১৯৬১ সাল। রমরম করে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ পালন হচ্ছে প্রবল উৎসাহে। তারই মধ্যে, কলেজ স্ট্রিট পাড়ার দেওয়ালে দেওয়ালে এক অভূতপূর্ব আর্টওয়ার্কের পোস্টার পড়তে দেখা গেল [১]। সত্যজিতের করা সেই পোস্টার থেকে সাহিত্যপ্রেমীরা জানতে পারলেন ১৯১৩-তে উপেন্দ্রকিশোরের হাত ধরে চালু হাওয়া সন্দেশ পত্রিকা নবকলেবরে প্রকাশিত হতে চলেছে তৃতীয় পর্যায়ে। ১৯২৩-এ সুকুমার রায়ের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই সুবিনয় রায় সন্দেশের দায়িত্বভার হাতে নেন, কিন্তু চালাতে পারেননি। ১৯২৫ সালে তা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯২৯ সালে সেটি আবার বেরোতে শুরু করে কিন্তু পুনরায় প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায় ১৯৩৪-এ। দীর্ঘ সাতাশ বছর বাদে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষে সন্দেশ আবার প্রকাশিত হতে শুরু করে সত্যজিৎ এবং রায় পরিবারের হাত ধরে। প্রথম সংখ্যার সম্পাদনার যৌথ দায়িত্বে ছিলেন সত্যজিৎ এবং তাঁর সুহৃদ, ‘পদাতিক’ কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। বছর দুয়েক বাদে, যখন উপেন্দ্রকিশোরের কনিষ্ঠা কন্যা পুণ্যলতা চক্রবর্তীর (ছোট্ট ছোট্ট গল্প [২] নামে পুণ্যলতার লেখা অসাধারণ শিশুপাঠ্য গল্পের সংকলনের সাথে হয়ত অনেকেই পরিচিত)। ১৭২/৩ বালিগঞ্জ এভিন্যু’র (বর্তমানে রাসবিহারী এভিন্যু) বাড়িতে সন্দেশের দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হলে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বদলে সত্যজিতের সাথে যুগ্ম সম্পাদিকা হন তাঁর ‘লীলুপিসি ’ – লীলা মজুমদার।

এই তৃতীয় পর্যায়ের সন্দেশে ছোটদের লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন সত্যজিৎ। বাংলায় সত্যজিতের সমস্ত প্রথম লেখাই (শিশু/কিশোর সাহিত্য) সন্দেশেই প্রকাশিত হয়েছে। সত্যজিতের প্রথম ছোটগল্প বঙ্কুবাবুর বন্ধুএলিয়েন নামে যার চলচ্চিত্রায়িত হওয়ার ছিল কলাম্বিয়া পিকচার্সের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে — কিন্তু হয়নি — এবং পরে যার অনুকরণে (বিষয়টি বিতর্কিত, এর পূর্ণাঙ্গ আলোচনার সুযোগ এখানে নেই) ইটি — দি এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল‘ বানান স্টিভেন স্পিলবার্গ — সন্দেশে প্রকাশিত হয় ১৯৬২-তে। তার আগে ১৯৬১-র পুজো সংখ্যা সন্দেশে বেরিয়ে গেছে ব্যোমযাত্রীর ডায়রি অর্থাৎ প্রফেসর শঙ্কুর প্রথম গল্প।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

১৯৬৫ সালের ডিসেম্বরে (অগ্রহায়ণ, ১৩৭২ বঙ্গাব্দ) সন্দেশে সত্যজিৎ আনলেন ফেলু মিত্তিরকে। পার্ক স্ট্রিটের অক্সফোর্ড বুক স্টল থেকে কেনা মলাটে সোনার জলে ইংরেজি অক্ষরে ‘নোটস’ লেখা বাঁধানো খাতার সাতাশ পাতা ধরে লেখা [৩] ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি তিন কিস্তি ধরে বেরোল সন্দেশের পরপর তিন সংখ্যায় (অগ্রহায়ণ – পৌষ – মাঘ, ১৩৭২ বঙ্গাব্দ)। জন্ম নিল বাংলা সাহিত্যের এক নতুন গোয়েন্দা চরিত্র, যা ছাপ্পান্ন বছর বাদেও এখনো শুধু কিশোর কিশোরীদেরই নয়, মুগ্ধ করে রেখেছে তাদের বাবা-মাকেও। “বাবা তো কিশোরদের জন্য ফেলুদা লিখতেন। কিন্তু মজার কথা আগে বড়রা পড়তেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একবার বাবাকে বলেছিলেন দেশ পত্রিকায় সব লেখা ছেড়ে প্রথম ফেলুদাই পড়েন। বাবা খুব অবাক হয়েছিলেন” — এক সাক্ষাৎকারে [৪] বলেছিলেন সত্যজিৎপুত্র।

ফেলুদার গোয়েন্দাগিরিকে উপন্যাস বলা যায়না, নভেলেট (বা খুব জোর নভেলা) বলাই যুক্তিযুক্ত। সে অর্থে প্রথম ফেলুদা উপন্যাস বাদশাহী আংটি, বারো কিস্তিতে সন্দেশে বেরোয় এক বছর ধরে (১৯৬৬ – ১৯৬৭)। পরে ১৯৬৯ সালের ২৯শে মে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে বই আকারে প্রকাশিত হয় । এরপর থেকে এক এক করে কখনো সন্দেশে, কখনো আনন্দমেলায়, কখনো বা শারদীয়া দেশে সর্বমোট পঁয়তিরিশটি [৫] ফেলুদা কাহিনী লেখেন সত্যজিৎ, শেষ উপন্যাস রবার্টসনের রুবি বেরোয় ১৯৯১ সালের শারদীয়া দেশে।

ডিসেম্বর ১৯৯৫ সালের (অগ্রহায়ণ ১৮০২ সংখ্যা) সন্দেশটি ছিল ফেলুদার প্রথম লেখা প্রকাশনের তিরিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা [৬]। সেই সংখ্যায় ‘ফেলুচাঁদ’ নামে একটি নিবন্ধ লেখেন লীলা মজুমদার [৭]। সেখানে তিনি বলছেন:

“… ফেলু চাঁদের গল্প – উপন্যাসে আর একটা ব্যাপার কেমন যেন ঠেকে। হ্যাঁ গা, গোয়েন্দা ও তাঁর সহকারীর আত্মীয় পরিজনদের দেখিনা কেন ? এমনকি খল নায়কদের বাড়িতেও চাকর-বাকর ছাড়া কেউ নেই!

