বর্ণালী মুখার্জি

বামপন্থী শিবির আবার এক ভাঙনের মুখে। বহু কষ্টে সকলে কাছাকাছি এসেছিলেন গত দশ বছর ধরে। কিন্তু ২০২১ বিধানসভার ভোটের প্রক্রিয়ায় যথারীতি আবার সব লণ্ডভণ্ড। এটাই রীতি যে সরকার থাকা বা বিরোধী পক্ষে থাকা দক্ষিণপন্থী দলগুলির সাথে কমিউনিস্টদের সম্পর্কের সমীকরণ কেমন হবে, এই প্রশ্নের সমাধান করতে না পেরেই বারবার ভাঙন হয়। মতাদর্শগত বিতর্কের নামে যতই তা আড়াল করার চেষ্টা করি না কেন। সেই ট্র্যাজেডিরই পুনরাবৃত্তি হল, এবারেও। তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক কেমন হবে, তা বুঝতে না পেরে ভেঙে গেল বাম শিবির। নিশ্চয়ই বামপন্থীরা এই বিষাক্ত পরিবেশ থেকে খুব দ্রুতই বেরিয়ে আসবেন। কিন্তু তার বদলে, কে কাকে গদ্দার বলল আর কে কাকে দালাল বলল, এসবই শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাউটস্কিকে গদ্দার বলা হয়েছিল, আবার পরে তাদেরই সঙ্গে জোটও হয়েছে। কেউ একবারের জন্যও মুখ ফুলিয়ে বলেননি, আগে ক্ষমা চাও তারপরে জোট। পুনরায় কাছাকাছি আসার জন্য আত্মসমালোচনার শর্ত কেউ দিলেই তাকে সাবধান করুন। কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়বে যে! মনে আছে তো, তিনটে আঙুল তাক করা আছে নিজেদের দিকে।

