঞ্জনের ভাষায় – ‘বৃহৎ জাতিগঠনের কাজের দায়িত্ব আমি গত দশ পনেরো বছর যাবৎ গ্রহণ করেছি। সেই দায়িত্ব নিয়ে এই পৌর প্রতিস্থানে অনেক কাজ করা সম্ভব বলে আমি মনে করি। আমার কর্মসূচীর লক্ষ্য কলকাতার নাগরিকদের সর্বাঙ্গীন উন্নতি সাধন।‘ তিনি আরও বলেন,’ভারতবাসীর মহান আদর্শ, দরিদ্র নারায়ণের সেবা…এই জন্য আমি দরিদ্র নারায়ণের সেবায় কর্পোরেশনকে আত্মনিয়োগ করতে বলি।’ চিত্তরঞ্জনের এই বক্তব্য ও কর্পোরেশনের দশ দফা কর্মসূচী সুভাষের কর্পোরেশন পরিচালনার নীল নকশা ছিল। ‘দরিদ্র নারায়ণের সেবা’ এই শব্দবন্ধটিকে বেদবাক্য হিসেবে গ্রহণ করে সুভাষ অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা, বিনামূল্যের চিকিৎসালয় ও ডিসপেনসারি, দুধ ও জলের সরবরাহ উন্নত করা, বস্তি উন্নয়ন ও শহরতলির উন্নয়নের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তবে কর্পোরেশনের বরাদ্দ অর্থ কম হওয়ায় তিনি প্রয়োজনের তুলনায় খুব কমই অগ্রসর হতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর আরেক কীর্তি ছিল জনসংযোগের জন্য একটি নিজস্ব পত্রিকা প্রকাশ। ১৯২৪ সালের ১৫ই নভেম্বর প্রকাশিত হয় ‘ক্যালকাটা মিউনিসিপ্যাল গেজেট’। শুধুমাত্র নগরজীবনের উন্নয়ন করেই সুভাষ স্থির থাকেননি। তিনি দেশপ্রেমিক ব্যক্তিদের নামে রাস্তার নামকরণ, পার্কের নামকরণ প্রভৃতির মাধ্যমে যথাসাধ্য জাতীয় অস্মিতার জাগরণে সচেষ্ট হন। তিনি শহরের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য কর্পোরেশনের বিভিন্ন পদ অবাধে উন্মুক্ত করে দেন ও কোনো ধর্ম বিবেচনা না করেই স্বচ্ছ নিয়োগে সচেতন হন। এই ভীতি মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ছিল, এবং সুভাষ পরবর্তী সময়ে কর্পোরেশনের নিয়োগের পরিসংখ্যানের দিকে নজর দিলে বোঝা যাবে সেই ভীতির ভিত্তিও ছিল, যে বর্ণ হিন্দু চিফ এক্সেকিউটিভ অফিসার পদে এসে মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিভেদমূলক আচরণ করবেন। সুভাষ তা না করায় বিশেষ করে বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে তাঁর বিশেষ জনপ্রিয়তা ও প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। বলা যেতে পারে, তিনি নিছক বাঙালি হিন্দু নেতা থেকে, বাঙালি নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এ ব্যতীত মহিলা কাউন্সিলারদের তিনি নিয়মিত উৎসাহ দিতেন এবং সময়ের তুলনায় লিঙ্গ সাম্য বিষয়ে তাঁর অত্যন্ত অগ্রসর মানসিকতা ছিল।

একথা অনস্বীকার্য প্রদীপের নিচে অন্ধকারও ছিল। সুভাষ স্বচ্ছতা রাখার প্রচেষ্টা করলেও চাকরি ও ঠিকাদারিকে কেন্দ্র করে দুর্নীতি তাঁর অধীনস্ত কর্পোরেশনে হয়েছিল। মেসার্স কর অ্যান্ড কোম্পানিকে টেন্ডার প্রদানের বিনিময়ে স্বরাজ্য পার্টির তহবিলে টাকা নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ ওঠে। স্বয়ং রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ অভিযোগ করেন – ‘স্বরাজিষ্ট পার্টি কর্পোরেশনের নির্বাচনে সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করেছে এবং তাদের সেই আধিপত্যকে দলের স্বার্থে কাজে লাগানো হচ্ছ…পূর্ব সংস্কার মুক্ত যে কোন দর্শকের কাছেই মনে হয় যে এটা ক্ষমতার নেশার মারাত্মক ফল ছাড়া আর কিছুই না।’