প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে যাওয়ার পরে প্যালেস্তাইনের দখল নিয়েছিল ব্রিটেন। সেখানে ইহুদিরা ছিল সংখ্যালঘু আর সংখ্যাগুরু ছিল আরবের মানুষ। তার জেরে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে টানাপোড়েন বাড়তে শুরু করে। ১৯২০-র দশক থেকে ১৯৪০-এর দশক পর্যন্ত প্যালেস্তাইনে ইহুদি অভিবাসীর সংখ্যা লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে। ইহুদি নিধন যজ্ঞ শুরু হয় জার্মানিতে এবং তার জেরে তারা পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় প্যালেস্তাইনে। যদিও এমন তথ্য রয়েছে যে ইহুদিরা দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের আগেই প্যালেস্তাইনে আসা শুরু করেছিল। সেই পরিস্থিতিতে দুই গোষ্ঠীর (ইহুদি ও আরবীয়) মধ্যে সংঘাত যত বাড়ে, ইহুদিদের জন্য পৃথক দেশ গড়ে তোলার দাবিও তত জোরালো হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মার্কিন রাষ্ট্রপতি হ্যারি ট্রুম্যান ইজরায়েল রাষ্ট্র সৃষ্টি করে মধ্যপ্রাচ্যে এক মার্কিন অনুগত দেশ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। কারণ আমেরিকাতে প্রায় পাঁচ লক্ষ ইহুদি বসবাস করত, যাদের ভোট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ব্রিটেন প্যালেস্তাইন সমস্যায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ে এবং তাদের অফিসার ও সাধারণ মানুষ বিভিন্ন ধরনের অসুবিধার সম্মুখীন হয়। ফলে তারা ১৯৪৭ সালে প্যালেস্তাইন সমস্যা সমাধানের ভার সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের হাতে তুলে দেয়। জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভা প্যালেস্তাইন ভাগ করার প্রস্তাব দেয়। আরব লীগের সাতটি দেশ (লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ট্রান্স জর্ডন, সৌদি আরব, ইয়েমেন ও মিশর) ১৯৪৭ সালে কায়রোতে বসে সিদ্ধান্ত নেয় করে যে তারা আরবদের সহায়তা করবে। আরবরা কিন্তু ইহুদি অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে পারেনি এবং বহু আরবি মানুষ শেষপর্যন্ত প্যালেস্তাইন ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ইহুদিরা ১৯৪৮ সালের ১৪ মে প্যালেস্তাইনে ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করে। আমেরিকা অতি দ্রুত এই রাষ্ট্রকে সমর্থন করে, কারণ তৈলসম্পদে সমৃদ্ধ অঞ্চলে একটি অনুগত রাষ্ট্র থাকা তার বিশেষ প্রয়োজন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

১৯৪৯ সালে প্রথম আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ শেষ হয় এবং সেই যুদ্ধে ইজরায়েল জয়লাভ করে। লক্ষ লক্ষ প্যালেস্তিনীয় নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় বা তাঁদের উৎখাত করা হয়। একাধিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ঘরছাড়া হয়েছিলেন প্রায় ৭.৫ লক্ষ প্যালেস্তিনীয়। এই ঘটনাকে আরবী ভাষায় ‘আল নকবা’ অর্থাৎ বিপর্যয় হিসাবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। পশ্চিমী শক্তি ওই অঞ্চলটিকে তিন ভাগে বিভক্ত করে – ইহুদিদের ইজরায়েল, আরবের ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক এবং গাজা স্ট্রিপ। কিন্তু তাতে কোনো সমাধান হয়নি। শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়নি। পরবর্তীকালে একাধিক যুদ্ধের ফলে কেবল সংঘাতের মাত্রা কখনো বাড়ে, কখনো কমে। এই সংঘাতের বাতাবরণকে কাজে লাগিয়ে ক্রমশ নিজেদের শক্তি বাড়িয়েছে ইজরায়েল। অন্যদিকে প্যালেস্তাইনের আরবরা পার্শ্ববর্তী আরব রাষ্ট্রগুলোতে আশ্রয় নেয়। ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ ১৮ বার এদের দেশে ফেরার কথা বা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বললেও কোনো ফল হয়নি। আরবরা ইহুদি প্রভাবিত ইজরায়েলে ফিরতে রাজি হয়নি। ইজরায়েলে অবস্থিত আরব গ্রামগুলোতে ইহুদিরা হত্যালীলা শুরু করে। এর মধ্যে দুটো গণহত্যা খুব গুরুত্বপূর্ণ – কার্ফ বারিম ও হাইফা (১৯৫৩-৫৪) এবং কার্ফ হাসেম (১৯৫৬)।