২০১৯ সাল দিয়েই শুরু করা যাক। তখন বাম শিবিরের কোনও দলই ‘নো ভোট টু বিজেপি’ স্লোগান তোলেনি। তখন কি বিজেপি ফ্যাসিস্ট ছিল না? নাকি বাস্তব হল ২০১৮ সালের পঞ্চায়েতে তৃণমূলী স্বৈরতন্ত্রের পর কোনও বাম দলই ভাবতে পারেনি এই স্লোগান তোলার কথা? তাই কার্যত যখন পশ্চিমবাংলায় বিজেপির সাথে বামপন্থীদের অলিখিত জোট হচ্ছে, তখন একদিকে গদ্দার আর অন্যদিকে দালাল গালাগালে বঙ্গের আকাশ বাতাস মুখরিত হয়নি। ২০১৯ সালেও বিজেপি অক্সিজেন টেনেছে বাংলা থেকে। পশ্চিমবঙ্গে তাদের উত্থান ঘটছে বাম দলগুলির পরোক্ষ সমর্থনেই, এই বার্তা দেশ জুড়ে না ছড়ালে, বিজেপি এত আসন পেয়ে কেন্দ্রে ফিরত না। প্রতিবেশী রাজ্য থেকে তারা এখানে লোক এনে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা, আসানসোলে দাঙ্গা লাগানো থেকে শুরু করে নানা ধরনের অপকর্ম করেছে। সেই লোকগুলো ফিরে গিয়ে বিহার, ঝাড়খণ্ডে তাদের পার্টিকে উজ্জীবিত করেছে। অংকের হিসাবেও এই ১৮টা আসন খুবই গুরুত্বের ছিল। সেদিন কোনও বাম দলই যা ভাবতে পারেনি, তা আজও কেউ কেউ ভাবতে পারছে না, এটুকুই যা তফাত। লঘু করছি না সেই অপরাধ, কিন্তু তিনটে আঙুলের মধ্যে একটা উঠে গেল নিজেদের দিকে। এবার দ্বিতীয় আঙুলের দিকে চাওয়া যাক।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বিজেপি প্রধান বিপদ, এই কথা বলা মাত্র বাম শিবিরের একটা কোণ থেকে তীব্র আপত্তি উঠে আসছে। প্রশ্ন হল, আপত্তি হিসাবে যা যা আজ বলা হচ্ছে, সেই সব কুযুক্তি কি এই প্রথম শুনল বামপন্থী শিবির? নিশ্চয়ই নয়। ২০১৭ সালের আগে বহু বাম দলের মুখেই একই কথা শোনা যেত কংগ্রেস সম্পর্কে। বিজেপির বিরুদ্ধে কংগ্রেসের সাথে জোট বা তাদেরকে ভোট প্রসঙ্গে একই বুলি কি শুনিনি আমরা? কংগ্রেস আমাদের কর্মীদের খুন করেছে, কংগ্রেস দাঙ্গা করেছে, কংগ্রেস দুর্নীতিপরায়ণ, কংগ্রেসের হাত দিয়েই বিশ্বায়নের নীতি কার্যকর হয়েছে। এক কথায় তারাই বিজেপিকে ডেকে এনেছে ভারতে, তাই জোট বা ভোট চলবে না, এসব কথা কি আমরা কেউ শুনিনি? নাকি ২০১৭ সালের পরে বিজেপি ফ্যাসিস্ট হল? সত্যি কথা হল, আজও সেই বামপন্থী দলগুলি কংগ্রেসের সাথে জোট করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়নি। রাজ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। অথবা জোটে না যাওয়ার, স্রেফ ভোট দেওয়ার সুবিধাবাদী ও আত্মহত্যামূলক সিদ্ধান্ত। কেন আত্মহত্যামূলক, সে প্রসঙ্গে তিন নম্বর আঙুল বৃত্তান্তে আলোচনা করা যাবে। কিন্তু দুই নম্বর আঙুল বলছে আজ যে সব কুযুক্তি হাজির করে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে বিরোধী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হলো, সেগুলি অবিকল গতকাল, গত পরশু শোনা গেছে বহু বাম দলের মুখে। আর আগামীকাল যাতে আবার শোনা যায় তার সুযোগ রেখে দেওয়া হয়েছে সুচতুরভাবে। নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রমাণ পাওয়া যাবে না দলিল দস্তাবেজে। নিন্দুকেরা অভিযোগ করেন, ২০১১ সালে ছিল “নো ভোট টু সিপিআইএম”, কিন্তু তৃণমূলের সাথে জোটের বা তৃণমূলকে ভোট দেওয়ার কোনো প্রামাণ্য নথি নেই কোথাও! রাজ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তের প্রমাণও নেই। কারণ সম্ভবত এই, যে দিমিত্রভ ফ্যাসিস্ট সংকটে জোট করতে বলে গেছেন, আর সিপিএম ফ্যাসিস্ট নয়।

তিন নম্বর আঙুল বৃত্তান্তের ভূমিকা করেই ফেলা হল। “নো ভোট টু বিজেপি, নো জোট উইথ তৃণমূল”, এই অবস্থান আত্মহত্যামূলক। বিজেপিকে ভোট নয় আবার তৃণমুলের সাথে জোটও নয় — এই অবস্থান কোন দলের সুবিধা করে দিয়েছে? বলাই বাহুল্য, মমতা ব্যানার্জিকে বিজেপি বিরোধী ভোটের সমস্ত ফসল ঘরে তোলার সুযোগ করে দিয়েছে। “তৃণমূলকে ভোটও না, জোটও না” যারা বলছে আর “তৃণমূলকে ভোট কিন্তু জোট না” যারা বলছে তাদের, অর্থাৎ সমগ্র বাম শিবিরকেই মমতা ব্যানার্জির অনুগামীতে পরিণত করেছে। বিধানসভা ভোটে বিজেপিকে হারানো বামপন্থীদের প্রাথমিক ও প্রধান কাজ ছিল নিঃসন্দেহে, কিন্তু একমাত্র কাজ ছিল না। বামপন্থী শিবিরের দায়িত্ব ছিল বিজেপিকে হারিয়ে বামপন্থীদের ক্ষমতার ভাগীদার করা। এককভাবে পারা যেত না নিঃসন্দেহে, কিন্তু ক্ষমতার ভাগ দেওয়া যেত। তা করতে কেউ চেষ্টা করেনি। তৃণমূলকে যদি ভোট দেওয়া যায়, তবে জোট বা ক্ষমতার ভাগ কেন চাওয়া যাবে না? সব আসন তৃণমূলকে ভেট দেওয়ার এই ঐতিহাসিক অপরাধ চিরকাল মনে করাবে তৃতীয় আঙুল।

