আমার বয়সী অনেকের ফাঁসি বলতেই মনে পড়ে ধনঞ্জয় চ্যাটার্জির গল্প। দীর্ঘ ১৪ বছর কারাবন্দি থাকার পর কলকাতা হাইকোর্ট তার ফাঁসির হুকুম দেয় ২০০৪ সালে, আজ থেকে ঠিক ২০ বছর আগে। মনে আছে, ফাঁসিবিরোধী জনমত তৈরি করতে যে গুটিকয় প্রয়াস নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোকে নস্যাৎ করতে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রী মীরা ভট্টাচার্য উঠে পড়ে লেগেছিলেন। ফাঁসুড়ে নাটা মল্লিককে পাশে নিয়ে পথসভা করে মীরা বলেছিলেন, তিনি মেয়ের মা। সেই সুবাদে ধর্ষিতা এবং মৃতা হেতাল পারেখের মায়ের যন্ত্রণা তিনি অনুভব করতে পারেন। মেয়ের মা হিসাবে তিনি হেতালের ধর্ষক ও খুনির ফাঁসি চান। এরপর ২০১২ সালে দিল্লিতে যে ঘটনা সারা দেশে চাঞ্চল্য তৈরি করেছিল তার কথা তো আমাদের প্রজন্মের এবং অগ্রজদের সকলেরই মনে আছে। ২০২০ সালে এই ঘটনায় দোষীদের মধ্যে চারজনের ফাঁসি হয়। ভারতবর্ষে এখন পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডের জন্য অপেক্ষারত অপরাধীদের মধ্যে তাদের উপরেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের বিচার অনুযায়ী বিরলতম অপরাধের ক্ষেত্রেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়ে থাকে আজকাল। হেতাল বা নির্ভয়ার ঘটনাগুলো নিশ্চয়ই সেই গোত্রের, নইলে মহামান্য সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিরা ফাঁসির হুকুম দেবেন কেন? তাছাড়া শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারে নারী স্বাধীনতার নানা পাঠে নিজেকে জারিত করতে করতে আমারও তো এসব ঘটনা শুনলে অপরাধীর বিরুদ্ধে মাথায় খুন চেপে যায়। একবার মেট্রোতে অবাঞ্ছিত স্পর্শ প্রতিরোধ করতে লোকটার চটি পরা পায়ে নিজের জুতোর হিল পিষে তার একটা আঙুল প্রায় থেঁতলে দিয়েছিলাম। দেব না-ই বা কেন? দ্রৌপদী তাঁর বস্ত্রহরণের প্রতিশোধ নিতে দুঃশাসনের রক্তে স্নান না করে নিজের চুল বাঁধেননি। সেই রাগ এবং প্রতিশোধ স্পৃহা নিয়েই তো নিজের নারীবাদকে পুষ্ট করেছি। ২০০৪ সালে যেসব মানবতাবাদীরা ধনঞ্জয়ের ফাঁসির বিরুদ্ধে নিয়মিত কথা বলছিলেন, তাঁদের যুক্তি সেদিনের ২৫ বছরের আমি ঠিক মন থেকে মেনে নিতে পারিনি। বুঝতেই পারিনি, কেন কেউ আমার ক্ষতি করলে আমি পালটা তার ক্ষতি চাইব না। কেন খামোকা আমাকে উদার হতে হবে?

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে, নিজের বেড়ে ওঠা সম্বন্ধে যেসব ধারণা ছিল, সেগুলো তোলপাড় হয়ে গিয়েছিল। কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল সে বিষয়ে নতুন করে বোঝাপড়া করতে হয়েছিল। টের পেয়েছিলাম, কত মারাত্মক সব চিন্তাভাবনা সেঁধিয়ে আছে কয়েক হাজার বছর ধরে তৈরি হওয়া মস্তিষ্কে। আমার মাথার কত জান্তব অভ্যাসজনিত চেতনার আজও বিবর্তন হয়নি। সম্পূর্ণ সভ্য মানুষ হওয়া হয়ে ওঠেনি আসলে। আজ যখন তিলোত্তমার হত্যা ও ধর্ষণ কাণ্ডে কলকাতার নাগরিক সমাজ উত্তাল এবং এই ঘটনার জেরে সারা ভারতের মানুষ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন, তখন খটকা লাগার মত কিছু প্রতিবাদও উঠে আসছে। বলিউডের নায়িকা পরিণীতি চোপড়া থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী হয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এবং তাঁর নারীবাদী ব্রিগেড – সবাই আর জি কর কাণ্ডের অপরাধীর ফাঁসি চাইছে।

