“The President has proclaimed an emergency. This is nothing to panic about. I am sure you are conscious of the deep and widespread conspiracy which has been brewing ever since I began to introduce certain progressive measures of benefit to the common man and woman of India. In the name of democracy it has been sought to negate the very functioning of democracy… the new emergency will in no way affect the rights of law-abiding citizen… that internal conditions will speedily improve to enable us to dispense with this proclamation as soon as possible.”

রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলি আহমদের স্বাক্ষরে ভারতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা হল ১৯৭৫ সালের ২৬শে জুন। দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হল। গ্রেপ্তার হলেন অসংখ্য মানুষ, (বেসরকারি হিসেবে পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি) এবং ৩০ জন সাংসদ। গ্রেপ্তার হলেন জেপি, পিলু মোদি, মোরারজি দেশাই, অশোক মেহতা, জ্যোতির্ময় বসু সহ বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্ব। আর, ৩০শে জুন সংশোধিত রূপে কার্যকরী হল মিসা- সাম্প্রতিক ইউএপিএ-র মতো এক ঘৃণ্য কানুন; এই কানুনে যে কোনও ব্যক্তিকে কোনও কারণ না দর্শিয়েই গ্রেপ্তার করতে পারে রাষ্ট্র। ২২শে জুলাই থেকে বলবৎ হল সংবাদপত্রের ওপরে বিধিনিষেধ। মাসের পর মাস বিধিনিষেধের কড়াকড়ি বেড়ে অবশেষে ১০ই ডিসেম্বর জারি হল রাষ্ট্রপতি-ডিক্রি, “the prevention of publication of objectionable matter” এবং এই ডিক্রির জোরেই সর্বশক্তিমান রাষ্ট্র আরও শক্তিশালী হল- যা কিছু খবর তার সার্বভৌমত্ব ও সংহতির প্রতি খতরনাক হতে পারে, তাকেই দমিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা পেল। গৌরকিশোর ঘোষ ‘পিতার পত্র’ নিবন্ধে লিখেছিলেন, “সরকার যেসব কথা শুনতে চাইবেন, শুধু সেসব কথা লিখতে হবে… সরকারের এই কাজকে আমি লেখকের অধিকারে অন্যায় হস্তক্ষেপ বলে মনে করি। আমি সেই অন্যায়ের প্রতিবাদ জানানোর জন্যেই মাথা মুড়িয়ে ফেলেছি।”- পরিণামে গ্রেপ্তার হতে হয় তাঁকে। সরকার বিরোধিতার সামান্য আভাস পেলেই সেই পত্রিকা বা সংবাদপত্রকে নিষিদ্ধ ক’রে দিত প্রশাসন। অথচ, আশ্চর্যের বিষয় এই যে, জরুরি অবস্থাতেই ২০ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন ইন্দিরা, ১লা জুলাই ১৯৭৫। আর, ওই ২০ দফা কর্মসূচির ঘোষিত লক্ষ্য ছিল মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, তপসিলি ও পিছড়ে বর্গ জনজাতির ক্ষমতায়ন, শহুরে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের উন্নতি এবং সামাজিক অপরাধের সংখ্যাহ্রাস। ১৯৭৭-র মার্চ থেকে ১৯৭৯-র আগস্ট অর্থাৎ, আড়াই বছরের জনতা পার্টির সরকার বাদ দিলে, কংগ্রেস যখনই ক্ষমতায় এসেছে ওই বিশ দফা কর্মসূচিকেই সম্পাদনা-সংশোধন ক’রে জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা করেছে. ১৯৮২, ১৯৮৬, ২০০৪ সালে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সরকারের ঘোষণাগুলি তারই সাক্ষ্য বহন করে। এই প্রসঙ্গে খেয়াল রাখা দরকার যে, প্রথমবার বিশ দফা কর্মসূচি ঘোষণা কালে কংগ্রেসের সমর্থক ছিল সিপিআই এবং ২০০৬ সালের ঘোষণায় বামফ্রন্ট ছিল ইউপিএ-র শরিক। আর, এও উল্লেখ্য যে, সংসদীয় দলগুলি আজও ওই বিশ দফা কর্মসূচির ‘জনমোহিনী’ নীতির বিকল্প খুঁজে না পেয়ে সেখানেই হাতড়েছে। কংগ্রেস অবশ্য বিশ দফা কর্মসূচির সফল রূপায়ণ চেয়েছিল তা নয়, কারণ তা হলে কংগ্রেসের ক্ষমতাভিত্তি জোতদার-উচ্চবর্গ-শিল্পপতিরা ক্ষেপে উঠত। বরং ১৯৭৬ সালে সঞ্জয় গান্ধী পাঁচ দফা কর্মসূচির ঘোষণা করলে, কংগ্রেস নেতৃত্ব তাতেই জোর দিতে থাকে। নিম্নশ্রেণি ও নিম্নবর্ণের ক্ষমতায়নের সম্ভাবনা ফের তলিয়ে যায় হরেক রঙের শাসক শ্রেণির আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ইন্দিরা যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন, তার সবচেয়ে বড় কারণ ছিল ক্ষমতা হস্তান্তরের পরে প্রথমবার কংগ্রেসের মৌরসিপাট্টা টালমাটাল