। এর পাশাপাশি কর্পোরেশনের ধাঙ্গররা ধর্মঘটে গেলেও স্বরাজ্য পার্টি সেই ধর্মঘটের বিরোধিতা করে। অথচ তাঁদের কর্মসূচীতে শ্রমিকদের অধিকারের কথা সুস্পষ্ট ভাবে বলা ছিল। এক্ষেত্রে তাঁদের মানসিকতা ছিল যে বাবুরা দরিদ্র নারায়ণের সেবা করবে, কিন্তু দরিদ্র নারায়ণ ভিক্ষা না নিয়ে অধিকার চাইতে এলে বাবুরা ডান্ডা ধরবেন। তাই অনেক প্রতিশ্রুতি দিলেও কার্যত তাঁদের নেওয়া নীতি ব্রিটিশ প্রশাসনের থেকে পৃথক ছিল না। যাই হোক, স্বরাজ্য দলের সঙ্গে বিপ্লবীদের যোগ আছে, এই অভিযোগে সরকার জরুরি আইন বা বেঙ্গল অর্ডিন্যান্স জারি করে ১৯২৪ সালের ২৪শে অক্টোবর মধ্যরাতে স্বরাজ্য দলের তিন উল্লেখযোগ্য নেতা সুভাষচন্দ্র বসু, অনিলবরণ রায় ও সত্যেন্দ্র মিত্রকে গ্রেফতার করে। সুভাষ বার্মার মান্দালয় জেলে নির্বাসিত হন। তাঁর কলকাতা পৌরসভা পরিচালনার প্রাথমিক ভাবে এখানেই ইতি ঘটে।

দ্বিতীয়বারের জন্য সুভাষ কলকাতা পৌরসভা পরিচালনার দায়িত্ব পান ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে। লাহোর কংগ্রেস থেকে ফেরার পর ব্রিটিশ সরকার ১৯৩০ সালের ২৩শে জানুয়ারি তাঁকে গ্রেপ্তার করে। জেলের মধ্যে থেকেই ঐ বছরের কলকাতা পৌর নির্বাচনে তিনি জে. এম. সেনগুপ্তর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি বিজয়ী হন। পুনরায় কলকাতার দায়িত্ব হাতে পেয়ে সুভাষ কাল বিলম্ব করেননি। তিনি মুক্তি লাভের পঅর পৌরসভাকে কংগ্রেসের আইন অমান্য আন্দোলনের একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারে রূপান্তরিত করার দিকে নজর দেন। হরতাল, ধর্মঘট, বয়কট প্রভৃতি সবপ্রকার কর্মসূচী তিনি প্রশাসনকে ব্যবহার করেই আরও জোরালো করে তোলেন। পৌরসভার অধীনে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো হয়ে ওঠে সক্রিয় রাজনৈতিক প্রচারের কেন্দ্র। ব্রিটিশ পণ্য বয়কট করে পৌরসভার প্রয়োজনে লাগে এমন অনেক উপকরণই বাইরে থেকে না আনিয়ে কর্পোরেশনের ওয়ার্কশপে উৎপাদনের দিকে নজর দেন। বিদ্যুৎ এর মাত্রাতিরিক্ত মূল্যের বিরুদ্ধেও তিনি ব্যবস্থা নেন। এই সময় কলকাতার বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্ব ছিল Calcutta Electric Supply Corporation-এর। সুভাষ এই সংস্থাকে লাভের হার কমিয়ে সুলভে বৈদ্যুতিন পরিষেবা প্রদানে বাধ্য করেন। ১৯৩০ ও ১৯৩১ – এই দুই বছরই বাৎসরিক বৃদ্ধির বদলে নগরবাসীর বিদ্যুৎ বাবদ দেয় অর্থের পরিমাণ হ্রাস পায়। সুভাষের উদ্যোগে বহু বিপ্লবী এই সময় কলকাতা পৌরসভায় চাকরি পান। সুভাষ কেবলমাত্র প্রশাসনিক কাজকর্মের মধ্যেই মেয়র রূপে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্বও দিতেন। ১৯৩১-এর ২৬শে জানুয়ারি স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ( কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, স্বাধীনতা লাভের পূর্বে ২৬শে জানুয়ারি ভারতের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করা হবে) বিশাল মিছিল কলকাতার রাজপথ স্তব্ধ করে দেয়। মিছিলের অগ্রভাগে সুভাষ। শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশের নির্মম লাঠিচার্জে তিনিও আহত হন। রক্তাক্ত মেয়রকে পরের দিন আদালতে হাজির করা হলে তাঁকে আবার কারাদন্ড দেওয়া হয়।