১৯৬৪ সালে আরব লীগের বিশিষ্ট নেতা, মিশরের রাষ্ট্রপতি গামাল নাসেরের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় প্যালেস্তাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)। স্বাধীন প্যালেস্তাইন রাষ্ট্রের যুদ্ধরত সমস্ত সংগঠনগুলোকে এর আওতাভুক্ত করা হয়। তবে পিএলও গঠনের পর থেকেই তা মূলত আরব দেশগুলোর নেতৃত্বাধীন ছিল। জর্ডনের ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক বা গাজা দখলের মত ঘটনা প্যালেস্তিনীয় চেতনায় প্রথম বড় আঘাত হানে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে মিশর ইজরায়েলের হাতে পরাজিত হওয়ার পর পিএলওর দায়িত্ব আরবদের হাত থেকে প্যালেস্তাইনের হাতে চলে আসে। ১৯৬৯ সালে ইয়াসের আরাফত পিএলওর দায়িত্বভার তুলে নেন। সেইসময় জর্ডনে পিএলও সমান্তরাল সরকার গড়ে তুললে জর্ডনের রাজা হুসেন ১৯৭০ সালে পিএলও যোদ্ধাদের জর্ডন থেকে বিতাড়িত করেন। ফলস্বরূপ আরাফত পিএলও যোদ্ধাদের কার্যালয়কে লেবাননের বেইরুটে স্থানান্তরিত করেন এবং সেখান থেকেই ইজরায়েলের বিরুদ্ধে আক্রমণ চলতে থাকে। এই আক্রমণগুলোর মধ্যে কুখ্যাত হল ১৯৭২ সালে মিউনিখ অলিম্পিকের আসরে ১১ জন ইজরায়েলি ক্রীড়াবিদকে হত্যা করা হয়।

অনেকের মতে, গত ৮ অক্টোবর হামাস যে হামলা চালিয়েছে তাতে তৃতীয় ‘ইন্তিফাদা’-র সূচনা হল। আরবী ভাষার ইন্তিফাদা শব্দের অর্থ হল নাড়িয়ে দেওয়া। ১৯৮৭ সাল থেকে এই শব্দটা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে। কারো কারো মতে, ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক আর গাজায় ইজরায়েলের উপস্থিতির বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ গড়ে তোলা হয়েছিল, তা ব্যাখ্যা করতেই ইন্তিফাদা শব্দটা ব্যবহার করে প্যালেস্তিনীয়রা।

প্রথম ইন্তিফাদা শুরু হয় ১৯৮৭ সালে এবং চলে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত। দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সূচনা হয় ২০০০ সালে। দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শেষ হওয়ার পরেও ইজরায়েল আর প্যালেস্তাইনের সংঘাত কমেনি, বরং সে সংঘাত অন্য মাত্রা পায়। অনেকের মতে, এরপর থেকে প্যালেস্তাইনে নিজেদের উপস্থিতি ক্রমশ বাড়াতে শুরু করে ইজরায়েল। অন্যদিকে হামাস, পিএলওর মত সংগঠন ‘সন্ত্রাসমূলক’ কাজকর্ম বাড়াতে থাকে। ফলে যুযুধান দুই পক্ষের সংঘাতে প্যালেস্তাইন অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে।

হামাসের উৎপত্তি নিয়ে দু-চার কথা

১৯৮৭ সালে প্রথম ইন্তিফাদার সূচনার পর হারাকাত আল-মুকাওয়ামা আল-ইসলামিয়া (হামাস) তৈরি করেছিলেন প্যালেস্তিনীয় ধর্মগুরু শেখ আহমেদ ইয়াসিন। এরা প্যালেস্তাইনের বৃহত্তম বিচ্ছিন্নতাবাদী ইসলামিক গোষ্ঠী এবং ওই অঞ্চলের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল হিসাবে চিহ্নিত। বর্তমানে গাজা স্ট্রিপের ২০ লক্ষের বেশি মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে হামাস। এই সংগঠনকে জঙ্গি গোষ্ঠী হিসাবে চিহ্নিত করেছে ইজরায়েল, আমেরিকাসহ অন্য পশ্চিমী শক্তিগুলো। আটের দশকের শেষ লগ্নে তৈরি হলেও নয়ের দশকে ইজরায়েল ও পিএলওর মধ্যে স্বাক্ষরিত অসলো শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করেই হামাসের মূল শক্তিবৃদ্ধি। হামাসের বক্তব্য ছিল, শান্তিচুক্তিতে যে দ্বিরাষ্ট্র তত্ত্বের কথা বলা হয়েছে তাতে প্যালেস্তাইনের আদি বাসিন্দাদের অধিকার খর্ব হবে। সেই শান্তিচুক্তি বানচাল করার লক্ষ্যে একাধিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল হামাস। তার ফলে বহু ইজরায়েলির মৃত্যু হয়। ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বর মাসে তাদের এক প্রভাবশালী নেতার মৃত্যুর পর হামলার মাত্রা বাড়ায় হামাস। লাগাতার বিস্ফোরণের জেরে শান্তিচুক্তি থেকে ইজরায়েল সরে গিয়েছিল বলে দাবি করে রাজনৈতিক মহল। হামাসের দাপট ক্রমশ বাড়তে থাকে। ইজরায়েল এবং তার বন্ধুরা যেমন হামাসকে জঙ্গি সংগঠন হিসাবে চিহ্নিত করেছে, তেমনই হামাসকে মসীহা হিসাবেও দেখে থাকে অনেকে। প্যালেস্তাইনের ক্ষতির প্রতিশোধ নিতে হামাস যেভাবে হামলা চালায়, তার প্রতি বহু মানুষের সমর্থন আছে। হামাস গাজা স্ট্রিপে বসবাসকারী গরিব অসহায় মানুষকে সাহায্য করে বলেও অনেকের বক্তব্য।

