আমাদের স্মৃতির সমাধিফলকগুলোর পাশে মধুকূপী ঘাস; মৃণাল সেন, চটি পরিহিত, হেঁটে চলে যাচ্ছেন দিগন্তের দিকে। ইতিহাস তাঁকে কোথায় নিয়ে গেল আজ বোঝা মুশকিল। আজ শহরে চুল্লির প্রহরসমূহ নিভে গেছে।
এই যে মৃণাল একশো বছরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন, এটা আমার বিশ্বাস হয় না। কেবলই মনে হয় ইতিহাস কোথাও আমাদের ফাঁকি দিচ্ছে। অথবা উল্টোদিক থেকে দেখলে মনে হয়, হয়ত মৃণালদার কথা ভাবতে ভাবতে আমি জাতিস্মর হয়ে উঠেছি। আসলে মৃণালদা যে বুড়ো হতে পারেন এটা আমাদের জানা ছিল না। তিনি যখন কলকাতা ৭১ শেষ হলে মেট্রো সিনেমার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েছিলেন এবং ছাত্ররা প্রবল উচ্ছ্বাসে তাঁর পাঞ্জাবি ধরে টানাটানি করছিল, তখন আমরা জানতাম যে তিনি আমাদের লোক। সারাজীবন সেই বিশ্বাসেই আমরা স্থির ছিলাম। কেন বলছি?
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আমরা সেই বিরল প্রজন্ম – সম্ভবত শেষ প্রজন্মও – যারা তাঁদের সিনেমা দেখা ছাড়াও সত্যজিৎ রায়কে রাস্তা পার হতে দেখেছে, ঋত্বিককে ঘটককে দেখেছে আড্ডায় এবং মৃণাল সেনকে দেখেছে টুলের উপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতে। কিন্তু শিল্পী হিসাবে এঁদের তুলনা না করে বলছি, সত্যজিৎ আর ঋত্বিকের ক্ষেত্রে বোঝা যায় ঐতিহ্য এবং একটা বড় ইতিহাসের সঙ্গে তাঁরা জড়িত। মৃণাল অন্য পথের পথিক। তাঁর প্রিয় উদ্ধৃতি সেজারে জাবাত্তিনির – “টুডে, টুডে অ্যান্ড টুডে”। একটা উদাহরণ দিই।
১৯৬০ সালে পরপর তিনটে ছবি মুক্তি পায় – দেবী, মেঘে ঢাকা তারা আর বাইশে শ্রাবণ। দেবী আর মেঘে ঢাকা তারায় ঐতিহ্যকে প্রশ্ন করা এবং ইতিহাসের সঙ্গে একটা বৃহৎ সংযুক্তির বিষয় ছিল। যতই আমরা দেশভাগ বা সংস্কারমুক্তি সম্বন্ধে কথা বলি না কেন, সত্যজিৎ আর ঋত্বিক দুজনেই ইতিহাসকে একইসঙ্গে দূর থেকে এবং কাছ থেকে দেখতে চাইতেন। মৃণাল কিন্তু রান্নাঘরের রূপকথা তৈরি করলেন। বাইশে শ্রাবণ, যা বাঙালি জাতির জীবনের এক শোকচিহ্ন, তাকে পরিণতি দিলেন একজন তুচ্ছ হকারের ব্যর্থ মিলন রজনীতে। এই কারণেই, অর্থাৎ মধ্যবিত্ত হয়ে মধ্যবিত্তকে বোঝার জন্যেই, মৃণাল চিরদিন আমাদের কাছে নিজের হয়ে রইলেন।
মৃণালদা তাঁর প্রাক-বিবাহ প্রণয়ের গল্প বারবার বলতেন। তিনি গীতা সোমকে, আজকালকার ভাষায় বললে ইম্প্রেস করতে, উইলসের প্যাকেট থেকে চারমিনার বার করতেন। কারণ চারমিনারের চেয়ে বেশি দামি সিগারেট কেনার ক্ষমতা তাঁর ছিল না। আরও বলতেন, গীতা সোমকে ট্রামের ফার্স্ট ক্লাস কামরায় দেখে তিনি সেকেন্ড ক্লাস কামরা থেকে তড়িঘড়ি নেমে যেতেন। স্পষ্টতই এসবের মধ্যে একটা মধ্যবিত্ত ছলনা রয়েছে। একজন মানুষ যার মধ্যে বড়লোক হওয়ার উচ্চাশা আছে, কিন্তু সে আসলে রাস্তার লোক। এই কারণেই মৃণালদা যখন আকাশ কুসুম ছবিটা করেন তখন তাতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের চরিত্রটার প্রতি প্রীতি ছিল, স্নেহ ছিল। আমাদের কারোর মনে হয়নি যে সৌমিত্র একজন সত্যিকারের ভিলেন। কারণ মৃণালদা জানতেন যে খলনায়ক হওয়ার যোগ্যতা মধ্যবিত্তের থাকে না। খলনায়ক হতে যে মেরুদণ্ড দরকার তা হয়ত দেশভাগ ভেঙে দিয়েছে।