ফেলুদা ও তোপসের আত্মীয় – বন্ধুরা ওদের চারপাশে ঘিরে থাকলে , পাঠকদের বেজায় আহ্লাদ হত , এমন কি তাতে গোয়েন্দাগিরিরও সুখ-সুবিধে ঢের বেড়ে যেত । অথচ গল্পের আসল মজা বা টইটুম্বুর রসটা, মোটেই টসকে যাবার সুযোগ নেই । ফেলুদা না হয় ছোটবেলায় বাপ্ – মা হারিয়েছে, কিন্তু তোপসের মা – বাবারা গেল কোথায়? দু’জনেরই ঠামু – দিদু, মামা – কাকা মাসি – পিসি কেউ নেই?…”

সত্যজিতের নীলুপিসির এই সস্নেহ অভিযোগটি, সম্ভবত, সর্বাংশে সত্যি নয়। ফেলুদার গোয়েন্দাগিরিবাদশাহী আংটিগ্যাংটকে গন্ডগোলসোনার কেল্লা এবং শেয়াল দেবতা রহস্য-তে তোপসের বাবার উল্লেখ আছে। বাদশাহী আংটিতে তো তোপসের বাবার ভূমিকা, যাকে বলে, অন্যতম প্রধান, কারণ তাঁরই বাল্যবন্ধু ধীরুবাবুর (পোশাকি নাম ডি কে সান্যাল) বাড়ি কেন্দ্র করেই রোমাঞ্চকর ঘটনাবলী আবর্তিত হয়। শেয়াল দেবতা রহস্যে তোপসের মা’র উল্লেখও পাই। লালমোহনবাবু, আসলে যিনি সর্বজ্ঞ গঙ্গোপাধ্যায় (রবার্টসনের রুবি), তাঁর পরিবারের সদস্য – দাদু জ্যাঠা কাকা বোন এবং খুড়তুতো বোনেদের এবং এমনকি তাঁদের স্বামীদের সম্পর্কেও আমরা বিস্তারিত জানতে পারি এবার কান্ড কেদারনাথে উপন্যাসে, যেখানে লালমোহনের সন্ন্যাসী ছোটকাকার সাথে তাঁর দেখা হয় বহু বছর বাদে।

ভিলেনদের ব্যাপারে বলতে গেলে প্রথমেই আসে মগনলাল মেঘরাজের কথা, মোট তিনটি উপন্যাসে (জয় বাবা ফেলুনাথযত কান্ড কাঠমান্ডুতে এবং গোলাপী মুক্তা রহস্য) যাঁর সাথে ফেলুচাঁদের মোলাকাত হয়। মগনলালের ছেলের সূরয মেঘরাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে সোনার কেল্লায়। ফেলুদার অধিকাংশ কাহিনীতেই পারিবারিক দ্বন্দ্বের বিশেষ গুরুত্ব আছে এবং সেই সূত্রে ফেলুদার মোট ২১ টি উপন্যাসে (মোট উপন্যাস সংখ্যার প্রায় দুই তৃতীয়াংশ) ভিকটিমের বাড়ির লোকেদের উল্লেখ (কখনো কখনো সেই উল্লেখ অতি বিশদে এবং তাঁদের যথেষ্ট ভূমিকা থাকে কাহিনীতে[৮]) রয়েছে, অনেক সময়েই সেই বাড়িরই লোকেদের মধ্যেই কেউ না কেউ খলনায়ক [৯]। বেশ কিছু উপন্যাস, যেমন অম্বর সেন অন্তর্ধান রহস্যজয় বাবা ফেলুনাথশকুন্তলার কণ্ঠহার কিংবা ছিন্নমস্তার অভিশাপ তো যাকে বলে জমজমাট ফ্যামিলি অ্যাফেয়ার। কোথাও কোথাও এক বাড়িতে তিন পুরুষের এক সাথে থাকারও উদাহরণ আছে [১০]।

ফেলুদা কাহিনীর চরিত্ররা সকলেই পরিজনহীন নিঃসঙ্গ শুকনো জীবন যাপন করতেন, এমনটি আদৌ ঘটনা নয়।

লীলা মজুমদার যেটা পরিষ্কারভাবে বলেননি, অথবা সন্দেশ ছোটদের পত্রিকা বলে বলতে চাননি, সেটা হল ফেলুদার গল্পে বা জীবনে নারী চরিত্রের অভাব আছে। তবে প্রোটাগনিস্টের জীবনে নারীর অভাব থাকলে বা গোয়েন্দা উপন্যাসের ডিটারমিনিং ফ্যাক্টার হিসেবে নারীর ভূমিকা না থাকা মানেই কি গল্পের ধারাটি পুরুষতান্ত্রিকতার দোষে দুষ্ট?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কয়েকটি জিনিস খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। দেখা প্রয়োজন ফেলুদার গল্পে শুধুই কি নারীর সংখ্যা কম নাকি যে সমস্ত নারী পার্শ্বচরিত্র আছেন তাঁদেরও গুরুত্বহীন করে রাখা হয়েছে? দেখা প্রয়োজন যে কিশোর গোয়েন্দা গল্পে, বা সাধারণভাবে কিশোর সাহিত্যে, সেই ধরণের পার্শ্বচরিত্র যথেষ্ট পরিমাণে রাখা সম্ভব কিনা, এবং যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে কেন তা সম্ভব নয়। এটাও দেখা প্রয়োজন, যে নারীচরিত্র কম থাকা বা প্রোটাগোনিস্টদের বান্ধবী না থাকা কি ফেলুদার (বা সত্যজিতের) লেখাতেই শুধু, নাকি ফেলুদা যে সময়ে লেখা হচ্ছে সেই সময়ের যাবতীয় শিশু- কিশোর সাহিত্যেরই এটা বৈশিষ্ট্য ছিল? এবং, যদি থাকে, তাহলে কেন ছিল? এই নিবন্ধের পরবর্তী অংশে এগুলিই আলোচনা করা হয়েছে ফেলুদার বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক গল্প ধরে ধরে বিশ্লেষণ করে।

