এক দেশ এক ভোট ব্যবস্থার জন্য অবশেষে লোকসভায় বিল পেশ করা হল। গত ১৭ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল লোকসভায় এই সম্পর্কিত দুটি বিল পেশ করেন। একটি লোকসভা ও সব রাজ্যের বিধানসভা ভোট একসঙ্গে করার জন্য সংবিধান সংশোধনী বিল। অপরটি লোকসভা ভোটের সঙ্গে কেন্দ্রশাসিত দিল্লি, পুদুচেরি, জম্মু-কাশ্মীরের বিধানসভা ভোট একসঙ্গে করার জন্য আইন সংশোধনী বিল। বিল দুটি পেশ করতে লোকসভায় ভোটাভুটি হয়। পক্ষে পড়ে ২৬৩ ভোট, বিপক্ষে ১৯৮। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সংবিধান সংশোধন করতে লোকসভা ও রাজ্যসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদের সমর্থন প্রয়োজন। বর্তমানে লোকসভায় এনডিএর সদস্য সংখ্যা ২৯৪, বিজেপির একার ২৪০। অন্তত ৩৬২ জনের সমর্থন না পেলে সংবিধান সংশোধনী বিলটি লোকসভায় পাস করানো যাবে না। রাজ্যসভাতেও যেখানে ১৫৮ জন সাংসদের সমর্থন প্রয়োজন, সেখানে বর্তমানে এনডিএর সদস্য সংখ্যা ১২৫। বিলটি এরপর যৌথ সংসদীয় কমিটিতে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।

প্রথম থেকেই বিজেপির এক দেশ এক ভোট নীতির বিরুদ্ধে বিরোধী পক্ষ সহ নানা মহল আপত্তি করে আসছে। দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গেই বিভিন্ন রাজ্যে বিধানসভা ভোট হয়েছিল। ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তেমনটাই হয়ে আসছিল। কিন্তু বিভিন্ন রাজ্যে অকংগ্রেসি সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলে যায়। রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে নির্বাচিত রাজ্য সরকার ভেঙে দেওয়া বা শাসক জোটের অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে বিভিন্ন রাজ্যে অন্তর্বর্তী নির্বাচনের প্রয়োজন পড়ে। মেয়াদ শেষের আগে লোকসভা ভেঙে দিয়ে অন্তর্বর্তী নির্বাচনের সূচনাও সেই সময়ে। ১৯৬৭ সালের নির্বাচনে গঠিত চতুর্থ লোকসভাও মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই ভেঙে দেওয়া হয়। কংগ্রেসের অন্তর্দ্বন্দ্বে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে সরকার অন্য দলের উপর নির্ভর করে চলছিল। নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গড়তে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই লোকসভা ভেঙে দিয়ে নির্বাচনের ডাক দেন। ১৯৭৭ সালে কেন্দ্রে প্রথম অকংগ্রেসি সরকার গঠিত হয়েছিল। সেই সরকার তিন বছরও টেকেনি। ১৯৮৯ সালের নবম লোকসভা টিকেছিল দেড় বছরেরও কম সময়। ১৯৯৬ সালের একাদশ ও ১৯৯৮ সালের দ্বাদশ লোকসভা দুবছরও অতিক্রম করতে পারেনি। সেইসময় কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান বক্তব্য ছিল – একমাত্র তারাই স্থিতিশীল সরকার দিতে পারে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

তারপর জাতীয় রাজনীতির পট অনেকখানি বদলেছে। এখন বিজেপি স্থিতিশীল সরকার দেওয়ার প্রচার করে। আর কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকার সুবাদে বিরোধী পক্ষ পরিচালিত রাজ্য সরকারগুলির উপর নানাবিধ চাপ সৃষ্টি করে। এমনকি গত দশ বছরে নির্বাচনে হেরে গিয়েও বিরোধী বিধায়ক ভাঙিয়ে রাজ্য সরকার গঠনের একাধিক নজির বিজেপি স্থাপন করেছে। জনমত নয়, যেনতেনপ্রকারেণ ক্ষমতায় আসাই হল রাজনৈতিক সাফল্য – এমন একটি ধারণা বিজেপি জনমানসে সৃষ্টি করতে চাইছে। সেই দল যখন এক দেশ এক ভোটের আওয়াজ তোলে, তখন তা সংসদীয় গণতন্ত্রের পক্ষে শুভ লক্ষণ নয়।

