‘ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন’ বা ‘হারাকাত আল-মুকাওয়ামা আল-ইসলামিয়া’ – সংক্ষেপে হামাস নাম। আমাদের যাদের জন্ম নয়ের দশকে, ইজরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব মাথা চাড়া দিয়ে উঠলেই সংবাদপত্রের ছাপার অক্ষরে অথবা দূরদর্শনে ফিলিস্তিনের প্রধান প্রতিরোধ শক্তি হিসাবে এই সংগঠনের নামই শুনে এসেছি চিরকাল। একেবারে সাম্প্রতিক সংঘাতেও প্রিন্ট থেকে সোশ্যাল – সবরকম মিডিয়াতেই ফিলিস্তিনের একপ্রকার প্রতিনিধি হিসাবেই উঠে এসেছে হামাসের নাম। অথচ এই ইসলামী সংগঠনটি দীর্ঘদিনের ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রামের প্রতিনিধিত্বকারী প্যালেস্তিনিয়ান লিবারেশন অর্গানাইজেশন বা পিএলওর অংশ তো নয়ই, বরং তার প্রবল শত্রু। আশির দশকের শেষদিকে প্রতিষ্ঠার পর থেকে হামাসের উল্কাবেগে উত্থান বহু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষককেই চমকে দিয়েছে। যে ফিলিস্তিনি আন্দোলন মূলত ধর্মনিরপেক্ষ, জাতীয় মুক্তি আন্দোলন ছিল, জর্জ হাবাশের মত ফিলিস্তিনি খ্রিষ্টান যে আন্দোলনের একদা প্রাণপুরুষ ছিলেন — সেই আন্দোলনের রাশ ক্রমশ হামাসের মত একটি কট্টর ইসলামী সংগঠনের হাতে চলে যাওয়া সত্যিই ছিল অবাক করার মত। তাই বর্তমান ফিলিস্তিনের বদলাতে থাকা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে উপলব্ধি করতে হলে হামাসের শিকড় সন্ধান করা একান্তই জরুরি।
হামাসের সৃষ্টি পুরনো ফিলিস্তিনি মুসলিম ব্রাদারহুড থেকে। ১৯২৮ সালে হাসান আল-বান্না মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুড প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠন পশ্চিম থেকে আধুনিকীকরণের যে ঝোড়ো বাতাস বইছিল তাকে প্রতিহত করার জন্য একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং অচিরেই সমগ্র আরব দুনিয়ায় বিস্তার লাভ করে। রাজনীতি থেকে সাধারণত এই সংগঠন দূরেই থাকত। এর ফল হয় দ্বৈত। এক দিকে যেমন এর ফলে ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহের অনেক দমন পীড়ন এঁদের পক্ষে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল, অন্যদিকে তেমন জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে বিশেষ অংশগ্রহণ না করার কারণে ঔপনিবেশিক যুগের অবসানে রাজনৈতিক প্রভাব তাঁরা বিশেষ বিস্তার করতে পারেননি। এই একই বিষয় আমরা ফিলিস্তিনের মুসলিম ব্রাদারহুডের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করব। স্বভাবতই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে আরব দুনিয়ায় যে রাজনৈতিক মতাদর্শ জনপ্রিয় হতে শুরু করে তা রাজনৈতিক ইসলাম নয়, বরং ধর্মনিরপেক্ষ প্যান-আরব মতাদর্শ এবং সমাজতন্ত্রী বাথিস্ট ও নাসেরিস্ট চিন্তাভাবনা।