ডাঃ মুনসীর ডায়রি দিয়ে শুরু করা যাক। ফেলুদা-কাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী, সবচেয়ে বর্ণময় নারীর চরিত্রায়ন সম্ভবত সায়কায়াট্রিস্ট ডক্টর রাজেন মুনসীর স্ত্রী ডলি মুনসীর মধ্যে। নিজের ভাই চন্দ্রনাথ বোসের হাত দিয়ে স্বামীকে হত্যা করান তিনি। ডক্টর মুনসীর উইলে তাঁর নামে সম্পত্তির আট ভাগের যে হিসাব ছিল, সেই অর্থ পেলে ডলি মুনসী নিজের ভাইকে আরো বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে রাখতে পারবেন – সেটাই সম্ভবত ওঁর মোটিভ ছিল, কারণ ডক্টর মুনসী চন্দ্রনাথবাবুকে একেবারেই পছন্দ করতেন না। স্বামীর পরিবর্তে নিজের ভাইয়ের ওপরে এই নজিরবিহীন স্নেহের (আকর্ষণ?) অস্বাভাবিক যৌনতার ফ্রয়েডিয়ান ব্যাখ্যা আছে। কিশোর উপন্যাস বলেই সত্যজিৎ সম্ভবত সেই দিকটি এড়িয়ে গেছেন তাঁর লেখায়। মিসেস মুনসীকে তাই ডক্টর মুনসীর ডায়েরির অন্যতম প্রধান, বা এমনকি প্রধান চরিত্র বললেও অতিশয়োক্তি হয় না।

ডলি মুনসীর মত অতটা কেন্দ্রীয় চরিত্র না হলেও, নীলিমা চৌধুরীর ভূমিকা যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য ছিন্নমস্তার অভিশাপ উপন্যাসে। এই উপন্যাসেও আমরা একসাথে তিন পুরুষের উপস্থিতি লক্ষ করি (যদিও তাঁরা এক বাড়িতে থাকেন না) – রাঁচির প্রাক্তন অ্যাডভোকেট মহেশ চৌধুরী, তাঁর তিন ছেলে (অরুণেন্দ্র, বীরেন্দ্র এবং প্রীতীন্দ্র), এবং ছোট ছেলে প্রীতীনের কন্যা বিবি। মহেশ চৌধুরীর সত্তরতম জন্মদিনে রাজারাপ্পায় পিকনিক করতে গিয়ে অরুণেন্দ্রর সাথে তীব্র কথা কাটাকাটিতে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গিয়ে মহেশ চৌধুরীর মৃত্যু হয় (সম্ভবত অতি উত্তেজনার অভিঘাতে সেরিব্রাল বা কার্ডিয়াক অ্যাটাক হয়েছিল মহেশবাবুর – ডাক্তারি মতে যেটা হওয়া সম্ভব ওই পরিস্থিতিতে)। সেই বাকবিতন্ডা অজান্তে ধরা থাকে প্রীতীনবাবুর টেপ রেকর্ডারে, যা পরে বুঝতে পেরে চৌধুরী পরিবারের কেউ একজন (সম্ভবত প্রীতীনবাবু নিজেই) রেকর্ডারটি সরিয়ে ফেলেন। নীলিমা দেবী সেই রেকর্ডার উদ্ধার করে ফেলুদার হাতে তুলে দেন, প্রীতীনবাবুর তীব্র অসম্মতি সত্ত্বেও। টেপ রেকর্ডারটা না পেলে ফেলুদার পক্ষে রহস্য সমাধান করা কোনভাবেই সম্ভব হত না। পারিবারিক সম্মান বাঁচানোর থেকে সত্যের এবং ন্যায়ের জয় যাতে হয় সেই রাস্তাই নীলিমা বেছে নিয়েছিলেন, তার জন্য স্বামীর সাথে সংঘাতে যেতেও পিছপা হননি। চৌধুরী পরিবারের অতি প্রিয় বধূ নীলিমা সুন্দরী, স্মার্ট, অতিথিবৎসল এবং অসম্ভব দৃঢ় মনের মহিলা [১১]। কিন্তু সত্য ও ন্যায়ের প্রতি নীলিমার নিষ্ঠা তাঁর বাকি সব গুণকেই ছাপিয়ে গেছে। ছোট পরিসরে হলেও, নীলিমার চরিত্র অন্যতম মুখ্য চরিত্র এবং অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ। যথেষ্ট শ্রদ্ধার সাথে নীলিমার চরিত্র চিত্রিত হয়েছে সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

নির্বাক চলচ্চিত্র যুগের বিখ্যাত সুন্দরী লখনৌয়ের অ্যাংলো ইন্ডিয়ান অভিনেত্রী শকুন্তলা দেবী (আসল নাম ভার্জিনিয়া রেনল্ডস)-এর বহুমূল্য জড়োয়ার হার (যা তিনি উপহার পেয়েছিলেন মহীশূরের রাজার থেকে) চুরি হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে দেন শকুন্তলার মেয়ে প্যামেলা সুনীলার (ও তাঁর স্বামী হেক্টর জয়ন্ত বিশ্বাসের) কন্যা মেরি শীলা। শকুন্তলার কণ্ঠহারের অন্যতম মুখ্য চরিত্র শীলা শুধু যে প্রখর বাস্তববুদ্ধির অধিকারী তাই-ই নয়, শীলা একজন আত্মনির্ভর চরিত্রের দৃঢ় মানসিকতার মেয়ে। ফেলুদার সাথে শীলাকে নিয়ে সুনীলার কথোপকথন থেকে আমরা জানতে পারি:

শীলা স্কুলে কলেজে অ্যাকটিং করেছে। ক্লাবে-ট্লাবেও দু-একবার করেছে। তার বেশি নয়। ও ফিল্মে অফার পেয়েছে, কিন্তু নেয়নি।

ও কি করতে চায়?

ও ওয়ার্কিং গার্ল হতে চায়। আপিসে কাজ করবে, নিজে রোজগার করবে। ও তো সবে বি.এ. পাশ করেছে। এর মধ্যে কিছু জার্নালিজম করেছে, খবরের কাগজে ওর দু’একটা লেখা বেরিয়েছে। ..