২০১৪ সালেই নরেন্দ্র মোদী এই আওয়াজ তুলেছিলেন। ২০১৮ সালে আইন কমিশন সারা দেশে পঞ্চায়েত থেকে লোকসভা ভোট একই বছরে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে করতে বলে। এর জন্য দেশের সংবিধান, জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, নির্বাচন সংক্রান্ত বিধিগুলি সংশোধনের প্রস্তাব দেয়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের নেতৃত্বে এই উদ্দেশ্যে একটি কমিটি গঠিত হয়। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে সেই কমিটি ১৮,৬২৬ পাতার রিপোর্টে এক দেশ এক ভোটের সুপারিশই করে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে লোকসভা ভোটের আগে এত দ্রুত রিপোর্ট প্রস্তুত করা থেকেই কমিটি গঠনের পিছনে আসল মতলব পরিষ্কার বোঝা যায়। বিজেপির, বিশেষত মোদীর, ইচ্ছাপূরণকে বৈধতা দিতেই ওই কমিটি গড়া হয়েছিল। কমিটি এর জন্য সংবিধানের বেশ কয়েকটি অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব দেয়। যার মধ্যে রয়েছে সংসদের মেয়াদ সংক্রান্ত ৮৩ নম্বর অনুচ্ছেদ, রাজ্য বিধানসভাগুলির মেয়াদ সংক্রান্ত ১৭২ নম্বর অনুচ্ছেদ, বিধানসভা নির্বাচনে সংসদের ক্ষমতা সংক্রান্ত ৩২৭ নম্বর অনুচ্ছেদ। লোকসভায় পেশ করা ১২৯তম সংবিধান সংশোধনী বিলে ওই অনুচ্ছদেগুলির বদলে ৮২এ নামে একটি নতুন ধারা যুক্ত করা হয়েছে। রামনাথ কোবিন্দ কমিটি পঞ্চায়েত ও পৌর ভোট এবং অভিন্ন ভোটার তালিকা ও ভোটার পরিচয়পত্র তৈরি করতে ভারতীয় নির্বাচন কমিশনকে ক্ষমতা দেওয়ার লক্ষ্যে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদগুলিরও সংশোধনের সুপারিশ করেছিল। এক দেশ এক ভোটের জন্য বিভিন্ন ধারা বদল এবং নতুন ধারা যোগ করে ১২৯তম সংবিধান সংশোধনী বিল তৈরি হয়েছে। যা গত ১৮ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনুমোদন পায়।

যৌথ সংসদীয় কমিটিতে গেলেও পরবর্তীকালে এই বিল পাস হওয়া সংখ্যাতত্ত্বের হিসাবে কঠিন। কিন্তু বিজেপি এ নিয়ে দেশজোড়া বিতর্ক চালাতে চায়। একসঙ্গে ভোটের প্রধান দুটি যুক্তি – বারবার ভোটে উন্নয়নের কাজ থমকে থাকা এবং ভোটের খরচ কমানো। আপাতদৃষ্টিতে দুটিই গ্রহণযোগ্য বলে মনে হতে পারে। নির্বাচনী বিধি বলবৎ থাকায় উন্নয়নের কাজ স্থগিত থাকুক – এমনটি কোনো নাগরিকই চান না। কিন্তু প্রশ্ন হল, সারাবছর সরকার উন্নয়নের কোন কাজ করে? সরকারের কাজ মানেই তো কর্পোরেট কর্তাদের স্বার্থরক্ষা করতে আমজনতার সর্বনাশ। সরকারি কাজে সাধারণ মানুষের কতখানি উপকার হয়? আর সেই কাজ ভোটের সময়ে কিছুদিন বন্ধ থাকলে আগে বা পরে করতে এমন কী ক্ষতি? ভোটে কাজের ক্ষতি, খরচের কথা জনমানসে ঢোকাতে পারলে ভোট ব্যবস্থা নিয়েই প্রশ্ন তোলার সুবিধা। বিজেপি ঠিক তাই চায়। ভোটে সরকারের পরিবর্তন ঘটলেও যে মানুষের অবস্থার খুব বেশি ইতিবাচক বদল ঘটে না, তা নাগরিকরা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারছেন। ভোটকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকা ব্যয়, প্রচারের জৌলুস সাধারণ মানুষ মেনে নিতে পারেন না। কিন্তু এসবের পিছনে দল হিসাবে বিজেপির অবদানও কি অস্বীকার করা সম্ভব? যারা নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার তহবিল গড়ে, তাদের কি এই নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানায়?

