কিছুদিন আগেই চলে গেল বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকরের জন্মদিন। প্রতিবারের মতই সংবাদমাধ্যমে এবং সোশাল মিডিয়ায় উঠে এসেছে পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের মানুষের লড়াই ও উত্তরণের নানা কাহিনি। স্বাধীন ভারতের অন্তহীন বিতর্কগুলোর মধ্যে অন্যতম হল সাংবিধানিকভাবে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য পড়াশোনা ও চাকরিবাকরিতে সংরক্ষণ। সাম্প্রতিককালে সেই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলেছে কর্ণাটক সরকারের মুসলমানদের জন্য সংরক্ষণ বাতিলের ঘোষণা।
আরও নির্দিষ্ট করে বললে, শিক্ষাক্ষেত্রে ও কর্মক্ষেত্রে সরকার প্রদত্ত সংরক্ষণের সুবিধা মুসলমানদের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে দুটো হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিলি করা। গত শতকের নয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্তি বাবদ মুসলমানরা ৪% সংরক্ষণের সুবিধা পেতেন। কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী বাসবরাজ বোম্মাই গত ২৫ মার্চ এক সাংবাদিক সম্মেলনে মুসলমানদের ওবিসি তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
কর্ণাটকের জাতিসম্প্রদায়সমূহের সরকারি তালিকায় 2B শ্রেণিতে এতদিন মুসলমানরা ছিলেন এবং সেই বাবদ সংরক্ষণের আওতায় ছিলেন। অন্যদিকে 3A শ্রেণির ভক্কালিগা ও সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়গুলো ৪% এবং 3B শ্রেণির বীরশৈব-লিঙ্গায়েত ও সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়গুলো ৫% সংরক্ষণের সুবিধা পেত। ২৫ মার্চের ঘোষণা ও ২৭ মার্চের সরকারি নির্দেশের মাধ্যমে এই তিনটি শ্রেণিই বিলোপ করে ভক্কালিগাদের 2C এবং লিঙ্গায়েতদের 2D হিসাবে নতুন শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, মুসলমানরা বাদ পড়েছেন। মোট ৩২% ওবিসি কোটার মধ্যে মুসলমানদের জন্য বরাদ্দ ৪% আধাআধি ভাগ করে দেওয়া হয়েছে ভক্কালিগা ও লিঙ্গায়েতদের মধ্যে, যার ফলে তাঁদের কোটা বেড়ে যথাক্রমে ৬% ও ৭% হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি তফসিলি জাতির জন্য সংরক্ষণ বাড়িয়ে ১৫% থেকে ১৭% এবং তফসিলি উপজাতির জন্য সংরক্ষণ ৩% থেকে বাড়িয়ে ৭% করার কথা বলা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, ওবিসি তালিকা থেকে বাদ পড়লেও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া অংশের জন্য সংরক্ষিত ১০% কোটার আওতায় সংরক্ষণের আবেদন করতে পারবেন মুসলমানরা। এই ১০% সংরক্ষণ ব্রাহ্মণ, জৈন প্রভৃতি অগ্রসর সম্প্রদায়গুলোর জন্যও প্রযোজ্য। অর্থাৎ এখন থেকে মুসলমানদের এই অগ্রসর জাতিগুলোর সঙ্গে সংরক্ষণের প্রতিযোগিতায় নামতে হবে।