শীলার ইন্টিরিয়র ডেকোরেশনেও উৎসাহ আছে এবং সে ছবিও আঁকতে পারে, আঁকেও। একজন আধুনিকমনস্কা, স্বনির্ভর তরুণীর ২০২১ সালে বসে যেমন চিন্তাভাবনা হওয়া উচিৎ, আজ থেকে তেত্রিশ বছর আগেই (শকুন্তলার কণ্ঠহারের প্রথম খসড়া লেখা হয় ১৯৮৮ সালে) সত্যজিৎ শীলার চরিত্র সেভাবে তৈরি করেছেন।

বোসপুকুরে খুনখারাপি উপন্যাসে খুন হওয়া সংগীতজ্ঞ, যাত্রার প্রসিদ্ধ পালাকার এবং ভায়োলিনিস্ট ইন্দ্রনারায়ণ আচার্যর মেজদা হরিনারায়ণ আচার্যের চোদ্দ বছরের মেয়ে লীনার সাথে কাকা ইন্দ্রনারায়ণের বোঝাপড়া ছিল খুবই ভাল। ইন্দ্রনারায়ণ লীনার মতামতকে এতটাই গুরুত্ব দিতেন যে পালা লিখে তাকেই প্রথম পড়াতেন এবং কোনো জায়গা লীনার অপছন্দ হলে তা পাল্টেও দিতেন। লীনা পিয়ানো শেখে কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং যাত্রার গানের ওপরেও তার দখল আছে, নিজেও গান গাইতে পারে। চোদ্দ বছরের একটি মেয়ের এই সাংস্কৃতিক পরিশীলন আমাদের মুগ্ধ করে। ক্রাইম ডিটেকশনে সরাসরি কোনো ভূমিকা না থাকলেও, লীনার চরিত্রায়ন যথেষ্ট ইতিবাচক।

অম্বর সেন অন্তর্ধান রহস্যে গোটা সেন পরিবারই জড়িত ছিল এবং তাদের ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে দেখানো হয়েছে। সেন পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য ঝর্ণা সেনের (অম্বর সেনের ভাই অম্বুজ সেনের কন্যা রূনা) ফেলুদাপ্রীতি এবং তার করা চ্যালেঞ্জ – যে, ফেলুদা কোনদিন কোন রহস্য সমাধানে অপারগ হবে না – এই সূত্রেই এই পারিবারিক নাটকের শুরু। সে অর্থে রূনার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, এবং মুখ্য। এ ছাড়াও রুনার মার উৎকৃষ্ট অভিনয় ফেলুদার তদন্ত প্রায় বিপথগামী করে ফেলেছিল। সে অর্থে মহিলা স্মার্ট এবং বুদ্ধিমতী। এবং তিনি যথেষ্ট সুন্দরীও বটে [১২]।

এই পাঁচটি উপন্যাস ছাড়াও, জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা-তে শঙ্কর চৌধুরীর (যাঁর হেফাজতে থাকা বাদশাহী মুদ্রা চুরি হয়) আটাত্তর বছর বয়স্ক কাকিমার চরিত্রেরও কিছু অপ্রত্যক্ষ ভূমিকা আছে অপরাধী সনাক্তকরণে। তাঁকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে তাঁরই ছেলে জয়ন্ত চৌধুরী নিজে কাকিমা সেজে বসেন। কিন্তু পান ছাড়া ফাঁকা হামানদিস্তা পেটার শব্দে ফেলুদা চালাকিটা ধরে ফেলে। প্রসঙ্গত, এই জয়ন্তবাবুই চৌধুরীবাড়ির স্বর্ণমুদ্রা চুরির সাথে জড়িত ছিলেন।

মহিলা জাতি সম্পর্কে কোনো অবমাননাকর উক্তি করা তো দূরে থাক, পঁয়ত্রিশটি ফেলুদা কাহিনীতে কোথাও লিঙ্গবিভাজন সংক্রান্ত মহিলাদের কোন সীমাবদ্ধতা দেখানোর সামান্যতম প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষ চেষ্টা করা হয়নি। ফেলু মিত্তিরের গোয়েন্দাগিরিতে এমন কোন ঘটনার, আলোচনার অথবা পরিকল্পনার উল্লেখ নেই যার মাধ্যমে জেন্ডার ইকুয়ালিটির সামান্যতম ভায়োলেশন হয়েছে এমন অভিযোগ আনা যেতে পারে। যদিও ফেলুদার উপন্যাসে সিগনিফিক্যান্ট মহিলা চরিত্র কম এসেছেন, কিন্তু যখন এসেছেন তখন তাঁরা বর্ণময় এবং অ্যাপ্রিসিয়েশনের যোগ্য হয়েই এসেছেন, উপরের উদাহরণগুলো দেখার পরে সে ব্যাপারে কোনো বিবাদ থাকার কথা নয়। ফলত, সাধারণভাবে তো দূরস্থান, এমনকি মেল গেজের (male gaze) ধোয়াঁটে উপপ্রমেয় প্রয়োগ করেও ফেলু মিত্তিরের কোনো কার্যকলাপকেই পুরুষতান্ত্রিক বলা যাবে না। শুধুমাত্র মহিলা চরিত্র কম, সেই কষ্টকল্পনা দিয়ে ফেলুদার কাহিনীতে লিঙ্গবিভাজনের তত্ত্ব দাঁড় করাতে গেলে তা অতিসাধারণীকরণ, অগভীর একদেশদর্শিতা এবং উদ্দেশ্যমূলক হবে।

হ্যাঁ, ফেলুদা বা তোপসের বান্ধবী নেই, লালমোহনবাবু বিবাহিত নন। কিন্তু তাতে হয়েছেটা কী? ব্যোমকেশের স্ত্রী হিসেবে সত্যবতীর উপস্থিতিতে কি পাল্টে যায় ব্যোমকেশের গোয়েন্দাগিরির ধরণ অথবা অপরাধী সনাক্তকরণের ব্যাপারে সাফল্য ও ব্যর্থতার খতিয়ান? ফেলুদার বা তোপসের বান্ধবী না থাকায় (অথবা লালমোহনবাবুর স্ত্রী/বান্ধবী) সত্যজিতের গোয়েন্দা কাহিনীর মূল সুর কোনভাবেই বিঘ্নিত হয়েছে বলে মনে হয় না।

কিশোর গোয়েন্দা গল্পে সিগ্নিফিক্যান্ট নারীচরিত্র রাখা সহজ না। নারীঘটিত, প্রবৃত্তিঘটিত অপরাধ (যা কিনা অ্যাডাল্ট থ্রিলার বা গোয়েন্দা কাহিনীর মূলধন) নিয়ে ষাটের (বা এমনকি সত্তর বা আশির দশকেও) দশকে বসে কিশোর-কিশোরী পাঠ্য ফিকশন লেখা অসম্ভব ছিল। তা ছিল একেবারেই অবাস্তব পরিকল্পনা। যদিও বড়রা খুবই উপভোগ করেন, কিন্তু ফেলুদার কীর্তিকাহিনী মুখ্যত ছোটদের উদ্দেশ্যেই লেখা, তারাই টার্গেট অডিয়েন্স। সেই টার্গেট অডিয়েন্সের জন্য গোয়েন্দা গল্প লিখলে তাতে কী কী উপকরণ থাকবে সে বিষয়ে সীমাবদ্ধতা থাকাটাই স্বাভাবিক। ‘নয়ন রহস্য’-তে সত্যজিৎ তাই ফেলুদার মুখ দিয়ে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নেন:

“…এটা ভুললে চলবে না যে, আমার পাঠক প্রধানত কিশোর কিশোরী। আমার এমন অনেক মামলার উদাহরণ দিতে পারি যেগুলো চিত্তাকর্ষক হলেও, তাতে এমন সব উপাদান থাকে যা কখনোই কিশোরদের [১৩] পাতে দেওয়া চলে না। ..”

