~অর্ক মুখোপাধ্যায়~

এই বছরের উচ্চমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক পরীক্ষা করোনার কারণে বাতিল হয়ে যাওয়ায় পরীক্ষার্থীদের মূল্যায়নের যে পদ্ধতি ঘোষণা করা হয়েছে তাতে নম্বরের ছড়াছড়ি হবে। আগে জানতাম যে হয়ত না পড়েও, চৌর্যবৃত্তি অবলম্বন করে (নকল করা, হল ম্যানেজ ইত্যাদির জোরে) কিছু ক্ষেত্রে ভালো নম্বর পাওয়ার উদাহরণ রয়েছে। দুর্নীতি অবলম্বন করে, পরীক্ষা ভালো না দিয়েও (এমনকি সাদা খাতা জমা দিয়ে) ভালো র‍্যাংক করেছে, এমন দৃষ্টান্তও অজানা নয় । স্কুল সার্ভিস কমিশনের মত বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় এরকম ঘটেছে বলে ভুরি ভুরি অভিযোগ আছে। অনলাইন পরীক্ষার নামে অনেক ক্ষেত্রে যে ওপেন বুক, নোট টোকা বা স্পেশাল গাইড সিস্টেমে পরীক্ষা চলছে, তাতে এই জিনিসের প্রবণতার বৃদ্ধি পাওয়া অবশ্যম্ভাবী।

তাই মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে নবম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার সঙ্গে ইউনিট টেস্টগুলোর গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল। উচ্চমাধ্যমিকের ক্ষেত্রে মাধ্যমিক, একাদশ শ্রেণি এবং দ্বাদশ শ্রেণির মূল্যায়ন দেখা হবে, তাহলে মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে অষ্টম শ্রেণি বাদ কেন? এমনও শোনা যায় যে মাধ্যমিকে ১০ নম্বরের ফর্ম্যাটিভ পরীক্ষায় বহু ইস্কুল স্রেফ রোল নম্বর অনুযায়ী নম্বর দিয়ে থাকে বা কোন কোন স্কুল গড় নম্বর দিয়ে দেয়। তাহলে পরিশ্রমী ও পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের সাথে তাদের অপেক্ষাকৃত অলস এবং অকৃতকার্য সহপাঠীদের পার্থক্য কী রইল? এইসব নম্বরের উপর বিচার করে মূল্যায়ন কখনো সঠিক হতে পারে?

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

উচ্চমাধ্যমিকের ক্ষেত্রে মাধ্যমিকে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া চারটি বিষয়ের ৪০% নেওয়া হচ্ছে। এখানে একটা প্রশ্ন আসতে বাধ্য। পরবর্তী সময়ে কলেজে ভর্তি বা কিছু কিছু চাকরির ক্ষেত্রে মাধ্যমিকের নম্বর এবং উচ্চমাধ্যমিকের নম্বরের জন্য আলাদা আলাদা ওয়েটেজ বরাদ্দ থাকে। সেক্ষেত্রে যে মাধ্যমিকে ভাল ফল করেছে, সে মাধ্যমিকের ওয়েটেজ বা শতাংশে এগিয়ে থাকবে এবং মাধ্যমিকের ভাল ফলের জন্য উচ্চমাধ্যমিকেও প্রাপ্ত নম্বর বেশি হবে। অর্থাৎ একটা পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে সে দুটো জায়গায় এগিয়ে থাকবে। আজকাল বিভিন্ন চাকরি বা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কি ভীষণ প্রতিযোগিতা! সেখানে একই ফলের জন্য দু জায়গায় এগিয়ে যাওয়া অন্যদের প্রতি অন্যায়।

আরো পড়ুন : পরীক্ষা বাতিল – অন্য কিছু করা যেত না?