কর্ণাটক সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে অমিত শাহ বলেছেন, ধর্মভিত্তিক সংরক্ষণ অসাংবিধানিক এবং সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু বিভাজনে তাঁরা বিশ্বাস করেন না। সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু বিভাজনে তাঁরা কী ঘোর অবিশ্বাসী তা রাম জন্মভূমি আন্দোলন থেকে শুরু করে স্কুলের পাঠক্রম থেকে মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাস বাদ দেওয়া – সবেতেই পরিষ্কার। প্রসঙ্গত, কর্ণাটকের বিজেপি সরকার সংরক্ষণ সংক্রান্ত এই ঘোষণা করেছে কর্ণাটকের বিধানসভা নির্বাচনের দিন ঘোষণার ঠিক আগে।
বিজেপির বাঁধাধরা ঢঙে কর্ণাটকের ৪% মুসলিম কোটার দায় বোম্মাই অবশ্যই চাপিয়েছেন কংগ্রেসের সংখ্যালঘু তোষণের রাজনীতির উপর, যদিও ইতিহাস অন্য কথা বলে। ভক্কালিগা ও লিঙ্গায়েতরা বরাবরই কর্ণাটকের শক্তিশালী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে অন্যতম। ব্রিটিশ আমলে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে কর্ণাটকে ব্রাহ্মণবিরোধী মনোভাব দানা বাঁধে এবং মূলত এই দুই সম্প্রদায়ের চাপেই ১৯২১ সালে মহীশূরের মহারাজা কিছু অব্রাহ্মণ সম্প্রদায় ও মুসলমানদের জন্য সংরক্ষণ বিধি চালু করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নতুন সংবিধান চালু হলে এই সংরক্ষণ বাতিল হয় এবং ১৯৬২ সালে গৌড়া কমিশনের পরামর্শ মেনে ওবিসি তালিকাভুক্ত ইসলাম ধর্মাবলম্বী কয়েকটা বিশেষ জনগোষ্ঠীকে সংরক্ষণের সুবিধা দেওয়া হয়। যথারীতি এর বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে নানা অভিযোগ দায়ের হয়। একইসঙ্গে তিন দশক জুড়ে একের পর এক হাভানুর কমিশন (১৯৭৫), ভেঙ্কটস্বামী কমিশন (১৯৮৩) এবং চিন্নাপ্পা রেড্ডির তত্ত্বাবধানে তৃতীয় অনগ্রসর শ্রেণি কমিশনের (১৯৯০) নিবিড় সমীক্ষাভিত্তিক রিপোর্ট মোতাবেক ১৯৯৪ সালে সামগ্রিকভাবে মুসলমানদের ওবিসি তালিকাভুক্ত করে ৪% সংরক্ষণের সুবিধা দেওয়া হয়।
বোম্মাই বলেছেন, ভারতীয় সংবিধানে ধর্মভিত্তিক সংরক্ষণের কোনো জায়গা নেই। অথচ একই যুক্তিতে খ্রিস্টান বা জৈনদের ওবিসি তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কথা। কিন্তু নতুন 2D শ্রেণিতে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এই ৪% সংরক্ষণ বাতিলের যুক্তি হিসাবে বোম্মাই বলেছেন, ভারতীয় সংবিধানে ধর্মভিত্তিক সংরক্ষণের কোনো জায়গা নেই। অথচ একই যুক্তিতে খ্রিস্টান বা জৈনদের ওবিসি তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কথা। কিন্তু নতুন 2D শ্রেণিতে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সংবিধানের ১৫ নং অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ পরিচয় বা জন্মস্থানের নিরিখে বৈষম্য নিষিদ্ধ এবং ১৬ (১) অনুচ্ছেদ অনুসারে সরকারি দপ্তরে নিয়োগের ক্ষেত্রে সমস্ত নাগরিককে সমান বলে ধরা হয়। স্বাভাবিক প্রশ্ন – তাহলে তফসিলি জাতি, উপজাতি, অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির জন্য