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে মিশরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসেরকে এই সংগঠনের হত্যা করার ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর প্রেসিডেন্ট নাসের ইসলামিক ব্রাদারহুডকে তার জন্মভূমিতেই নিষিদ্ধ করে দেন এবং তার উপর নানা প্রকার নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এই সময় সিআইএ মুসলিম ব্রাদারহুডকে প্রচুর পরিমাণ অর্থসাহায্য দেয়, কেননা ওয়াশিংটনের হিসাবে চুড়ান্ত মার্কিন বিরোধী নাসেরকে উৎখাত করার ক্ষমতা ব্রাদারহুডের ছিল। এই সময় গাজা ভূখণ্ড মিশরের অধীনে ছিল, এবং নাসের সেখানেও ফিলিস্তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডকে মূল থেকে উচ্ছেদ করার প্রচেষ্টা করতে থাকেন। এই সময় গঠিত পিএলও-ও এই সংগঠনগুলোর প্রতি যথেষ্ট বিরূপ মনোভাবাপন্ন ছিল। কিন্তু এই অবস্থার পরিবর্তন হয় ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দের আরব-ইজরায়েল যুদ্ধে মিশরের শোচনীয় পরাজয় এবং গাজা ও সিনাই উপদ্বীপ ইজরায়েলের হাতে চলে যাওয়ার পর। ইজরায়েল নাসেরের নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত নীতি গ্রহণ করে। তাদের চোখে মূলত সামাজিক ও ধর্মীয় কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত ফিলিস্তিনি মুসলিম ব্রাদারহুড প্রধান সমস্যা ছিল না, বরং পিএলও এবং তার সশস্ত্র সংগ্রাম চিন্তার বিষয় ছিল। এই কারণে ইজরায়েল ধর্মনিরপেক্ষ পিএলওর উপর একদিকে চূড়ান্ত দমনপীড়ন নামিয়ে আনে, অপর দিকে মুসলিম ব্রাদারহুডকে পরোক্ষ, কখনও কখনও প্রত্যক্ষ সমর্থন প্রদান করে। উদ্দেশ্য ছিল পিএলওর বিরোধী একটি সংগঠন যেন ফিলিস্তিনের সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে পারে ও তার জনভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে তা নিশ্চিত করা।
এই পরিস্থিতির পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করেন ব্রাদারহুড নেতা শেখ আহমেদ ইয়াসিন। মুসলিম ব্রাদারহুডের ‘মুজামা আল-ইসলামিয়া’ নামক সমাজসেবামূলক সংগঠন প্রায় দুই দশকের দমন পীড়নের পর এই প্রথম খোলামেলাভাবে কাজ করতে সচেষ্ট হয়। প্রাথমিকভাবে ইজরায়েলের লক্ষ্য পূর্ণ হয়েছিল। গাজাতে পিএলওর প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায় এবং ফিলিস্তিনি মুসলিম ব্রাদারহুড সমাজসেবা, মসজিদ নির্মাণ, ইসলামিক শিক্ষা প্রদানকারী স্কুল প্রতিষ্ঠা — এর মধ্যেই নিজের কর্মসূচী সীমাবদ্ধ রাখে। এই সময় ইজরায়েল অধিকৃত ওয়েস্ট ব্যাংকেও মুসলিম ব্রাদারহুড সক্রিয় ছিল, কিন্তু সেখানে পিএলওর সংগঠনের শিকড় ছিল আরও গভীরে, তাই এই অঞ্চলে ব্রাদারহুডের পক্ষে তেমন প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু গাজাতে চিত্র ছিল বিপরীত। এখানে খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই ব্রাদারহুড নিয়ন্ত্রিত মসজিদের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।
আরো পড়ুন হিজাববিরোধী ইরান: বিপ্লব চাপিয়ে দেওয়া যায় না
১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে ইরানে ইসলামিক বিপ্লব ও ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার পর রাজনৈতিক ইসলাম মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমশ জনপ্রিয়তা অর্জন করতে শুরু করে। আফগানিস্তানে মার্কিন সমর্থিত মুজাহিদিনদের সোভিয়েত সেনা ও আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে সাফল্য এই জনপ্রিয়তাকে আরও বৃদ্ধি করে। ফিলিস্তিনও এই সাধারণ ঝোঁকের বাইরে ছিল না। ১৯৮০-র দশকে ফিলিস্তিনে, বিশেষ করে গাজায় ফতেহ বা পিএলএফপির মত সংগঠনের পরিবর্তে ক্রমশ ব্রাদারহুড শক্তি সঞ্চয় করতে সক্ষম হয়। গাজায় ব্রাদারহুডের এই সাফল্য লাভের আরও একটি কারণ ছিল। ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে ফিলিস্তিনের মুসলিম ব্রাদারহুড যেখানে শুধুই ফিলিস্তিনি সমাজের ইসলামীকরণের প্রচেষ্টার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছিল, গাজাতে ধীরে কিন্তু স্থিরভাবে ব্রাদারহুডের সংগঠনগুলি মূল জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের রাজনৈতিক ধারাতেও অংশগ্রহণ করছিল। তাই ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম ইন্তিফাদার সময় ব্রাদারহুডের গাজা শাখাই প্রথম সামাজিক সংগঠন থেকে সরাসরি রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবে আত্মপ্রকাশ করার পদক্ষেপ নেয়। শেখ আহমেদ ইয়াসিন, মাহমুদ আল-জাহারের মত নেতাদের হাত ধরে জন্ম নেয় হামাস।
হামাস আত্মপ্রকাশ করার পর পিএলওর মতই ঘোষণা করে তারা জর্ডন নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করার লক্ষে সংগ্রাম করবে। কিন্তু এই রাষ্ট্রের চরিত্র ও সংগ্রামের ধরণ প্রসঙ্গে হামাস এতদিনের বিভিন্ন ফিলিস্তিনি সংগঠনের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য রাখে। অপর সকল ফিলিস্তিনি সংগঠন তাদের সংগ্রামকে একটি জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম হিসাবে চিহ্নিত করে এসেছে এবং তাদের কাঙ্ক্ষিত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, যেখানে আরব ও ইহুদি উভয়ের অধিকারই সমানভাবে রক্ষিত হবে। এই প্রসঙ্গে ইজরায়েল রাষ্ট্রের জায়নবাদী ধর্মভিত্তিক ‘Promised Land’-এর ধারণাকে চিরকালই ফিলিস্তিনের মুক্তিসংগ্রাম পরিচালনাকারী দলগুলি আক্রমণ করে এসেছে। পিএলএফপির নেত্রী লায়লা খালেদের বিখ্যাত উক্তি ছিল “Do you think God has a real estate agency? God promises to give land to those people and that people?” অপর ফিলিস্তিনি নেতারাও চিরকাল বলে এসেছেন ইজরায়েলের মত কোনো ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র তাঁরা গঠন করতে আগ্রহী নন। কিন্তু হামাস এই অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ সরে আসে। তারা ফিলিস্তিনকে মুসলিমদের পবিত্রভূমি ও দৈবসম্পত্তি বা ‘ওয়াকফ’, এবং তাকে মুক্তি করার সংগ্রামকে জিহাদ হিসেবে চিহ্নিত করে। কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের চরিত্র হবে ইসলামিক, এই মর্মেও বক্তব্য রাখে হামাস। এর ফলে হামাস যত শক্তি অর্জন করতে শুরু করে, আন্তর্জাতিক মহলে ফিলিস্তিনের সংগ্রামের যে উচ্চ নৈতিক ভূমি ছিল, তাও ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে। এর পূর্বে এই সংগ্রাম ছিল, ঘাসান কানাফানির ভাষায় “A liberation movement fighting for justice”। কিন্তু হামাস ক্রমে এই সংগ্রামকে জায়োনিস্ট ধর্মভিত্তিক যুক্তির প্রতিপক্ষের আসনে বসিয়ে দেয়।
