সূর্য সেন (মাস্টারদা)

আজ বিজয়া দশমী। উৎসবের শেষ দিন। এই দিনটিতে নাগরিক ডট নেটের পাতায় রইল মাস্টারদা সূর্য সেনের একটি লেখা। শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারসহ অনুজ শহীদদের নিয়ে সূর্য সেনের এই রচনা। ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন প্রীতিলতা। চট্টগ্রামের রণাঙ্গনে শহীদ হয়েছে আরো অনেক তরুণ। তাঁদের স্মৃতিতে দাদা সূর্য সেনের সংযত, অথচ তীব্র আবেগের দলিল এই লেখা। বানান অপরিবর্তিত।

 

আমার এ ক্ষুদ্র জীবনে কত বিজয়াই তো এসে গেছে। কিন্তু আজকের বিজয়া আর অন্য বিজয়ার মধ্যে কত তফাৎ — এবারকার বিজয়া যেন সবচেয়ে বেশি মূল্যবান।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

জীবনে যা দেখিনি, জীবনে যা পাইনি, জীবনে যা শিখিনি, এমন কত অভিনব জিনিষ নিয়েই বিজয়া এলো আজ আমার কাছে। কত নূতন অভিজ্ঞতাই সে নিয়ে এলো।

গত দুমাস যেন আমার জীবনের অভিনব, অভূতপূর্ব্ব অধ্যায়। এই দু’মাসের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি, আনন্দ, বিষাদ, জ্বালা, আমার জীবনে খুব বড় সঞ্চয়ই হয়ে রইল।

আজ বিজয়ার দিনে মার কাছে প্রার্থনা করছি, যেন এই অমূল্য সঞ্চয়টুকু আমার জীবনকে ঐশ্বর্য্যময় করে তোলে। এই দু মাসে সব কিছুর মধ্যে আনন্দই সবচেয়ে ছাপিয়ে উঠেছে। এত আনন্দ জীবনেও পাইনি, বিষাদ আর জ্বালা আনন্দকে আরও মধুময় করে তুলেছে। আমার দুর্ভাগ্য — একান্ত দুর্ভাগ্য যে, এমন প্রাণমাতানো আনন্দের মধুর স্মৃতি আজ আমায় অহরহ ব্যথা দিচ্ছে।

আজ মনে পড়ছে, কত সুন্দর অমূল্য রত্নরাজি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবনের সুখ, সম্পদ, ঐশ্বর্য সব তুচ্ছ করে হাসতে হাসতে মাতৃযজ্ঞে নিজেদের আহুতি দিয়ে চলে গেছে, একটু দ্বিধা করেনি, একটু সংকোচ করেনি, আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে স্বেচ্ছায় মরণের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

আজ এমন পবিত্র দিনে তাদের কথা মনে করে আমার মত কঠিন হৃদয়ের চোখে জল আসছে — দেহের বীরত্বের কাহিনী মনে করে আমার গৌরবে বুক ফুলে উঠছে।

নরেশ, বিধু, টেগরা, ত্রিপুরা, মধু, অর্দ্ধেন্দু, প্রভাস, নির্ম্মল, পুলিন, মতি, শশাঙ্ক, জিতেন, আন্দু, অমরেন্দ্র, মনা, রজত, দেবু, স্বদেশ, মাখন, রামকৃষ্ণ, ভোলা — সবারই কথা আজ একে একে মনে পড়ছে। আর স্মৃতির মধ্যে দিয়ে তাদের বিজয়ার সম্ভাষণ জানাচ্ছি।

কত জীবনের বিজয়ার নিমিত্তই হলাম — কত স্নেহময়ী জননীর বুক শূন্য করে তার সোনার পুতলিকে স্বাধীনতার বেদীমূলে আহুতি দিয়েছি — কতজনকে অন্তরীণে, কারাগারে, নির্ব্বাসনে, দ্বীপান্তরে পাঠিয়েছি, ঘরে ঘরে হাহাকারের সৃষ্টি করেছি — দেশের উপর গভর্নমেন্টের অত্যাচার নির্যাতন টেনে এনেছি। এ সবের দায়িত্ব থেকে নিজেকে বাদ দেই কি করে?