হল ’৭০ দশকের মাঝামাঝি এসে। ১৯৭৫ সালের ১২ই জুন ইন্দিরা এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ে অভিযুক্ত হলেন নির্বাচনী দুর্নীতির দায়ে। বিচারপতি সিন্‌হার রায়ে রায়বেরিলী কেন্দ্রে ইন্দিরার নির্বাচনী জয় বাতিল হয়ে গেল, ফলে প্রধানমন্ত্রীত্ব থেকে পদত্যাগ ছাড়া অন্য উপায় রইল না তাঁর। এর ঠিক একদিন পরেই গুজরাত বিধানসভা নির্বাচনে জনতা ফ্রন্টের কাছে হেরে গেল ইন্দিরার কংগ্রেস, মুখ্যমন্ত্রী হলেন বাবুভাই প্যাটেল। জনতা মোর্চার এই সাফল্য ইন্দিরার রাজনৈতিক অহংয়ে বড় আঘাত দিয়েছিল ও জনতা মোর্চার উত্থান স্পষ্ট করে দিয়েছিল। ১৯৭৪ সালের জুন মাসে বিহারের ছাত্রছাত্রীদের মিছিলে নেতৃত্ব দিয়ে জয়প্রকাশ সরকার উৎখাতের ডাক দেন। আর, ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বরে গুজরাতের এলডি কলেজের ছাত্রছাত্রীরা হস্টেল-ফি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে ও সার্বিক ফি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলে অচিরেই তা ছাত্রছাত্রী সমাজের আন্দোলনে পরিণত হয়; আদি কংগ্রেস ও ভারতীয় জনসঙ্ঘের রাজনৈতিক ভূমিকায় ইন্দিরা কংগ্রেসের সরকারের (মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন চিমনভাই প্যাটেল) বিরুদ্ধে শ্রমিক-ছাত্রছাত্রী জোটবদ্ধ আন্দোলন গড়ে ওঠে। অরাজকতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ সরকারকে সরিয়ে গুজরাতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি ক’রে দেন ইন্দিরা। ১৯৭৪ সালে ইন্দিরার সরকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছিল জর্জ ফার্নান্ডেজের নেতৃত্বে রেলশ্রমিকদের ধর্মঘট। ১৯৭৫ সালের ২৬শে জুনে ঘোষিত জরুরি অবস্থা গণতন্ত্রের পক্ষে দুর্ভাগ্যজনক কিন্তু ইন্দিরার মতো অহংসর্বস্ব ও প্রচারকেন্দ্রিক রাষ্ট্রপ্রধানের থেকে অপ্রত্যাশিত ছিলনা।

১৯৬৭ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলে কংগ্রেস শাসনক্ষমতা পেলেও, বিরোধী দলগুলির উল্লেখযোগ্য উত্থান ঘটেছিল। কংগ্রেসের অভ্যন্তরে রক্ষণশীল বনাম উদারনৈতিকদের দ্বন্দ্বে আদি কংগ্রেস ও ইন্দিরা কংগ্রেস বিভাজন হয়ে যাওয়ায় সিপিআই তাদের নির্বাচনী ফায়দা তুলতে চেয়েছিল। ইন্দিরাকে ‘নিও কমিউনিস্ট’ ভেবেই হয়তো সিপিআই শ্রেণিঅবস্থান এবং সামাজিক অবস্থান ভুলে অর্হনৈতিক সংস্কারবাদে মজে গিয়ে ইন্দিরা-কংগ্রেসের সঙ্গে সংযুক্ত মোর্চা গড়ে তোলে। ১৯৭০ সালের কেরালা নির্বাচনে এই মোর্চা সিপিআইএমকে হারিয়ে ক্ষমতা দখল করে এবং সিপিআইয়ের অচ্যুত মেনন মুখ্যমন্ত্রী হন। “When the Ninth Congress of the CPI met (1971) in Cochin, Kerala, the party had a new vision of India’s future. Verbalizing that vision to the Congress, Achutha Menon, Kerala’s first CPI chief minister, said that the alternative to congress rule was not any unprincipled anti-Congress alliance with reactionary elements, but a coalition of all progressive forces, including those within the Congress Party.” কংগ্রেসের সাথে সংযুক্ত মোর্চায় আরএসপি জিতেছিল ৬টি আসন, সিপিআই ১৬টি এবং বিরোধীপক্ষে সিপিআইএম পেয়েছিল ২৯টি আসন। কেরালা মডেল (কংগ্রেস, সিপিআই, আরএসপি, প্রজা সোস্যালিস্ট পার্টি, কেরালা কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের মোর্চা) সেই সময় সিপিআইয়ের আদর্শ মডেল হয়ে উঠেছে; কিন্তু, তাতে শ্রেণির প্রশ্ন কোথায়? রক্ষণশীল কেরালা কংগ্রেস আর মুসলিম লিগের থেকে তৎকালীন যুব কংগ্রেস ও সিপিআই কিছু প্রগতিশীল ভূমিকা রাখতে চেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু পার্টির নবম কংগ্রেসে ঘোষণা হয়ে গেল প্রগতিশীল দক্ষিণপন্থী ও বামপন্থীদের মিলিত সরকার তৈরি করার লক্ষ্য। কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে জাতীয়তাবাদী ও জাতীয় বুর্জোয়াদের জগাখিচুড়ি পাকিয়ে দেশের ক্ষমতালাভের দিবাস্বপ্নে সিপিআই যতই ডুবে থাকুক, কংগ্রেস অন্ততঃ ওই বকচ্ছপ জোট থেকে ফায়দার সন্ধান পায়নি। কারণ, ’৭০ দশকের শুরুতে সংসদীয় বামদলগুলির থেকেও কংগ্রেসের বেশি দুশ্চিন্তা ছিল আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং গোঁড়া দক্ষিণপন্থী দলগুলিকে নিয়ে। ইন্দিরা-কংগ্রেস ও সঞ্জয় গান্ধীর নেতৃত্বাধীন যুব কংগ্রেসকে নিয়ে সিপিআইয়ের আশা এত প্রবল ছিল যে, উগ্র দক্ষিণপন্থী ও প্রতিক্রিয়াশীল দলগুলির বিরুদ্ধে ইন্দিরার সরকারকে সর্বাত্মক সমর্থন দিতেও তাই বাধেনি তাদের, এমনকি সেই মুহূর্তে ইন্দিরার থেকেও জয়প্রকাশ ও জয়প্রকাশের আন্দোলনকে ‘প্রধান শত্রু’ বলে চিহ্নিত করেছিল তারা। আর, কংগ্রেস দলে ১৯৬৯-র ভাঙনের পরে সিপিআইয়ের সমর্থন নিয়ে কেরালায় যেভাবে সংযুক্ত মোর্চা হয়েছিল, সেই মডেলেই দেশে দক্ষিণ-বাম মিশেলের ‘প্রগতিশীল’ সরকার গড়তে চেয়েছিল সিপিআই; তাই, জেপির আন্দোলনের বিরুদ্ধে ইন্দিরাকে সমর্থন দিলে ভবিষ্যতের ক্ষমতা সুনিশ্চিত হবে তথা ইন্দিরার সুনজরে থাকা যাবে, এমন দুরাশা করেছিল তারা। স্বৈরতন্ত্রী ইন্দিরার চাপিয়ে দেওয়া জরুরি অবস্থাকে নির্দ্বিধায় সমর্থন জানিয়েছিল তাই। গণতন্ত্রের প্রবল দুর্দিনে ১৯৭৬ সালেও মোহিত সেন তাই উল্লসিত ছিলেন কংগ্রেস-সিপিআই জোট নিয়ে ও ইন্দিরা সরকারের আর্থ-সামাজিক সংস্কারের বিষয়ে। প্রায় সওয়া দু’লাখ পার্টিকর্মী নয়া অর্থনৈতিক কর্মসূচিগুলির সপক্ষে প্রায় ৪৪,০০০ গ্রামে প্রচার করেছে বলে গর্বিত রিপোর্ট পেশ করেছিল সিপিআই। আর, জরুরি অবস্থার সময়ে কংগ্রেস-সিপিআই জোটের ফলে পার্টিতে দু’লাখ সদস্যপদ বেড়েছিল বলেও জানায় তারা। ‘মাস্‌ কমিউনিস্ট পার্টি’ তৈরির এক আত্মঘাতী আকাশকুসুমে মজে গিয়ে সঞ্জয় গান্ধীর জনবিরোধী প্রকল্পগুলিতেও বিশ্বাস করতে শুরু করে সিপিআই। অক্টোবর ১৯৭৬ সালে পার্টির তরফে কংগ্রেসের সঙ্গে ‘সম্পর্কে চির ধরলেও প্রেম অটুট’ জাতীয় রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। কিন্তু, ১৯৭৬ সালের শেষের দিকে কংগ্রেস তার মতাদর্শগত নীতি মেনেই কমিউনিস্ট মতাদর্শকে আক্রমণ শানায় ও ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলনে (১৯৪২)’ কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা খুঁচিয়ে তোলে; এরই সঙ্গে সঞ্জয়-ইন্দিরা জুটির স্বৈরতান্ত্রিক দাপট এবং কুড়ি দফা ও পাঁচ দফা কর্মসূচির পক্ষে (সঞ্জয়ের ঘোষিত নীতি) জবরদস্তি সম্মতি আদায়ে ইন্দিরা তাঁর বক্তব্যে সিপিআইয়ের ‘আনুগত্য’ নিয়েই প্রশ্ন তুলে দেন! ১৯৭৬-র নভেম্বরে সঞ্জয় গান্ধী, অম্বিকা সোনি, পঙ্কজ ব্যানার্জ্জীদের দাপটে সিপিআই প্রবল নীতসংকট ও দিশাহীনতায় ভুগতে শুরু করে। কুট্টির কার্টুনে দেখা যায় সঞ্জয় অম্বিকাদের নামে জয়ধ্বনি লেখা লিফলেট উড়ছে আর চিড়িয়াখানায় নিঃসঙ্গ গণ্ডার হয়ে বসে আছে সিপিআই। ফলে ১৯৭৭-র শুরুতেই সিপিআইয়ের কেন্দ্রীয় কমিটিকে আলোচনায় বসতে হয় ইন্দিরা কংগ্রেসের সঙ্গে জোট রাখা নিয়ে! আশ্চর্য এই যে, ডাঙ্গে ও কৃষ্ণনরা তখনও কংগ্রেসের সঙ্গে ভৃত্যসুলভ আনুগত্যের সম্পর্কের পক্ষপাতী! ভূপেশ গুপ্ত ও রাজ্যেশ্বর রাওরা ততদিনে নীতিগত ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। বিহারের রাজ্য কমিটি ততদিনে কংগ্রেস-বিরোধী মতামত স্পষ্ট ক’রে দিয়েছে, অবশ্যই তার একটা বড় কারণ বিহারে জয়প্রকাশের জনপ্রিয়তা ও সার্বিক কংগ্রেসবিরোধী হাওয়া। কেরলে তখনও রাজ্যকমিটি গদির লোভে কংগ্রেসের সঙ্গে গাঁটছড়ায় আগ্রহী, যদিও নিচুতলায় অসন্তোষ প্রবল। আর, বাংলায় রাজ্যকমিটি সিপিআইএমের সঙ্গে ফ্রন্ট গড়ার কথা ভাবছে; বাংলায় ’৭২ সালের নির্বাচনের পরেই সিপিআইএম কংগ্রেসকে ‘আধা ফ্যাসিস্ত’ ঘোষণা ক’রে দিয়েছে। ১৯৭৭ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময়ও ডাঙ্গেদের দোদুল্যমানতা প্রবল। তাদের নির্বাচনী ইস্তেহারে জরুরি অবস্থার সমালোচনার থেকেও প্রাধান্য পেল কংগ্রেসবিরোধী শক্তিগুলির বিরুদ্ধে আক্রমণ। ১৯৭৮ সালে ভাতিণ্ডা সম্মেলনে রাজ্যেশ্বর রাওদের নীতিকৌশলের লাইন সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে হয়তো সিপিআই-কংগ্রেস বিচ্ছেদ ঘটত না! বাংলার এক রাজনৈতিক ঔপন্যাসিক দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বিবাহবার্ষিকী (১৯৭৭)’ উপন্যাসে এই দ্বিধাদীর্ণ রাজনীতি আখ্যায়িত করেছেন। নিজে সিপিআইয়ের সর্বক্ষণের পার্টিকর্মী হয়েও জরুরি অবস্থা, সিপিআইয়ের অবস্থান ও সিপিআইএমের ভূমিকা নিয়ে লিখেছেন; উপন্যাসের প্রোটাগনিস্ট মণিমোহন অসংখ্য সিপিআই কর্মীর প্রতিনিধি যারা নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

