জেমস কোনোলি

(গত ৮ সেপ্টেম্বর এলিজাবেথ উইন্ডসর নামক এক ব্রিটেনবাসিনী নবতিপর ভদ্রমহিলার মৃত্যুর পরে গোটা পৃথিবীতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধার বন্যা বয়ে যায়। তিনি ব্রিটেনের ‘রানি’। ভারত সরকার জাতীয় শোক পালন করে রানীর স্মৃতিতে এবং ভারতের বহু মানুষ এ দেশের একদা অত্যাচারী শাসক রানির গুণগান গাইতে শুরু করেন। গণতান্ত্রিক সমাজে রাজতন্ত্রের মত ঘৃণ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত কাঠামো নিপাত যাবে — এই আশা রেখে আয়ারল্যান্ডের বিখ্যাত সোশালিস্ট নেতা ও স্বাধীনতা সংগ্রামী জেমস কোনোলির ১৯১১ সালে লেখা ‘Visit of King George V লেখাটি অনুবাদ করলাম। কোনোলিকে ব্রিটেনের সাম্রাজ্যবাদী সরকার ও রাজতন্ত্রের গুন্ডারা ১৯১৬ সালে ইংল্যান্ডবিরোধী ইস্টার রাইজিংয়ের পরে খুন করে — অনন্য চক্রবর্তী)

সাথিরা,

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আপনারা সকলেই দৈনিক খবরের কাগজ পড়ে জানেন যে রাজা পঞ্চম জর্জের রাজকীয় আগমন আমাদের শীঘ্রই ধন্য করতে চলেছে।

এর আগের রাজসফরগুলোর অভিজ্ঞতা এবং রাজ্যাভিষেক ঘিরে গত কয়েক সপ্তাহের পাগলামি দেখে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি, যে এই অনুষ্ঠানটি শুধুমাত্র রাজতন্ত্র ও উঁচ্চশ্রেণির শাসনের পক্ষে এবং গণতন্ত্র ও জাতীয় মুক্তির বিপক্ষে প্রচারের স্বার্থে ব্যবহার করা হবে। সেইজন্য এই অনুষ্ঠানটির কোনো মিছিল বা সম্মেলনে আপনাদের কেন যোগ দেওয়া উচিত নয়, তার কয়েকটি কারণ তুলে ধরতে চাই। আমরা শ্রমিক হিসাবে সমস্ত শ্রমিককে এই অনুষ্ঠান বয়কট করার আহ্বান জানাচ্ছি। আপনারা যে যে রকমের কাজই করুন না কেন– সে মাথার কাজ হোক বা শরীরের — আপনাদের এবং আপনাদের সন্তানদের কথা আমরা চিন্তা করছি; আপনাদের স্বার্থকেই আমরা রক্ষা করতে এবং এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।

শ্রমজীবী মানুষের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করতে সমস্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক পদের উপর সমস্ত নারী ও পুরুষের অধিকার থাকা উচিত; বংশ বা সম্পত্তিভিত্তিক সব বিশেষ অধিকার তুলে দেওয়া উচিত এবং এই মাটিতে জন্মানো সমস্ত নারী-পুরুষের এই দেশের উচ্চতম পদে বসার সমান সুযোগ থাকা উচিত। দ্য সোশালিস্ট-এর মতে, যে কোনো সরকারি পদ লাভের জন্য শুধু মানুষ হয়ে জন্মানো ছাড়া আর কোনো জন্মগত অধিকারের প্রয়োজন হওয়া উচিত নয়।

মনুষ্যত্বের চেয়ে পবিত্র আর কিছু নয় — এই বিশ্বাস থেকে আমরা ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের প্রতি সমস্ত আনুগত্য অস্বীকার করছি এবং রাজার সফরকে সেইসব লুটেরা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমাদের তীব্র ঘৃণার আগুনে নতুন করে ঘি ঢালা মনে করছি, যে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধি এই রাজা। পুঁজিপতি ও জমিদার শ্রেণির লোকজন রাজার চারপাশে মৌমাছির মত ভনভন করুক। তিনি তাদেরই লোক; তাঁর মধ্যেই তারা শ্রেণি ও জাতি বৈষম্যের প্রতিমূর্তি দেখতে পায়; তারাই রাজার গৌরবকীর্তন করে এবং জনমানসে তাঁর প্রতি আনুগত্য ও সার্বিক রাজনৈতিক বৈষম্যের ভাব সৃষ্টি করতে চায়। কারণ তারা জানে যে রাজতন্ত্রের প্রতি অন্ধ শ্রদ্ধার বিষ মানুষের মনে গেঁথে থাকলে তারা কোনোমতেই গণতন্ত্রের মর্ম — যা সামাজিক স্বাধীনতার জন্য ভীষণ জরুরি — ঠিকমত বুঝতে পারবে না। রাজনৈতিক রাজায় অভ্যস্ত মনকে খুব সহজেই সামাজিক রাজার অধীনে আনা যায়। অর্থাৎ ওয়ার্কশপ, মিল, রেল, জাহাজ ও বন্দরের পুঁজিপতি রাজার অধীনে। সুতরাং রাজার অভিষেক আর রাজার সফরের মত অনুষ্ঠানগুলো আমাদের জালিয়াত ও নিদ্রাহীন মালিকপক্ষ গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী প্রচার হিসাবে ব্যবহার করছে। কিন্তু আমাদের মালিক এবং রাজারা যদি আমাদের সর্বনাশ করার জন্য না ঘুমিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম করা উচিত, জেগে উঠে নিজেদের সাথিদের কাছে প্রকাশ্যে শ্রমিকশ্রেণির সম্মান বজায় রাখার আহ্বান করে যাওয়া উচিত এবং গণমুক্তির রাস্তা তৈরি করা উচিত।