সংরক্ষণই বা করা হয় কী করে? করা যায়, কারণ ১৫ (৪) অনুচ্ছেদে প্রত্যেক রাজ্যকে তফসিলি জাতি, উপজাতি সমেত সামাজিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে অনগ্রসর শ্রেণির জন্য সংরক্ষণের অধিকার দেওয়া হয়েছে এবং ১৬ (৪) অনুচ্ছেদে সরকারি চাকরিতে প্রতিনিধিত্বের নিরিখে পিছিয়ে থাকা সামাজিক গোষ্ঠীগুলোকে সংরক্ষণের অধিকার দেওয়া হয়েছে। রেড্ডি কমিশনের রিপোর্টে দেখা গিয়েছিল, উচ্চশিক্ষায় ভক্কালিগা ও লিঙ্গায়েতদের উপস্থিতি যথাক্রমে ১৫% ও ১১%। অথচ মুসলমান মাত্র ৫%। বিভিন্ন সরকারি চাকরি মিলিয়ে ভক্কালিগা ও লিঙ্গায়েত যথাক্রমে ১৭% ও ১৩%, কিন্তু মুসলমানরা মাত্র ৮%। সুতরাং রেড্ডি কমিশনের রিপোর্টে ভক্কালিগা ও লিঙ্গায়েতদের অগ্রসর এবং মুসলিমদের অনগ্রসর সম্প্রদায় হিসাবে চিহ্নিতকরণে হিসাবের গরমিল নেই। উল্লেখ্য, তার আগে ভেঙ্কটস্বামী কমিশনের রিপোর্টমাফিক ভক্কালিগা, লিঙ্গায়েতসহ একাধিক মুখ্য সম্প্রদায় অনগ্রসর শ্রেণির তালিকা থেকে বাদ পড়ায় ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার হয় এবং চাপের কাছে নতিস্বীকার করে কৰ্ণাটক সরকার ওই রিপোর্ট অগ্রাহ্য করে।
কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তের সপক্ষে আম্বেদকর ও সংবিধানের দোহাই ছাড়াও অন্ধ্রপ্রদেশের উদাহরণ দেন বোম্মাই। ২০০৪ সালে অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার মুসলিমদের জন্য ৫% কোটা চালু করে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত অনগ্রসর শ্রেণি কমিশনের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে গৃহীত না হওয়ায় এবং এই কোটার ফলে মোট কোটার অনুপাত ৫০% ছাড়িয়ে যাওয়ায় অন্ধ্রপ্রদেশ হাইকোর্ট এই কোটা বাতিল করে। অনগ্রসর শ্রেণি কমিশন এই কোটা অনুমোদন করলেও হাইকোর্ট ফের এই কোটার সমর্থনে উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ দাবি করে। পরবর্তীকালে পি এস কৃষ্ণন কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী ওবিসি তালিকায় নতুন সংযোজনের মাধ্যমে ১৪টা ইসলাম ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়কে ৪% কোটার আওতায় আনা হয়। এর ফলে ধর্মান্তর বেড়ে যাবে – এই আশঙ্কা প্রকাশ করে হাইকোর্ট এই সংরক্ষণও বাতিল করে। অবশেষে অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার শীর্ষ আদালতে গিয়ে স্থগিতাদেশ আদায় করে এবং এখনো পর্যন্ত বিষয়টা অমীমাংসিত।
এটুকু স্পষ্ট, যে তিন তিনটে কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে নির্ধারিত এবং
তিরিশ বছর ধরে চলে আসা সংরক্ষণকে এক আঁচড়ে বাতিল করার চেষ্টাকে
শীর্ষ আদালত ভালো চোখে দেখছে না।