এবং তার সাথে আমাদের এটাও ভুলে গেলে চলবে না, উপরের বক্তব্যের কিশোর কিশোরীরা ষাট সত্তর আশির দশকের মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ নিয়ে বেড়ে ওঠা ইন্টারনেটহীন, কম্পালসারি ডেটিং (বান্ধবী/বিশেষ পুরুষ বন্ধু না থাকলে মান থাকে না) হীন কিশোর কিশোরী। ‘প্রেমের’ কথা আলোচনা করতে যাদের লজ্জায় কান লাল হয়ে যেত এবং তা আড়ালে আড়ালে গুজগুজ ফুসফুস করেই হত শুধু, মা বাবার বা পরিবারের কোন গুরুজনের সামনে নৈব নৈব চ। ফলে চোদ্দ বছরের তোপসের ঘোষিত গার্লফ্রেন্ড থাকবে, এই আশা করাটাই অন্যায় – বিশেষত যে টাইমলাইনে ফেলুদা লেখা হচ্ছে। ষাট সত্তর আশির দশকে সন্দেশ পত্রিকায় প্রেমের গল্প বেরোচ্ছে – ব্যাপারটা আদৌ কল্পনা করা যায় কি? কিন্তু এখন আনন্দমেলায় দিব্বি প্রেমের গল্প বেরোচ্ছে, পান্ডব গোয়েন্দা পর্দায় এনে বাচ্চু প্রেমে পড়ছে বাবলুর এবং ঘুরে ঘুরে গান গাইছে। সময় এবং সমাজের একটা প্রভাব তো শিশু/কিশোর সাহিত্যের ওপরে অবশ্যই থাকবে, থাকতে বাধ্য। ২০২১ সালের আবহে বসে, ষাটের দশকে কিশোর সাহিত্যে মহিলা চরিত্র ছিল না ফলে সেই সাহিত্য রিগ্রেসিভ – এভাবে দেগে দেওয়া মূর্খের কাজ।

এবং ফেলুদা নিয়ে সমস্যা এটাই, যে:

“..এইসব উপন্যাস যদি শুধু কিশোররাই পড়ত, তা হলে কিন্তু কোন সমস্যা ছিল না ; আসলে যেটা ঘটে সেটা হল, কিশোরদের সঙ্গে তাদের মা, বাবা, মাসি, পিসি, খুড়ো, জ্যাঠা সকলেই এসব উপন্যাস পড়ে। একসঙ্গে এত স্তরে চাহিদা মেটানো কি চাট্টিখানি কথা? ..”

ফল – “যদি প্রেম দিলে না প্রাণে”!

ফেলুদার বা তোপসের কোনো সহকারিণী নেই কেন? কেন কোন গোয়েন্দানীর আমদানি করেননি সত্যজিৎ? উত্তরটা খুব একটা জটিল নয়, এবং আগেই আলোচনা করা হয়েছে — এর কারণ সাহিত্যের ওপর তার সময় এবং সমাজের প্রভাব। ষাট সত্তর আশির দশকে বসে কোন কিশোরী বা যুবতী, অনাত্মীয় কিশোর বা যুবকের সাথে ঘুরে ঘুরে অপরাধী ধরে বেড়াবেন, এই কল্পনায় আঁতকে উঠতেন সেই সময়ের বাবা মা-রা। ফলে কিশোরী গোয়েন্দা এসেছে শিশুসাহিত্যে, কিন্তু কিশোর কিশোরী একসাথে অপরাধী ধরতে বেরিয়ে পড়ছে সেরকমটি দেখা যায়না বড়। গোয়েন্দা গণ্ডালুতে [১৪] কোনো উল্লেখযোগ্য কিশোর বা তরুণ গোয়েন্দা নেই, কালু (কাকলি চক্রবর্তী), মালু (মালবিকা মজুমদার), বুলু (বুলবুলি সেন) আর টুলু (টুলু বোস), ক্লাস এইটের এই চার কিশোরী গোয়েন্দার কারুরই নেই কোন বয়ফ্রেন্ডও। এমনকি লীলা মজুমদার যে লীলা মজুমদার, তিনি পর্যন্ত গুপী পানুর গোয়েন্দাগিরি-তে কারো কোন ‘বিশেষ বান্ধবী’ বা মহিলা গোয়েন্দা রাখার কথা ভাবেননি, সাহস করেননি প্রকৃত প্রস্তাবে — অন্যে পরে কা কথা! শুধু ফেলু মিত্তিরকে পুরুষতান্ত্রিক বলে দুষে লাভ?

এবং এই একই প্রবণতা দেখা গেছে সেই সময়কার যাবতীয় কিশোর সাহিত্যে — হয় মেয়েরা সেখানে নায়িকা (খুব কম এমন গল্প লেখা হয়েছে যদিও তুলনায়, উদাহরণস্বরূপ গণ্ডালু কিংবা মতি নন্দীর কলাবতী চরিত্র), অথবা পুরুষরা নায়ক। বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ডের নামগন্ধ নেই। কিশোর তোপসে না হয় অনেক ছোট, কিন্তু যুবক তারাপদ আর চন্দন? কিকিরার গোয়েন্দা গল্প তন্ন তন্ন করে খুঁজলেও এদের বান্ধবীদের (অথবা কোন নারী চরিত্রের, যার প্রতি তারাপদ বা চন্দন দুর্বল হয়েছে) কোন চিহ্ন পাওয়া যাবে না। সিগনিফিক্যান্ট নারীচরিত্র বলতে এক তারাপদর দিদি, এবং কিকিরার প্রথম উপন্যাস কাপালিকরা এখনো আছে-তে সিয়াঁসে হত যে মেয়েটি, সে। একইভাবে, বাহাত্তর নম্বর বনমালী নস্কর লেনে আড্ডা জমিয়ে তোলা চার মেসবাসী যুবক সুধীর, শিবু, শিশির গৌরের, অথবা পটলডাঙার রকে বসা প্যালা ক্যাবলা হাবুলের কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই। ঘনাদা বা টেনিদার গল্পে কোন চিহ্নই নেই রোমান্সের। অথচ হতেই পারত — কলকাতার মেসের বাসিন্দা যুবকদের নিয়ে এত অসংখ্য প্রেমের গল্প লেখা হয়েছে যে তা বাংলা সাহিত্যে একটা জঁরে পরিণত হয়েছে প্রায়। কিন্তু সুধীর, শিবু ইত্যাদিদের জীবনে প্রেম নেই!