প্রথম ইন্তিফাদা চলাকালীনও হামাস আর ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষের মধ্যে যোগাযোগ বজায় ছিল। ইজরায়েলের দৃষ্টিতে হামাস তখনও ছিল “lesser evil” এবং তখনও ইজরায়েলের কর্তৃপক্ষ গোপনে হামাসের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছিল। এই যোগাযোগ শুধু নিচের স্তরে ছিল এমন নয়। হামাসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মাহমুদ আল-জাহার এই সময়েই ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ইৎজহাক রাবিনের সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাৎ করতেন। কিন্তু প্রথম ইন্তিফাদাই হামাসের রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্রমশ বৃদ্ধি করতে থাকে। পিএলও ইজরায়েলের অস্তিত্ব ও দুই-রাষ্ট্র সমাধান মেনে নিলে হামাসের উগ্রবাদী অবস্থান সাধারণ মানুষের অনেকের কাছেই আপোসহীন সংগ্রামী মানসিকতা হিসাবে ধরা দেয়। ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে পিএলও এবং ইজরায়েলি সরকারের মধ্যে অনুষ্ঠিত অসলো অ্যাকর্ডের হামাস তীব্র সমালোচনা করে এবং ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে ইহুদি সন্ত্রাসবাদীদের দ্বারা হেব্রনের মসজিদে প্রার্থনার সময় ফিলিস্তিনিরা আক্রান্ত হলে সেই সমালোচনাকে তারা প্রতিযোগিতামূলক সন্ত্রাসবাদে রূপান্তরিত করে। ইজরায়েল ও ফিলিস্তিন – দুই রাজনৈতিক প্রেক্ষিতেই আপোষমুখী ও শান্তিকামী পিএলও এবং লেবার জায়নিস্টরা ক্রমশ রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হতে থাকে এবং প্রতিযোগিতামূলক চরমপন্থী অবস্থান নিয়ে সেই স্থান দখল করে ইজরায়েলে ক্ষেত্রে লিকুদ এবং ফিলিস্তিনে হামাস।
৯০-এর দশকে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ হামাসকে প্রথম সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে নিয়ে আসে, যদিও অধিকাংশ ফিলিস্তিন জনতা কখনই এই পন্থাকে সঠিক বলে মনে করেনি এবং ইয়াসের আরাফত ও পিএলওর দিকেই তখনও জনসমর্থনের পাল্লা ভারি ছিল। এছাড়া হামাসের ইসলামীকরণ প্রক্রিয়া, জোর করে হিজাব চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা প্রভৃতি কার্যকলাপও ফিলিস্তিনের জনতা ভাল চোখে দেখেনি। যে কোন বিচক্ষণ রাজনৈতিক দলের মতই হামাস ক্রমে তার মুসলিম ব্রাদারহুড থেকে প্রাপ্ত মুলত ধর্মনিরপেক্ষ ফিলিস্তিনি সমাজের ইসলামীকরণের প্রকল্প ৯০-এর দশকের শেষ থেকেই মুলতুবি রেখে ফিলিস্তিনের মুক্তির জন্য “সশস্ত্র জিহাদ” এবং বিভিন্ন সমাজ কল্যাণমূলক কর্মসূচীর দিকেই জোর দিল। ২০০০ সাল থেকে যে দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সূচনা হয়, সেখানে দেখা যায় হামাসই বিভিন্ন সশস্ত্র কার্যকলাপ পরিচালনা করছে। অসলো অ্যাকর্ডের ব্যর্থতা ও প্যালেস্তিনীয় কর্তৃপক্ষের দুর্নীতি এমনিতেই সাধারণ মানুষের মনে পিএলও সম্পর্কে একপ্রকার বীতশ্রদ্ধ মনোভাবের জন্ম দিয়েছিল। দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময় তাদের অপেক্ষাকৃত নরমপন্থী, আপোষমুখী অবস্থানে সেই মনোভাব আরও বৃদ্ধি পায়।