রাজতন্ত্র কী? কোথা থেকে সে নিজের ক্ষমতা লাভ করে? মানবজাতির উন্নতিসাধনে তার কী ভূমিকা? রাজতন্ত্র সেই অন্ধকার দিনের অত্যাচারের ধ্বংস না হওয়া রূপ, যা লোভ ও তঞ্চকতার কালো হাতে তৈরি। সে ক্ষমতা অর্জন করে দস্যুর তলোয়ারের দমে এবং উৎপাদকের সর্বনাশের উপর ভর করে। মানবসভ্যতায় তার অবদান কী তা বোঝা মুশকিল। শুধুমাত্র উন্মত্ত, নির্লজ্জ বৈষম্যের পরিমাপেই তার বিচার করা সম্ভব।

আমাদের সমাজে ব্রিটিশ রাজতন্ত্র ছাড়া সব শ্রেণির মানুষেরই সামাজিক উন্নতিসাধনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। কিন্তু ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের কোনো প্রতিনিধি শিল্পকলা, বিজ্ঞান, সাহিত্য, যান্ত্রিক গবেষণা, আইনব্যবস্থার গণতন্ত্রীকরণসহ কোনো মানবিক পরিসরে অবদানের মধ্য দিয়ে সমাজের নৈতিক, বৌদ্ধিক ও বস্তুগত অগ্রগতিতে কোনোদিন সামিল হয়নি। বরং এই রাজপরিবার সমস্ত প্রগতিশীল পরিবর্তনের বিরোধিতা করেছে, সব দেশভক্তদের খুন করেছে এবং সব কল্যাণকর কাজের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছে। জনগণের সমস্ত বন্ধুর লাঞ্ছনা করে সমস্ত শত্রুর সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছে। বিভ্রান্ত ধর্মগুরুরা যতই গুণগান করুন না কেন, এই রাজপরিবারের জঘন্যতম অপরাধের কলঙ্ক কখনোই মুছে যাবে না। খুন, জালিয়াতি, ব্যভিচার, অজাচার, ডাকাতি, মিথ্যাচার — এইসব ঘৃণ্য দোষে দোষী এই রাজপরিবারের লোকেরা। পঞ্চম জর্জ এদেরই গর্বিত বংশধর।

“তাঁর রক্ত
বন্যার পরে বয়ে গেছে বজ্জাতদের মধ্যে”

যদি তিনি তাঁর সমস্ত রাজ অধিকার ত্যাগ করেন, আমরা তাঁকে তাঁর বাপ-ঠাকুর্দার অপরাধের দোষ দেব না। কিন্তু তিনি যতদিন সেই বংশের অধিকার ধরে রাখবেন, তাঁর বাপ-ঠাকুর্দার দোষের দায় তাঁকে নিতেই হবে।

সাথি শ্রমিকরা, নিজেদের শ্রেণির সম্মান রক্ষা করুন। এই রাজকীয় ব্রিটিশ কুচকাওয়াজ, এই বর্বর উচ্চশ্রেণি, এই ধুলো চাটা পুঁজিবাদী ঠগবাজ — এরা সব সমাজের অসুখের লক্ষণ। সেই অসুখ যা এই রাজার সফর নগ্নভাবে আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছে। কিন্তু রোগ সারানোর জন্য যেমন রোগের অস্তিত্ব স্বীকার করতে হয়, তেমন দুর্নীতির মূলে পৌঁছনো আমাদের কাজ। এই রাজার সফরে সব দুর্নীতির পাণ্ডারা একসঙ্গে এলে তাদের বন্ধুত্বের আসল চেহারা জনগণের সামনে পরিষ্কার হবে এবং আমাদের শ্রমের উপর বেঁচে থাকা ব্রিটিশ রাজতন্ত্র, জমিদার ও পুঁজিপতি শ্রেণিকে কীভাবে ধ্বংস করতে হয় — তা আমাদের বুঝতে সুবিধা হবে। তাদের ওয়ার্কশপ, জমি, মিল, কারখানা, জাহাজ, রেল আমাদের দখলে আসুক। কারণ আমরাই সেগুলো চালাই। পুঁজিবাদী মালিকানার জায়গায় জনগণের মালিকানা তৈরি হোক, সামাজিক গণতন্ত্র ভেঙে দিক সব রাজনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য এবং শ্রমের ক্ষমতা ধ্বংস করুক জন্মগত অধিকার ও পুঁজিবাদী রাজতন্ত্রের সমস্ত দেওয়াল।

আরো পড়ুন বরিস বিদায় ও যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

আমাদের শ্রেণির মধ্যে যারা এখনো এসব জানেন না, তাঁদের বোঝানো এবং গোলামি করা জনতার সমস্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক কুসংস্কার ভাঙাই আমাদের আশু কর্তব্য। আমরাই পারি সেই দিন আনতে, ‘৪৮ এর বীর দেশপ্রেমিক জোসেফ ব্রেনানের ভাষায়, যেদিন সারা বিশ্বে সৃষ্টি হবে

“The Right Divine of Labour
To be first of earthly things;
That the Thinker and the Worker
Are Manhood’s only Kings.”

কৃতজ্ঞতা: মার্কসিস্ট ইন্টারনেট আর্কাইভ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.