ভুবন সোম ছবিটার কথা ভাবা যাক। মৃণালদা একজন আমলাকে দেখালেন। সে দুর্নীতিগ্রস্ত ছিল ঠিকই, কিন্তু গ্রাম থেকে ঘুরে এসে তার এক নতুন পরিণতি হল। চালু ভাষায় বললে বলতে হয়, তার মহিলার দোষও হল। এটা মৃণালদার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা হতে পারে, কিন্তু আমরা কার্যত দেখি একটি গ্রাম্য মোষের সামনে জবুথবু একজন ভারতীয় আমলাকে। আমাদের গ্রামোন্নয়নের প্রকল্প কী পরিমাণ ব্যর্থ হচ্ছে, পল্লী সংস্কার কী পাহাড়প্রমাণ কাগজপত্রের তলায় তলিয়ে যাচ্ছে তা ওই এক দৃশ্যেই পরিষ্কার হয়ে যায়।
আসলে মৃণালদা সারাজীবনই মধ্যবিত্তকে দেখে গেছেন। তিনি ঋত্বিক আর সত্যজিতের থেকে আলাদা হয়ে নিজে যে শ্রেণির লোক, সেই মধ্যবিত্ত শ্রেণির দুর্বলতা ও ত্রুটি খেয়াল করেছেন। তিনি যখন ইন্টারভিউ ছবিতে মায়ের উনুন ধরানো দেখান, তখন সেই ভূমিকায় রেখেছেন কিন্তু করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। অর্থাৎ পথের পাঁচালী ছবিতে যে সর্বজয়া ছিল চিরন্তন বাংলার এক মাতৃত্বের নিদর্শন, তাকেই মৃণাল সেন একটা বাড়ির ছাদে নিয়ে এসেছেন। ওই উনুনের ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে কলকাতা শহর দেখা যাচ্ছে এবং মৃণাল সেন দেখছেন ছেলে কর্মপ্রার্থী হবে বলে রান্না করছেন অপুজননী। সমস্ত শহরটা সিনেমা আর বাস্তবের মাঝামাঝি। রাস্তায় দক্ষযজ্ঞ আর দুটি মন ছবির বিরাট হোর্ডিং নিয়ে মজুর হেঁটে যাচ্ছে আর ট্রামে নায়ক রঞ্জিত মল্লিক বলছেন, তিনিই মৃণাল সেনের নায়ক। একটা অলীক শহরে আমাদের ঘোর লেগে যায়। চালচিত্র ছবিতে মৃণালদা জিজ্ঞেস করেছিলেন কলকাতা শহরে কতগুলো উনুন আছে। কারণ তিনি জানতেন যে ওই উনুনগুলোয় আমাদের নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত মায়েরা প্রতিদিন রান্না করেন। অর্থাৎ তাঁর মত করে মধ্যবিত্তকে তার ভূমিতে এত তলিয়ে কেউ দেখেনি।
খারিজ ছবিতে তিনি নিজেকে ফালাফালা করে দিলেন। একদিন প্রতিদিন ছবিতে যখন বাড়ির মেয়েটি ফেরে না, তাকে ঘিরে আমাদের নানারকম কৌতূহল, প্রায় অশ্লীল আগ্রহ জেগে ওঠে। এই জাগরণে কিন্তু মৃণালদা আসলে নিজেকে দেখছেন। এই দেখার মধ্যে দিয়েই তাঁর সঙ্গে সঙ্গে আমরা বুঝেছি যে বাঙালি মধ্যবিত্ত বড় হচ্ছে, তার ক্ষয় হচ্ছে। যে বাঙালি মধ্যবিত্ত রামমোহন রায় বা বিদ্যাসাগরকে মনীষী বানিয়েছে, যে রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ে বলে রবীন্দ্রনাথ কবি, যে ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ বা কমিউনিস্ট পার্টিকে ভালবাসত বলে বামপন্থার রমরমা ছিল – সেই মধ্যবিত্তকেই তিনি দেখেন নয়ের দশকের শুরুর দিকে। তখন বার্লিনের প্রাচীর ভেঙে পড়ছে তাদের মশারির ভিতরে।