মা, আনন্দময়ী মা আমার, আজ তোমার বিসর্জ্জনের দিনে তোমায় একান্ত ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞাসা করছি — আমি কি অন্যায় করে যাচ্ছি?

পনেরো বৎসর আগে অনেক ভেবে চিন্তে, ভালোমন্দ বিচার করে জীবনের যে লক্ষ্য, যে আদর্শ গ্রহণ করেছিলাম, আজও তাই আঁকড়ে ধরে আছি। দুর্ব্বলতা কি আসতে চায়নি? কত রকমের দুর্ব্বলতা আসতে চেয়েছে, কিন্তু তবু নিজের লক্ষ্যটিকে তো ছাড়িনি। আজও মনে হচ্ছে, খুব নিঃসন্দেহেই মনে হচ্ছে, আমি যে পথে চলেছি দেশের অনেক লোক ভুল বুঝলেও সেই পথটাই ঠিক।

এ বিশ্বাস এখনো আমার অটুট আছে যে, আমি অন্যায় করছি না, পাপ করছি না। দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে আমার দেশে যে হাহাকার, অত্যাচারের সৃষ্টি হয়েছে, এর চেয়ে আরো অনেক বেশি — সব দেশেই তাই হয়েছে। আমার আদর্শের উপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস রেখেই আমার পথে আমি চলেছি — এখনো কোনো দ্বিধা আসেনি।

মা, তোমায় মিনতি জানাচ্ছি, যদি আমার ভুল হয়, আমার ভুল ভেঙ্গে দিও, আর যদি ঠিক পথেই আমি চলে থাকি, তাহলে আমার বিশ্বাসকে আরও শক্ত করে দাও — আমার মধ্যে যেন কোন রকমের দুর্ব্বলতা না আসে, আমি যেন আমার পথ থেকে কোনদিন একচুলও না সরি।

আমি যেন বড় নিঠুর ছিলাম, কিন্তু গত দু’মাসের পথ চলা যেন আমার নিঠুর হৃদয়ের মধ্যে মমতা এনে দিয়েছে, কারুণ্যের সৃষ্টি করেছে; তাই অতি আদরের ছেলে, মেয়ে, ভাইবোনকে হারিয়ে তাদের যে সব আত্মীয়স্বজন আজ বিজয়ার দিনে চোখের জলে বুক ভাসাচ্ছেন, তাদের কথা মনে করে আমার মনে আজ ভীষণ লাগছে।

হয়ত তাঁরা আমাকে তাঁদের বুকের ধন হারাবার নিমিত্ত মনে করে আমায় অভিশাপ দিচ্ছেন — সেজন্য আমি চিন্তা করছি না, কিন্তু তাদের বুকভাঙ্গা ক্রন্দন, মর্ম্মভেদী হাহাকার যে আমার বুকে ভীষণ বাজছে।

আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, কত স্নেহময়ী জননী তার আদরের সন্তানকে হারিয়ে কি মর্ম্মান্তিক কান্নাই কাঁদছেন। কি অসহ্য বেদনায় তার হৃদয় অস্থির হয়ে উঠেছে — বিজয়ার এমন আনন্দের দিনটি তাঁর কাছে কত যন্ত্রণাদায়ক হয়েছে।

বাপ তাঁর আদরের দুলালকে হারিয়ে বিজয়ার দিনে সমস্ত উৎসবকে বিষাদময় করে তুলেছেন। ভাইবোন তাদের স্নেহের ভাইবোনকে হারিয়ে আজ কত অসহনীয় যাতনাই ভোগ করছে। কত বড় অভাববোধ তাঁদের হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করছে। কত বড় অভাববোধ তাদের হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করছে। এ সব ভেবে আমার মত পাষাণও আজ গলে যাচ্ছে।

আবার তোমায় জিজ্ঞাসা করছি মা, আমি কি অন্যায় করে যাচ্ছি? এত মায়ের চোখের জল, এত বাপের বুকফাটা কান্না, এত ভাইবোনদের হৃদয়ভেদী দীর্ঘশ্বাস, এ সবের কারণ হয়েছি বলেই আমি কি অন্যায় করছি?