কিন্তু, সিপিআইয়ের নেতারা বোঝেননি যে, জরুরি অবস্থাকে সমর্থন জানানো মানে ভারতীয় বামপন্থার পিঠে ছুরি মারা। সংসদীয় বামপন্থী ও অসংসদীয় বামপন্থীরা উভয়েই ইন্দিরার নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। শুধুমাত্র নিজেদের বৃহত্তম সংসদীয় বামদল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার স্বার্থপরতায় সিপিআই নেতৃত্ব দীর্ঘ এক দশক মতাদর্শগত সমস্ত নীতি বিসর্জন দিয়েছিল। ১৯৬২ থেকেই সিপিআই শ্রেণিসংগ্রামের তত্ত্বানুশীলন থেকে সরতে থাকে, সোভিয়েত বনাম চিন দ্বন্দ্ব তা আরও বেশি প্রকট ক’রে তোলে। জরুরি অবস্থার মতো ঘৃণ্য পদক্ষেপে সমর্থন সিপিআইকে আশু ফায়দা জোগালেও, তাতে দীর্ঘস্থায়ী ভরাডুবির পথ প্রশস্ত হয় তাদের। ১৯৭৭ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিহার, মণিপুর, ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গে একটিও আসন পায়নি তারা। তবে, সিপিআই সেইসময় একটা রাজনৈতিক বিষয় ঠিক অনুধাবন করেছিল- “The [1971] rightist ‘grand alliance’ has now appeared in the garb of the Janata Party and is posing a new danger which must be fought.” জেপি তথা জয়প্রকাশের নেতৃত্বে ১৯৭৭ সালের শুরুতেই জনতা পার্টি আত্মপ্রকাশ করেছিল। যদিও, তার প্রস্তুতি সত্তর দশকের শুরু থেকেই চলছিল। উগ্র দক্ষিণপন্থী ও হিন্দুত্ববাদী দলগুলির প্রভাব প্রথম থেকেই বেশি ছিল, জয়প্রকাশ মারা যাওয়ার পরে হিন্দুত্ববাদী দলগুলি জনতা পার্টির দখল নেয়, ১৯৮০ সালে গড়ে ওঠে ভারতীয় জনতা পার্টি। কিন্তু, এই হিন্দুত্ববাদী যাত্রাপথের সূত্রগুলি কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিল সিপিআই; এখানেই সিপিআইএমের ব্যর্থতা। ১৯৮০-র দশক থেকে হিন্দুত্ববাদী উগ্রতা আর বিজেপির বাড়বাড়ন্তের দায় তাদের ওপরেও কিছুটা বর্তায়- কংগ্রেসবিরোধী জোটের কৌশলে মতাদর্শ ও নীতি ভাসিয়ে দেওয়ার ব্যর্থতা, দক্ষিণপন্থার রাজনীতিকে বিশ্লেষণ না করতে পারার দায়। কীভাবে?

১৯৭০-র দশক মুক্তির দশক হতে পারেনি। ইন্দিরা হয়ে উঠেছিলেন ‘এশিয়ার মুক্তিসূর্য’! সত্তর দশকেই ভারতের প্রথম পরীক্ষামূলক পরমাণু বিস্ফোরণ (১৯৭৪), সিকিমের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে ভারতের অঙ্গরাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায় (১৯৭৫), সোভিয়েতের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় (১৯৭১), কাশ্মীরে শেখ আবদুল্লার সরকার ক্ষমতাসীন হয় (১৯৭৫), আর্যভট্ট উপগ্রহ উৎক্ষেপণ হয় (১৯৭৫), বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে সফল সম্প্রসারণবাদী হস্তক্ষেপ (১৯৭১)- ইন্দিরাকে তাঁর অনুগামীরা ‘প্রিয়দর্শিনী’ আখ্যায়িত করল! প্রায় চার দশক পেরিয়ে জোট-ভোটের দায়রক্ষায় সংসদীয় বামেরাও এই বয়ান প্রচার করতে শুরু করল। আর, এই ‘প্রিয়দর্শিনী’ মুখোশের আড়ালে জরুরি অবস্থা জারির পাশাপাশি আরও কয়েকটি উল্লেখ্য বিষয়- জরুরি অবস্থার সময় ইন্দিরা শ্রমিকদের বোনাস বন্ধ ক’রে দিয়েছিলেন ও সমস্ত শ্রমিক প্রতিবাদের কর্মসূচি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। ১৯৭০-৭১ সালে সারা ভারতের কৃষিশ্রমিকদের গড় মজুরি ছিল ২.৮৭ টাকা (মধ্যপ্রদেশে সবচেয়ে কম- ১.৬৮ টাকা)। জমিসম্পর্ক ও উৎপাদন সম্পর্কের শোষণ অব্যহত ছিল। বেঠবেগারী, ক্ষেতমজুরের ওপরে শোষণ, বর্গাদারের ওপর জোতদারের জুলুম সবই চলছিল। সঞ্জয় গান্ধীর প্রত্যক্ষ নির্দেশে দিল্লি প্রায় ৭ লাখ বস্তিবাসীকে বাস্তুচ্যুত করা হয়েছিল জরুরি অবস্থার ২১ মাসের সময়কালে। দিল্লি উন্নয়ন পর্ষদ ও দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর কার্যত সঞ্জয়ের হাতের পুতুল হয়ে গেছিল। ১৯৭৬ সালের ১৮ই এপ্রিল দিল্লির আসিফ আলি রোডের তুর্কমান গেটের বস্তি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হল, অসংখ্য মানুষ হতাহত হলেন, প্রশাসনিক নির্দেশে রাতারাতি