একাদশ শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষার খাতা দেখার প্রক্রিয়া ঘিরে অনেক প্রশ্ন চিহ্ন আছে। বহু স্কুলেই খাতা দেখা হয় না, গড় নম্বর বসিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। অনেক স্কুলে নাকি খাতা না দেখে মাধ্যমিকের প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে আন্দাজে নম্বর বসিয়ে দেওয়া হয়। এমন পদ্ধতি কিন্তু করোনার কারণে চালু হয়নি। আবার অনেক স্কুলে কেবল এমসিকিউ দেখে তার উপর শতাংশের হিসাবে নম্বর দেওয়া হয় বলে শোনা যায়। মোট কথা প্রক্রিয়াটা ত্রুটিপূর্ণ এবং বিশ্বাসযোগ্য নয়। কটা স্কুলে ভাল করে খুঁটিয়ে খাতা দেখা হয় সন্দেহ। এর সাথে আছে স্কুলের শিক্ষকের কাছে টিউশন পড়লে বেশি নাম্বার পাবার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই একাদশ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার খাতার নম্বরের ৬০% নিতে হলে উচ্চমাধ্যমিক সংসদকে প্রথমে খাতাগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন হয়েছে কিনা তা সুনিশ্চিত করতে হবে।

এর পর যে প্রশ্ন আসে, তা হলে নবম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার ফল কারোর খারাপ হতে পারে। তাই উচ্চমাধ্যমিকের ক্ষেত্রে দশম, একাদশ ও দ্বাদশ নেওয়া হলেও মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে কেন শুধু নবম শ্রেণির বার্ষিকের ফল? কেন ইউনিট টেস্টগুলোর ফলাফল উপেক্ষিত? কেন অষ্টম শ্রেণি বাদ? ওই ক্লাস থেকেই তো মাধ্যমিকের সলতে পাকানো শুরু হয়। যাঁরা এই নীতি প্রণয়ন করছেন তাঁরা সবদিক ভেবেচিন্তে এই রাস্তা বাতলেছেন, নাকি চটজলদি সমাধান সূত্র খুঁজে দায় মুক্ত হতে চেয়েছেন, সেই প্রশ্ন উঠতে বাধ্য।জটিল এবং অবৈজ্ঞানিক যে সূত্র তাঁরা খাড়া করেছেন তার ফলে অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে পড়তে বাধ্য।

হ্যাঁ, অনেকই বলতে পারেন নম্বর কখনও যোগ্যতার সঠিক প্রমাণ হতে পারে না। কথাটি হয়ত যুক্তিযুক্ত। নম্বর সবসময় সব কিছু বিচার করতে পারে না। কিন্তু নম্বর নির্ভর পরীক্ষাব্যবস্থার থেকে উন্নততর কোনো ব্যবস্থা তৈরী না করেই তাকে সরিয়ে ভজঘট সমাধানও ফলপ্রসু হতে পারে না। বাস্তবসম্মতভাবে চিন্তা করলে, ভারতের মতন দুর্বল শিক্ষার পরিকাঠামো ও বিপুল জনসংখ্যাওয়ালা দেশে, নম্বর নির্ভর পরীক্ষাব্যবস্থার কোনো বিকল্প কোথাও এখনো রূপায়িত হয়নি। তাই আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা এবং চাকরির ব্যবস্থা নম্বর নির্ভর। নম্বরের উপর ভিত্তি করেই বহুলাংশে যোগ্যতা বিচার করা হয় । সেখানে কিন্তু নম্বরই উসেন বোল্ট বা মিলখা সিং।এই ব্যবস্থা কি সমস্ত প্রশ্নের উর্দ্ধে? একদমই নয়। কিন্তু কোথাও গিয়ে লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীকে খানিকটা সমতল খেলার মাঠ তো দিতেই হবে। একই অলিম্পিক ইভেন্টে আপনি উসেন বোল্টের জন্যে একরকম দৌড়ানোর ট্র্যাক, একরকম স্টপওয়াচ আর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্যে আরেকরকম দৌড়ানোর ট্র্যাক, অন্যরকম স্টপওয়াচ রাখতে পারেননা। এইভাবে নিয়মের ফাঁকতালে অন্য প্রতিযোগীদের হারিয়ে জয়ী হওয়া যেমন অন্যায়, নম্বরের ক্ষেত্রে এই ধরণের বন্টনও কিন্তু ভাবার বিষয়। এইভাবে নম্বর পাওয়া ছেলেমেয়েরা কিন্তু অন্য বছরের তুলনায় অনেক এগিয়ে থাকবে । কিছু কিছু ক্ষেত্রে নম্বরের বিধি নিষেধ সহজেই ছুঁয়ে ফেলবে। আমাদের সাধারণ ধারণা এবং নীতিবোধ আমাদের শেখায়, জীবনে সাফল্য পরিশ্রম, মেধা ও ভাগ্যের সমন্বয়। কিন্তু এরকম মূল্যায়ন ব্যবস্থায় প্রাপ্ত নম্বর আর পরিশ্রম বা মেধা দ্বারা অর্জিত থাকবে না। তা হয়ে যাবে ভাগ্য নির্ভর।

