অনামিকা নন্দী

জুলাই গণঅভ্যুত্থান, ২০২৪ একটি তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। গণঅভ্যুত্থানের মুখে ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটেছে। একইসঙ্গে এই পতন রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সরকার এবং জনগণ সম্পর্কের কিছু নতুন বিষয় উন্মোচন করেছে। বিশেষ করে জনগণের উপর রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখতে সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা ক্ষুণ্ণ করেছে। ফলে ৫ অগাস্ট পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পুনর্গঠন একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে, যা অবশ্যই সময়সাপেক্ষ।

এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের উপর হামলার অতিরঞ্জিত, অবাস্তব, কাল্পনিক এবং ভিত্তিহীন খবর বাংলাদেশের সামাজিক সংহতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়কেও আরও বিপদে ফেলছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এই কৌশলী প্রচার মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ও বিভেদ সৃষ্টি করছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বাংলাদেশের হিন্দু জনগণের পশ্চিমবঙ্গে অভিবাসনের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯০৫ সালের পর থেকে হিন্দুদের যে অভিবাসন পশ্চিমবাংলায় ঘটেছিল, তা ১৯৪৭ পরব থেকে ত্বরান্বিত হয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর তা আরও তীব্র হয়। মুক্তিযুদ্ধের পর রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক হিংসায় আক্রান্ত হয়ে বহু হিন্দু বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে যান, যা পশ্চিমবাংলার স্মৃতিতে এখনো তাজা। সেই স্মৃতির কারণে বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর নির্যাতনের গল্প প্রচার করে পশ্চিমবঙ্গের জনগণকে প্রভাবিত করা অনেক সহজ। তবে ২০২৪ সালের বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে হিন্দু শরণার্থীর সেই চাপ ভারতকে নিতে হয়নি। অথচ ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই মুহূর্তে বাংলাদেশে হাজার হাজার হিন্দু অত্যাচারিত, আহত এবং নিহত হচ্ছেন। যদি বাস্তব পরিস্থিতি এর কাছাকাছিও হত, তবে ভারতের পক্ষে শরণার্থীর স্রোত ঠেকানো কঠিন হত।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুর হিসাব জটিল এবং রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, যা দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং কূটনৈতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রচার এবং নির্বাচনী কৌশলের অন্যতম বড় অস্ত্র সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা এবং সুরক্ষা। অথচ গত ১৫ বছরে হিন্দুদের বাড়িঘর, মন্দিরে অগ্নি সংযোগ ও সম্পত্তি দখলের ঘটনা নজিরবিহীন। জাতীয় দৈনিকগুলোর রিপোর্ট অনুযায়ী, শুধুমাত্র ২০২১ সালের দুর্গাপুজোতেই ৫১৭ খানা মন্দির এবং পুজো মণ্ডপে হামলা, ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। ১৩-১৭ অক্টোবর, মাত্র তিনদিনেই হামলা হয় ৭০-এর বেশি মন্দিরে। অথচ হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় গণমাধ্যম ৫ অগাস্টের আগে বাংলাদেশি হিন্দু সম্প্রদায়কে নিয়ে এত উদ্বেগ প্রকাশ করেনি। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার প্রশ্ন তাদের চিন্তার মূলে নেই। থাকলে একই ধরনের উদ্বেগ বিগত বছরগুলোতেও প্রকাশ করা হত।