গায়েব হয়ে গেলেন অনেক মানুষ। মুসলমান অধ্যুষিত বসতি লোপাট করার সময় দিল্লি উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান জগমোহনকে তাঁদের পুনর্বাসনের কথা জিজ্ঞেস করা হলে জগমোহন বলেছিলেন, “Do you think we are mad to destroy one Pakistan to create another Pakistan?” এই জগমোহন প্রায় কুড়ি বছর পরে বিজেপির প্রার্থী হয়ে সাংসদ হয়েছিলেন। ১৯৭০-র দশকের শুরুতে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের খতম করতে ইন্দিরা পরিচালিত রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্দেশ দিল ‘ঊড বি ফট ট্যু দি ফিনিশ’। নকশালবাড়ি-শ্রীকাকুলাম কৃষিবিপ্লব দমনের জন্যে কুখ্যাত রাষ্ট্রীয় নির্দেশে দেশজুড়ে পরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যা সংঘটিত করল পুলিশ, আধাসেনা ও বিভিন্ন রাজ্যের ক্ষমতাশালী সংসদীয় দলগুলি। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় এবং ইন্দিরার যুগলবন্দী শুধু কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের হত্যা করল না, বরং গণতন্ত্র হত্যার ছকও সাজিয়ে নিল- সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের সাজানো নীলনকশায় জরুরি অবস্থা বলবৎ করেছিলেন ইন্দিরা! আর, বাক্‌স্বাধীনতা হরণ এবং যে কোনও ছুতোয় যে কাউকে গ্রেপ্তার ও ভুয়ো সংঘর্ষে হত্যা সত্তর দশকের রোজনামচা ছিল। ইন্দিরাকে ‘প্রিয়দর্শিনী’ ডাকার আগে, কংগ্রেসকে গণতান্ত্রিক অ মেহনতী-দরদী বলার আগে বামপন্থীরা অন্ততঃ এই তথ্যগুলি মনে রাখলে ভাল হয়।

ইন্দিরা গাব্ধীর একমাত্র সর্বভারতীয় বিরোধী সেই সময়ে ছিলেন জেপি, জয়প্রকাশ নারায়ণ। জেপি এমন এক স্থিতিস্থাপক ব্যান্ড এবং ব্র্যান্ড হয়ে উঠেছিলেন সত্তর দশকে, যাঁর আহ্বানে রক্ষণশীল হিন্দুত্ববাদীরা যেমন আরএসএস, জনসঙ্ঘ, আনন্দ মার্গ এবং ব্র্যাকেটে মার্ক্সবাদীরা একসঙ্গে জুড়ে যেত কংগ্রেসের বিরোধিতায়। ১৯৭৪ সালে বিহারের ছাত্র-আন্দোলন থেকে জেপি এক নতুন ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। গণতন্ত্রের মেসিহা। ক্ষমতা-হস্তান্তর পরবর্তী ভারতে কংগ্রেসের রাজনীতির পৃষ্ঠপোষক ছিল জোতদার-মহাজন ও মুৎসুদ্দি বেনিয়ারা। ’৫০-’৬০-র দশক জুড়ে খাদ্য আন্দোলন, মূল্যবৃদ্ধি, মজুতদারি, কৃষিসমস্যা এবং আর্থ-রাজনৈতিক অস্থিরতা নির্বিত্ত-নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্তের সংকট ঘনীভূত করেছিল। ষাটের শেষে ও সত্তরের শুরুতে নকশালবাড়ি-শ্রীকাকুলাম কৃষিবিদ্রোহ ও সেই মতাদর্শে উজ্জীবিত শ্রমিক আন্দোলন সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়লে নৃশংস দমনপীড়নের পথ বেছে নিল ভারতরাষ্ট্র। দ্রোহকে তরলীভূত করার আরেকটা উপায় ছিল- সংসদীয় বামপন্থার সেফ্‌টি ভালভ্‌ দিয়ে সমাজের নিচুস্তর থেকে উঠে আসা সমস্ত ক্ষোভ প্রশমিত ক’রে দেওয়া। জয়প্রকাশ নারায়ণ দীর্ঘদিনের গান্ধীপন্থী এবং প্রবীণ অভিজ্ঞ নেতা। দেশের বৃহত্তর জনগণের ক্ষোভ কোন পথে ঘুরিয়ে দেওয়া যায় এবং পুঁজিবাদী উদারনৈতিক মতাদর্শ দিয়ে শ্রমিক-কৃষকের ক্ষোভকে আপসের কানাগলিতে নিয়ে যাওয়া যায় সেইসব জেপি খুব ভাল জানতেন তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায়। দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় জেপি সম্পর্কে লিখছেন, “যিনি ভারতে আয়ুব খাঁর বেসিক ডেমোক্রেসির পক্ষে ওকালতি করেন এবং সাতষট্টি সালে রাজ্যে রাজ্যে যুক্তফ্রন্টের বিজয় অভিযানে বেসামাল হয়ে বলে ফেলেন একমাত্র ডিকটেটরশিপই বামপন্থার বিপদকে ঠেকাতে পারে, মাত্র সেদিন যিনি বলেছেন জনসংঘ যদি ফ্যাসিস্ট হয় তাহলে আমিও ফ্যাসিস্ট” ১৯৭৪ সালে বিহারে প্রশাসনিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই থেকে শুরু হয় ‘জেপি আন্দোলন’, যা এখনও পর্যন্ত ক্ষমতা হস্তান্তরোত্তর ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় দক্ষিণপন্থী আন্দোলন। ১৯৭৪ সালের নভেম্বর মাসে এক বৈঠকের পরে ইন্দিরা ও জেপির সম্পর্ক সাপে-নেউলে হয়ে ওঠে এবং জেপি এরপরেই সর্বশক্তি নিয়ে চেষ্টা করেন ইন্দিরাবিরোধী সংসদীয় দলগুলিকে একজোট করার। ১৯৭৫-র ৬ই মার্চ প্রায় ১ লক্ষ অনুগামী নিয়ে জেপি