ভোটে সরকারের খরচ হয় কেন্দ্রীয় বাজেট বরাদ্দের মাত্র ০.০৯%। একসঙ্গে ভোট হলে ইভিএম বাবদ খরচ দ্বিগুণ হবে। নানা সরকারি বিজ্ঞাপন, অনুষ্ঠানের নামে ঘুরিয়ে দলীয় প্রচার এবং প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ শিল্পপতিদের নিয়ে ঘন ঘন বিদেশ সফরে কত খরচ হয়? ২০২৩ সালের জুলাই মাসে রাজ্যসভায় এক প্রশ্নের উত্তরে বিদেশমন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী ভি মুরলীধরন লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন, গত পাঁচ বছরে প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরে খরচ হয়েছে ২৫৪,৮৭,০১,৩৭৩ টাকা। সেই অধিবেশনেই রাজ্যসভায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুরের পেশ করা লিখিত জবাবে জানা যাচ্ছে, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৩-২৪ আর্থিক বছরের ১৩ জুলাই পর্যন্ত সরকারি নানা প্রকল্প ও কাজের বিজ্ঞাপন দিতে কেন্দ্রের খরচ হয়েছিল ৩০৬৪, ৪২,০০,০০০ টাকা।

বিভিন্ন সময়ে উপনির্বাচনে বাড়তি ব্যয় হয়। উপনির্বাচনগুলি কিন্তু সবসময় জনপ্রতিনিধির মৃত্যুর জন্য হয় না। বিধায়ক বা সাংসদ দলবদল করলে বা কোনো বিধায়ক সাংসদ হয়ে গেলে, সাংসদ বিধায়ক হয়ে গেলেও উপনির্বাচন করতে হয়। গত ১৩ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের ছটি বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন হল। সবকটিতেই নির্বাচিত বিধায়ক সাংসদ হওয়ায় এই উপনির্বাচন। তার মধ্যে আবার হাড়োয়ার বিধায়ক বসিরহাটের সাংসদ হওয়ার পরে মারা যান। এইসব উপনির্বাচনের ব্যয় রোধ করতে নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন। সংসদীয় গণতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করতেও তা প্রয়োজন। একজন দলীয় প্রার্থীকে মানুষ দল দেখে নির্বাচিত করেন। তিনি জনপ্রতিনিধি থাকা অবস্থাতেই দলবদল করা কি জনগণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা নয়? তাহলে তিনি পদত্যাগ করেই উপনির্বাচনে অন্য দলের প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে কেন পারবেন? আবার একজনকে বিধায়ক হিসাবে মানুষ নির্বাচিত করার পরেও তিনি কেন লোকসভায় দাঁড়াতে পারবেন? জনমতকে এভাবে অসম্মান করার সুযোগ যদি জনপ্রতিনিধির থাকে, তাহলে জনসাধারণ প্রয়োজনে পাঁচ বছরের আগেই প্রতিনিধি প্রত্যাহারের অধিকার পাবেন না কেন?

