মিম আরাফত মানব ও রাজীব দাস

বাংলাদেশের সংবিধানের ইতিহাস খুব মসৃণ নয়। ১৯৭২ সালের গণপরিষদ বিতর্ক থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে শেখ হাসিনা আমলের নানা ‘অগণতান্ত্রিক’ সংশোধনী পর্যন্ত আমাদের সংবিধান দীর্ঘ ঘটনাবহুল যাত্রাপথ পেরিয়ে এসেছে। এদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় সংবিধান কিন্তু বারবার ব্যর্থ হয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠতে পারে, সংস্কার হলে তা কি কোনো অংশে আলাদা হবে? এই নিবন্ধে সেটাই আমাদের আলোচ্য বিষয়। সংবিধান সংস্কার কমিশন সম্প্রতি যে খসড়া প্রস্তাবটা এনেছে, তার ভিত্তিতেই আমরা এই আলোচনা করব।

সংস্কারের নেপথ্যে

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

গণঅভ্যুত্থানের পর গত অগাস্ট মাসে স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। সেই থেকে ৫৪ বছর বয়সী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি টালমাটাল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতালাভের পর থেকে, এদেশের শাসন পরিকাঠামো নানাভাবে বদলেছে। কখনো প্রেসিডেনশিয়াল রিপাবলিক, কখনো পার্লামেন্টারি রিপাবলিক, কখনো বা মিলিটারি ডিক্টেটরশিপ। প্রতিশ্রুতি দিয়েও পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে, হাসিনা তাঁর কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার জন্য বারবার ধিক্কৃত হয়েছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতায় এসেছিলেন যে মানুষটি, তিনিই পরবর্তীকালে দেশজুড়ে ধীরে ধীরে তৈরি করলেন একটি স্বৈরাচারী একদলীয় ব্যবস্থা। গণতন্ত্র সরে গিয়ে শুরু হল ব্যক্তিপুজোর অনুশীলন – পুজোর বেদিতে হাসিনার পরিবার। দল আর ব্যক্তি সমার্থক হয়ে গেল। যদিও ফ্যাসিবাদ বা কর্তৃত্ববাদের নির্দিষ্ট সংজ্ঞা হাসিনা সবসময় অনুসরণ করেননি, নিজের সুবিধামত মাঝেমধ্যেই বামপন্থী ও দক্ষিণপন্থী, দুই ধরনের রাজনৈতিক শক্তিকেই তুষ্ট রাখতে চেয়েছেন, কিন্তু তাতে দেশে বিচার-বহির্ভূত হত্যার সংখ্যা বা দুর্নীতি – কোনোটাই কমেনি, বরং অভাবনীয় হারে বেড়েছে। বিরোধী স্বরকে ক্রমশ দমন করার চেষ্টা হয়েছে। গত দশ বছরে কত মানুষকে যে গুম করা হয়েছে তার হিসাব নেই। এমনকি একটা সুষ্ঠু নির্বাচন অবধি হয়নি।

২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল। একই বছরে নির্বাচন হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, রাশিয়া, ইউরোপিয় ইউনিয়ন, মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতে – সব মিলিয়ে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু গণআন্দোলনের জেরে মাত্র সাত মাসের মধ্যেই একটা ‘নির্বাচিত সরকার’ এভাবে পড়ে যাওয়ার ঘটনা কিন্তু কেবল বাংলাদেশেই ঘটল। যদিও দেশের মানুষ জানতেন, ২০২৪ সালের নির্বাচন আসলে পুরোটাই ভাঁওতা। তবে নির্বাচনী ফলাফলের পক্ষে চীন, রাশিয়া আর ভারত এক সুরে গলা মেলাল – এমনটাও বোধহয় এই শেষবার ঘটল। যে গণআন্দোলন হাসিনাকে গদিচ্যুত করল, তার সূচনা কোটা সংস্কার আন্দোলন দিয়ে। কিন্তু সেনা-পুলিশের হাতে দু হাজারেরও বেশি ছাত্র ও সাধারণ নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলল। হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর স্বাধীন বাংলাদেশের একমাত্র নোবেলজয়ী মুহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে। এই সরকারে সমর্থন দিয়েছেন ছাত্র নেতৃত্বও।

এই অন্তর্বর্তী সরকার বর্তমানে কিছু সংস্কারমূলক কাজের দিকে মন দিতে চাইছে, যদিও এ কাজ খুব সাংবিধানিক নয়। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করা তাদের প্রধান কর্তব্য। গদিতে বসার পরে পাঁচ মাস অতিক্রান্ত, এর মধ্যে তারা তৈরি করেছে ছ-ছটা সংস্কার কমিশন। তার মধ্যে সংবিধান সংস্কার কমিশনের কাজই হল বাংলাদেশের নতুন সংবিধান রচনা করার জন্য কিছু জরুরি প্রস্তাব দাখিল করা। দুজন নাগরিকের কথায় কমিশন সম্প্রতি পুরো প্রস্তাবটাই নিজের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করেছে।