যদি তাই হয়, তুমি আমার ভুল ভেঙ্গে দিও, আমায় ঠিক পথে চালিও। কিন্তু আমার মনে হয়, আমি ঠিক পথে চলেছি। তাই চারিদিকে শ্মশান সৃষ্টি হচ্ছে দেখে মনে ব্যথা পেয়েও আমি কান্নাটিকে বুকে চেপে ধরে আছি — এই আশায় যে, এসকল পবিত্র শ্মশান-স্তূপের উপরে একদিন স্বাধীনতার সৌধ নির্ম্মিত হবে।

পনের দিন আগে যে নিখুঁত পবিত্র, সুন্দর প্রতিমাটিকে এক হাতে আয়ুধ, অন্য হাতে অমৃত দিয়ে বিসর্জ্জন দিয়ে এসেছিলাম, তার কথাই আজ সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে। তার স্মৃতি আজ সবকে ছাপিয়ে উঠেছে।

যাকে নিজ হাতে বীর সাজে সাজিয়ে সমরাঙ্গনে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম, নিশ্চিত মৃত্যুর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুমতি দিয়ে এসেছিলাম, তার স্মৃতি যে আজ পনের দিনের মধ্যে এক মুহূর্ত ভুলতে পারলাম না। সাজিয়ে দিয়ে যখন করুণভাবে বললাম, ‘তোকে এই শেষ সাজিয়ে দিলাম। তোর দাদা তো তোকে জীবনে আর কোনোদিন সাজাবে না,’ তখন প্রতিমা একটু হেসেছিল। কি করুণ সে হাসিটুকু। কত আনন্দের, কত বিষাদের, কত অভিমানের কথাই তার মধ্যে ছিল।

সে নীরব হাসিটুকুর ভিতরে অফুরন্ত কথা আমার সারা জীবন ভাবলেও শেষ করতে পারবো না — শেষ করতে চাইও না। তা যেন আমার জীবনে নিত্য নতুন চিন্তার উপকরণ যুগিয়ে আমার জীবনকে ঐশ্বর্য্যময় করে তোলে, দিন দিন উন্মত্ত করে তোলে।

সে তো আজ নিজ হাতে অমৃত পান করে অমর হয়ে গেছে। কিন্তু মরজগতে আমরা তার বিসর্জ্জনের ব্যথা যে কিছুতেই ভুলতে পারছি না।

আজ বিজয়ার দিনে, সে দিনের বিজয়ার করুন স্মৃতি যে মর্মে মর্মে কান্নার সুর তুলছে — চোখের জল যে কিছুতেই রোধ করতে পারছি না —‘চাপিতে গেলে উঠে দু’কূল ছাপিয়া।’

সে যে আমার আনন্দের উৎস — নির্দোষ, নিষ্পাপ ছিল — সুন্দর পবিত্র মহান ছিল। তার মধ্যে একাধারে যত গুণ দেখেছি, আর কোনো মানুষের মধ্যে আমি তত গুণ দেখিনি।

তার অন্তরের সৌন্দর্য আমায় মুগ্ধ করেছিল। তার মনের জোর, দৃঢ় সংকল্প, সাহস, বীরত্ব কারও চেয়ে কম দেখিনি। তার সরলতা, বাধ্যতা খুব সুন্দরই ছিল। তার শিক্ষা, আদর্শের অনুভূতি, সুন্দর ব্যবহার কিছুরই অভাব ছিল না।

সর্বোপরি, কঠোর বিপ্লবী মনোভাবের মধ্যে ভগবানের উপর অটুট ভক্তি, বিশ্বাস, সে যেভাবে বজায় রেখেছিল, তা দেখলে বাস্তবিকই শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছা হয়।

এত গুণের আধার ছিল বলে তাকে খুবই স্নেহ করতাম — হৃদয়ের সমস্ত উজাড় করে তাকে দিয়েছিলাম — প্রতিদানে অসীম আনন্দই পেয়েছি, এত আনন্দ জীবনে পাইনি। এত স্নেহের, এত আদরের প্রতিমাকে নিজ হাতে বিসর্জ্জন দিয়ে চলে এলাম। তাই সেদিনের কথা আজ কেবলই মনে হচ্ছে, মনে পড়ছে সেই প্রতিমাটিকে।