এই প্রেক্ষিতে ২০০৫ সালে গাজা থেকে ইজরায়েলের একতরফা সরে যাওয়ার ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে হামাসের সশস্ত্র জিহাদের পন্থার যথার্থতাই প্রমাণ করে। এই ঘটনা ও ইয়াসের আরাফতের মৃত্যু পরবর্তী যে বিশাল রাজনৈতিক শূন্যস্থান সৃষ্টি হয়েছিল, তাকে কাজে লাগিয়েই হামাস ২০০৬ সালে ফিলিস্তিনের সংসদের নির্বাচনে ১৩২টি আসনের মধ্যে ৭৪টি আসনে জয়লাভ করে। এই ঘটনা ফিলিস্তিনের রাজনীতির একটি জলবিভাজিকা বলে গণ্য হতে পারে। হামাসের এই বিজয় প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘ চার দশকের ফিলিস্তিনি ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের প্রধান চালিকাশক্তি পিএলওর জন্য এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক, আদর্শগত ও নৈতিক পরাজয়। ইজরায়েলের ক্ষেত্রে এ যেন ছিল ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের তারই সৃষ্ট ও মদতপুষ্ট রাক্ষসের মুখোমুখি হওয়া। হামাস ও পিএলও এই সংঘাত অচিরেই গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতিতে পৌঁছয় এবং ২০০৭ সালে তা প্রত্যক্ষ গৃহযুদ্ধের রূপ নেয়। রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বে পিএলও ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে এবং প্রধানমন্ত্রী ইসমাইল হানিয়ার নেতৃত্বে হামাস গাজার দখল নেয়। ফিলিস্তিন অধ্যুষিত ভূখন্ড কার্যত দুই যুযুধান বিপরীত মতাদর্শের সংগঠনের মধ্যে দ্বিখন্ডিত হয়ে যায়।
গাজা ভূখণ্ডে ক্ষমতা দখলের পর হামাস দ্বৈত সংগ্রামের নীতি গ্রহণ করে। সাধারণত কোন সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ক্ষমতায় এলে শাসনের বাস্তবতা তার উগ্রতাকে বহুলাংশেই প্রশমিত করে। হামাসের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে কিন্তু তা হয়নি। হামাস একইসঙ্গে শাসনের বাস্তবতা বজায় রেখেছে এবং ইজরায়েলের বিরুদ্ধে তাদের রাজনৈতিক জিহাদও চালিয়ে গেছে। এর প্রধান কারণ ছিল প্রাথমিকভাবে সিরিয়া ও ইরান, দুই শক্তির তরফ থেকেই বিপুল পরিমাণ অর্থ ও অস্ত্রের সহায়তা লাভ করা। এছাড়াও হামাস তার সশস্ত্র শাখা ‘ইজ্জউদ্দিন আল-কাসসাম ব্রিগেড’-কে ক্রমশ একটি সমান্তরাল সংগঠন হিসাবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে একাধারে সিরিয়া ও ইরানের সহায়তায় হামাস গাজায় যেমন রাষ্ট্রীয় শক্তি হিসাবে কাজ করতে পেরেছে, অন্য দিকে ‘ইজ্জউদ্দিন আল-কাসসাম ব্রিগেড’-এর মাধ্যমে অরাষ্ট্রীয় শক্তি হিসাবে তাদের সশস্ত্র কাজ চালিয়ে যেতে পেরেছে। কিন্তু প্রাথমিকভাবে এই পদ্ধতিতে হামাস সাফল্য অর্জন করলেও ২০১০-এর পর তারা নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে শুরু করে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে তাদের আসাদবিরোধী অবস্থান এবং ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে ইরানবিরোধী অবস্থান সিরিয়া ও ইরান উভয় সরকারকেই হামাসের প্রতি ক্ষুব্ধ করে এবং দুই দেশের তরফ থেকেই সাহায্য তলানিতে ঠেকে। অপর দিকে মিশরে সাময়িকভাবে মহম্মদ মোরসির মুসলিম ব্রাদারহুড সরকারের প্রতিষ্ঠা হামাসকে উজ্জীবিত করলেও অচিরেই ফত্তাহ আল-সিসি তাকে উৎখাত করে মিশরে ক্ষমতায় আসে এবং হামাসের শেষ আশাও ফুরিয়ে যায়। সিসি সরকার শুধু মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ করেনি, গাজার যে অংশটা মিশরের সীমান্ত সংলগ্ন তা সম্পূর্ণ অবরোধ করে।