দুই কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ

কমিশনের দায়িত্বে আছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির বিশিষ্ট অধ্যাপক আলি রিয়াজ। ফলে তাঁর প্রস্তাবিত সংস্কারে যে মার্কিন প্রভাব থাকবে তা খুবই স্বাভাবিক। আপাতত তাঁর কমিটি একটা হাইব্রিড মডেলের প্রস্তাব রেখেছে। একটায় রয়েছে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব, অন্যটায় ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট ভোটিং। যে দেশে ক্ষমতার ভারসাম্য রাখার নীতি প্রায় নেই, সেখানে এই ধরনের দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রস্তাব নিঃসন্দেহে অভিনব। যা মনে হচ্ছে, একই সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে দুই কক্ষের সদস্যরা নির্বাচিত হবেন। এটা ঠিকই যে, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নীতি চালু হলে উচ্চকক্ষে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ কমবে। কিন্তু যদি আলাদাভাবে নির্বাচন করা যায় – যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সেনেট আর হাউজ অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসের নির্বাচন আলাদাভাবে হয় – তবেই দুটো কক্ষের নির্বাচনী ফলাফলে স্বাতন্ত্র‍্য বজায় থাকবে, তাদের ক্ষমতার মধ্যেও ভারসাম্য আসবে।

নতুন প্রস্তাব কি গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করবে?

সংস্কার প্রস্তাবটিকে পাশ করাতে গেলে সংসদের উচ্চ (যার নাম দেওয়া হয়েছে সেনেট) ও নিম্ন – দুই কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। এ পর্যন্ত সব ঠিকই আছে। কিন্তু শেষ ধাপে যখন গণভোটের ব্যাপার আসছে, সেখানে বলা হচ্ছে, ৫১% ভোট পেলেই চলবে। প্রস্তাবের এই অংশটি দেখে আমাদের সন্দেহ, মানুষকে ‘গণতন্ত্র ফিরছে’ বলা হলেও পুরোপুরি তা না-ও ঘটতে পারে।

সংবিধানের কুখ্যাত ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ সম্ভবত রদ হতে চলেছে। সেই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সাংসদ তাঁর দলের বিরুদ্ধে চাইলেও ভোট দিতে পারেন না। অর্থাৎ কার্যত তাঁরা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী বা বিরোধী নেতা, নেত্রীদের হাতের পুতুল। রাজা-রানি যেমন নাচাবে, তেমনি নাচতে হবে। দেরি করে হলেও এই প্রস্তাব সাংসদদের নিজের পছন্দ মত ভোটদানের অধিকার দিচ্ছে। একমাত্র ব্যতিক্রম অর্থ বিল। অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণের মত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কেন এমন অগণতান্ত্রিক পথে নেওয়া হবে – আমাদের দুজনের কাছেই তা বড় রহস্য। বিএনপি এর আগে ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। নিজের দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার অধিকার (ব্যঙ্গ করে যাকে ‘ঘোড়া কেনাবেচা’ বা ‘দলদ্রোহিতা’-ও বলা হয়) কেড়ে নেওয়ার এমন অগণতান্ত্রিক পরিসর যেখানে উপস্থিত, সঙ্গে যদি জড়িয়ে থাকে ‘অনাস্থা প্রস্তাব, অর্থ বিল, সংবিধান সংশোধনী বিল, এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়’, সেখানে কমিশনের প্রস্তাব মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। এই অনুচ্ছেদ ভারতীয় সংবিধানের ১০ নম্বর তফসিলের কথা মনে করায়। যদিও সেখানে কিছু অগ্রাধিকারের কথা বলা আছে, তাও অন্যান্য ‘গণতান্ত্রিক’ দেশগুলোর সংবিধান যা বলে তার তুলনায় এই অনুচ্ছেদ অনেকাংশে অগণতান্ত্রিক।