 

পঞ্চায়েত, পৌরসভা হল স্থানীয় সরকার। অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রকে স্বীকৃতি দিয়ে ১৯৯২ সালে সংবিধান সংশোধন করে সারা দেশে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়। পঞ্চায়েত পরিচালনায় জনসাধারণই মূল চালিকা শক্তি। লোকসভা ভোটের বছরেই পঞ্চায়েত, পৌরসভার ভোট করালে এর মূল উদ্দেশ্যই ধাক্কা খাবে।

 

গণতন্ত্রের বিস্তারে নাগরিকদের প্রতিনিধি প্রত্যাহার করার অধিকার (right to recall) এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গণভোটের দাবি অনেকদিন ধরেই উঠছে। গণতন্ত্র মানেই শুধুমাত্র মানুষের পাঁচ বছর অন্তর ভোটের অধিকার আর জনপ্রতিনিধিদের যা খুশি তাই করার অধিকার নয়। নিয়মকানুনের ফাঁকফোকর গলে যেভাবে বড় বড় রাজনৈতিক দল নির্বাচনকে ব্যয়বহুল করে ফেলছে তা গণতন্ত্রের পক্ষে শুভ নয়। কেন্দ্র বা রাজ্যে ক্ষমতায় থাকার সুবাদে কীভাবে শিল্প-বাণিজ্য মহলের থেকে অনুদান পাওয়া যায়, নির্বাচনী বন্ড তা পরিষ্কার করে দিয়েছে। আইন সংস্কার করে এই বিপুল অর্থ ব্যয় রোধের কথা কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার বলছে না। নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে দলগুলির ভোট প্রাপ্তির আনুপাতিক হারে বিধানসভা, লোকসভায় প্রতিনিধির সংখ্যা নির্ধারণের প্রস্তাব অনেকেই দিচ্ছেন। কারণ দেখা যাচ্ছে, অনেক দল তুলনামূলকভাবে কম ভোট পেয়েও বেশি আসনে জিতছে। আবার কেউ তার থেকে সার্বিকভাবে বেশি ভোট পেয়েও কম আসনে জিতছে বা কোনো আসনই পাচ্ছে না। এই প্রস্তাবের পক্ষে, বিপক্ষে নানা মত রয়েছে। এর ভাল, মন্দ দুদিকই রয়েছে। কিন্তু তা নিয়ে আলোচনার অবকাশ আছে। কেন্দ্রীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের কথা বলছে, অথচ সেই পথে হাঁটছে না। তাদের নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্য গণতন্ত্রের বিস্তার নয়, আরও কেন্দ্রীকরণ।

আরো পড়ুন বেহাল গণতন্ত্র বেহাত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে নির্বাচনী বন্ড

এক দেশ এক ভোট নীতির আসল লক্ষ্য সেটিই। পঞ্চায়েত, পৌরসভা হল স্থানীয় সরকার। অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রকে স্বীকৃতি দিয়ে ১৯৯২ সালে সংবিধান সংশোধন করে সারা দেশে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়। পঞ্চায়েত পরিচালনায় জনসাধারণই মূল চালিকা শক্তি। লোকসভা ভোটের বছরেই পঞ্চায়েত, পৌরসভার ভোট করালে এর মূল উদ্দেশ্যই ধাক্কা খাবে। যেখানে গ্রাম সংসদ, গ্রামসভাকে বিধানসভা, লোকসভার থেকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে গণতন্ত্রের বিস্তার প্রয়োজন, সেখানে লোকসভা ভোটের সঙ্গে একে জুড়ে দিলে তার স্বশাসন ক্ষমতাই কমে যাবে।