প্রকৃতপক্ষে প্রেম নেই (বা ক্রস জেন্ডার অ্যাপিয়ারেন্স নেই) সেই সময়কার প্রায় কোন কিশোর সাহিত্যেই – পঞ্চপান্ডব (পটলা, হোঁৎকা, ঘোঁৎনা, সমী আর ফটিক — স্রষ্টা শক্তিপদ রাজগুরু), পিন্ডিদা আর তার চ্যালারা (আশুতোষ মুখোপাধ্যায়), গোগোল (সমরেশ বসু), সাধু কালাচাঁদ (শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়), জয়ন্ত মানিক বিমল কুমার (হেমেন্দ্রকুমার রায়), ঋজুদা রুদ্র (বুদ্ধদেব গুহ), ট্যাঁপা মদনা (আশাপূর্ণা দেবী) — যেদিকেই তাকাই না কেন, প্রেম রোমান্সের ছিটেফোঁটা নজরে পড়বে না। একমাত্র রুআহা উপন্যাসে তিতির গিয়েছিল আফ্রিকায়, এবং সন্তু কাকাবাবু উপন্যাসের শেষের দিকে সন্তুর বয়সী দেবলীনার আবির্ভাব হয়। ষষ্ঠীপদ চট্যোপাধ্যায়ের পান্ডব গোয়েন্দায় বাচ্চু বিচ্ছুর ভূমিকা নেহাতই রাখতে হয় তাই থাকা ধরণের – এনিড ব্লাইটনের ফেমাস ফাইভের অনুকরণে যেহেতু তিনটি ছেলে আর দুটি মেয়ের দরকার ছিল, শুধু সেজন্যই। সেসময়, এমনকি কিশোর কিশোরীদের অভিনয়যোগ্য নাটকগুলিও বহুলাংশে স্ত্রী/পুরুষ ভূমিকা বর্জিত রাখা হত।

ফেলুদা কাহিনীতে নারী চরিত্রের অনাধিক্য বা প্রেমিকার অনুপস্থিতির সাথে, সুতরাং, পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাধারার কোন সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না। অপর্যাপ্ত মহিলা চরিত্রের উপস্থিতির কারণ এরকম কোন মনোভাব থেকে উৎপন্ন হয়নি, যে, পুরুষরা যে কাজ করতে পারে মহিলারা তা পারবেন না। বিষয়টি উৎস আসলে কোনো একটি নির্দিষ্ট স্পেস-টাইমের ডোমেনে (ষাট-সত্তর-আশির দশক) বাঙালি (সাধারণভাবে ভারতীয়) মধ্যবিত্ত সমাজের রক্ষণশীল মনোভাব। কিশোর সাহিত্যের ধারণা এবং নির্মাণ প্রক্রিয়া আপেক্ষিক, চলমান সময়ধারার সাথে শিশু সাহিত্য / কিশোর সাহিত্যের সংজ্ঞা পাল্টে পাল্টে যায়। অবনীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ, লীলা মজুমদার, আশাপূর্ণা দেবী, নলিনী দাশের সময়কার কিশোর সাহিত্য আর বর্তমানের ইন্টারনেট স্যাভি বয়ফ্রেন্ড/গার্লফ্রেন্ড বেষ্টিত কিশোরী/কিশোরদের পছন্দ বা চাহিদা অনুযায়ী সাহিত্যের মধ্যে যে আকাশ পাতাল ফারাক থাকবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে সত্যজিৎ ফেলুদা লিখেছিলেন কিশোর সাহিত্য হিসেবে – এবং পুরোনো দিনের কিশোর সাহিত্য হিসেবে। দু হাজার একুশ সালে বসে ফেলুদার নারীবাদী ডিকন্সট্রাকশনের সময় এই গুরুত্বপূর্ণ স্বতঃসিদ্ধটি মাথায় রাখা প্রয়োজন।

ফেলু মিত্তিরের কাহিনীতে, সুতরাং, গুরুত্বপূর্ণ নারীচরিত্র বহুল মাত্রায় রাখা, অথবা প্রোটাগোনিস্টদের প্রেমিকার উপস্থিতি, কোনোটাই সম্ভব ছিল না।

দরকারও ছিল কি? ষাট থেকে আশির দশকের মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ অনুসরণ করে বেড়ে ওঠা কৈশোরের কাছে সত্যজিৎ এন্টারটেইনার মাত্র, নীতি প্রচারক নন। সাতাশ বছর বাদে অত্যন্ত ঐতিহ্যসম্পন্ন একটি পত্রিকা নতুন করে বার করাটাই একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ – গল্প লেখার সময় সন্দেশ পত্রিকার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করার এবং বিক্রি বাড়ানোর কথা মাথায় রাখতে হয়েছে সত্যজিৎকে, মাথায় রাখতে হয়েছে বইয়ের কাটতির কথা, কেন না তিনি এন্টারটেইনার, এবং বইয়ের রয়্যালটির পয়সায় খান। ফলে প্রকাশকের লাভ লোকসানের কথা মাথায় রেখে তিনি গল্পের কী ধরনের সার্বিক গঠন, কিরকম থালায় সাজিয়ে পরিবেশন করলে কোন প্রজন্মের কোন অডিয়েন্স তা কতটা খাবে সেটা বিচার করে কলম ধরেছেন সত্যজিৎ। এবং তা একেবারেই দোষের নয়। পৃথিবীর তাবৎ এন্টারটেনারের কাজই এই, কেউ তা সৎভাবে সোজাসুজি স্বীকার করেন, কেউ আবার আপন মাহাত্ম্য প্রচারের উদ্দেশ্যে নৈতিক দ্বিচারিতা করে ঢাক পিটিয়ে অস্বীকার করেন — এটুকুই তফাৎ। এটাই সত্য। বাস্তবকে মেনে নেওয়াটাও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিরই অঙ্গ।