অর্থাৎ তিনি সারাজীবন ধরে দেখে গেলেন মধ্যবিত্তের নীরব রক্তপাত কীরকম।
আমার আজ মৃণাল সেনের শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, তিনি এমন একজন পরিচালক যিনি পরাজয় নিশ্চিত জেনেও আত্মহত্যার অধিকার ছেড়ে দিতে চাননি। তাঁর মধ্যবিত্ত পরিবেশেই বাস করেছেন। গ্রামে যেতে চেয়েছেন, কিন্তু সেটা ছলনা। তিনি যখন বলেন “বুঝলে স্মিতা পাতিল, এই হচ্ছে তোমার বাংলাদেশ” – তখন তিনি আমাদের সম্পূর্ণ উপস্থাপনকে, অর্থাৎ মধ্যবিত্তের চোখ দিয়ে দেখা বাংলাকে, প্রশ্ন করেন। সারাজীবনই তিনি নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়েছেন।
যখন আয়ুর্বেদিক ওষুধ বিক্রেতার কাজ করতেন উত্তরপ্রদেশে, তখন হঠাৎ একদিন বাড়ি এসে আয়নার সামনে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে নেচেছিলেন এবং উপলব্ধি করেছিলেন যে ওষুধ বেচা তাঁর নিয়তি নয়। তাঁকে ছবি বানাতেই হবে।
আরো পড়ুন ঋত্বিক কুমার ঘটক, তাঁর যুক্তি তক্কো আর গপ্পো
মৃণাল সেনের মধ্যে দিয়েই আমরা দেখলাম, যে মাঝারিয়ানার এত উচ্ছ্বাস, অসাম্য, অসঙ্গতি সত্ত্বেও এই মাঝারিরাই আসলে ইতিহাসের নিয়ন্তা। সে-ই ইতিহাসকে ভাঙে। তিনি এটা বিশ্বাস করতে রাজি ছিলেন না যে শ্রমিক, কৃষক ইতিহাসকে বদলাবে। যে শ্রমিক বা যে কৃষক বদলাবে, সে আসলে মধ্যবিত্তের চোখে দেখা নির্মিত শ্রমিক বা কৃষক। মৃণাল শেষপর্যন্ত এই সভ্যতাকে দণ্ডিত করেন একটা মধ্যবিত্ত ছেলের চোখ দিয়েই। যখন তিনি একটা বড় দোকানে যৌনাঙ্গবিহীন ম্যানেকুইন দেখান তখন আসলে একথাই বলেন, যে মধ্যবিত্তদের কোনো সৃজনশীলতা অবশিষ্ট নেই। মৃণালদা এটা অনুমান করলেও তাঁকে যে সে জিনিস দেখে যেতে হবে তা ভাবেননি। তাঁর দুর্ভাগ্য যে দেখে যেতে হয়েছে।
বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে মৃণাল ক্রমশ ছবির সংখ্যা কমালেন এবং নয়ের দশকে তো আর ছবি করলেনই না। আমার ভুবন বলে যে ছবিটা করলেন তা অনেকটাই অঙ্ক মেলানোর তাগিদে। ওই ছবিতে মৃণাল নিজে উপস্থিত ছিলেন না। আমার ভুবনের মৃণাল এমনকি সেই মৃণালও নন, যিনি নীল আকাশের নীচে-র মত হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের উপর ভর দিয়ে থাকা ছবিতেও একটা পোস্টারের মধ্যে দিয়ে একজন সুন্দরীকে দেখিয়ে কোথাও বাইসাইকেল থিভস-এর প্রতি তাঁর প্রীতি এবং মধ্যবিত্ত জীবনের হতাশার কথা প্রকাশ করেন। অবশেষে, পুনশ্চ, প্রতিনিধি – সর্বত্র তিনি অনুপুঙ্খে, হাড়ে মাংসে মধ্যবিত্তকে দেখেছেন। আজ এটুকুই বলব, আমাদের মধ্যবিত্তদের যদি সেলুলয়েডে কোনো রাষ্ট্রদূত থেকে থাকে, তিনি মৃণাল সেন।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