আরো পড়ুন হামাস: অতীত থেকে বর্তমান, একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা

অসলো চুক্তি সত্ত্বেও ইজরায়েল ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের দখল ছাড়েনি বলে লাগাতার অভিযোগ ওঠে। ফলে ২০০০ সালে প্যালেস্তাইনের ইজরায়েলবিরোধিতা চরম আকার ধারণ নেয়। ইজরায়েলের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী এরিয়েল শ্যারন ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের তৃতীয় পবিত্র স্থান আল-আকসা মসজিদে পা রাখলে দলে দলে মানুষ রাস্তায় নেমে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে শামিল হন। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যে বিদ্রোহ শুরু হয়, ২০০৫ সাল পর্যন্ত তা স্থায়ী হয়। ২০০২ সালে ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক বরাবর দেওয়াল তোলা অনুমোদন করে ইজরায়েল সরকার। এর বিরোধিতা করতে বাধ্য হয় আন্তর্জাতিক ন্যায় আদালত এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। ২০১৩ সালে ইজরায়েল এবং প্যালেস্তাইন কর্তৃপক্ষের মধ্যে মিটমাট করাতে উদ্যোগী হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কিন্তু সেই শান্তি প্রক্রিয়া মাঝপথেই ভেস্তে যায়। কারণ শান্তিচুক্তির বৈঠক চলাকালীনই, ২০১৪ সালে প্যালেস্টাইনের তদানীন্তন শাসকদল ফতেহ, প্রতিদ্বন্দ্বী হামাসের সঙ্গে হাত মিলিয়ে জোট সরকার গঠন করার কথা ঘোষণা করে। মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড সংগঠনের শাখা হামাস প্যালেস্তাইনে রাজনৈতিক দল হিসাবে বিরাজ করলেও, হামাসকে ১৯৯৭ সালে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন বলে ঘোষণা করেছিল আমেরিকা। বলা বাহুল্য, প্যালেস্তাইনে হামাসের সরকারে আসা মনঃপুত হয়নি আমেরিকার। ফলে শান্তি আলোচনার সেখানেই ইতি, ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন সংঘাত ফের বেড়ে যায়।