কর্ণাটকের এই কোটা বাতিলের বিরুদ্ধে শীর্ষ আদালতে দায়ের হওয়া মামলার প্রথম শুনানি ছিল ১৩ এপ্রিল। বিচারপতি কেএম জোসেফ এবং বিভি নাগারত্নের বেঞ্চ এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলেও এখনো অবধি কোনো স্থগিতাদেশ দেননি। তাঁদের মূল আপত্তির জায়গা এই, যে বোম্মাই সরকারের এই সিদ্ধান্ত কেবলমাত্র একটা অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্টের ভিত্তিতে অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে নেওয়া। সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ভুল অনুমানের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে – এরকম আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন দুই বিচারপতি। মামলা বাতিল না হওয়া পর্যন্ত কৰ্ণাটক সরকার পরিবর্তিত সংরক্ষণ বিধি কোনোভাবেই প্রয়োগ করতে পারবে না। ১৩ তারিখের পর প্রথমে ১৮ এপ্রিল এবং তারপর ২৫ এপ্রিল আরও দুটো শুনানি হয়। দুদিনই কর্ণাটক সরকারের কৌঁসুলি কোটা বাতিলের পক্ষে নথি ও প্রমাণ দাখিল করার জন্য আরও সময় চাওয়ায় আপাতত ৯ মে পর্যন্ত শুনানি মুলতুবি রাখা হয়েছে। তবে বিচারপতিদের বক্তব্যে এটুকু স্পষ্ট, যে তিন তিনটে কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে নির্ধারিত এবং তিরিশ বছর ধরে চলে আসা সংরক্ষণকে এক আঁচড়ে বাতিল করার চেষ্টাকে শীর্ষ আদালত ভালো চোখে দেখছে না।
মুসলমানদের জন্য সংরক্ষণের বিষয়ে যে প্রশ্নটা বারবার ওঠে তা হল মুসলমানরা একটাই সম্প্রদায় হিসাবে বিবেচ্য কিনা। কালেলকর কমিশন (১৯৫৫) এবং মণ্ডল কমিশন (১৯৭৯) – উভয়েরই মত ছিল, গোটা মুসলমান সম্প্রদায়কে এক করে দেখা চলে না। মুসলমান সমাজে বর্ণাশ্রম না থাকলেও ধর্মীয় অভ্যাস, পারিবারিক পেশা, ভাষা, আদি বসতি – এরকম কিছু বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বৈষম্য বর্তমান। ভারতীয় মুসলমানদের একটা বড় অংশই ধর্মান্তরিত হওয়ায় হিন্দু জাতি কাঠামোর প্রভাব রয়ে গিয়েছে কমবেশি সব রাজ্যেই। সব গোষ্ঠীই সমান পিছিয়ে নেই। কর্ণাটকের ওবিসি তালিকার 1 এবং 2A শ্রেণিতেও ১৭টা অনগ্রসর মুসলিম উপজাতি রয়েছে এবং বোম্মাই সরকার তাদের অবস্থার কোনোরকম পরিবর্তন ঘটায়নি। এই যুক্তিতে সরকার এবং কোনো কোনো বিশেষজ্ঞও এই কোটা বাতিলকে মুসলমানদের প্রতি অবিচার হিসাবে দেখতে নারাজ। কিন্তু কর্ণাটকে মোট সংরক্ষণের পরিমাণ যেখানে ৬০%, সেখানে মুসলমানদের বাতিল কোটা ভক্কালিগা ও লিঙ্গায়েতদের মধ্যে বিলি করা হল কোন যুক্তিতে? সেটা স্পষ্ট হয় শাহের তেলেঙ্গানা সফরের দিকে তাকালে। বছর শেষে তেলেঙ্গানায় বিধানসভা ভোট। সেখানে ‘বিজয় সংকল্প সভা’-য় শাহ বলেছেন, ক্ষমতায় এলে তেলেঙ্গানাতেও ৪% মুসলমান কোটার তুলে দিয়ে তা তফসিলি জাতি, উপজাতি এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে।