রাজনৈতিক স্টান্ট দেখাতে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী গত ৩ সেপ্টেম্বর বিধানসভার মাত্র একঘন্টার অধিবেশন ডেকে তড়িঘড়ি অপরাজিতা বিল পাস করিয়ে ফেললেন। এই বিলের মুখ্য উপজীব্য নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থা ও অত্যাচারের ক্ষেত্রে শাস্তি আরও কড়া তথা দৃষ্টান্তমূলক করে তোলা। যাবজ্জীবন ও ফাঁসির মত কঠোর শাস্তির বিধান দেওয়া এই বিল আইন হয়ে ওঠার পথে এখন রাজ্যপাল ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এমতাবস্থায় এহেন আইন তথা রাষ্ট্রের শাস্তিবিধান নিয়ে অবিবেচকের মত আচরণের বিরুদ্ধে কথা বললে গণহিস্টিরিয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো হবে। জনগণ খুব সহজেই এই অবস্থানকে ‘ধর্ষকের পক্ষে কথা বলছে’ বলে দাগিয়ে দেবে।

সেই ঝুঁকি নিয়েই আমার এই অপ্রিয় অবস্থানের কারণগুলো একবার আলোচনা করে নেওয়া যাক।

প্রথমত, ফৌজদারি মামলায় আনুষঙ্গিক প্রমাণের (circumstantial evidence) ভিত্তিতে আদালত যদি কোনোভাবে ভুল করে নির্দোষকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ফেলে, তাহলে তা সংশোধন করার কোনো উপায় থাকে না। ধনঞ্জয়ের কথাই ধরা যাক। সুপ্রিম কোর্টের কেস ফাইলের ছয় নম্বর অধ্যায়ে লেখা ছিল, পুরো মামলাটাই পরোক্ষ প্রমাণের উপর দাঁড়িয়ে। সম্প্রতি খবরে এসেছে জাপানের ইওয়াও হাকামাদার ঘটনা। ছেচল্লিশ বছর আগে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ পাওয়া ৮৮ বছরের হাকামাদা নির্দোষ প্রমাণিত হলেন গত বৃহস্পতিবার। পৃথিবীর কোনো আদালতই যে ১০০% নির্ভুল বিচার করতে পারে না তা বারবার প্রমাণিত।

দ্বিতীয়ত, মৃত্যুদণ্ডকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসাবে দেখিয়ে সমাজে অপরাধী মানসিকতার প্রতিষেধক হিসাবে এর পক্ষে যুক্তি সাজানো প্রায় প্রতিদিন হাস্যকর প্রমাণিত হচ্ছে। প্রখ্যাত মানবাধিকার কর্মী সুজাত ভদ্র এই ‘ডেটারেন্ট এফেক্ট’-এর যুক্তিকে কুসংস্কার হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর ভাষায় ‘যখন নির্ভয়া কেসে চারজন অপরাধীকে ফাঁসি দেওয়া হচ্ছে, তখনই ভারতে কতগুলো ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা ঘটছিল পরিসংখ্যান দেখে মিলিয়ে নিন।’ মিলিয়ে দেখলাম, পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ সালে, অর্থাৎ যে বছরের ২০ মার্চ নির্ভয়ার অপরাধীদের ফাঁসি হয়েছিল, সেবছর মোট ২৮,০৪৬ জনের ধর্ষণের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে দেশে। গড়ে দৈনিক প্রায় ৭৭ জন। তাহলে কী এমন দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে সম্ভাব্য ধর্ষকদের সামনে?

ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটি (এনএলইউ)-র এক গবেষণা বলছে, মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত অপরাধীদের আর্থসামাজিক ও ধর্মীয় পরিসংখ্যান সন্ধান করলে দেখা যায় আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা, দলিত ও মুসলমান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আইনের দেবীর পাল্লা অদ্ভুতভাবে ভারি। তবে এই অদ্ভুত ঘটনা যে কেবল ভারতেই ঘটে তা নয়। দেখা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত গণতন্ত্রের তীর্থক্ষেত্রেও পরিসংখ্যান অনুযায়ী সাদা আমেরিকানদের তুলনায় অনেক বেশি কালো মানুষ মৃত্যুদণ্ড পান। এনএলইউয়ের পরিসংখ্যান বলছে, ৩৮৫ জন অভিযুক্তের মধ্যে পরিবারের একমাত্র রোজগেরে লোকের সংখ্যা বেশি। দলিতরা এই তালিকার ২৪.৫%, মুসলমানরা ২০.৭%।

বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারে মুসলমানদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই, কিন্তু দেশের জেলগুলোতে মুসলমান প্রতিনিধিত্ব নজর কাড়ার মত। এই পরিসংখ্যান কি ভারতের আদালতের বিচারকদের পক্ষপাতিত্বের প্রমাণ, নাকি অপরাধ ওই জনগোষ্ঠীর মধ্যেই বেশি? দ্বিতীয় সরলীকরণটাই অনেকের পছন্দ হবে, কারণ তাতে জনমানসে প্রচলিত সংখ্যালঘুবিদ্বেষের আগুনে আরও ঘি ঢালা যাবে। আইন বিশারদ, অধ্যাপক ও মানবাধিকার আইনজীবী ফাইজান মুস্তাফা বললেন ‘ফৌজদারি মামলায় একজন অভিযুক্ত বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে সর্বশক্তিমান রাষ্ট্র লড়ে। দেওয়ানি আইনের মত দুজন সমকক্ষ ব্যক্তি একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ে না। এখানে সবদিক দিয়ে বাদীর ক্ষমতা বেশি। কারণ এক্ষেত্রে বাদী কে? স্বয়ং রাষ্ট্র, যে আইন বানিয়েছে। তাই আইনকে খুব স্বাভাবিক কারণেই অভিযুক্তের প্রতি নমনীয় ও সহনশীল হতে হবে। বিচারব্যবস্থার উদ্দেশ্যই হল সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। এক্ষেত্রে অপরাধীকে আইনে নির্দেশিত সাজা দেওয়া এবং নিরপরাধকে মুক্তি দেওয়াই সাধারণ নিয়ম। যদি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনা অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা না যায়, অর্থাৎ বিচার প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়ে আদালতের মনে এই সন্দেহের উদ্রেক হয়, যে অভিযুক্ত অপরাধের সঙ্গে জড়িত না-ও থাকতে পারে, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া যায় না।’

আইনের ভাষায় এই নীতিকেই বলা হয়, দোষহীনতার অনুমান নীতি (presumption of innocence)। অর্থাৎ চূড়ান্ত বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত যে কোনো অভিযুক্তকে আদালত নির্দোষ বলে ধরে নেওয়া। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই, যে ভারতের বহু বিচারপতি নানা কারণে এই নীতি মানেন না। মুস্তাফা নামোল্লেখ না করে সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারপতির উদাহরণ দিলেন, যিনি ২০০০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ৩০ জন অভিযুক্তের মধ্যে ১৪ জনকে ফাঁসির সাজা দিয়েছেন। এই ১৪ জনের মধ্যে এমন দুজন আছেন, যাঁদের হাইকোর্ট নির্দোষ বলে রায় দিয়েছিল। মুস্তাফা বলছেন ‘দেশের কোনো একটি হাইকোর্টের বিচারপতি যে অভিযুক্তকে নির্দোষ বলে রায় দিয়েছেন কোনো অভিযোগে, সেই অভিযোগ বিরলতম (rarest of rare) হতে পারে না নিশ্চয়ই? সুতরাং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক মহোদয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ আছে।’

পরের কথা বলার আগে একটা ছোট ঘটনার উল্লেখ করি।

সিস্টার হেলেন প্রেজানের লেখা বিখ্যাত ডেড ম্যান ওয়াকিং বইতে উনি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত প্যাট্রিক সনিয়ারের সঙ্গে কাটানো সময়ের যে অভিজ্ঞতা লিখেছেন, তাতে এক জায়গায় একটা অসাধারণ কথোপকথন রয়েছে। একটা ছোট ছেলে ফাদার বিলকে জিজ্ঞেস করে, কেন প্যাট্রিকের মৃত্যুদণ্ড হল? ফাদার বিল বলেন, কারণ প্যাট্রিক দুজনকে খুন করেছে। তখন ছেলেটা জিজ্ঞেস করে ‘কিন্তু ফাদার, তাহলে প্যাট্রিককে যারা খুন করবে তাদেরও কি মৃত্যুদণ্ড হবে?’ এই সহজ প্রশ্নের উত্তর ভারতের মত আরও ৫৫ দেশের আদালত দিতে পারছে না। যেখানে নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ বা শ্রীলঙ্কার মত ছোট দেশগুলো মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাহার করে নিয়েছে, সেখানে ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ইরান, চীন ইত্যাদি দেশ এই পশ্চাদপর মানসিকতার শাস্তি বলবৎ রেখেছে। দ্য হিন্দু কাগজে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষের হিসাব অনুযায়ী, মোট ৫৬১ জন অভিযুক্ত মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় দিন গুনছে।