আজকাল বামপন্থীরা স্বীকার করতে রাজী নন যে হিটলারের উত্থানের জন্য শুধু সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরাই নয়, তারা নিজেরাও দায়ী। যদিও কিছু অতি মূর্খ আছেন যাঁরা আবার বুক ঠুকে বলেন ইউরোপে কমিউনিস্টরা যা করেছিলেন বেশ করেছিলেন। ফ্যাসিবাদ আসার আগে ফ্যাসিস্টদের রোখার দরকার নেই। এখনও ভারতে ফ্যাসিবাদ আসেনি, তাই আমরাও ইউরোপের পুর্বসূরীদের মতোই ফ্যাসিস্টদের রোখার জন্য “নীতি বিসর্জন” দেব না। ততোধিক মূর্খরা আবার তর্ক জোড়েন এই বলে, যে ভারতে ফ্যাসিবাদ এসে গেছে, তাই এখনই জোট করতে হবে! চলতে থাকে অবিরাম তর্ক, চুলচেরা বিশ্লেষণ, ফ্যাসিবাদ এসেছে না আসেনি! কিন্তু এই নন্দী ভৃঙ্গীদের বাদ দিলে আমরা সকলেই বুঝি, ১৯১৯ সাল থেকে ১৯৩৪ পর্যন্ত যা আমরা করেছি, তার ক্ষমা নেই। বিশেষত ১৯২৪ থেকে ১৯৩৪ সাল। এবং তার দায় শুধু কমরেড জিনোভিয়েভকে দিয়ে লাভ নেই। দিমিত্রভ যেদিন যুক্তফ্রন্টের তত্ত্বকে ফেরত আনলেন, সেটাও করলেন ১৯২২ সালের বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তকে উহ্য রেখে, এক আশ্চর্যজনক সুবিধাবাদী অস্পষ্টতা রেখে। তা-ও আমরা কমিউনিস্টরা নিজেদের ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত। কারণ আমরাই পেরেছি তত্ত্বে না হোক অন্তত বাস্তবে অস্পষ্টতাকে চূর্ণ করে ডান-বাম জোট গড়ে তুলতে, হিটলারকে ধ্বংস করতে। কমিন্টার্নও নিশ্চয়ই বুঝেছিল যে তারা ভুল করেছিল। সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্টদের মধ্যে ভোট ভাগ না হলে হিটলার ক্ষমতাতেই আসতে পারত না। আর ক্ষমতা ছাড়া কেউ ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে পারে না। সমাজতন্ত্রীরা তাদের মুখপত্রে ঘোষণা করেছিল যে হিটলার সাংবিধানিক পথে ক্ষমতায় আসছে, তাই সে অত বিপজ্জনক হবে না। এই অবস্থান অপরাধ হলে অপরাধী কমিউনিস্টরাও। যারা হিটলার ক্ষমতায় আসার সাত মাস পরেও বলেছে, যে হিটলারকে নিয়ে অযথা ভীতি সঞ্চার করছে সমাজতন্ত্রীরা! আসলে আমরা দলিল দস্তাবেজে সমাজতন্ত্র সাম্যবাদ নিয়ে যা লিখি তা নিজেরা বিশ্বাস করি না। তাই ভাবি, হিটলার মাইন কাম্ফে যা লিখেছিলেন, বা গোলওয়ালকার যা লিখেছেন, সেগুলোও আমাদেরই মত শুধু লেখার জন্য লেখা, বাস্তবে ওগুলো রূপায়িত হবে না। “পুঁজিবাদ আপাতত স্থিতিশীল হয়েছে”— এই অজুহাত দেখিয়ে ১৯২২ সালের যুক্তফ্রন্টের অবস্থান বদলানো হল ১৯২৪ সালে এসে। অথচ তার মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই, ১৯২৯ সালে পুঁজিবাদের চরম সংকট উপস্থিত হওয়া সত্ত্বেও যুক্তফ্রন্টের অবস্থানে ফেরত যাওয়া তো দূরের কথা, সমাজতন্ত্রীরা হয়ে গেলেন বিশেষণযুক্ত ফ্যাসিস্ট! সুতরাং সমাজতন্ত্রীরাই যখন ফ্যাসিস্ট তখন ইংল্যান্ড-আমেরিকাতে থাকা সরকারি দক্ষিণপন্থী সব দলই যে ফ্যাসিস্ট হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মনে রাখতে হবে, লেনিন এই যুক্তফ্রন্টের তত্ত্ব যদি ১৯১৮ সালে দিতেন, মেনে নেওয়া যেত যে সেটি ইউরোপের আশু বিপ্লবের কথা মাথায় রেখে তিনি হাজির করেছিলেন, কিন্তু তা নয়। “শিশুসুলভ বিশৃঙ্খলা” লেখার দুই বছর পরে, সোভিয়েত দেশের বৈদেশিক কূটনীতি চালু হওয়ার পরে, ইংল্যান্ড ও ইতালির সাথে কুটনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক চালু হওয়ার পরে তিনি যুক্তফ্রন্টের কথা বলেছিলেন। ভুল নয়, অপরাধ হয়েছিল কমিউনিস্টদের। তাই আজ পরস্পরের কাছে আত্মসমালোচনার শর্ত রেখে ঐক্যের কথা বলার আগে, দুবার আত্মসমীক্ষা করে নেওয়াই ভাল। তিনটে আঙুল কিন্তু তাক করা আছে নিজেদেরই দিকে।