আইন অমান্য আন্দোলনের শেষে সুভাষ তাঁর ভগ্ন স্বাস্থ্য উদ্ধার করতে ইউরোপ যান। কলকাতা পৌরসভা তখনও সুভাষপন্থীদের হাতেই ছিল। কিন্তু দুটি ঘটনা হয়। আইন অমান্য আন্দোলনের সময় পৌরসভাকে যেভাবে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল তার যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, তার জন্য সরকার আইন করে কর্পোরেশনের অর্থনৈতিক ক্ষমতা সীমাবদ্ধ করে দেয়। এর পশ্চাতে মূলতঃ Calcutta Electric Supply Corporation-এর চাপ ছিল। সুভাষ যে তাঁদের গলায় দড়ি দিয়ে সাধারণ মানুষকে ন্যায্য মূল্যে বিদ্যুৎ দিতে বাধ্য করেছিলেন, সেই অপমান তাঁরা ভোলেননি। সুভাষচন্দ্র ও যতীন্দ্রমোহনের ব্যক্তিগত মতবিরোধ ছিল এবং তা যথেষ্ট তিক্ততারও জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু দুজনেরই ব্যক্তিগত সততা প্রশ্নাতীত ছিল। কিন্তু যতীন্দ্রমোহন প্রয়াত হলে ও সুভাষ ইউরোপ গমন করলে তাঁদের অনুগামীরা এই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, কাদা ছোঁড়া ছুঁড়ি আর দুর্নীতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। কলকাতার ইউরোপীয় সমাজও রক্তের গন্ধ পাওয়া হাঙরের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে এই ডামাডোলের সুযোগ নিতে। এডওয়ার্ড বেন্টহলের নেতৃত্বে ইউরোপিয়ান অ্যাসোসিয়েশন কংগ্রেসের গণভিত্তিতে ক্রমশ ক্ষয় ধরাতে থাকে এবং দলিত-মুসলিম সমর্থনকে কংগ্রেস থেকে পৃথক করতে প্রয়াসী হয়। বেন্টহলের কথায় – ‘The first thing to be done is to get in touch with the Moslem factions and to weld them into one, and to maintain their solidity afterwards. The Depressed people must not be neglected. They are of immense importance and contact must be established and maintained with them.’ পূর্বেই বলা হয়েছে নিয়োগের বিষয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখার দিকে সুভাষ বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। কিন্তু তাঁর অনুগামীরা কেউই তাঁদের নেতার থেকে কোনো শিক্ষাই নেননি। এই সময় কর্পোরেশনে পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে সুভাষপন্থীরা নিজেদের অনুগামী ও আত্মীয়দের চাকরি তো পায়েই দিত, রীতিমত অর্থের বিনিময়ে পদ বিক্রি করত। ড. বিধানচন্দ্র রায় বাংলার কংগ্রেসে সুভাষচন্দ্রের বিপরীত দিকের মানুষ ছিলেন। তিনি একবার কলকাতার মেয়রও হয়েছিলেন। তিনি যখন কংগ্রেসের এই দুর্নীতি রোখার প্রচেষ্টা করে জনৈক কাউন্সিলারকে প্রশ্ন করেন কেন তাঁরা স্বচ্ছ নিয়োগ হতে দিচ্ছেন না, নির্লজ্জ কিন্তু সৎ উত্তর আসে – ‘Ready cash, sir! Ready cash.’। তিরিশের দশকে মন্দার পরিস্থিতিতে এমনিতেই ছিল চাকরির আকাল, তার মধ্যে এইপ্রকার নিয়োগ সংক্রান্ত দুর্নীতি সাধারণ মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছিল। সুভাষ শহরের মুসলিম জনসংখ্যা থেকে দেশবন্ধু মেয়র থাকাকালীনই আনুপাতিক হারে মুসলিম কর্মচারী নিয়োগ করতেন। কিন্তু তাঁর অবর্তমানে এই নীতি পরিত্যক্ত হয়। বিশেষ করে উর্দু ভাষী মুসলিম সম্প্রদায় জোরালো দাবী তোলে যে জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে নিয়োগ করতে হবে। শেরে বাংলা ফজলুল হক কংগ্রেসের সমর্থনে কলকাতার মেয়র পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর বারবার অনুরোধ করেন এই বিষয়ে