দেশজুড়ে প্রতিনিয়ত নেওয়া হচ্ছে ছোট বড় নানা পদক্ষেপ, যার লক্ষ্য হিন্দুরাষ্ট্রের কাঠামোকে ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী করে তোলা। দারিদ্র্য, অশিক্ষা, বেকারত্ব – যে কোনো সূচকের ভিত্তিতেই মুসলমানরা একেবারে নিচের সারিতে। ওবিসিদের মধ্যে মুসলমানরা মাত্র ১৬ শতাংশের কাছাকাছি। কিন্তু মুসলমানদের মধ্যে ওবিসি হিসাবে চিহ্নিত প্রায় ৪১%। তাই ওবিসি কোটা থেকে বাদ পড়লে মুসলমানদের একটা বড় অংশ শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের সুযোগ থেকে আরও বঞ্চিত হবেন। এক সাম্প্রতিক গবেষণায় (আশার, নভোসাদ, রাফকিন; ২০২২) দেখা গেছে যে স্বাধীনোত্তর ভারতে তফসিলি জাতি ও উপজাতির মধ্যে শিক্ষাগত যোগ্যতা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বেড়েছে; মুসলমানদের ক্ষেত্রে ঘটেছে ঠিক উল্টোটা। পুত্রসন্তানদের ক্ষেত্রে এই বৈষম্য বিশেষত প্রবল। এই গবেষণার অন্যতম কৌতূহলোদ্দীপক জায়গা ছিল অর্থনৈতিক সচ্ছলতার বিচারে একটা সম্প্রদায়ের নিচের দিকের ৫০% বা ৭০% পিতাদের পুত্রের শিক্ষাগত যোগ্যতা। সেই সূচকে দেখা যাচ্ছে, স্বাধীনতা পরবর্তী চার দশকে সাধারণ অগ্রসর ও তফসিলি জাতির মধ্যে পার্থক্য ক্রমশ কমেছে আর মুসলমান সম্প্রদায়ের সঙ্গে ওই দুই জনগোষ্ঠীরই তফাত ক্রমশ বাড়ছে। অর্থাৎ আন্তঃপ্রজন্ম উন্নতির নিরিখে মুসলমান ছেলেরা সবচেয়ে পিছিয়ে। গবেষকরা স্পষ্ট বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, যে সাধারণ অগ্রসর ও তফসিলি জাতির মধ্যে পার্থক্য কমে আসার কারণ তফসিলি জাতির জন্য সাংবিধানিক সংরক্ষণ। অন্যদিকে সংরক্ষণের সুবিধা না পাওয়ায় শিক্ষাক্ষেত্র থেকে ক্রমশ বাইরে চলে যাচ্ছে মুসলমান সম্প্রদায়।
আরো পড়ুন অপারেশন জাহাঙ্গিরপুরী: রাষ্ট্রীয় মদতে মুসলিম উচ্ছেদের চেষ্টা
আমাদের বর্ণহিন্দুদের বাড়িতে, সামাজিক বৃত্তে, পাড়ার মোড়ে একটা কথা প্রায়ই শুনতে পাওয়া যায় “সবকটা ক্রিমিনালের নাম পদবি দেখবি!” বাচনভঙ্গীতে মিশে থাকে প্রচ্ছন্ন অহঙ্কার। এই অহঙ্কার কিন্তু নিছক ধর্মীয় পরিচয় থেকে আসে না, আসে ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নাতীত উত্তরাধিকার থেকে। সেই উত্তরাধিকার বাবদই আমরা জানি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির চর্চা অপরাধমনস্কতা কমায়, আর্থিক স্বাচ্ছল্য এনে অপরাধের প্রয়োজনীয়তাও কমায়। আমরা আরও জানি, যে কোনো একটা সামাজিক গোষ্ঠী যদি ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে পড়ে, তবে তার ক্ষমতায়নের উপায় হল শিক্ষা ও সুযোগের ক্ষেত্রে সংরক্ষণ। কিন্তু ওই নাম-পদবির পাকেচক্রে দুয়ে দুয়ে চারটা করতে আমরা মোটেই স্বচ্ছন্দ বোধ করি না।
সার্বিকভাবে মুসলমানদের সংরক্ষণের আওতায় আনলে সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষা হয় কিনা, তা অবশ্যই তর্কের বিষয়। তবে সামগ্রিকভাবে মুসলমান সম্প্রদায়কে অতিরিক্ত অপরাধপ্রবণতা, ধর্মান্ধতা, হিংস্রতার জন্য দাগিয়ে দিতে পারে যে রাষ্ট্র, সামগ্রিকভাবে মুসলমানদের সংরক্ষণ দেওয়ার কথায় সে আঁতকে ওঠে কেন – সেটাও ভেবে দেখার দরকার বৈ কি।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