বিধানসভা, লোকসভা ভোটের চরিত্র আলাদা। বিধানসভায় যেমন রাজ্যের ইস্যু গুরুত্ব পায়, তেমন লোকসভায় দেশের ইস্যু। দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন নির্বাচনে বিভিন্ন দল বা জোটকে ভোট দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। তাই ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে জুনে হওয়া লোকসভা নির্বাচনের ফলের সঙ্গে অক্টোবরে হওয়া হরিয়ানা, নভেম্বরে হওয়া মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল একেবারেই মিলল না। একসঙ্গে ভোট হলে স্থানীয় বা রাজ্যের ইস্যু গুরুত্ব হারাতে পারে, আবার এর উল্টোও ঘটতে পারে। সাধারণভাবে একসঙ্গে ভোট হলে কেন্দ্রে যারা শক্তিশালী তাদেরই রাজ্যেও লাভ হয়। পঞ্চায়েত, পৌরসভা ভোটও সেই আবহে হলে অতি কেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যপূরণ হবে। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি সেই কাজকে আরও ত্বরান্বিত করবে। দশ বছরে নির্বাচন কমিশনের নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্ব দেশবাসী দেখতে পাচ্ছে।

একসঙ্গে লোকসভা, বিধানসভার ভোট হলে মাঝপথে অন্তর্বর্তী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংকট বাড়বে। কোনো রাজ্যে কোনো কারণে সরকারের পতন ঘটায় অন্তর্বর্তী নির্বাচন হলে নতুন সরকারের মেয়াদ কত বছরের হবে? বলা হচ্ছে, নতুন সরকারের মেয়াদ মধ্যবর্তী সময়টুকু থাকবে। অর্থাৎ চার বছরের মাথায় নতুন সরকার হলে তার মেয়াদ হবে মাত্র এক বছর। এক বছর পরে লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গে সেই রাজ্যে আবার বিধানসভা নির্বাচন হবে। তাহলে এতে খরচ কমবে না বাড়বে? সবচেয়ে বড় কথা, নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছর না থাকা কি বিধানসভা তথা রাজ্যবাসীর মতামতের পক্ষে সম্মানের? লোকসভার যদি অন্তর্বর্তী নির্বাচন হয় আর নতুন কেন্দ্রীয় সরকারের মেয়াদ স্বল্পকালীন হয়, তাহলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়বে।

 

কোনো রাজ্যে কোনো কারণে সরকারের পতন ঘটায় অন্তর্বর্তী নির্বাচন হলে নতুন সরকারের মেয়াদ কত বছরের হবে? বলা হচ্ছে, নতুন সরকারের মেয়াদ মধ্যবর্তী সময়টুকু থাকবে। অর্থাৎ চার বছরের মাথায় নতুন সরকার হলে তার মেয়াদ হবে মাত্র এক বছর। এক বছর পরে লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গে সেই রাজ্যে আবার বিধানসভা নির্বাচন হবে। তাহলে এতে খরচ কমবে না বাড়বে?

 

একসঙ্গে ভোট হলে ছোট দলগুলির সমস্যা আরও বেশি। কয়েকটি দলের মধ্যেই ভোট সীমাবদ্ধ থাকবে। যে দলগুলির মধ্যে মৌলিক নীতির হয়ত বিশেষ কোনো ফারাক থাকবে না। বিকল্প কণ্ঠস্বর কেন্দ্র বা রাজ্যের আইনসভায় তোলার সুযোগ কমবে। নির্বাচন মানে কেবল শাসক বা বিরোধী পক্ষ নির্ধারণ নয়। নানা মত আইনসভায় উত্থাপিত হওয়া গণতন্ত্রের পক্ষে শুভ। বহুদলীয় সংসদীয় ব্যবস্থা বিপন্ন হলে গণতন্ত্রই দুর্বল হয়। স্থায়ী সরকারের নাম করে কয়েকটি হাতে গোনা দলের মধ্যে গোটা সংসদীয় ব্যবস্থা সীমাবদ্ধ রাখার অপচেষ্টা নতুন নয়। অথচ ক্ষমতার লোভে যারা দলবদলে উৎসাহ দিয়ে নির্বাচিত বিরোধী পক্ষের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চায়, তারাই স্থিতিশীল সরকারের কথা বলছে। তাই দলবদল রোধ করার মত নির্বাচনী সংস্কারের পথে সরকার এগোচ্ছে না।