এর পর ২০১৪ সালের ইজরায়েলি বাহিনী এবং হামাসের ব্যাপক যুদ্ধ শুরু হয়। ইজরায়েলের দাবি অনুযায়ী প্রায় ৩,০০০ রকেট ছোঁড়ে হামাস। পাল্টা ইজরায়েলি আক্রমণে কার্যত ধুলোয় মিশে যায় গাজা। সে বছর অগাস্ট মাসে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় বটে, তবে ততদিনে আনুমানিক ৭৩ জন ইজরায়েলি নাগরিক এবং ২,২৫১ জন প্যালেস্তিনীয় নাগরিকের মৃত্যু হয়েছিল। এর পর ২০১৮ সালে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ক্ষোভ, বিক্ষোভ চলাকালীন ১৮০ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন ছ হাজারের বেশি মানুষ। ২০২১ সালের অগাস্ট মাসে সংযুক্ত আরব আমিরশাহী এবং বাহরিন হস্তক্ষেপ করতে এগিয়ে আসে, শামিল হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমেত পশ্চিম এশিয়ার আরও কয়েকটা দেশ। আব্রাহাম চুক্তির প্রস্তাবও আনা হয়, কিন্তু প্যালেস্তাইন তাতে রাজি হয়নি। সে বছর অক্টোবরে ইজরায়েলের আদালত পূর্ব জেরুজালেম থেকে বেশ কিছু প্যালেস্তিনীয় পরিবারকে উৎখাতের নির্দেশ দেয়। তাঁদের জমিজমা, সম্পত্তি তুলে দিতে বলা হয় ইহুদিদের হাতে; বিক্ষোভ শুরু হয়। ২০২১ সালে এপ্রিল মাসে জেরুজালেমের রাস্তায় মানুষ আন্দোলনে নামের প্যালেস্তাইনের শেখ জারা থেকে ইজরায়েলিদের উৎখাত করার দাবিতে। রাতের পর রাত ধর্না চলতে থাকে, মে মাসে তাতে সিলমোহর দেয় আদালত। সেই সময় আল-আকসা মসজিদ চত্বরে পুলিসের বিরুদ্ধে গুলি, গ্রেনেড এবং রবার বুলেট ছোঁড়ার অভিযোগ ওঠে। শয়ে শয়ে প্যালেস্তিনীয় নাগরিক আহত হন। দ্রুত অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে অন্যত্রও। ক্রমশ তা সামরিক লড়াইতে পরিণত হয়। গোলাগুলি, বোমাবাজি, রকেট হামলার ঘটনা ঘটে, ২০ জন প্যালেস্তিনীয়ের মৃত্যু হয়। ইজরায়েল আকাশপথে হামলা চালায়। বোম ফেলে বসতি এলাকা, এমনকি শরণার্থী শিবির উড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। ২০২১ সালের মে মাসে ইজরায়েল এবং হামাস যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। দু পক্ষই নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করে। এই সংঘর্ষের প্রায় ৩০০ প্যালেস্তিনীয়ের মৃত্যু হয়, আহত হন প্রায় ২,০০০ মানুষ। গাজায় হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হয়। জাতিপুঞ্জের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় ৭২,০০০ প্যালেস্তিনীয় নাগরিক গৃহহীন হয়ে পড়েন। সাম্প্রতিকতম লড়াইয়ের কারণ গাজার সীমানা বন্ধ রাখা নিয়ে বিবাদের জেরে হামাসের ইজরায়েলে ঢুকে আক্রমণ।

ইজরায়েল-প্যালেস্টাইন সংঘাতে ভারতের অবস্থান

২০১৭ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইজরায়েল সফরে যান, পরের বছর ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ভারত সফরে আসেন। তাঁদের ঘনিষ্ঠতা তখন থেকেই দৃশ্যমান। ইজরায়েল রাষ্ট্রের মুসলমানবিরোধিতা সর্বজনবিদিত। সে ব্যাপারে মোদীর সরকারের অবস্থান নিয়ে তর্কের অবকাশ নেই। সেটাই ভারত সরকার আর ইজরায়েল সরকারের সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতার কারণ কিনা, সে প্রশ্ন অমূলক নয়। ভারতের বৈদেশিক নীতির ইতিহাস কিন্তু বলে, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ইজরায়েলের প্যালেস্তাইন দমননীতি সমর্থন করেননি। ১৯৬৭ সালে জাতিপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশনে ভারতীয় প্রতিনিধি সমর সেন স্পষ্ট করে বলেন, ভারত চায় ইজরায়েল প্যালেস্তাইনের যে জায়গাগুলো দখল করেছে সেখান থেকে সরে দাঁড়াক। ১৯৭৪ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী প্যালেস্তাইনের মুক্তি আন্দোলনের প্রতি (পিএলও) পূর্ণ সমর্থন জানান। ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও ইজরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নে স্বার্থে। এবারের ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন যুদ্ধে বরাবরের ধারা ভেঙে প্রধানমন্ত্রী মোদী সাত তাড়াতাড়ি এক্স সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করে ইজরায়েলের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। হামাসের আক্রমণকে সন্ত্রাসবাদী হামলা বলে আখ্যা দিয়ে দ্বিরাষ্ট্র তত্ত্বের প্রতি ভারতের বরাবরের যে সমর্থন তা থেকে সরে এসেছেন। অবশ্য বৃহস্পতিবার ভারত সরকারের বিদেশমন্ত্রক যে বিবৃতি দিয়েছে তাতে আবার সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে বলেও প্যালেস্তাইনের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন জানানো হয়েছে।

বর্তমান আন্তর্জাতিক সংকটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা প্যালেস্তাইন-ইজরায়েল সংকটের সমাধান তো হচ্ছেই না, উলটে সমস্যা দিনদিন বেড়ে চলেছে। একদিকে পশ্চিমী রাষ্ট্রগুলোর ভাষায় ইজরায়েলের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, অন্যদিকে প্যালেস্তাইনের মানুষের নিজভূমে নিরাপদে বসবাসের স্বপ্ন – এই দুইয়ের মধ্যে বরাবরই শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো ইজরায়েলের দাবিকেই বেশি সমর্থন দিয়ে থাকে। ফলে প্যালেস্তাইনের মানুষের কান্না আর হাহাকারে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠলেও তাদের স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.