সুভাষের পূর্ব নীতিকেই আইনি রূপ দিতে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল কংগ্রেসের মধ্যে যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত গ্রুপ রাজী থাকলেও, সুভাষপন্থীরাই এই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। আসলে এঁদের মধ্যে তিক্ততা এতই অধিক ছিল, এক গোষ্ঠী কিছু সমর্থন করলে আরেক গোষ্ঠী তার বিরোধ না করে থাকতে পারত না, সে তাঁদের নিজেদের নেতার নীতি হলেও। ক্ষুব্ধ ও হতাশ ফজলুল হক মেয়র পদ থেকে পদত্যাগ করেন ও ঘোষণা করেন – ‘Hitherto I have been among the best defenders of the Corporation, but henceforth I will be foremost in launching an attack on the Corporation which in my opinion, does not deserve to exist.’। এইভাবে কংগ্রেস তার এক শুভাকাঙ্ক্ষীকে হারায় ও পৌরসভা আরও সমস্যার মুখে পড়ে।

দুর্নীতি ও দলাদলি নিয়ে পৌরসভা এমনিতেই খাদের কিনারায় দাঁড়িয়েছিল। যে বিপুল জনসমর্থন ও জনতার সহানুভূতির ওপর পৌরসভাকে সুভাষ দাঁড় করিয়ে গেছিলেন, তা অনেকদিন ধরেই নড়বড় করছিল। ১৯৩৭ সালের একটি ঘটনা এর কবরে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। বীরেন সেন নামক জনৈক ইন্সপেক্টর অফ স্কুল প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকাদের নিয়মিত শ্লীলতাহানী করতেন। ততকালীন সামাজিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে কেউই তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা বাইরে বলতে পারেননি। তাছাড়া প্রভাবশালী হিসেবে বীরেন সেনের পরিচিত ছিল। কিন্তু জনৈক শিক্ষিকা, যিনি বহুবার সেনের শ্লীলতাহানীর শিকার হয়েছিলেন, তিনি প্রকাশ্যে এসে সকল অত্যাচার জনসমক্ষে তুলে ধরেন। সাত বছর আগে যে পৌরসভা সাধারণ মানুষের হৃদয় জয় করেছিল, যে পৌরসভার নেতৃত্বে কলকাতার মানুষ আইন অমান্য আন্দোলনে জীবন পণ করে ঝাঁপিয়েছিল, সেই পৌরসভার মান সম্মান এই ঘটনার পর ধুলোয় মিশিয়ে গেল। সুভাষ স্বয়ং ততদিনে বিদেশ থেকে ফিরে এসেছেন। তিনি একবার শেষ প্রচেষ্টা করলেন এই আস্তাবল পরিষ্কার করার। কিন্তু পাঁকে কলকাতা পৌরসভা এমন ডুবে গেছিল, যে এই অসাধ্য সাধন তাঁর পক্ষেও সম্ভব ছিল না। কিছুকাল প্রচেষ্টার পর সুভাষ হাল ছেড়ে দিলেন। ১৯৩৭-৩৮ -এর মধ্যে সুভাষের এই শেষ চেষ্টা ব্যর্থ হলে, কলকাতা পৌরসভার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেল। বেন্টহলই শেষ হাসি হাসলেন। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম লীগ ইউরোপিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের সহায়তায়, সুরেন্দ্রনাথের উদারপন্থী আইনের ভিত্তির ওপর যে কলকাতা পৌরসভা দাঁড়িয়ে ছিল, তিলে তিলে সেই ভিত্তির ওপর যে ইমারত দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ও দেশগৌরব সুভাষচন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন, তাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল। ‘Calcutta Municipality Amendment Act’ অনুসারে সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে কলকাতা পুরসভার আসন নির্দিষ্ট করা হল। নতুন মেয়র হলেন লীগের এ. আর. সিদ্দিকী। এই সময় থেকেই রাস্তাঘাটে হিন্দু-মুসলিম সংঘাতের সূত্রপাত হল, যা অন্তিম পরিণতি লাভ করে ১৯৪৬ সালের কলকাতার দাঙ্গার মধ্যে দিয়ে।