কোনটা সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রকাশের অডিয়েন্স বা মিডিয়াম, এবং কোনটা শুধুই বিশুদ্ধ আনন্দদানের মাধ্যম, সে সম্পর্কে খুব পরিষ্কারভাবে ধারণা থাকা দরকার কোন সৃষ্টির ও তার স্রষ্টার উত্তরাধুনিক বিনির্মাণ অথবা পুনর্নির্মাণের সময়। সত্যজিৎ জেন্ডার ইকুয়ালিটি সংক্রান্ত সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট মাত্রায় সচেতন ছিলেন। মহানগরকাপুরুষ থেকে শুরু করে তাঁর একাধিক চলচ্চিত্র আছে যেখানে অত্যন্ত শক্তিশালী নারীচরিত্র কে এপিসেন্টারে রেখে কাহিনী আবর্তিত হয়েছে। ফেলু-উপাখ্যানকে তিনি সেইভাবে বানাতে পারেননি কারণ সেই সময়ে বসে একজন এন্টারটেইনার (কিশোর কিশোরীদের জন্য) হিসেবে সেটা করা সম্ভব ছিল না।

যেই মুহূর্তে একটি বিশেষ সময়কালের কিশোর সাহিত্যের বাধ্যতামূলক গন্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন সত্যজিৎ, সেই মুহূর্তেই কিন্তু তাঁর লেখায় জটিল নারীচরিত্রের উপস্থিতি নজরে পড়েছে। অক্সফোর্ড বুক স্টোর থেকে কেনা তাঁর সেই বিখ্যাত হার্ডবাউন্ড খাতায়, ১৯৬৫-তে ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি লেখা শেষ করেই তিনি লিখেছিলেন ময়ূরকন্ঠী জেলি নামে কল্পবিজ্ঞানের গল্প। ১৯৬৫ সালের শারদীয়া আশ্চর্য [১৫] পত্রিকায় সেই গল্প প্রকাশিত হয়। মৃত বৈজ্ঞানিক প্রদোষ সরকারের সুন্দরী স্ত্রী নিভা সরকারকে নিয়ে প্রদোষের বন্ধু শশাঙ্কশেখর বোসের মানসিক ও শারীরিক ফ্যান্টাসির পরিষ্কার উল্লেখ আছে সে গল্পে। নিভা সরকার সেই গল্পের একজন মুখ্য চরিত্রও বটে। পিকুর ডায়রি-তে (১৯৭০ সালে শারদীয়া আনন্দবাজারে প্রকাশিত) রয়েছে পরকীয়ার জটিল বিবরণ।

আজ, ফেলুদার প্রথম কাহিনী লেখার ছাপান্ন বছর বাদেও তাই যাঁরা ফেলুদার গল্প পড়ে মুগ্ধ হবেন, নিজেদেরকে জেন্ডার ইস্যুতে পলিটিক্যালি কারেক্ট নন ভেবে তাঁদের হীনমন্যতায় ভোগার কোনো কারণ নেই।

তথ্যসূত্র, টীকা ও গ্রন্থপঞ্জী

[১] বসু, বাদল, ‘পিওন থেকে প্রকাশক’, (অনুলিখন ও সম্পাদনা: বাগচী, সিজার), এপ্রিল ২০১৬ (প্রথম সংস্করণ), আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড।

[২] ছোট ছোট ছেলেমেয়ে এবং তাদের চারপাশের জগতের খেলার সাথী কুকুর বেড়াল কাঠবেড়ালি এবং অন্যান্য জন্তু যেমন হরিণ, ব্যাঙ, ইঁদুরছানার কাহিনী নিয়ে পুণ্যলতার লেখা এক বা আধ পাতার সাতচল্লিশটি গল্প বৈশাখ ১৩৭৪ বঙ্গাব্দ থেকে অশ্বিন ১৩৮১ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত সন্দেশে প্রকাশিত হয়। গল্পগুলি একত্র করে সত্যজিতের অলঙ্করণ সহ আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে।

[৩] রায়, সন্দীপ, ‘খসড়া খাতায় ফেলুদা’, সন্দেশ, তৃতীয় পর্যায়, বর্ষ ৩৫, সংখ্যা ৮, অগ্রহায়ণ সংখ্যা, ১৪০২ বঙ্গাব্দ (ডিসেম্বর ১৯৯৫ সংখ্যা), পৃষ্ঠা – ১৯৮

[৪] ২০১৬ সালের ৩০শে নভেম্বর আনন্দবাজার পত্রিকার বিনোদন বিভাগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সন্দীপ রায়ের বক্তব্য।

[৫] পঁয়তিরিশটি সম্পূর্ণ ফেলুদা কাহিনীর মধ্যে ইন্দ্রজাল রহস্য উপন্যাসটি সত্যজিতের মৃত্যুর পরে সন্দেশে প্রকাশিত হয় ধারাবাহিকভাবে, যদিও কালানুক্রমিক বিচারে সেটি রবার্টসনের রুবির আগেই লেখা হয়েছিল। এ ছাড়াও আদিত্য বর্ধনের আবিষ্কার নামে একটি অসম্পূর্ণ ফেলুদা কাহিনীর খসড়া পাওয়া গেছে। ২০০৪ সালে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত ফেলুদা একাদশ গ্রন্থে সেটি সংকলিত হয়েছে অভিজিৎ চট্যোপাধ্যায়ের ইলাস্ট্রেশন সহ। গ্রন্থভুক্ত হওয়ার আগে খসড়াটি ১৯৯৭ সালের শারদীয়া সন্দেশে প্রকাশিত হয়েছিল। এ ছাড়াও কয়েকটি খসড়া পাওয়া গিয়েছে, যেগুলি, প্রকাশিত ফেলুদা কাহিনীর বিভিন্ন রূপ – পরে পাল্টে প্রকাশিত উপন্যাসগুলোর ফাইনাল ফর্ম দেওয়া হয়।

[৬] তৃতীয় পর্যায়, বর্ষ ৩৫, সংখ্যা ৮, অগ্রহায়ণ সংখ্যা, ১৪০২ বঙ্গাব্দের বিশেষ ফেলুদা সংখ্যাটির প্রচ্ছদকাহিনী ছিল ফেলুদা ৩০, অর্থাৎ ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি নভেলেটের ত্রিশতম বর্ষপূর্তি সংখ্যা। সম্পাদনায় ছিলেন লীলা মজুমদার ও বিজয়া রায়, সহযোগী সম্পাদক হিসেবে ছিলেন সন্দীপ রায়। প্রচ্ছদ সন্দীপ রায় করেছিলেন, এবং অলংকরণে ছিলেন সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়, তা ছাড়াও সত্যজিৎ রায়ের করা কিছু ইলাস্ট্রেশনও ছিল। এই সংখ্যাতেই সত্যজিতের মৃত্যুর পরে খুঁজে পাওয়া ইন্দ্রজাল রহস্য কাহিনীটি ধারাবাহিকভাবে বেরোতে শুরু করে। ইন্দ্রজাল রহস্য লেখা হয়েছিল ১৯৮৭ সালে, সেই বছরের শারদীয়া সন্দেশে প্রকাশিত অপ্সরা থিয়েটারের মামলা লেখার আগেই। কেন সেটি সত্যজিৎ তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশ করেননি তা অজ্ঞাত।