তাই বলছিলাম, তিনটে আঙুলকে সাবধান। পরবর্তী কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ভুল শুধরানোর পন্থাতেই সকলকে ভরসা রাখতে হবে। বিজেপি এতটুকুও বিশ্রাম নিচ্ছে না। প্রতিটা ফাঁকফোকর দিয়ে আক্রমণ শানিয়েই যাচ্ছে। ২০২২ সালের উত্তরপ্রদেশের ভোট আর ২০২৪ সালের লোকসভা ভোট তাদের টার্গেট। মাথায় রাখতে হবে উত্তরপ্রদেশের বিজেপি অন্যান্য রাজ্যের মত মোদীনির্ভর নয়। ওখানে আছে সাক্ষাৎ শয়তান যোগী নিজেই। তাছাড়া পশ্চিমবঙ্গে যেমন বুদ্ধিজীবীদের কথার গুরুত্ব বিরাট, উত্তরপ্রদেশে তা নয়।

ইতিমধ্যেই দুটো সুযোগ পেয়েছিলাম আমরা, বাম শিবিরের ঐক্যকে নতুন করে গড়ে তোলার। সিবিআই ও আলাপন কান্ডে বামপন্থীদের পক্ষ থেকে যৌথ বিবৃতি দেওয়ার সুযোগ হারালাম। তবে সুযোগ আরও আসবে, বিজেপি থামবে না।

এক চূড়ান্ত ফ্যাসিস্ট রাজত্ব কায়েম করতে তারা মরিয়া। ফলে আগামী কর্মসূচি হিসেবে ২০২৪ সালের নির্বাচনকে পাখির চোখ করা ছাড়া কমিউনিস্টদের গত্যন্তর নেই। তৃণমূল কংগ্রেস সহ বিজেপি বিরোধী (খাঁটিত্বের বিচার না করে) সমস্ত দলকে ঐক্যবদ্ধ করার দায়িত্ব নিতে হবে বামপন্থীদেরই। একটা স্পষ্ট দ্বিমেরু রচনা করার দায়িত্ব এখন আমাদেরই নিতে হবে। যে স্পষ্ট দ্বিমেরুর মধ্যে দিয়েই আবার আমাদের বিকাশ ঘটবে।

~লেখিকা বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী, মতামত একান্ত ব্যক্তিগত। 

1 মন্তব্য

Leave a Reply