সুভাষচন্দ্রের প্রথমে সি.ই.ও ও পরে মেয়র হিসেব কলকাতা পুরসভায় ভূমিকা সংক্ষেপে পূর্বের অনুচ্ছেদগুলিতে আলচিত হল। এখন এইখান থেকে মূল প্রশ্ন যেটা উঠে আসে, তা হল সুভাষচন্দ্রর নগর পরিচালনা সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট আদর্শভিত্তিক নীতি ছিল কি ? নাকি তিনি সময়ের প্রেক্ষিতে পরিকল্পনাবিহীন ভাবে যখন যেমন প্রয়োজন হয়েছে, সেই অনুসারে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ? সৌভাগ্য বশতঃ আমাদের কাছে এর সুস্পষ্ট উত্তর আছে। সুভাষচন্দ্র অতি স্বল্প সময়ের জন্যই কলকাতার পৌরসভার দায়িত্বে ছিলেন এবং দুই বারই এই সংক্রান্ত দায়িত্ব তিনি পেয়েছিলেন রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গের মধ্যে, তা স্বত্বেও তাঁর একটি সুনির্দিষ্ট ভিশন অবশ্যই ছিল। এই বিষয়ে সুভাষ প্রেরণা ছিলেন জনৈক বিদেশী, অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনার দীর্ঘকালের মেয়র কার্ল জাইৎস। জাইৎস সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক ওয়ার্কাস পার্টির সদস্য ছিলেন। জাইৎস বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকের মধ্যভাগ থেকে ১৯৩৪ সালে অস্ট্রিয়ায় ফ্যাসিস্টদের ক্ষমতা দখলের সময় পর্যন্ত ভিয়েনার মেয়র পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁর আমলে ভিয়েনা ইউরোপের একটি মডেল সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের শহর হিসবে গণ্য হত। ‘লাল ভিয়েনা’ নতুন প্রকার নগর পরিচালনার একের পর এক দিশা দেখায়। গৃহ সমস্যার সমাধানে প্রায় ষাট হাজার নতুন অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক নির্মাণ করা হয়। এদের বলা হত ‘Germaindebauten’। এর মধ্যে সর্বাপেক্ষা বিখ্যাত ছিল ‘Karl-Marx-Hof’। নিকাশি ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হয়। সুলভে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। সুভাষ এ সবই নিজের চোখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ইউরোপ ভ্রমণের সময় দেখেছিলেন। তিনি জাইৎসের সঙ্গে দেখা করেন ও আলোচনার পর এই পৌর সমাজতন্ত্র বা ‘Municipal Socialism’-এর উৎসাহী সমর্থকে পরিণত হন। ‘লাল ভিয়েনা’ তাঁর হৃদয়ে কি গভীর প্রভাব ফেলেছিল, তাঁর বক্তব্য থেকেই আমরা দেখে নিতে পারি – ‘While in Europe, I had the opportunity to study the socialist municipality of Vienna. Anyone who has been to that city cannot return without being convinced of the importance and significance of the working of the municipality to all those interested in civic affairs. During las twelve years the Vienna municipality has provided good housing to 200,000 persons, without raising loans. The entire cost has been charged to the revenue and realised through taxing entertainments. The Municipality has effectively solved the problem of water supply, roads, education for children, health, infant mortality and hundred other problems. If so much can be done in one city, naturally it has its importance for other parts of the world.’