[৭] ফেলুদা ৩০ বিশেষ সংখ্যায় সন্দীপ রায়ের দুটি অবদান সহ মোট ৩৬ টি নিবন্ধ, এবং সত্যজিৎ রায়ের খেরোর খাতা ও ফেলুদার ফটো অ্যালবাম বেরোয়। ওই সংখ্যার প্রথম লেখাটি ছিল ‘ফেলুদাকে’ শীর্ষক রেবন্ত গোস্বামীর একটি কবিতা এবং জটায়ু-সন্দেশ নামের শেষ লেখাটি ছিল নবনীতা দেব সেনের। ২২০ পাতার বিশেষ সংখ্যাটির দাম ছিল ৩০ টাকা, সম্ভবত তিরিশে তিরিশে মিলিয়ে দাম ধরা হয়েছিল। সন্দেশের নিয়মিত সংখ্যাগুলির দাম তখন ছিল সাড়ে আট টাকা।

[৮] উদাহরণস্বরূপ, গ্যাংটকে গন্ডগোলে খুন হওয়া শিবকুমার শেলভাঙ্কারের ছেলে হেলমুট উঙ্গার (শেলভাঙ্কারের দ্বিতীয় স্ত্রী হেলগা উঙ্গারের সন্তান), বা রয়েল বেঙ্গল রহস্যে মহীতোষ সিংহরায়ের দাদা দেবতোষ সিংহরায় – এবং এরকম আরো অনেকে।

[৯] উদাহরণস্বরূপ, বাক্স রহস্য-তে দীননাথ লাহিড়ীর ভাইপো প্রবীর কুমার লাহিড়ী, কিংবা সমাদ্দারের চাবি-তে রাধারমণ সমাদ্দারের ভাইপো মণিমোহন সমাদ্দার – বা এরকম আরো অনেকে।

[১০] নেপোলিয়নের চিঠি-তে বালক অনিরুদ্ধ হালদার, তার বাবা অমিতাভ হালদার এবং ঠাকুরদাদা পার্বতীচরণ হালদার একসাথে একই বাড়িতে থাকেন বারাসাতে।

[১১] তোপসের বয়ানে পাই উনি হলেন প্রীতীনবাবুর স্ত্রী নীলিমা দেবী। এঁকে দেখে বুঝলাম যে চৌধুরী পরিবারের সকলেই বেশ ভালো দেখতে

রাজরাপ্পায় পিকনিক চলার সময় নীলিমা দেবীর বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটি থেকে, যেমন লালমোহনবাবুর সাথে জল মাটি আকাশ খেলার সময়, বোঝা যায় নীলিমা দেবী যথেষ্ট মিশুকে এবং স্মার্ট। আমরা এটাও জানতে পারি যে মহেশবাবুর দুর্ঘটনা ঘটার পর বাড়ি ফিরেই নীলিমাদেবী অতিথিদের দেখাশুনার কাজে কোনো ঢিলে দেননি। পিকনিক আর হয়নি, তাই কারুর খাওয়া হয়নি। কিন্তু এই অবস্থার মধ্যেই প্রীতীনবাবুর স্ত্রী আমাদের পরোটা, আলুর দম, মাংসের কাবাব ইত্যাদি এনে দিলেন। আশ্চর্য শক্ত বলতে হবে ভদ্রমহিলা ”

[১২] ..রীতিমতো সুন্দরী মহিলা, তার উপর যাকে বলে ‘ব্রাইট’। বয়েস চল্লিশের ওপর হলেও দেখে বোঝার জো নেই – তোপসের জবানিতে রুনার মা’র বর্ণনা।

[১৩] আগের লাইনেই কিশোর-কিশোরী লিখে তারপরের লাইনগুলোতে শুধু কিশোর লেখাটা সম্ভবত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়, নেহাতই ক্যাজুয়াল। ফলে শুধু কিশোর কেন, কিশোরী নেই কেন – সুতরাং জেন্ডার বায়াস আছে – এই অভিযোগ তোলা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক হবে বলেই প্রতিবেদকের বিশ্বাস।

[১৪] পুণ্যলতা চক্রবর্তীর মেয়ে বিশিষ্ট বিদুষী নলিনী দাশ সর্বপ্রথম কিশোর সাহিত্যে মহিলা গোয়েন্দা চরিত্রের আমদানি করেন। পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের সীমান্তে একটি কাল্পনিক জায়গার বোর্ডিং স্কুলের ক্লাস এইটের চার ছাত্রীই গোয়েন্দা। তারা হোস্টেলে একই ঘরে থাকে, এবং তাদের সবার ডাক নামের শেষে `লু’, সেই অর্থে এক গন্ডা লু বা গন্ডালু। মোট ২৯ টি গল্প লেখা হয় সন্দেশে গোয়েন্দা গন্ডালুদের নিয়ে। অলংকরণ করেন সত্যজিৎ রায়। সত্যজিৎ মোট পঞ্চান্নটি ছবি এঁকেছিলেন গন্ডালুর গল্পগুলির জন্য। টাইমলাইন দেখতে গেলে, এটা খুবই ইন্টারেস্টিং যে গন্ডালু আর ফেলুদা প্রকাশিত হত একই সময়ে – অনেকবার ই এমন হয়েছে যে সন্দেশের পুজোসংখ্যায় ফেলুদা এবং গন্ডালু একই সাথে প্রকাশিত হয়েছে। তা সত্ত্বেও কিন্তু ফেলুদার গল্পে বান্ধবী বা গন্ডালুর গল্পে কারো বয়ফ্রেন্ডের উদয় হয়নি। লেখক লেখিকা সেটা চাননি, সমাজের দাবি মেনেই নিশ্চয়।

[১৫] বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম কল্পবিজ্ঞান পত্রিকা আশ্চর্য ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয়। স্বনামধন্য কল্পবিজ্ঞান লেখক অদ্রীশ বর্ধন, আকাশ সেন ছদ্মনামে পত্রিকাটির সম্পাদনা করতেন। বাংলা ভাষায় লেখা বহু বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান গল্প ও প্রবন্ধ এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

Leave a Reply