সংসভবন অভিযান করে দাবিসনদ পেশ করেন। জেপি ভারতীয় রাজনীতিতে সম্ভবতঃ প্রথম আমদানি করেন ‘পার্টিলেস ডেমোক্র্যাসি’-র ধারণা। সাম্প্রতিক কালে উত্তরাধুনিক মতাদর্শের প্রভাবে কাঠামোহীন দল, সকলেই স্বাধীন, গণতান্ত্রিকতাই দলীয় নীতি ইত্যাদি ফাঁপাকথা শোনা যায় খুব; কিন্তু, ১৯৭৫ সালে জেপিই প্রথম সর্বভারতীয় স্তরে এই কথাগুলি বলে ‘শান্তিপূর্ণ সর্বাত্মক বিদ্রোহে’র ডাক দিয়েছিলেন। আদতে ওই সর্বদলীয় বহুরং ছাতার তলায় মূল মাথা জেপি হলেও, হিন্দুত্ববাদী দক্ষিণপন্থী মতাদর্শই ছিল প্রধান। আরএসএস, জনসঙ্ঘের মতো দলের পাশাপাশি স্বতন্ত্র পার্টি, ভারতীয় লোকদল, সংযুক্ত সোশ্যালিস্ট পার্টি ও সিপিআইএম জেপি আন্দোলনের প্রচারক সমর্থক ছিল। আর, এই দলগুলির সিংহভাগই হিন্দুত্ববাদে বিশ্বাসী ও সাম্যবাদ বিরোধী। রাজাগোপালাচারীর নেতৃত্বে স্বতন্ত্র পার্টি তৈরিই হয়েছিল কংগ্রেসের অভ্যন্তরে সমাজতন্ত্রী নীতিগ্রহণের বিরোধিতা ক’রে। ১৯৮০ সালে জনসঙ্ঘ এই মহাজোটকে মতাদর্শগতভাবে জিতে নিয়ে বিজপিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়; আর, তার পরের দশক থেকে বিজেপি-আরএসএসের অ-হিন্দু নিধন, সাম্প্রদায়িকতা এবং ফ্যাসিস্ত প্রবণতা সকলেরই জানা। কিন্তু, এই বৈশিষ্ট্যগুলি তো তাদের মধ্যে আগেও ছিল, জয়প্রকাশেরও প্রকাশ্য সমর্থন ছিল এদের প্রতি। তা সত্ত্বেও সিপিআইএমের সঙ্গে এদের রাজনৈতিক সখ্য গড়ে ওঠে সত্তর দশকের শুরু থেকে। ১৯৭৫ সালের ২২শে মে ‘গণশক্তি’তে প্রমোদ দাশগুপ্তর স্বাক্ষরিত বিজ্ঞাপন বেরোয় জয়প্রকাশ ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত মিছিলে রাজ্য সিপিআইএমের সমস্ত সদস্য-সমর্থককে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে। আর, সেই আহ্বানের উল্লেখযোগ্য দু’টি বাক্য- ‘শাসক-কংগ্রেস বিরোধি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের আহ্বানে’ এবং “এই মিছিলে কোনো দলীয় পতাকা ও ফেস্টুন থাকবে না”। জয়প্রকাশের লাইন কার্যত শিরোধার্য ক’রে নেয় সিপিআইএম। কোনও শ্রেণিনীতির অনুশীলন নয়, জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের মহড়াও নয়- তৎকালীন সিপিআইএমের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল জয়প্রকাশের জনতোষী নীতির শরিক হয়ে সর্বভারতীয় স্তরে হারানো ভোটবাক্স পুনরুদ্ধার করা। ‘নো পাসারন’ প্রবন্ধে দীপেন্দ্রনাথ এই পতাকাহীন মিছিলের প্রবল সমালোচনা করেন এবং ‘বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের’ মুখোশের আড়ালে থাকা কমিউনিস্ট-বিরোধী শ্রমিক-কৃষকবিরোধী মুখগুলিকে চিহ্নিত ক’রে দেন (প্রফুল্ল সেন, সুশীল ধাড়া, পিলু মোদি প্রমুখ)। কিন্তু, এই সমস্যা শুধু রাজ্য সিপিআইএমের নয়। জনসঙ্ঘ ও আরএসএসের স্বরূপ চিনতে রাজনৈতিক ব্যর্থতা ছিল তাদের কেন্দ্রীয় কমিটিরও। স্বৈরতান্ত্রিক ইন্দিরার বিরোধিতা অবশ্যকর্তব্য কিন্তু ফ্যাসিপ্রবণ আরএসএসের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ‘ব্যক্তি স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার’ খুঁজতে চাওয়াও কোনও কাজের কথা নয়। সংশোধনবাদের অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে পার্টির সাধারণ সম্পাদক সুন্দরাইয়া এই আরএসএস ও জনসঙ্ঘের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ভবিষ্যবিপদ আঁচ করেছিলেন। ১৯৭৫ সালে তাঁর পদত্যাগপত্রে পার্টির নীতিগত ব্যর্থতা (মূলত ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন ও কৃষক সমস্যার ক্ষেত্রে) উল্লেখের পাশাপাশি পদত্যাগের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন, “My resignation is due to the fact that the CC majority has decided for joint actions with pro-imperialist Jana Sangh with para-military fascist (storm-trooper like RSS) as its core in the name of fighting emergency, which I consider very harmful for our party; both among democratic masses in our country and abroad, we will be getting isolated from the anti-imperialist and socialist forces.” এর একটা বিশদ ব্যখ্যাও রাখেন সুন্দরাইয়া। ভারতীয় লোকদল, স্বতন্ত্র