আরো পড়ুন আজ হঠাৎ বিপন্ন হয়নি ভারতের বহুত্ববাদী সংবিধান

নির্বাচনী প্রক্রিয়া যখন চলছে, সেইসময় প্রশাসন পরিচালনার জন্য একটা অন্তর্বর্তী সরকারকে স্থায়ী সমাধান হিসাবে গ্রহণ করার যে নীতি, যেখানে বিচারকরাই প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে বিবেচিত হবেন, তাতে আমরা অবাক তেমন হইনি, বরং দুঃখ পেয়েছি। যদি আমাদের সেই অগণতন্ত্রের উপরেই নির্ভর করতে হয়, সেখানে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদেরই বা কী অর্থ? আর এতরকম সংস্কারেরই বা কী প্রয়োজনীয়তা? যদি অনির্বাচিত নেতাদের হাতেই কিছু সময়ের জন্য ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয় – সেটা যত কম সময়ই হোক – সেক্ষেত্রে আমরা আশঙ্কা করছি ‘গণতন্ত্র ফিরছে’ প্রতিশ্রুতি শেষপর্যন্ত মুখের কথা হয়েই থেকে যাবে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়ার মত দেশে (যাদের ঔপনিবেশিক ইতিহাস মোটামুটি একই) নির্বাচনী প্রক্রিয়া যখন চলে, তখন জাতীয় সরকারের হাতে ক্ষমতা থাকে কম। বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে কিছুদিনের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হয় একটা তত্ত্বাবধায়ক বা অস্থায়ী অ্যাড হক সরকারকে। যুদ্ধ বা অভ্যুত্থানের মতো সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি হলে (যেমনটা বাংলাদেশের এই মুহূর্তে হয়েছে) তবেই অস্থায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রয়োজন পড়ে, দায়িত্বভার তুলে দিতে হয় ‘অনির্বাচিত’ প্রধান উপদেষ্টার হাতে। এই সার সত্য অস্বীকার করার চেয়ে কানাডা, অস্ট্রেলিয়ার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নীতি অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। আর যদি কোনো রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো দৃঢ় হয়, সেখানকার সাধারণ নির্বাচনকে কোনো অবস্থাতেই ‘সংকটময় পরিস্থিতি’ বলা যায় না।

এক সংস্কার থেকে আরও অনেক সংস্কার

ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পর এক মাস না হতেই আমাদের বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা ডঃ ইউনুস ঘোষণা করেছিলেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একজন ন্যায়পাল নিযুক্ত করা হবে। এটা একটা সাংবিধানিক পদ এবং সংবিধানের ৭৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যে কোনো মন্ত্রণালয় বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজকর্ম ন্যায়পাল খতিয়ে দেখতে পারেন, সে সম্পর্কে সংসদকে জানাতেও পারেন। এ ব্যাপারে তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পাবেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কেউ এই পদে আসেননি। কিন্তু অবাক করার মত ব্যাপার হল, খসড়া প্রস্তাবে ন্যায়পালের কোনো উল্লেখ নেই। এমনকি ইলেকটোরাল কলেজ সিস্টেমের অংশ হিসাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ডিস্ট্রিক্ট কো-অর্ডিনেটিং কাউন্সিলের যে ভূমিকা থাকবে, সেই প্রসঙ্গেও বিস্তারিত কিছু লেখা হয়নি।

প্রশ্ন অনেক। আঠেরো কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য নিম্নকক্ষে ৪০০ জন সদস্য কি আদৌ যথেষ্ট, নাকি সাংসদ সংখ্যা আরও বাড়ানো প্রয়োজন? যে শাসনব্যবস্থায় অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে সাংসদদেরও কোনো স্বাধীনতা থাকবে না, নির্বাচন চলাকালে প্রশাসনিক দায়িত্ব বর্তাবে অগণতান্ত্রিক নেতৃত্বের হাতে, সেই দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থাই কি চালু হবে? বাংলাদেশের বিপুল জনঘনত্বের একটা দেশের ফেডারেল পরিকাঠামো কি আরও শক্তিশালী করা হবে?

সংবিধানের ৭ নম্বর তফসিলটাকেই (১৯৭১ সালের স্বাধীনতা ঘোষণা) বা কেন সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে? নীতিমালা বদলের কথাই বা কেন বলা হচ্ছে? এসবও আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ অনেক দেশেই এমন কোনো ঘোষিত নীতিমালা নেই। তাতে রাষ্ট্রচালনায় বিশেষ অসুবিধাও হয় না। সেদিক থেকে সংবিধানে এই ধরনের নীতিমালার অন্তর্ভুক্তিই অদ্ভুত। আরও আশ্চর্যের বিষয়, যে তিনটে নতুন নীতির অন্তর্ভুক্তিকরণের কথা বলা হয়েছে (সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার) – প্রত্যেকটার উৎস কিন্তু ১৯৭১ সালের ওই ঘোষণাপত্র। এদিকে নতুন সংশোধনীতে সেটাকেই মুছে দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পূর্ববর্তী চারটে নীতির মধ্যে থেকে প্রস্তাবিত নীতিমালার পাঁচ নম্বরে জায়গা পেয়েছে কেবল গণতন্ত্র। এটা অবশ্য নতুন ঘটনা নয়। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতন্ত্রকে নীতি হিসাবে রাখার আকুতি এর আগেও দেখা গিয়েছে। তিন নতুন নীতি যে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র থেকে নেওয়া, তা তো বলাই হয়েছে। বাকি রইল প্রস্তাবিত চতুর্থ নীতি – বহুত্ববাদ। এখানেই চলে আসে আরেকটা প্রশ্ন। বহুত্ববাদ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে তার সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। এটা কি ধর্মনিরপেক্ষতার বিকল্প শব্দ? কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, বর্তমান সংবিধানের ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ বাদ দেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে আমাদের প্রশ্ন – এই অনুচ্ছেদের মধ্যে ‘কোনও বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বা তাহার উপর নিপীড়ন’ বিলোপের যে প্রতিশ্রুতি ছিল, নতুন এই বহুত্ববাদ নীতির নামে সে প্রতিশ্রুতি কি বহাল থাকবে? অবশ্য বর্তমান সংবিধানের ৮(২) নম্বর অনুচ্ছেদ বলছে, ‘এই সকল নীতি আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য হইবে না’। ফলে আমাদের অন্তত এটুকু সান্ত্বনা আছে যে ভবিষ্যতে যা-ই ঘটুক, বর্তমান অবস্থার চেয়েও খারাপ কিছু ঘটবে না।