গাজার ইজরায়েল সংলগ্ন সীমান্ত এর আগে ইজরায়েল অবরোধ করেই রেখেছিল, দক্ষিণের মিশর সংলগ্ন সীমান্ত অবরোধের পর গাজার অবস্থা হয় কার্যত জেলখানার মত। হামাসের আর্থিক সমস্যা এত বেড়ে যায়, যে সরকারী কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার মত অর্থও তাদের ছিল না। এই পরিস্থিতিতে খালেদ মিশালের নেতৃত্বে হামাস পিএলওর সঙ্গে সমঝোতা করে নিতে আলোচনা চালাতে বাধ্য হয়। এই আলোচনা অনেকটা এগোলেও এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ সফল হয় নি। অন্যদিকে মতাদর্শগত দিক থেকেও বর্তমানে হামাস পশ্চাদগমন করছে। গাজায় তাদের ইসলামীকরণ প্রকল্প সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। অন্য দিকে আবার ইজরায়েলের বিরুদ্ধেও তারা রকেট নিক্ষেপ (যার অধিকাংশই আয়রন ডোম মিসাইল সিস্টেম দিয়ে ইজরায়েল প্রতিহত করেছে) আর কিছু বিক্ষিপ্ত আক্রমণ ছাড়া বিশেষ কিছু করতে পারেনি। একথা ঠিক, বিকেন্দ্রীভূত নেতৃত্ব থাকার জন্য মোসাদ পিএলওর মত হামাসের নেতাদের হত্যা করে সংগঠনকে দুর্বল করতে পারেনি, কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে এও সঠিক যে বিকেন্দ্রীভূত সংগঠনের জন্যই হামাস কোন সামঞ্জস্যপূর্ণ পদক্ষেপও নিতে পারেনি। বিশেষ করে ‘ইজ্জউদ্দিন আল-কাসসাম ব্রিগেড’-এর সঙ্গে হামাস নেতৃত্বের বারংবার মতৈক্যের অভাব দেখা গেছে। ফাটল দেখা গেছে ফিলিস্তিনের মধ্যে এবং ফিলিস্তিনের বাইরে বসবাসকারী নেতৃত্বের মধ্যেও।
এই প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালে হামাস যে নতুন চার্টার প্রকাশ করে তা গুরুত্বপূর্ণ। এই চার্টারে হামাস কার্যত ইজরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান মেনে নিয়েছে এবং ইজরায়েল রাষ্ট্রকেও স্বীকৃতি দিয়েছে। হামাস যে তার রাজনৈতিক অবস্থানে ক্রমেই নরমপন্থী হচ্ছে, কিছুটা বাধ্য হয়েই, এই চার্টারই তার প্রমাণ।
আরব দুনিয়ায় রাজনৈতিক ইসলামে এখন ভাঁটার টান চলছে। বিভিন্ন ইসলামপন্থী দল আগের মত আর কট্টরপন্থী অবস্থান গ্রহণ করছে না এবং তারা মধ্যপন্থী অবস্থান গ্রহণের পরেও নির্বাচনে বারংবার পরাজয়ের সম্মুখীন হচ্ছে নানা দেশে। বিভিন্ন দেশে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বা প্রভাব বিস্তার করার পর রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা যে মূলগত সমস্যা সমূহের সমাধানে ব্যর্থ, তা বারংবার প্রমাণিত হচ্ছে। হামাসও এই ঝোঁকের বাইরে নয়। ২০২১-এ ফিলিস্তিনের নির্বাচন যদি স্বাভাবিকভাবে অনুষ্ঠিত হতে পারত, তাহলে এই সত্য বাস্তবেও প্রমাণিত হত। কিন্তু শেখ-জারা থেকে বলপূর্বক ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ, আল-আকসা মসজিদে প্রার্থনার সময় সেখানে ইজরায়েলের হামলা এবং তার প্রতিরোধে হামাসের রকেট হামলা তাদের জনপ্রিয়তাকে সাময়িকভাবে হলেও বৃদ্ধি করেছে। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন যদি হয়, কিছু লাভের ফসল হামাস ঘরে তুলতেও পারে। কিন্তু সামগ্রিক প্রেক্ষিতে যে চক্রব্যূহে হামাস ধরা পড়েছে, তা থেকে তারা বেরোতে পারবে কিনা, এর উত্তর জানে একমাত্র ভাবীকাল।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