যে এত অফুরন্ত আনন্দ আমায় দিল, এত গুণ দেখিয়ে গেল, এত মহৎ আত্মদান করে গেল, দেবতার মত শ্রদ্ধা আমায় দিল, সেসব কথা মনে করে আজ আনন্দ না পেয়ে তাকে সরাবার ব্যাথাই আমার প্রানে এত বেশি বাজছে — আজ আমার এই একমাত্র দুঃখ।

অসুরদলনী মা আমার! আজ বিজয়ার দিনে তোমার কাছে এই কামনা, তুমি আমায় এই বর দাও — যেন তার স্মৃতি আমাকে আনন্দ দেয়, তার গুণের কথা মনে হলে যেন আমি গৌরব অনুভব করি।

তার অপূর্ব আত্মদান আমার প্রাণের যেন আনন্দ দেয়, আমাকে যেন আরও শক্তিমান করে তোলে, তার শ্রদ্ধা যেন আমাকে তার শ্রদ্ধার উপযুক্ত করে তোলে — তাকে হারাবার ব্যথাটা এত আনন্দকে ছাপিয়ে যেন কিছুতেই না ওঠে।

আমার স্নেহের প্রতিমাকে বলছি — রানী, তোকে আমি কতদিন কত ব্যথাই দিয়েছি; আজ বিজয়ার দিনে তোর দাদার সব দোষত্রুটি ভুলে যা, আমার উপর আর অভিমান রাখিস না।

তোকে হৃদয় উজাড় করে স্নেহ করেছি, তোর গুণ দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি — তোর ভগবৎ-ভক্তি দেখে তোকে শ্রদ্ধা করেছি; তোর সঙ্গে প্রাণ খুলে নিঃসংঙ্কোচে মিশেছি।

এত আপনার করে নিয়েছিলাম বলেই হয়তো তোকে সামান্য দোষে অথবা বিনা দোষে কত গাল দিয়েছি, হয়তো কোন সময় ভুল বুঝে তোর মনে ব্যথা দিয়েছি, তোকে খুব স্নেহ করতাম বলে তোকে গাল দিতে কোন দিন ইতস্ততঃ করিনি, মনে করতাম তোকে হাজার গাল দিলেও তুই আমার উপর রাগ করবি না, কোনদিন রাগ করিসও না।

শেষ মুহূর্তে তোকে ভুল করে আমি একটু গাল দিয়েছিলাম বলে তুই হয়তো অভিমান নিয়ে গেছিস। আজকের দিনে তুই যেখানে আছিস, সেখান থেকেই আমার সব দোষ ত্রুটির জন্য আমায় ক্ষমা করে যা।

শেষ মুহূর্তে তোকে একটু কষ্ট দিয়েছি বলে আমি যে দিনরাত অশান্তির দহনে দগ্ধ হচ্ছি তা তো তুই দেখছিস। তোর দাদা যেন শান্তি পায়, তার ব্যবস্থা তুই করে দে।

আজ মিলনের দিন, ভেদাভেদ ভুলে যাওয়ার দিন। আজ তুই আমার পাশে থাকলে যে আনন্দ আমি পেতাম, দূর থেকেও সে আনন্দ আজ তুই আমাকে দে।

এমন সুন্দর দিনে মায়ের নামটি নিয়ে বলতে ইচ্ছা হচ্ছে, তোর মত নির্দোষ, নিষ্পাপ, নিষ্কলঙ্ক কাউকে আমি পাইনি। বাস্তবিক ফুলেরই মত তুই সুন্দর, পবিত্র ও মহান ছিলি। তোর অপূর্ব আত্মদান তোকে আরও সুন্দর, আরও মহনীয় করে তুলেছে।

বরদাত্রী মা আমার — আমায় আশীর্বাদ কর যেন আমার স্নেহের প্রতিমার মধ্যে যা কিছু সুন্দর, যা কিছু মহৎ দেখেছি, তা যেন আমার এবং আমার প্রিয় ভাইবোনেরা জীবনে প্রতিফলিত করবার জন্য চেষ্টার ত্রুটি না করে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.