পার্টি ও জনসঙ্ঘের পার্টিচরিত্র ও শ্রেণিদৃষ্টিভঙ্গির ব্যাখ্যায় তিনটিকেই আদি কংগ্রেসের সমশ্রেণিভুক্ত করেন যারা জোতদার-বুর্জোয়ার স্বার্থরক্ষা করে এবং শ্রমিক-কৃষকদের বিরোধী। আর, জনসঙ্ঘকে সাম্রাজ্যবাদপন্থী, উগ্র-হিন্দুত্ববাদী এবং কমিউনিস্ট-বিরোধী হিসেবে ব্যখ্যা করেন। কিন্তু, দেশজুড়ে ইন্দিরাবিরোধী জোটে সিপিআইএমের সক্রিয় যোগদানে সমর্থন দেয় কেন্দ্রীয় কমিটি। জনসঙ্ঘ, আনন্দ মার্গীদের গোঁড়া হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের সঙ্গে জোটকে আঁকড়ে ধরার গোঁড়ামিতেই অনড় থাকে তারা। কারণ, একবার ইন্দিরাকে ক্ষমতা থেকে সরানো গেলে জেপির নেতৃত্বে যে ক্ষ্মতাকেন্দ্র তৈরি হত, তাতে লাভের গুড়ের প্রত্যাশা ছিল তাদের। বিশেষতঃ সাংসদ জ্যোতির্ময় বসুর বিরুদ্ধে সুন্দরাইয়ার অভিযোগ ছিল আরও নির্দিষ্ট- “He [Jyotirmoy Basu] used the position and inspite of repeated warnings, he continued his public statements and parliamentary activities in such a way as to create an impression in public that there is in effect an united opposition bloc from Jana Sangh to CPI (M) in the parliament. His latest act was his attending the meeting of the leaders of Janata Front as an “Observer” on behalf of our party, CPI (M), some time on June 16th 1975 or so.” কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশ অমান্য করেই জ্যোতির্ময় বসু জনতা ফ্রন্টের সঙ্গে বারবার মিটিংয়ে যান এবং উগ্র দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদীদের সঙ্গে পার্টির সখ্য গড়ে তোলেন। সিপিআইএম কেন্দ্রীয় কমিটি যে আরএসএস ও জনসঙ্ঘের প্রতি পূর্বে গৃহীত কঠোর নীতিগত অবস্থান থেকে সরে এসে নীতিগত আপসের রাস্তায় মেহনতী জনতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে, এমন আভাস পেয়েছিলেন। কিন্তু, এই সমালোচনার ফলেই কি সুন্দরাইয়া অপরাধমুক্ত হয়ে যান? ’৬০ দশকের শেষ থেকে সিপিআইএমকে ক্রমেই আরও সংশোধনবাদী পথে নিয়ে যান সম্পাদক সুন্দরাইয়া এবং ’৭৫ সালে পদত্যাগের আগে অবধি অন্ততঃ ঘোষিত ‘জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব’-এর পথে পার্টিকে দিশা দেখাতে পারেননি। ট্রেড ইউনিয়ন কিংবা ভূমিহীন ক্ষেতমজুরদের সমস্যাগুলিকে দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের অভিমুখে চালিত করতে পারেননি। ১৯৭০-র দশকে কংগ্রেস যখন আইনরক্ষার নামে নকশালপন্থী কমিউনিস্টদের একের পর খুন করেছে তখন পশ্চিমবঙ্গে, অন্ধ্রপ্রদেশে, কেরলে এবং অন্যান্য রাজ্যে সিপিআইএম ও সিপিআইয়ের নীরব (কখনও সক্রিয়) সমর্থন আদতে দক্ষিণপন্থার ভিত শক্ত করেছে। আর, কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিই যদি হিন্দুত্ববাদী ও উগ্র দক্ষিণপন্থীদের সঙ্গে জোটে সায় দেয়, বুঝতে হয় সেই পার্টির রাজনৈতিক লাইনই ভুল- সংসদীয় আসন সমঝোতা ছাড়া আর কোনও অভিমুখ তার নেই। দীপেন্দ্রনাথের উপন্যাসে সিপিআইয়ের মণিমোহন সিপিআইএমের প্রসন্নকে বলেছিল, “ভারতের সব কটা কমিউনিস্ট ও বামপন্থী দল হল পেটি বুর্জোয়া পার্টি। বুর্জোয়া দলগুলির পেছনে বিগ ফিনান্স থাকলেও, তাদের মূল নীতি মালিকবাবুরা এঁচে দিলেও- সেগুলি ইমপ্লিমেন্ট করে পেটবুর্জোয়া নেতা আর কর্মীরাই।” দীপেন্দ্রনাথ তাঁর উপন্যাসে আত্মসমালোচনার রাস্তা বেছে নিয়েছিলেন, সিপিআই এবং কংগ্রেসের পার্থক্য যে প্রায় মুছে গেছিল তা স্বীকার করেছিলেন এবং জরুরি অবস্থার সময়ে সংসদীয় বামপন্থীদের সার্বিক রাজনৈতিক গলদগুলি খুঁজতে চেয়েছিলেন।

জরুরি অবস্থা ভারতবর্ষের রাজনীতিক্ষেত্রে কিছু দীর্ঘস্থায়ী বদল এনেছিল।

১) স্বৈরতান্ত্রিক সরকার সমস্ত গণতান্ত্রিক পরিসরকে কীভাবে গ্রাস করতে পারে এবং এক আমলাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় বদলে দিতে পারে।

২) কংগ্রেস দল এই সময়েই আরও বেশি গান্ধী পরিবারের কুক্ষিগত হয়ে গেল এবং মস্তানপন্থা ও মেগালোম্যানিয়াক সঞ্জয় গান্ধীর জন্যেই (যদিও, সেই সময় যুব কংগ্রেসের সদস্যসংখ্যা প্রায় ৪০ লক্ষ ছিল) কংগ্রেসের সর্বভারতীয় গ্রহণযোগ্যতা ধাক্কা খেতে শুরু করল।