অর্থাৎ এই ধরনের মূল্যায়ন পদ্ধতি পরবর্তী বা পূর্ববর্তী ব্যাচের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে স্বাভাবিক বৈষম্য সৃষ্টি করবে। অনেকে বলবেন, সরকার বলেছে পরে পরীক্ষা নেবে। কিন্তু এর মধ্যেও ধোঁয়াশা রয়েছে । সরকার নির্দিষ্ট করে বলেনি ঠিক কবে নাগাদ পরীক্ষা নেওয়ার কথা চিন্তা ভাবনা করছে। মাধ্যমিক স্তরের ছাত্রছাত্রীরা বেশীরভাগই উচ্চমাধ্যমিকের পড়াশুনো শুরু করে দিয়েছে। ফলে তারা মাধ্যমিক দেবার মত অবস্থায় নেই। যদি সরকার নির্দিষ্ট করে বলে, তাহলে হয়ত তারা মাধ্যমিকের জন্য আবার প্রস্তুতি শুরু করতে পারে। সরকার এখনও বলেনি পরীক্ষার ফর্ম্যাট কী হবে ? যদি ধরে নিই, কেউ পরীক্ষায় বসবে, স্বাভাবিকভাবেই পরবর্তী সময়ে তার নম্বর যদি এই পদ্ধতিতে প্রাপ্ত নম্বরের সমমানে বলে ধরা হয়ে, তাহলে অন্যায় হবে। তার নিষ্ঠা, মেধা এবং পরিশ্রমের প্রতি অবিচার হবে।

উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও জটিল। তাদের প্রবেশিকা পরীক্ষা আছে। এই ফলের উপর নির্ভর করে বিভিন্ন কোর্সে ভর্তি হবার ব্যাপার আছে। স্বাভাবিকভাবেই সুনির্দিষ্ট আশ্বাস না দেওয়া হলে তারা পরীক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। আসলে সরকারও পরীক্ষা নেবার দায় নিতে চায় না, তাই ঢেলে নম্বর দেওয়ার এই ব্যবস্থা।

একটাই আশঙ্কা, মূল্যায়নের জায়গায় অবমূল্যায়ন না হয়ে যায়। আদর্শ ব্যবস্থায়, পিছিয়ে পড়া বা অপেক্ষাকৃত খারাপ ফল করা ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের পরিশ্রম ও সহৃদয় শিক্ষকদের থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাকে সম্বল করে কাঙ্খিত সাফল্য পাবে, এইটাই কাম্য। কিন্তু না পড়ে বা অল্প পড়ে নিয়মের কেরামতিতে বেশি নম্বর পেয়ে বেরিয়ে যাওয়া কিন্তু শিক্ষার একরকম অবমূল্যায়নই । ১৯৯২ ক্রিকেট বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল মনে আছে? ইংল্যান্ড বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা। বৃষ্টিবিঘ্নিত সেই ম্যাচে নিয়মের জাঁতাকলে ইংল্যান্ড জিতে যায়, কারণ দক্ষিন আফ্রিকার লক্ষ্য ১২ বলে ২২ থেকে কমে ১ বলে ২২ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ইংল্যান্ড ফাইনালে হেরেছিল।

লেখক সমাজকর্মী ও গৃহশিক্ষক।মতামত ব্যক্তিগত।

মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক – ছবি Wikipedia ও India Today website-এর সৌজন্যে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.