যতটুকু আশার আলো

যদিও সংস্কার প্রস্তাবে রাষ্ট্রধর্ম সংক্রান্ত বিষয় সহ আরও অনেক বিষয়েই ফাঁক থেকে গিয়েছে, তবুও এতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ উত্থাপন করা হয়েছে। নাগরিকদের মৌলিক অধিকারকে ‘আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য’ করে তোলার সঙ্গত প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ১৯৭২ সালে সংবিধান রচনার সময়েই এ দাবি তোলা হয়েছিল, কিন্তু ধোপে টেঁকেনি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকারের কথাও উঠে এসেছে প্রস্তাবে। ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে গোটা বিশ্ব, এখনই এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সঠিক সময়। রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর জন্য সর্বাধিক দুবারের মেয়াদ-সীমা নির্ধারণ করে দেওয়ার যে প্রস্তাব আনা হয়েছে তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। জরুরি অবস্থা সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ ১৪১খ ও ১৪১গ (যে দুই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জরুরি অবস্থার সময়ে নাগরিকের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়) বাতিল করার প্রস্তাবও মানবাধিকারের প্রেক্ষিতে যথেষ্ট প্রশংসনীয়। যদিও নিম্নকক্ষের মোট আসনের ন্যূনতম ১০% আসন তরুণ-তরুণীদের জন্য সংরক্ষিত রাখার যে প্রস্তাব আনা হয়েছে, সেখানে ‘তরুণ-তরুণী’-র সংজ্ঞা নির্ধারণ কিসের ভিত্তিতে হবে তা আমাদের কাছে এখনো পরিষ্কার নয়। এমনকি আমাদের সংসদ ভবনে দুটো আলাদা কক্ষকে জায়গা দেওয়ার মত পর্যাপ্ত জায়গা আছে কিনা কিংবা ২০২৪ গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের সন্তুষ্ট করতেই সাংসদদের ন্যূনতম বয়স কমিয়ে ২১ করা হল কিনা – সেগুলো নিয়েও ধোঁয়াশা থেকে যাচ্ছে।

কিন্তু সব মিলিয়ে এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো আমাদের কাছে ইতিবাচক বলেই মনে হয়েছে। এখন আমরা মূলত চাইছি, যে সংস্কারের কথা বলা হয়েছে সেগুলো আমাদের দেশে প্রয়োগের জন্য কতখানি উপযুক্ত তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হোক, চর্চা হোক। হতে পারে সবকটা প্রস্তাব হয়ত পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম দেশগুলোর শ্রেষ্ঠতম নথিপত্র থেকেই অনুপ্রাণিত। কিন্তু তা যদি আমাদের দেশের প্রকৃত বাস্তবতার সঙ্গে না মেলে এবং গণতন্ত্রের পরিচায়ক না হয়, তাহলে ব্যাপারটা উলুবনে মুক্তো ছড়ানোর বেশি কিছু হবে না।

বড় মাত্রায় সংবিধান সংস্কারের এমন সুযোগ বারবার আসবে না। এই কমিশন যদি এবার প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারে, স্বৈরাচারী শাসককে গদিচ্যুত করলেন বাংলাদেশের সেসব ‘নক্ষত্রগণ’, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হওয়ার জন্য তাঁদেরই দোষের ভাগী হতে হবে।

মীম আরাফত মানব স্নাতকোত্তর স্তরের ছাত্র ও গবেষক, থাকেন আয়ারল্যান্ড ও স্পেনে। বর্তমানে কাজ করছেন ডিজিটাল মানবাধিকার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভরতা নিয়ে। রাজীব দাস পেশায় গবেষক ও সাংবাদিক, যুক্ত আছেন ইতালির ফ্লোরেন্সের ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউটে। মতামত লেখকদের

ভাষান্তর: সোহম দাস

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.