মানবাধিকার কর্মী ও এপিডিআর সদস্য নীলাঞ্জন দত্ত বললেন ‘মৃত্যুদন্ড আসলে একটি প্রতিহিংসাপরায়ণ আইন যা হিংস্র সমাজের প্রতিভূ হিসাবে ততোধিক হিংস্র রাষ্ট্রীয় বিচারের নামে আইনিভাবে ব্যক্তিকে খুন করে থাকে। কোনো দেশে ফৌজদারি আইন কতটা উদার ও পরিণত তা বলে দেয় সেই দেশ ও তার সমাজ আধুনিকতার পথে কতটা এগিয়ে। ‘চোখের বদলে চোখ’ মার্কা কঠোর প্রতিহিংসাপরায়ণ আইন আদিম হিংস্র প্রবৃত্তির পরিচায়ক।’

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘প্রচলিত দণ্ডনীতি’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘নির্দয় প্রণালী যে কার্যকরী, এই ধারণা বর্বর প্রবৃত্তির স্বভাবসঙ্গত। পাঠশালা থেকে আরম্ভ করে পাগলাগারদ পর্যন্ত এর ক্রিয়া দেখা যায়। এর প্রধান কারণ, মানুষের মনে যে বর্বর মরে নি নির্দয়তায় সে রস পায়। সভ্য দেশে সেই রসসম্ভোগের স্থান সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। তার কারণ, কালক্রমে মানুষ খানিকটা সভ্য হয়েছে, সেই খানিকটা-সভ্য মানুষ আপনার ভিতরকার বর্বর মানুষকে লজ্জা দেয় এবং সংযত করে। যেখানে সেই সংযমের দাবি নেই সেখানে বর্বর সম্পূর্ণ ছাড়া পায়, নির্দয়তাই বৈধ হয়ে ওঠে। জেলখানায় মনুষ্যত্বের আদর্শ বর্বরের দ্বারা প্রতিদিন পীড়িত হচ্ছে, তাতে সন্দেহ নেই।’

কোনো আধুনিক সমাজে এহেন পিছিয়ে থাকা আইন টিঁকে থাকতে পারে না। ভারত রাষ্ট্র ও তার সমাজ যে এখনো মৃত্যুদণ্ডকে প্রত্যাহার করতে পারে নি তা আমাদের অনগ্রসর মানসিকতারই পরিচয় দেয়।

মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সময়ে সর্বোচ্চ আদালত অনেক সময়েই দেশের জনগণের চাহিদা বা সমাজের বিবেক ইত্যাদির দোহাই দিয়ে থাকে। সুজাত ভদ্রর মতে, সমাজের বিবেক বা জনগণের আবেগ ইত্যাদি তো কিছু আইন বহির্ভূত কথা। যখন এখানে তিলোত্তমার বিচারের জন্য রাত দখল হচ্ছে, সেই একই সময়ে তো উত্তরাখণ্ড থেকে বদলাপুর হয়ে আমাদের ঘরের কাছের সোদপুরেও ধর্ষণ ও যৌন হেনস্থার কথা শোনা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, গত দুমাসে পশ্চিমবঙ্গে নারী ও শিশু ধর্ষণ তথা যৌন হেনস্থার ভিডিও দেওয়া নেওয়া বেড়ে গেছে। এর মানে কী দাঁড়ায়? এরা প্রত্যেকেই তাহলে সম্ভাব্য ধর্ষক এবং শুধুমাত্র একটি ধর্ষণ বা খুনের ঘটনায় অভিযুক্তকে মৃত্যুদণ্ড দিলে ভবিষ্যতের ধর্ষকদের সামনে কোনো ভীতিপ্রদ দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যায় না। যে সমাজে হানি সিংয়ের মত জনপ্রিয় গায়ক ‘ম্যায় হুঁ বলাৎকারী’ গান গেয়ে বাহবা কুড়োতে পারেন, সেই সমাজের আবেগের তাড়নায় আদালত দায়িত্বজ্ঞানহীনের মত একজন অভিযুক্তের উপর মৃত্যুদণ্ড চাপিয়ে দিতে পারে না। অভিযুক্ত পুরুষ যে ধর্ষক হয়ে উঠেছে, তার জন্যে আমাদের সমাজও সমানভাবে দায়ী। তাই তিলোত্তমার ধর্ষণের বিচার এই ধর্ষক তৈরি করা ভারতীয় সমাজের কাছেও চাইতে হবে।

আরো পড়ুন পুলিসের কি মানবাধিকার নেই নাকি?

মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে বলার শেষতম কারণটা হল, যত ঘৃণ্য অপরাধই করে থাকুক, মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মত ক্ষমাহীন অবস্থান নেওয়া মানে অভিযুক্ত সংশোধনের ঊর্ধ্বে – এই সত্য স্বীকার করে নেওয়া। তাহলে জেলখানাকে সংশোধনাগার বলা বন্ধ করতে হবে। শিল্পী অলকানন্দা রায় জেলের কয়েদীদের নিয়ে যে পুনর্বাসনের প্রয়াস করেছেন, তাতে কিন্তু দেখা গেছে বহু খুনের আসামী সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলে আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতই আচরণ করেন। কয়েদীদের হাতে গড়া জিনিসের প্রদর্শনী হয় স্ট্র্যান্ড রোডে। সেদিকে যদি আমরা মন খুলে তাকিয়ে দেখি, তাহলে অপরাধের গহনে অপরাধীর পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি কতটা দায়ী তা মেনে নিতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আবার রবীন্দ্রনাথের থেকে ধার নিয়ে বলতে হয়, ‘যারা যে কারণেই হোক আইন ভেঙে অপরাধীর শ্রেণীতে গণ্য হয়েছে তাদের সম্বন্ধে এমন একটা সংস্কার বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে, তাদের প্রতি অমানুষিক ব্যবহার করতে মন বাধা পায় না। ধরে রেখেছি, তারা আমাদের মতো নয়; আর যারা আমাদের মতো নয় তাদের প্রতি আচরণ অত্যাচার হয়ে উঠলে সমস্ত সমাজেরই যেন সমর্থন পাওয়া যায়। সমাজের গূঢ় অন্তরে যে নির্দয় প্রবৃত্তি আছে তাই চরিতার্থ করবার উপলক্ষ্য হয়ে ওঠে এরা।’

আর শুধু রবীন্দ্রনাথ কেন? মার্কসবাদী রোজা লুক্সেমবার্গ থেকে মহাত্মা গান্ধী হয়ে মিশেল ফুকো পর্যন্ত আধুনিক মননের বহু দার্শনিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মৃত্যুদণ্ডের তীব্র নিন্দা করেছেন। দুই থেকে আড়াই হাজার বছর আগের মানবতাবাদী যিশুখ্রিস্ট ও বুদ্ধের মত ধর্মগুরু তথা সমাজসংস্কারকদের বাণীতেও অপরাধকে ঘৃণা করার কথা বলা আছে, অপরাধীকে সংশোধনের সুযোগ করে দেওয়ার উপদেশ রয়েছে।

তাহলে কি ধরে নিতে হবে যে আমরা আদতে তেমন আধুনিক হতে পারিনি? লুক্সেমবার্গ ১০০ বছরেরও বেশি আগে লিখেছিলেন, শাস্তির কঠোরতার মধ্যে ধনতন্ত্রের বঞ্চনা আর বর্বরতার অভিপ্রায় লুকিয়ে আছে, যা সত্যিকারের সমাজতান্ত্রিক দেশে বদল হওয়া উচিত। অথচ চীন মৃত্যুদণ্ড চালু রেখেছে। আসলে যুক্তি যখন কঠোর বিকল্প হিসাবে আসে, তখন হয়ত তা যৌক্তিকতার বহুমাত্রিক সম্ভাবনাকে এড়িয়ে এক স্থূল অথচ নিষ্ঠুর অবস্থানে অনড় থাকে। মৃত্যুদণ্ডের সপক্ষে যাবতীয় যুক্তি এই অবস্থানকেই সমর্থন করে। অপরাধের মাত্রা, বীভৎসতা এবং সামাজিক পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, মৃত্যুদণ্ড এমন এক বিকল্প যা ওইরকম স্থূল, এই দণ্ড দেওয়া মানে অনায়াসে সামাজিক দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলা। মজার কথা, বিভিন্ন ধর্মে আধুনিক যুগের বহু আগেই ক্ষমার কথা বলা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, ধর্ম যৌক্তিকতা ও আধুনিক যুক্তিবাদের চেয়ে এক্ষেত্রে অনেক বেশি যুক্তিগ্রাহ্য ও আধুনিক অবস্থান নিয়েছে। তাহলে বুদ্ধ, গান্ধী, রবীন্দ্রনাথের দেশে আমরা তেমন মানবিক ও যথার্থ যুক্তিবাদী অবস্থান নিতে পারছি না কেন?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.