৩) হিন্দুত্ববাদী ও উগ্র দক্ষিণপন্থী দলগুলি এই সময় থেকেই নিজেদের মতাদর্শ বিকাশের পূর্ণ সুযোগ পেয়ে গেল। কংগ্রেসের নরম হিন্দুত্ববাদকে টেক্কা দিয়ে সেই বিকল্প গণতন্ত্রের ধারণা নিয়ে উপস্থিত হল তারা; পরবর্তীতে বিজেপি তৈরির পরে একদিকে ফ্যাসিস্ত মতাদর্শ অন্যদিকে গণতান্ত্রিক পরিসরকে ধর্মমুখী ক’রে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগল।

৪) সর্বভারতীয় রাজনীতিতে সংসদীয় বামপন্থীদের ব্যবহৃত হওয়ার সেই শুরু। আসন-সমঝোতা এবং ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্যে নীতি ও মতাদর্শের সঙ্গে আপসের রাজনীতি আশু লক্ষ্যপূরণে শুরু করেছিল তারা, কিন্তু সেটাই পরে তাদের একমাত্র পরিকল্পনায় বদলে গেল; একইসঙ্গে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ল। আরএসএস-বিজেপির উত্থান হয়তো পরের দশকে হতই, কিন্তু দুর্ভাগ্য এটাই যে তারা বিকল্প গণতন্ত্রের মুখোশ পরার সুযোগ পেয়ে জনগণের চোখে অন্যতম ‘অপশন’ হয়ে উঠেছিল।

জরুরি অবস্থা কংগ্রেসের জন্যেও নেমেসিস হয়ে এসেছিল। এমনকি চ্যবন পরে স্বীকার করেছিলেন যে, সংবাদপত্রের ওপরে মাত্রাতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞায় কংগ্রেসের নেতৃত্বের কাছেই দেশের সব খবর পৌঁছাত না। ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে চিরকালের মত ক্ষমতা থেকে সরে যায় তারা। যে আমলাতান্ত্রিকতা ও উচ্চবর্গ-উচ্চশ্রেণির জনতোষের ওপরে ভর ক’রে তাদের মৌরসিপাট্টা ছিল, তার হাতবদল হতে থাকে। সিপিআইএম আর সিপিআই দু’টি দলই সেদিন শ্রেণিভিত্তিক অবস্থান নিতে পারেনি। জনসঙ্ঘ-আরএসএসকে আটকানোর জন্যে কংগ্রেস ও ইন্দিরা কেন আদর্শ বিকল্প? ইন্দিরা ও কংগ্রেসকে আটকানোর জন্যে আরএসএস-জনসঙ্ঘ-জেপি কেন বিকল্প? শ্রেণি ও বর্ণগত অবস্থান থেকে তাঁরা একথা ভাবেননি। “গণতন্ত্রের লড়াই লড়তে গিয়ে কংগ্রেসের ক্ষেত্রে যে ভুল আমরা করেছি- সেই একই ভুল তোরা করছিস জনতা পার্টির ক্ষেত্রে। জনতা পার্টি মানে হল একদিকে মাল্টিন্যাশনাল অন্যদিকে গোহত্যা নিবারণ আর হরিজন হত্যা। আমি নিশ্চয়ই জানি একদিন লোকে তোদেরও প্রশ্ন করবে-” দীপেন্দ্রনাথ যথার্থই দূরদর্শী ছিলেন, তা একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের বাস্তবতায় বোঝা যায়। কিন্তু তাঁর ও তাঁর পার্টির আত্মসমালোচনা হতে হতে বড্ড দেরি হয়ে গেছিল। অথচ, ষাট-সত্তরের রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রয়োজন ছিল বামপন্থী গণতান্ত্রিক জোট। ভারতের আধা-সামন্ততান্ত্রিক ও আধা-ঔপনিবেশিক সমাজব্যবস্থাকে বিশ্লেষণ ক’রে শ্রেণিভিত্তি দৃঢ় ক’রে সংগ্রামের দিকে এগোনো। জরুরি অবস্থায় আইন-প্রশাসন এবং দক্ষিণপন্থী দলগুলির জনবিরোধী ভূমিকাকে জনগণের সামনে এক্সপোজ্‌ ক’রে এবং ন্যক্কারজনক সংসদীয় ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিস্পর্ধা জানিয়ে সর্বাত্মক বিদ্রোহ করার প্রয়োজন ছিল। রাজনৈতিক ঘোলাজলে জেপি ‘সর্বাত্মক শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের’ আহ্বানে দক্ষিণপন্থী থেকে বামপন্থীদের বকচ্ছপ জোট বানিয়ে নিল; আর, সেই মুহূর্তে দুই বৃহৎ সংসদীয় বামপন্থী দল সেই সাহসটুকু দেখাল না? ১৯৭৫ সালের ৫ই জুন দলীয় পতাকাহীন মিছিলে যোগ না দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির লাল পতাকা সামনে রাখা প্রয়োজন ছিল; ইন্দিরার মধ্যে মুক্তিসূর্যের সম্ভাবনা না খুঁজে নিজেদের কর্মসূচি প্রয়োগের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু, গদির লোভ, জনতোষী হওয়ার দৌড়, রাজনৈতিক অবিবেচনা এবং বড় সংসদীয় পার্টি হওয়ার দম্ভে তা সম্ভব হল না। তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব এখনও বিদ্যমান।

জরুরি অবস্থা : মগজে কারফিউ – সেকাল থেকে একাল (ছবি উইকিপেডিয়া থেকে )

1 মন্তব্য

  1. পড়লাম। খুবই বিশ্লেষণাত্মক, সন্দেহ নেই। খারাপ লাগে ভাবতে যে আজকের বিজেপি-র এই উত্থানের নেপথ্যে প্রায় বিলীয়মান কম্যুনিস্ট পার্টিরও একটা পরোক্ষ, বা হয়ত কিছুটা প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিলো।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.