সম্প্রতি ইস্কনের প্রাক্তন সদস্য চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতারের পরে ভারতে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ চালাচ্ছে বেশ কিছু হিন্দু সংগঠন। সেখানে বাংলাদেশে হাজার হাজার হিন্দুকে নির্বিচারে হত্যা, নারী ধর্ষণ, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার কথা উচ্চারিত হচ্ছে বারবার। একই বয়ান বিভিন্ন রাজনৈতিক ভাষণ, গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেও দেখা গেছে, যার একভাগও বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতির পরিচায়ক নয়। চিন্ময়কৃষ্ণের গ্রেফতারিকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে এক হিন্দু যুবকের নাম শোনা যায় এবং ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা হয় যে সে ইসকনের সদস্য, চিন্ময়কৃষ্ণের ঘনিষ্ঠ। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এ ব্যাপারে কোনো সংবাদ প্রকাশ করেনি, বরং সাইফুলকে চিন্ময়ের আইনজীবী হওয়ায় হত্যা করা হয়েছে বলে প্রথম সারির বেশ কয়েকটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম প্রচার করেছে, যা আদৌ সত্য নয়। সাইফুল চিন্ময়ের আইনজীবী ছিলেন না। একইভাবে গত ২৫ নভেম্বর ঢাকায় দুটি কলেজের ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষের একটি ভিডিও পোস্ট করে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর আক্রমণ হয়েছে। এই অতিরঞ্জিত, বিকৃত তথ্যের মাধ্যমে একদিকে মানুষের আবেগ উস্কে দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে এই ধরনের প্রোপাগান্ডা সম্মতি উৎপাদনের মাধ্যমে জনমত তৈরি করে সাম্প্রদায়িক বিভাজন গভীর করে তুলছে।

আরো পড়ুন অ্যাঙ্কর বয়কট আবশ্যিক কিন্তু পর্যাপ্ত নয়

ভারতীয় গণমাধ্যমের এই ভূমিকা কিন্তু সবচেয়ে বিপজ্জনক বাংলাদেশি হিন্দুদের জন্য। এর ফলে হিন্দু জনগণ স্থানীয় রাজনীতিতে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। একইভাবে জমি দখল, আর্থিক বৈষম্য এবং সাম্প্রদায়িক হামলার যেসব ঘটনা সত্যিই ঘটে, সেসবের সমাধান এবং বিচার ধামাচাপা পড়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তার সবচেয়ে বড় শিকার হয় আর্থিক ও সামাজিকভাবে তুলনামূলকভাবে দুর্বল হিন্দুরা। শাসকশ্রেণি ধর্মীয় চেতনাকে হাতিয়ার বানিয়ে বরাবরই জনতাকে বিভক্ত করে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে। এই প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্মীয় বিদ্বেষ এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির অনুঘটক হিসাবে কাজ করে। ফলে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা আরও বেড়ে যায়। তাই এই বিপদ যতখানি বাংলাদেশি হিন্দুর, ততখানি ভারতীয় হিন্দুরও।

ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের যে চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে তা শুধু অতিরঞ্জনই নয়, অপতথ্যে পরিপূর্ণ বানোয়াট এবং ভিত্তিহীন প্রোপাগান্ডা। এই বয়ান বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করার পাশাপাশি বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে টালমাটাল করে দিয়ে আধিপত্যবাদী আচরণ বজায় রাখারও এক কৌশল। এই কৌশল বৃহত্তর হেজিমনি প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা থেকে ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দলগুলো চর্চা করে থাকে, ভোটের রাজনীতি তো আছেই।

ফ্যাসিবাদের সবচাইতে বড় কৌশল হল মিথ্যা বয়ান তৈরি করে জনমত তৈরি করা। পরে সম্মতি উৎপাদনের মাধ্যমে সেই বয়ানকে জিইয়ে রাখা হয়। ফলে সরকার, প্রশাসন আর রাষ্ট্র যে আলাদা – জনগণ এই ধারণা ক্রমশ হারিয়ে ফেলে। একথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে জনগণের এক অংশকে অন্যের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থাকে টিকে থাকতে হয় আর মাঝখানে যদি কাঁটাতার থাকে, তাহলে ব্যাপারটা আরও সহজ হয়। পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের জনগণের এক ঐতিহাসিক আত্মিক বন্ধুত্ব রয়েছে, যা বহুকালের। তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা জনগণকেই নস্যাৎ করে দিতে হবে, কারণ এই সম্পর্কের ভিত্তি একে অপরের সংস্কৃতি। তাই যে জনগণ আর জি করের ঘটনায় মধ্যরাতে রাজু ভাস্কর্যের সামনে প্রতিবাদ জানায় অথবা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কলকাতায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে সংহতি মিছিল করে, আমরা সেই জনগণে আস্থা রাখি।

নিবন্ধকার বাংলাদেশি সাংবাদিক, বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণারত। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.