স্বরাজ্য পার্টি কলকাতা কর্পোরেশনের ক্ষমতা লাভের পর প্রথম মেয়র দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ঘোষণা করেছিলেন কর্পোরেশনের প্রধান উদ্দেশ্য হবে ‘দরিদ্র নারায়ণের সেবা’।  ভিয়েনায় সেই আদর্শের বাস্তব প্রয়োগ সুভাষ প্রত্যক্ষ করেন। তাঁর মনে হয়েছিল আজকের ভিয়েনাই ভবিষ্যতের কলকাতা হতে পারে ও সমগ্র বিশ্বেরই এই পৌর সমাজতন্ত্র থেকে কিছু শেখার আছে। এই কারণেই তিনি মন্তব্য করেন – ‘In the world today, civic affairs are consciously or unconsciously moving towards municipal socialism; there is no need to fight shy of it… Municipal socialism is nothing but collective effort to serve the entire community. If that were done, the corporation would be serving not only the particular city concerned, but humanity as a whole.’ তিনি কলকাতাতেও তাঁর অনুগামীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন ভিয়েনার থেকে শিক্ষা নিতে ও কলকাতাকে ঢেলে সাজাতে। গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে আর দুর্নীতিতে ব্যস্ত তাঁর অনুগামীরা সে দিকে অবশ্য কর্ণপাত করেনি। সেই ঐতিহ্য বর্তমানেও একই ভাবে বহমান। চিত্তরঞ্জন কলকাতা পৌরসভাকে করতে চেয়েছিলেন দরিদ্র নারায়ণের সেবক, সুভাষ চেয়েছিলেন কলকাতা পৌরসভা হোক পৌর সমাজতন্ত্রের প্রয়োগের হাতিয়ার। কোনোটাই তাঁদের জীবদ্দশাতে হয় নি। ১৯৩৮ সালে সুভাষ মত দেন পথ চলা এখনও অনেক বাকি, তিনি বলেন – ‘One of India’s great men, the late Deshbandhu Das, when he became the Mayor of Calcutta, stated that every civic body should be made into a real poor men’s corporation, and laid down a programme of service to the poor. It was an ideal programme. We have yet to travel a long way before we can call our municipalities poor men’s corporations.’। অত্যন্ত বাস্তববাদী বিশ্লেষণ। কিন্তু প্রশ্ন হল, পরবর্তী এক শতকে এই দরিদ্র মানুষের পৌরসভার দিকে কলকাতা আদৌ এগিয়েছে ঠিক কতটা ? সুভাষচন্দ্র কলকাতা পৌরসভার সি.ই.ও পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার প্রায় শত বছরের মাথায় যখন ২০২১-এর কলকাতা পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সুভাষের স্বপ্নের পৌর সমাজতন্ত্রের দিকে আদৌ এগিয়েছি, নাকি সেই এগিয়ে যাচ্ছি ক্রমশ পিছনের দিকে, এই প্রশ্নগুলো কিন্তু কিছুতেই আমাদের পিছু ছাড়ছে না।

1 মন্তব্য

  1. চমৎকার লেখা। ধন্যবাদ, অর্কপ্রভ। ঘটনাক্রম টুকরো টুকরো জানতাম, জোড়া দেবার উপায় পাইনি। ভিয়েনার প্রভাব সম্পর্কে একেবারেই জানতাম না।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.