উন্নয়নের স্বার্থে বিভিন্ন স্তরে একই দল বা জোটের সরকার প্রতিষ্ঠা করার প্রচার ইদানীং বিশেষ মাত্রা পেয়েছে। বিজেপি যেমন ডবল ইঞ্জিনের সরকারের কথা বলে, অর্থাৎ কেন্দ্রে আর রাজ্যে একই দলের বা জোটের সরকার। এই রাজ্যেও তৃণমূল কংগ্রেস পৌরসভা বা পঞ্চায়েতে শাসক দলের জয় হলে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হওয়ার প্রচার করে। এইসব প্রচারের আড়ালে কায়দা করে একপ্রকার হুমকিও থাকে। রাজ্যে বিরোধী পক্ষের পৌরসভা, পঞ্চায়েতগুলিকে বঞ্চিত করে, চাপ দিয়ে আনুগত্য আদায় করা হচ্ছে। একই আচরণ কেন্দ্রের বিজেপি সরকার বিরোধী দল বা জোটশাসিত রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে করে। বিরোধীশূন্য করার এই ঝোঁক গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক। এক দেশ এক ভোট সেই পথকে আরও মসৃণ করবে। ভারতের মত বৈচিত্র্যময় দেশে, যেখানে বিভিন্ন দল, নানা রাজনৈতিক মত, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করে, সেখানে এক দেশ এক ভোট ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে সংবিধানের যুক্তরাষ্ট্রীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোকেই দুর্বল করবে।

বিজেপি আসলে তাই চায়। অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের আমলে নতুন করে সংবিধান রচনা করার কথা বলা হয়েছিল। মার্কিন ধাঁচে রাষ্ট্রপতিকেন্দ্রিক নতুন শাসনব্যবস্থার প্রচার শুরু হয়েছিল। আসলে দল নয়, সেখানে ব্যক্তিরই প্রাধান্য বাড়ে। গণতন্ত্রের পথেই স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আশঙ্কা থাকে। এক দেশ এক ভোট আসলে ভারতের সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে সেই পথে এগিয়ে চলার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্য গণতন্ত্রের বিস্তার নয়, সংকোচন।

 

বিজেপি যেমন ডবল ইঞ্জিনের সরকারের কথা বলে, অর্থাৎ কেন্দ্রে আর রাজ্যে একই দলের বা জোটের সরকার। এই রাজ্যেও তৃণমূল কংগ্রেস
পৌরসভা বা পঞ্চায়েতে শাসক দলের জয় হলে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হওয়ার প্রচার করে। এইসব প্রচারের আড়ালে কায়দা করে একপ্রকার হুমকিও থাকে।
রাজ্যে বিরোধী পক্ষের পৌরসভা, পঞ্চায়েতগুলিকে বঞ্চিত করে, চাপ দিয়ে আনুগত্য আদায় করা হচ্ছে। একই আচরণ কেন্দ্রের বিজেপি সরকার
বিরোধী দল বা জোটশাসিত রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে করে। বিরোধীশূন্য করার এই ঝোঁক গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক।

 

প্রতিটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বিধানসভার মতামত ছাড়া এক দেশ এক ভোট চালু করা সংবিধানের মূল সুরের বিরোধী। ভোট ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অংশীদার হলেন জনসাধারণ। তাঁদের মতামত ছাড়া কোনোভাবেই নির্বাচনী ব্যবস্থার বদল ঘটানো গণতন্ত্রবিরোধী। তাই সংসদ, রাজ্য বিধানসভাগুলিতে বিতর্ক হোক, আলোচনা হোক। তার সঙ্গে দাবি উঠুক এই বিষয়ে গণভোটের। শাসকের ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের নীতির বিরুদ্ধে গণভোটের দাবিই গণতন্ত্রের পরিসরকে বিস্তৃত করতে পারে।

মতামত ব্যক্তিগত

 

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.